


আজ কেয়া চক্রবর্তীর জন্মদিন। কেয়া চক্রবর্তী ও শাঁওলী মিত্রের দীর্ঘদিনের নাট্য-আত্মীয়তা। সেই স্মৃতির খানিক ‘কেয়াদির কথা’ নামে লিখে রেখেছিলেন শাঁওলী মিত্র। জন্মদিনে সেই অপ্রকাশিত গদ্যটি প্রকাশ করল রোববার.ইন।
কৃতজ্ঞতা: শৈবাল বসু
কেয়াদি যে তাঁর সময়ের এক অনন্যা নারী ছিলেন, তা আমাদের মতো থিয়েটারকে ভালোবাসার মানুষরা প্রত্যেকেই জানেন। তবে এত দীর্ঘদিন আগে তিনি চলে গিয়েছেন আমাদের ছেড়ে যে, বর্তমান যুগের ছেলেমেয়েরা তাঁর সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকিবহাল বা জানতে আগ্রহী, তা-ও আমি জানি না। সম্প্রতি একটি সিনেমা হয়েছিল ‘সিনেমার মতো’। সেই ছবি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা হয়তো খানিকটা আভাস পেয়েছেন। দু’টি বইও প্রকাশিত হয়েছে তাঁকে ঘিরে।

আমি শুধু বলতে চাই আমি তাঁকে কীরকম দেখেছি। আমার তখন খুবই অল্পবয়স। যখন ‘রক্তকরবী’ নাটকের ‘নাটমঞ্চ সমিতি’র প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চস্থ হচ্ছে, তখন আমার বয়স ১৮-১৯। তখন আমি কেয়াদিকে দেখেছি। ‘বহুরূপী’ তখন যে বাড়িটায় মহলা দিত, সেখানে একটিই ঘর আর প্রকাণ্ড ছাদ। তিনটে দল মিলে নাটক হচ্ছে। গরমের মধ্যে কোথায় বসবে অত লোকজন। তাই তেপ্পল খাটিয়ে ছাদ ঢাকা হয়েছিল। সারাদিন মহলা হত! রোদ্দুর খুব তো! ওখানেই সবাই বসে থাকতেন। ঘরে আর কত লোকের জায়গা হয়?
স্নান করে এক দুপুরে গিয়েছি সেই মহা আয়োজন প্রত্যক্ষ করতে। কেয়াদি ছাদে বসেছিল শতরঞ্চির ওপরে। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই সরল গলায় বলে উঠলেন– ‘ও মা! তোর কী চুল রে! গুটিয়ে রেখে দিস কেন? এমনই খুলে রাখবি!’ আমার খুব মজা লেগেছিল।

কেয়াদি উদার, কেয়াদি থিয়েটারে নিবেদিতপ্রাণ, কেয়াদি অসাধারণ অভিনেত্রী– এসবই সবাই জানেন। কিন্তু আমার মনে হয়, কেয়াদি সেইসব ছাড়িয়ে আরও কিছু, অন্য কিছু। কেয়াদির মধ্যে অদ্ভুত এক পাগলামি ছিল। থিয়েটার নিয়ে তো ছিলই, জীবন নিয়েও ছিল। আমার কেমন মনে হত, কেয়াদি যেন সব কিছু পরখ করে দেখতে চাইতেন। সেই কবিতার ছেলেটির মতো: ‘দেখি না কেমন লাগে!’

‘ভালোমানুষ’ দেখতে গিয়েছি রঙ্গনা মঞ্চে। আজ যা প্রায় অবলুপ্ত। যেমন অবলুপ্ত বিশ্বরূপা, সারকারিনা, সম্ভবত রংমহল-ও। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো কল্পনাই করতে পারবে না যে, ওই পাড়ায় একসময় রমরমিয়ে চলত চার-পাঁচটা থিয়েটার হাউস। সপ্তাহে চার-পাঁচটা অভিনয় একই নাটকের! সেই সময় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় সাহস করে রঙ্গনা মঞ্চটি লিজে নিয়েছিলেন। নাটক দেখে কেয়াদির অভিনয়ে তো আমি অভিভূত! কিন্তু দেখা করতে পারিনি। আমাদের বাড়ি আবার উল্টোদিকে। বেশ দূরে। রাতে কেয়াদিকে ফোন করতেই, ‘দেখতে এসেছিলি না? ভেতরে এলি না কেন?’ তারপরেই– ‘কী কী খারাপ লেগেছে তা-ই বল।’
এই ছিল আমার দেখা কেয়াদি।

তারপর ‘বিনোদিনী’র অভিনয় দেখেও আমার একই দশা। সে অভিনয় ছিল অ্যাকাডেমিতে। ভিতরে গিয়ে দেখি অত ভারি অভিনয়ের পরে, কেয়াদি নাটকের টুকিটাকি অভিনয়ের জিনিস গোছাচ্ছে। কেয়াদির গায়ে জ্বর। খুব কষ্ট হচ্ছিল। উৎকণ্ঠা দেখে কেয়াদি বলল, ‘ও কিছু না।’ ওষুধ খেল ফ্লাস্ক থেকে গরম জল বের করে। ধারেপাশে কেউ নেই সাহায্য করার। খুব অবাক লেগেছিল আমার। কেয়াদির হাত বরফের মতো ঠান্ডা। ‘কেমন লেগেছে বলবি তো!’ কথা সরছিল না মুখ দিয়ে। সেদিন ‘বিনোদিনী’ হয়ে কেয়াদি অন্তরাল থেকে গেয়েছিল– ‘হরি মন মজায়ে লুকালে কোথায়?’ সে আজও আমার কানে বাজে।

যাঁরা একটুও কেয়াদিকে জানেন, তাঁরা জানেন, কেয়াদি ছিলেন প্রবলভাবে ফেমিনিস্ট। ‘মিসেস আর. পি. সেনগুপ্ত’ তাঁর অতিখ্যাত রচনা। কেয়াদি কেবলই প্রশ্ন তুলতেন, ‘কেন একটা মেয়েকেই কাজ সেরে বাসন ধুতে হবে?’, ‘কেন একটা মেয়েকেই বিছানা গোছাতে হবে?’– এইসব প্রশ্ন। আমার কখনও এমনটা মনে হত না। তাই মজা লাগত।
আর একদিন ‘বহুরূপী’র মহলাকক্ষ থেকে ফোন করেছি সকালবেলায়। মা কী-একটা খবর দিতে বলেছিলেন রুদ্রদাকে। আমি সে-কথা বলতে খুব সহজ স্বরে বলল, ‘রুদ্র তো আর এখানে থাকে না রে। কী বলতে হবে বল, সন্ধেবেলায় নন্দীকারে দেখা হবে, বলে দেব।’ আমি মায়ের কথামতো বললাম সেইসব কথা।
কথা হয়ে গেলে বললাম, ‘ছাড়ি?’
কেয়াদি বলে উঠল, ‘না। সকালবেলায় বহুরূপীতে এসেছিস যে!’ বললাম, ‘মহলা আছে, আজ সারাদিন চলবে।’ তখন নিধুবাবুকে নিয়ে একটা নাটক হচ্ছিল। আমি ‘শ্রীমতী’-র ভূমিকায়। কেয়াদি ছেলেমানুষের মতো বলল, ‘ইস, তোর কী মজা! কতক্ষণ রিহার্সাল দিবি। আমাদের সেই সন্ধেবেলায়।’ এমনই পাগল ছিল কেয়াদি!

কেয়াদির সঙ্গে এমন টুকরো-টুকরো অনেক কথা হয়েছে অনেক সময়। শেষ দেখা সম্ভবত ১৯৭৬-এর পয়লা মে।
‘বহুরূপী’র জন্মদিনে সাজানো অ্যাকাডেমির ফয়ারে ‘রাজা অয়দিপাউস’ নাটকের অভিনয় দেখতে পাঁচটার আগেই কেয়াদি হাজির। তখন সেখানে কত গল্প, কত আনন্দ! আর সেই অভিনয়ের শেষে মুখ কালো করে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হয়েছিল কেয়াদিকে। কত কষ্ট হয়েছিল যে সেই মুখখানি দেখে, তা বলতে পারি না। এমন একটা দিনে আবার এইরকম এক অভিজ্ঞতা! সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কারওর সম্পর্কেই আজও মনের বিরূপতা দূর হয়নি। এত বছর পরেও। আমি মেয়ে বলেই হয়তো তা বেশি করে অনুভব করেছিলাম।

১৯৭৭-এর ১২ মার্চ, বিদেশ থেকে কী এক অভিনয় কিংবা ব্যালের আয়োজন ছিল রবীন্দ্রসদনে। সকাল থেকে ভাবছি অনেক দিন পরে আজ কেয়াদির সঙ্গে দেখা হবে! শুরুর সময় এসে গেল। আমরা আসন গ্রহণ করলাম। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। কোথাও কেয়াদি নেই। থিয়েটারের সমস্ত দলই সেই দর্শকাসনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কিন্তু কেয়াদি কই? বিরতির সময় আবার খোঁজা। না। কই নেই তো! নান্দীকারের কেউই নেই। মা-কে বললাম, ‘মা, দেখো, নান্দীকারের কেউই আসেনি! কী আশ্চর্য!’ মাও এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন, ‘সত্যিই তো!’

পরের দিন খবরের কাগজ থেকে জানতে পারলাম, কেয়াদি এই পৃথিবীতে নেই! ১২ মার্চ কেয়াদি গঙ্গার জলে পড়ে গিয়েছে। তার পর থেকে নিখোঁজ। স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া কেয়াদিকে পাওয়া গেল ১৪ মার্চ। আমরা খবর পেলাম সন্ধের পরে। অ্যাকাডেমিতে যখন আমাদের অভিনয় চলছে।
কেয়াদি না-থেকেও আমাকে কতরকমভাবে তার অস্তিত্ব জানান দিত, তার ইয়ত্তা নেই। আমার সংসার হয়েছে, ঘরের কাজ করছি– হঠাৎ কেয়াদি যেন বলে উঠলেন, ‘তুই সব কাজ করবি কেন?’ ‘পাগলা ঘোড়া’র অভিনয় করছি। মঞ্চের অন্ধকারে কেয়াদি যেন বললেন, ‘তোর কী মজা! তোর শরীর আছে, তাই তুই অভিনয় করতে পারছিস! আমার তো আর শরীর নেই, আমি তাই আর করতে পারছি না।’ মনে হত অভিনয় করার আকাঙ্ক্ষায় এই অভিনয়ের তীর্থক্ষেত্রে কেয়াদি সবসময় বর্তমান। খুব কষ্ট হত তখন।

এ আমার একেবারে নিজস্ব অনুভব। এ আমি তখন কাউকে বলতে পারিনি। আর এই অনুভব বেশ কয়েক বছর ধরে আমাকে তাড়না করত। নিজের ভিতরটা কেবল শুকিয়ে যেত কষ্টে, আর মনে পড়ত অপমানে কালো হয়ে যাওয়া কেয়াদির ওই মুখখানি।
কৃতজ্ঞতা: শৈবাল বসু
আলোকচিত্র ঋণ: কেয়ার বই, সম্পা. চিত্তরঞ্জন ঘোষ
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved