


সুজাতা গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রকে আত্মস্থ করলেন যেন তার পুত্র রতিকান্ত মহাপাত্রের থেকেও বেশি। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র তাঁর ওড়িশি নৃত্যের প্রচারকে কলকাতা থেকে এমনভাবে বিস্তার করেছিলেন যে, সেই নৃত্যে এক কলকাতা-কেন্দ্রিকতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই কেন্দ্রিকতাকে এক লপ্তে যিনি ছিন্ন করেছিলেন, তাঁর নাম সুজাতা মহাপাত্র। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের সমস্ত ওয়ার্কশপে তিনি হতেন প্রধান নৃত্যশিল্পী।
‘বিস্তারি পাটি খাইলা মাটি
মা যশোমতি ছাতরে পিটি
আকট তেথরে কাপে ত ভিতরে
অশেষ ব্রহ্মাণ্ড দেখাইলাটি…’
ওড়িশার মধ্যযুগের কবি বনমালী দাস একটি গান রচনা করেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের নানারকম লীলা বর্ণনা করে। সেই লীলায় এক বৃন্দাবনবাসিনী তাঁর বান্ধবীকে জানাচ্ছেন যে, যশোদার ছোট্ট পুত্রটির নানারকম দুষ্টুমি নজরে পড়ছে। সেই ‘টিকি পিলাটি’ অর্থাৎ, বালকৃষ্ণ পুতনাকে বধ করেছে, শকটাসুরকে মেরেছে, কালীয়নাগের মাথায় চড়ে নেচেছে। তারপর ষষ্ঠ স্তবকে এসে কবি বিস্তারিত বলছেন যে, একবার মা যশোমতি ঘরে ফিরে দেখলেন– শিশু কৃষ্ণ মাটি খেয়ে ফেলেছে। তিনি যখন তাকে মুখ খুলতে বলছেন, তখন সেই হাঁ-মুখের দিকে তাকিয়ে মা যশোদা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করলেন! এর একটু আগেই যে মা যশোদা, কৃষ্ণকে প্রায় লাঠিপেটা করেছেন, তিনি তার মুখে অশেষ ব্রহ্মাণ্ড লক্ষ করে ভক্তিতে গদগদ হয়ে উঠলেন।

বনমালী দাসের এই গানের ওপর ভিত্তি করে ওড়িশি নৃত্যের বিভিন্ন নৃত্যগুরু অভিনয় নির্মাণ করেছেন, যাঁদের মধ্যে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র অন্যতম। ‘কেড়ে ছন্দ জানিল সখি’ নামক গানটির ওপরে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র রচিত অভিনয়টির সবথেকে সুন্দর নিদর্শন বোধহয় আমরা পেয়েছি, তাঁরই ছাত্রী ও পুত্রবধূ শ্রীমতি সুজাতা মহাপাত্রের নৃত্যে। সমগ্র গানের অভিনয়টির কথা যদি ছেড়েও দিই, ঠিক এই জায়গাটাতে এসে; একদিকে বালকৃষ্ণের অভিনয়, অন্যদিকে মা যশোদার অভিনয় এবং সেই সময়টা যখন মা যশোদা শ্রীকৃষ্ণের হাঁ-করা মুখটির দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করছেন, দেখতে পাচ্ছেন শ্রীবিষ্ণুকে, ব্রহ্মা, মহেশ্বর এবং অন্যান্য দেবদেবতাদের এবং বিস্ফারিত দু’নয়ন তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভক্তিতে ক্রন্দনরত হয়ে পড়ছে– এই অভিব্যক্তি অসাধারণ বললে কম বলা হয়।

গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের শিষ্যভাগ্য ছিল ভীষণরকম উজ্জ্বল। প্রথম জীবনে তিনি ছাত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন শ্রীমতি সংযুক্তা পানিগ্রাহীকে। তিনি, সংযুক্তা পানিগ্রাহী এবং তাঁর স্বামী গায়ক রঘুনাথ পানিগ্রাহী– এই তিনজনের যে একটি ছোট দল তৈরি হয়েছিল, তাতে ওড়িশি নৃত্যের একটি বিশেষ দিগন্ত খুলে গিয়েছিল।
গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ১৯৬৬ সালে ‘সংগীত নাটক আকাদেমি’ পুরস্কার প্রাপ্তির আগে প্রায় একজন অচেনা নৃত্য-শিক্ষক ছিলেন। সেই পুরস্কার প্রাপ্তির অনুষ্ঠানে, তাঁর ছাত্রী সংযুক্তা যখন দিল্লিতে ওড়িশি নৃত্য পরিবেশন করেন, তখন সমালোচক ও গুণগ্রাহীরা একটি নতুন শাস্ত্রীয় নৃত্যের দর্শন পান। সংযুক্তা পানিগ্রাহী মাত্র চার বছর বয়সে কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে ওড়িশি নৃত্য শুরু করলেও, পরবর্তীকালে চেন্নাইয়ের ‘কলাক্ষেত্র’ নৃত্য-শিক্ষালয়ে স্বয়ং রুক্মিণী দেবী অরুন্ডলের কাছে ভরতনাট্যম শিক্ষা করেন। সেখানে ছ’-বছর নৃত্য-শিক্ষার পরে ‘নৃত্য প্রবীণ’ ডিপ্লোমা নিয়ে তিনি পাশ করেন। তারপর একটি স্কলারশিপে গুরু হাজারিলালের কাছে কথক নৃত্য শুরু করেও তা ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন ওড়িশাতে। সেই যে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে ওড়িশি নৃত্য শুরু করেন, তারপর আর থামেননি।

দিল্লির শিল্পীমহলে তাঁর ওড়িশি নৃত্য এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, সংযুক্তা পানিগ্রাহীকে দেখে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের মহিমা সকলে উপলব্ধি করেছিলেন। ছাত্রী যদি এমন হয়, তবে তার গুরু কেমন হতে পারেন! এইরকম এক ভাবনায় কেলুচরণ মহাপাত্র ‘গুরু’ হিসেবে এক বিরাট প্রাধান্য লাভ করেছিলেন। সংযুক্তা পানিগ্রাহীর নৃত্য যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন, গতিময়তার দিক থেকে তৎকালীন ভরতনাট্যম কিংবা কুচিপুড়ির সঙ্গে তুলনা করলে, সেই বিশেষ নৃত্য খুব একটা আলাদা নয়। সংযুক্তা পানিগ্রাহীর পদচারণা, মুদ্রা ধারণ এবং অভিনয় দেখলে মনে হত– ওড়িশি নৃত্য শাস্ত্রীয় দিক থেকে যেন বা ভরতনাট্যমেরই ভগিনী। সকলে মনে করেছিলেন যে, ওড়িশি নৃত্য সংযুক্তা পানিগ্রাহী যেভাবে করে দেখান, যেভাবে প্রদর্শিত করেন– গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের প্রকরণ ও শিক্ষাপ্রণালী ঠিক সেরকমই।
কিন্তু তারপর গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জীবনে গুরু এবং ওড়িশি নৃত্যের প্রচারক হিসেবে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয় এই কলকাতা শহরে। এ-শহরের উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরা তাঁর কাছে বিশিষ্ট নাট্যকার শ্যামানন্দ জালান প্রতিষ্ঠিত ‘পদাতিক’-এ ওড়িশি নৃত্য শিখতে শুরু করেন। তখন গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ছাত্রীরা, প্রধানত সকলেই বাঙালি– সে সুতপা তালুকদার হোন কিংবা শর্মিলা বিশ্বাস। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ওড়িশি নৃত্য মানেই সুন্দরী লাস্যময়ী বাঙালি নারী। দলে দলে বাঙালি ছেলেমেয়েরা গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ওড়িশিতে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এমন বললে অত্যুক্তি হয় না যে, ওড়িশি নৃত্যের একটি কলকাতা-কেন্দ্রিকতা তৈরি হয় এক সময়।

কেলুচরণ মহাপাত্র ভুবনেশ্বরে তাঁর ‘সৃজন’ নৃত্য শিক্ষালয়টি তৈরি করেন ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৭ সালে ক্যানসারে অকালমৃত্যু হয় সংযুক্তা পানিগ্রাহীর। সুতপা তালুকদার ওড়িশি নৃত্যে একটি নাম হিসেবে প্রতিভাত হন। শর্মিলা বিশ্বাস গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের প্রকরণের সঙ্গে সঙ্গে আরও গবেষণার মাধ্যমে একটি অভিনব ওড়িশি নৃত্য আঙ্গিক তৈরি করেন নিজের মতো করে। এদিকে পৌষালী মুখার্জী, যিনি কলকাতায় গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের প্রথমদিকের ছাত্রী এবং নৃত্যশিল্পের পাশাপাশি একজন খুব ভালো মৃদঙ্গবাদক ছিলেন, তিনি রবীন্দ্রভারতীর সাহায্যে একটি ক্যাসেট কোম্পানি থেকে ওড়িশি নৃত্যের অনেকগুলি পদ আছে, এমন একটি ক্যাসেট বের করেন। তাতে ‘মঙ্গলাচরণ’, ‘বটু’, ‘বসন্ত পল্লবী’, ‘সাবেরী পল্লবী’, ‘হরিরিহামুগ্ধা’ এবং ‘দশাবতার’ অভিনয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই ক্যাসেটটি সমগ্র বাংলায় ওড়িশি নৃত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
যে-কোনও ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষাপ্রণালীর ভিতরে ঢোকার আগে ওই ক্যাসেট থেকেই প্রায় রবীন্দ্রনৃত্য তোলার মতো ওড়িশি নৃত্য শিখতে শুরু করে। অলিগলিতে গজিয়ে ওঠে ওড়িশি নাচের ইশকুল। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র তখন ওয়ার্কশপ করাতে কলকাতায় মাঝে-মধ্যে আসেন। আর সে-নৃত্যের গভীর শিক্ষার জন্য যদি কেউ ইচ্ছুক থাকত, তাদের যেতে হত গুরুজির কটক কিংবা ভুবনেশ্বরের নৃত্য শিক্ষাকেন্দ্রে। ঠিক এই সময়ে বলা চলে, উল্কার গতিতে ওড়িশি নৃত্যের আঙিনায় পদার্পণ করেন সুজাতা মোহান্তি।

বালেশ্বরের মেয়ে সুজাতা, প্রথম দিকে গুরু সুধাকর সাহুর কাছে ওড়িশি নৃত্য শুরু করেন। তারপর ১৯৮৭ সাল নাগাদ তিনি ভুবনেশ্বরে আসেন ‘ওড়িশি রিসার্চ সেন্টার’-এ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের কাছে নৃত্য-শিক্ষা করবেন বলে। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ওড়িশি নৃত্যের যে-প্রকরণ প্রথম দিকে নির্মাণ করেছিলেন, যে-প্রকরণ সংযুক্তা পানিগ্রাহী, সুতপা তালুকদার, শর্মিলা বিশ্বাস, আলোকপ্রভা কানুনগো, রিনা জানা, নন্দিনী ঘোষাল, কাকলি বোস, দেবমিত্রা সেনগুপ্ত কিংবা মায়া ভট্টাচার্যরা শিখেছিলেন– সেই প্রকরণ তিনি নিজেই বদলে দিতে শুরু করেন সুজাতার মধ্যে দিয়ে। এই নব প্রকরণে ওড়িশির নৃত্যে গতিময়তা যেন খানিক কম। প্রকৃত চৌকায় সেই নাচ না হয়ে অর্ধচৌকাতে এই নৃত্য কেন্দ্রস্থ হল। হাতের মুদ্রা, চোখের অভিনয় এমনকী হাসিটুকু পর্যন্ত হয়ে উঠল এক জ্যামিতিক জগৎ। মন্দিরগাত্র থেকে উদ্ভূত ওড়িশি নৃত্য যেন আরও গভীর হল এবং মঞ্চে যখন নৃত্যশিল্পী হাজির হলেন, তখন দেখা গেল ভরতনাট্যম থেকে এই নৃত্য একেবারে আলাদা, মাহারি নৃত্য থেকে এই নৃত্য পুরোপুরি পরিবর্তিত!
এই নতুন প্রকরণের স্নিগ্ধতা অপরিসীম; এমনকী সংযুক্তা পানিগ্রাহীকে আমরা যখন মঞ্চে দেখেছি, তিনি অনেক সময় ওড়িশি নৃত্যের পোশাকে বিনুনি করতেন। কিন্তু নতুন এই ধারায় পোশাক, সাজগোজ– সবেতে একটা ভিন্ন মাত্রা সংযুক্ত হল। ওড়িশি মানে একটা খুব সাংঘাতিক গতি বা শক্তি প্রদর্শনের নাচ নয়, ওড়িশির নতুন অর্থ হল– একটি শান্তিময়তা, একটি ঈশ্বরীয় উপস্থিতি, যা দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। তা বলে কি তাতে কোনও ছন্দ ছিল না? তাল ছিল না? সবই ছিল। কিন্তু এক অমলিন পেলবতা এই নাচের মধ্যে উপস্থিত হল এবং এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন দেখা গেল সুজাতার নৃত্যে। মোহান্তি থেকে সুজাতা মহাপাত্র হলেন কেলুচরণ মহাপাত্রের পুত্র রতিকান্তকে বিবাহ করে। একটি পারিবারিক সূত্র তৈরি হল, যা গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র, তাঁর পুত্র রতিকান্ত এবং পুত্রবধূ সুজাতা এগিয়ে নিয়ে গেলেন।

সুজাতা গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রকে আত্মস্থ করলেন যেন তার পুত্র রতিকান্ত মহাপাত্রের থেকেও বেশি। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র তাঁর ওড়িশি নৃত্যের প্রচারকে কলকাতা থেকে এমনভাবে বিস্তার করেছিলেন যে, সেই নৃত্যে এক কলকাতা-কেন্দ্রিকতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই কেন্দ্রিকতাকে এক লপ্তে যিনি ছিন্ন করেছিলেন, তাঁর নাম সুজাতা মহাপাত্র। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের সমস্ত ওয়ার্কশপে তিনি হতেন প্রধান নৃত্যশিল্পী। গুরুজি যা চাইতেন, তা প্রদর্শন করে দেখাতেন সুজাতা। দেশে-বিদেশে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের ওড়িশি নৃত্যের সমস্ত রকম প্রকরণ বিধৃত হত সুজাতা মহাপাত্রের নৃত্যের মাধ্যমে। ওড়িশি নৃত্যের এমন কোনও প্রকোষ্ঠ ছিল না, যেখানে সুজাতা মহাপাত্র একটি অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে প্রতিভাত হননি। তিনি যখন ‘মঙ্গলাচরণ’ করেন, মনে হয় সেই নৃত্যের আরাধিত দেবতাটি তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন! তিনি যখন স্থায়ী ‘বটু’ নৃত্য করেন, তখন মনে হয় মন্দির গাত্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্য বিবৃত হচ্ছে সুজাতার শরীরী বিভঙ্গের মাধ্যমে। তিনি যখন ‘পল্লবী’ করেন (সোশাল মিডিয়ায় তাঁর প্রচুর ‘পল্লবী’ নৃত্যের পরিবেশনা পাওয়া যায়), সে-নৃত্যের প্রতিটি চারি, প্রতিটি পদচালন, প্রতিটি মুদ্রা– সেই বিশেষ রাগটিকে ভীষণ রকম পল্লবিত করতে সাহায্য করে।
তাঁর অভিনয়ের কথা প্রথমেই বলেছি। ‘কেড়ে ছন্দ জানিল সখি’ ছাড়াও গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র-কৃত সমস্ত অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বোধহয় সুজাতা মহাপাত্রের নৃত্যেই ধরা আছে। তাঁর ‘সখী হে’ অভিনয়টির কথা আলাদা করে বলতেই হয়। এই অভিনয়তে প্রেমিকা যখন তার প্রেমাস্পদের হাতটি ধরে টানেন, কিংবা তারপরেই প্রেমিকের এক কাঁধে কর্কট মুদ্রায় দু’হাত রেখে মিষ্টি করে একটা হাসি ছুড়ে দেন, তখন মনে হয়, কী ঐশ্বরিক মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছে! সবথেকে বড় কথা, যিনি ওড়িশি নৃত্য সম্বন্ধে কিছু জানেন না, তিনিও যদি সুজাতা মহাপাত্রের নৃত্য দেখেন বা তাঁর অভিনয় খেয়াল করেন, তবে সেই অভিনয়ের কাহিনিটি যেন সুস্পষ্টরূপে তাঁর চোখের সামনে ধরা দেয়।

যে-কোনও শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীর এমন সিদ্ধি, যা অপ্রশিক্ষিত দর্শকেরও সহজবোধ্য, তার জুড়ি মেলা ভার। ওড়িশি নৃত্যের কলকাতা-কেন্দ্রিকতা মুছে দিয়ে সুজাতা উল্টোদিক থেকে এই কলকাতাতেই তাঁর নৃত্যের মাধ্যমে এমন এক ফ্যানবেস আজ তৈরি করে নিয়েছেন যে, শুধু এ-শহর কেন, দেশের যে-কোনও প্রান্ত থেকে ওড়িশি নৃত্যশিক্ষা করতে আসা নতুন ছাত্র-ছাত্রী যদি তার সামনে কোনও আদর্শ দেখতে চায়, তবে তাকে সুজাতা মহাপাত্রের দিকে তাকাতেই হবে। এই মুহূর্তে ভারতে ওড়িশি নৃত্যের নানারকম আঙ্গিক ও প্রকরণ আছে। কিন্তু গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের বিশিষ্ট প্রকরণের যদি আজও অপরিমেয় জনপ্রিয়তা থেকে থাকে, তার সিংহভাগ সুজাতা মহাপাত্রের প্রাপ্য, এমন বললে অসত্য হয় না।

আরেকটি ব্যাপারেও সুজাতা মহাপাত্র তুলনাহীন। তাঁকে যখন সাধারণভাবে আমরা দেখি, তাঁর শ্যামলা গায়ের রং, মলিন পোশাক ও মাতৃভাষা প্রভাবিত ইংরেজি কথা ভীষণ রকম অনাকর্ষণীয় লাগে। কিন্তু তিনি যখন মেকআপ নিয়ে, ওড়িশি নৃত্যের পোশাকে মঞ্চে এসে দাঁড়ান, তাঁর মঞ্চ উপস্থিতির ঔজ্জ্বল্য চারিদিকে বিচ্ছুরিত হয়। তাঁর সান্নিধ্যের এই জাদু দর্শককে আরও প্রভাবিত করে।

একক নৃত্যশিল্পের পাশাপাশি, সুজাতা মহাপাত্র আজ গুরু কেরুচরণ মহাপাত্রের ওড়িশি নৃত্যপ্রকরণের একজন বরিষ্ঠ গুরু। বালেশ্বরের সেই কৃষ্ণাঙ্গী নৃত্য-শিক্ষার পাশাপাশি ওড়িয়া ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্সও করেছেন। গুরু ও শ্বশুরমশাই– কেলুচরণ মহাপাত্রের নৃত্য তো বটেই, তাঁর স্বামী রতিকান্ত মহাপাত্রেরও বিভিন্ন নির্মাণের প্রধান চরিত্র আজও হয়ে ওঠেন তিনিই। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র যে-বছর (১৯৬৬) ‘সংগীত নাটক আকাদেমি’ পুরস্কার পান, তখন সুজাতার বয়স মাত্র দুই। ৫০ বছর পর সংগীত নাটক আকাদেমি এই পুরস্কারে তাঁকেও ভূষিত করে।
আজ ২৭ জুন। সুজাতা মহাপাত্রের জন্মদিন। তাঁর নৃত্যশিল্পের প্রতি রইল বহুকোটি প্রণাম।
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ভাস্কর মজুমদার-এর অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved