Robbar

সত্য সে লুকা!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 4, 2026 12:44 pm
  • Updated:July 4, 2026 12:49 pm  

প্রিয় গায়ক ম্লাদেন গ্রদোভিচের গাওয়া এই গান ২০ বছর আগেও তিনি গাইতেন। অনেকে প্রশ্ন করে, অশান্ত শৈশব না থাকলে তিনি কি মদ্রিচ হতে পারতেন? খানিক ঘুরিয়েও ভাবা যায়। অশান্ত শৈশব মদ্রিচকে কী করতে পারত? অস্ত্র তুলে নিতেন হাতে? পুড়তেন প্রতিশোধের আগুনে? যুদ্ধবিরোধীই থাকতেন, না কি ভালোবাসতেন হিংসাকে? না কি এমনই ফুটবলপ্রেমে আছন্ন শান্ত স্থিতধী এক পুরুষকে পেত পৃথিবী? প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তর…? ওই গ্রামের রাস্তায় ফিরে গেলে মাইনের সাবধানবাণীর পাশাপাশি পোড়োবাড়ির দরজায় আরও কিছু আঁকিবুকি খুঁজে পাওয়া যায়। যে অস্পষ্ট হরফগুলি অনুবাদ করলে, পড়া যায়, কেউ কেউ লিখে গিয়েছেন, ‘ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন লুকা!’

স্বস্তিক চৌধুরি

পাথুরে জমি ক্রমে লাল হয়ে উঠছে। এ লাল কোমল নয়। এ লাল ভালোবাসারও নয়। লাজুক ঠোঁটের হাসিও মিশে নেই এ রঙে। শুধু মিশে আছে একরাশ ভয়। গাঢ় বর্ণ তরল দ্রুত ঘিরে ফেলছে সবুজ কচি ঘাসকে। সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে একরত্তি শিশু। কতই বা বয়স তার, সদ্য ছ’য়ে পা। সামনে মৃত দাদুর লাশ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে উপত্যকার পাহাড়ি ফুল। সার্বিয়ান মিলিশিয়া বাহিনীর বুলেট ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে বৃদ্ধের দেহ। তবু শিশুটি একদিন বড় হবে। দৈনন্দিন সঙ্গী বারুদের গন্ধ আর গ্রেনেড ফাটার তীব্র আওয়াজ। এসব ভালো লাগে না তার। ইয়াসেনিস থেকে দূরে পালাতে চায় সে। বহুদূরে, যেখানে সীমাহীন প্রশান্তি। এমনিতেই এখানে দুরহ দিনযাপন। ভেলেবিট পর্বতমালার দুর্গম পাদদেশ। ইয়াসেনিস, ছোট্ট গ্রাম। মদ্রিচি জনপদ। পারিবারিক জীবিকা পশুপালন। তবু দেশের পরিস্থিতি ভালো না। জল ও বিদ্যুতের কোনও নিশ্চয়তা নেই। আশেপাশের জমিতে ইতিউতি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড। ‘মাইন হইতে সাবধান’। সামান্যতম ভুল পদক্ষেপে পা উড়ে যেতে পারে।

তবু সে পা মাইন খোঁজেনি। খুঁজে নিয়েছে একটুকরো বাঁচার আশ্বাস। উদ্বাস্তু হয়েছিলেন নিজের বাড়ি থেকেই। শরণার্থী শিবিরের হোটেল করিডরে নিভৃতে সঙ্গী ছিল ফুটবল। একাকী একান্তে চামড়ার গোলকে ছুঁয়ে দিয়েছেন জাদুকরী ডান পা। ভুলতে চেয়েছেন ঘর ছাড়ার যন্ত্রণা, পেটের খিদে, বেঁচে থাকার তাগিদ। কী সুমধুর স্পর্শ ওই বিস্ময় গোলকের। তিনি জানতেন না, যে বাড়িটিতে ঘুমোচ্ছেন আগামী সকালে সেটি আদৌ অক্ষত থাকবে কি না! তবু রাতে বিছানায় শয্যাসঙ্গী ফুটবল। হোটেল করিডরে হিমশীতল কংক্রিটের উপর অবিরাম চলত ড্রিবলিং। আর স্বপ্ন দেখত বড় হওয়ার। যখন হব বাবার মতো বড়, ভালো ভালো পুষব পাখির ছানা।

শৈশবের মদ্রিচ

পক্ষীশাবকের হদিশ অজ্ঞাত, তবে সে বড় হয়েছে। বিশ্ব তাঁকে ‘মদ্রিচ’ নামে চেনে। লুকা মদ্রিচ। ক্রোয়েশিয়ান ক্যাপ্টেন। সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিড। বিশ্বের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ মিডফিল্ডার। ২০১৮-তে পেয়েছেন ব্যালন ডি’অর। এছাড়াও ঝুলিতে রয়েছে ‘বেস্ট ফিফা মেন্‌স প্লেয়ার’ ও ‘উয়েফা মেন্‌স প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ তকমাও। নিজের কেরিয়ারে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুউতে এনেছেন ২৭টির উপর শিরোপা। যার মধ্যে রয়েছে ৬টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ও ৪টি লা লিগা। দেশকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। জিততে পারেননি অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সের বিরুদ্ধে। তবু বাঁশের কেল্লা দিয়ে গড়েছিলেন অসম ব্যারিকেড। তাও যেন বড় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল সবটা। এই তো কত রাত জাগা এল-ক্লাসিকো। সোনালি চুলের যুবক লড়ছেন। সাইডলাইনে কখনও ডন কার্লো, কখনও জিদান। ৭ নম্বর জার্সির ভারে খানিক ম্লান, কিন্তু জরুরি স্তম্ভ। শেষ অধ্যায়েও কি খানিক মুখোমুখি দাঁড়ালেন দুই তারকা? শেষ গোলটা যদি হত? ক্রিশ্চিয়ানো বুকে টেনে নিলেন একসময়ের সহযোদ্ধাকে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করেছেন। এখনও আলোচনা উঠলে ভুলতে পারেন না মাদ্রিদকে। সেকেন্ড হোম।

রিয়েল মাদ্রিদের পুরনো বন্ধুত্ব, মদ্রিচকে বুকে নিয়ে রোনাল্ডো

বাড়ি বড় কাছের। শিকড়ের টান একমাত্র উদ্বাস্তুই বোঝে। সেই যে শৈশবে ঘরছাড়া হওয়া। বাড়িটা না কি এখনও আছে। দূরের সড়ক থেকেই দেখা যায়। ভগ্নপ্রায় পলেস্তারা খসা ধ্বংসাবশেষ। তবু তিনি ভীষণ ঋণী। স্মৃতি কবেকার! কিছু দুঃখ, কিছু সুখ। অমোঘ আকর্ষণ। তবু তিন সন্তানকে নিয়ে যাননি কখনও। ইভানার বয়স দশ, এমার সাত এবং সোফিয়ার প্রায় তিন। শৈশবের ভয়াবহতা আঁকড়ে ধরতে চায়। সভয়ে ফাঁস ছাড়িয়ে বেরন মদ্রিচ। ‘ওরা এখনও অনেক ছোট এবং আমি এখনই ওদের ওই গল্পগুলো বলতে চাই না’। খানিক চুপ থাকেন তারপর। ‘হয়ত আরও কয়েক বছর পর…!’ থেমে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন লুকা। তাঁর বহু ভক্ত আজও ওই গ্রামে গেলে বাড়িটির ছবি তুলে তাঁকে পাঠায় কিংবা ট্যাগ করে সোশাল মিডিয়ায়। রাস্তার বাঁকে ছোট্ট বাড়িটি পুড়ে গিয়েছে। ছাদের বেশিরভাগ অংশ নেই। দরজা-জানলা ঝুলছে। আগাছায় ভরে গিয়েছে উঠোন। আশেপাশের জমিতে এখনও মড়ার খুলি ও হাড়ের ছবি দেওয়া সতর্কবাণী। ‘নে প্রিলাজিতে’, কাছে আসবেন না। ৩০ বছর পরও খুঁজলে ল্যান্ডমাইন পাওয়া যায়। বাড়িটি ছিল তাঁর দাদু-দিদার। সেই দাদু, যাকে সৈন্যরা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেন। দাদু ভেড়া, ছাগল, মুরগি পালন করতেন। ছোট্ট মদ্রিচ, দাদুর হাত ধরে ঘুরতে যেতেন ভেলেবিট পার্বত্য অঞ্চলে। কখনও গিয়েছেন শিকারে। সেই দাদুর রক্তাক্ত দেহ শায়িত তাঁদের ঘরের সামনে। বাবা পাশ থেকে বলেছিলেন কফিন-বন্দি দাদুকে একবার চুমু খেতে। অস্ফুটে গলার কাছে দলা পাকিয়েছে একরাশ চাপা কান্না। বাবা-মার অনুপস্থিতিতে এই মানুষটার সঙ্গেই সময় কাটাত ছোট্ট লুকা। ওই বয়সে সে বুঝতেই পারেনি আশেপাশে কত কিছু ঘটে চলেছে। সে প্রত্যক্ষ করে বাবা-মার চোখে তীব্র আতঙ্ক। তবু লুকাকে তারা ভুলিয়ে রাখছেন এই সবকিছু থেকে। 

মাদ্রিদের বাড়ি, শৈশবের পলেস্তারা খসা ধ্বংসাবশেষ

১৯৯২। পৃথিবী জুড়ে বাড়ছে বিশ্বায়নের বিষ। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অভিশাপ তখনও স্থান পায়নি ভারত নামক রাষ্ট্রের ইতিহাসে। সুদূর ক্রোয়েশিয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধ। সার্ব-নেতৃত্বাধীন যুগোস্লাভিয়ান সৈন্যরা পাহাড়ি ঢালের সেই উপত্যকা দখল করেছে। মদ্রিচ পরিবার বুঝল, আর নয়! ঘর ছাড়ার সময় আসন্ন। না-হলে বাঁচাতে পারবেন না ছোট্ট সন্তানটিকেও। পাড়ি দিলেন অন্যত্র। প্রথমে মাকার্সকার একটি শরণার্থী শিবিরে, তারপর ডালমেশিয়ান উপকূলবর্তী শহর জাদারে। হোটেল কোলোভারে, দীর্ঘদিনব্যাপী চলতে থাকা সংঘাতের কারণে ঘরছাড়া শরণার্থীদের জন্য এটিকে একটি অস্থায়ী শিবিরের রূপ দেওয়া হয়েছিল। আজ কোলোভারে একটি সুন্দর চার-তারা হোটেল। এর পেছনেই রয়েছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর। ঝাঁ-চকচকে বিলাস-ব্যসনের চাকচিক্যে শোনা যায় না আর হতভাগ্য বাস্তুচ্যুতর কান্না। তারপর একদিন বাবাও পাড়ি দিলেন যুদ্ধে। স্টিপ মদ্রিচ দেশের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর শরণার্থী শিবিরেই দিনযাপন। শিবির ছেড়ে সর্বশেষ যে পরিবারগুলি বেরিয়েছিল তাদের মধ্যে মদ্রিচ পরিবার অন্যতম। তাই হয়তো নিজের প্রথম বড় রোজগার দিয়ে লুকা পরিবারের জন্য একটি বাড়ি কেনেন।

ব্যালন ডি’অর হাতে, ২০১৮

শরণার্থী জীবন আটকে রাখতে পারেনি ফুটবল প্রতিভাকে। পার্কিংয়ে নিয়মিত বল পায়ে দেখা যেত এক কিশোরকে। শান দিচ্ছেন ঈশ্বর-প্রদত্ত প্রতিভায়। বিচ্ছুরণ নজর এড়ায়নি স্কুল-শিক্ষক অ্যালবার্ট রাদোভনিকোভিচের। চমকে উঠেছিলেন লুকার পায়ের কাজ দেখে। তাঁকে বয়সে বড় টিমের সঙ্গেও খেলাতেন। কখনও অবতীর্ণ হতেন গোলরক্ষকের ভূমিকায়। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু। তারপর ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার কিছু ফুটবল ক্লাব হয়ে নজরে এলেন প্রাইম ইউরোপ স্কাউটের। টটেনহ্যাম তাঁকে ২০০৮ মরসুমে সই করায়। পারফরম্যান্স নজরে পড়ে হোসে মোরিনহোর। অগত্যা মাদ্রিদ যাত্রা। তারপর স্বপ্নের সাম্রাজ্য। যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে সংশয় ছিল একসময়। বহু সময় গ্রুপ স্টেজ থেকেই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে, তারাই পৌঁছয় বিশ্বকাপ ফাইনালে। পরাজিত করে ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনার মতো দলকে। স্বপ্নের উড়ানের অন্যতম কাণ্ডারি মদ্রিচ। ’২৬-এ শেষবার নিজের ছাপটুকু রাখতে চেয়েছিলেন। পারেননি। বয়সের ভারে খানিক ন্যুব্জ। ভাগ্যও বঞ্চনা করেছে খানিক। আজীবন তর্ক চলবে শেষ গোলটা কি আদৌ বাতিলযোগ্য! তবু তিনি মদ্রিচ। সহজ সাবলীল জয় প্রাপ্য ছিল না কোনওকালেই।

পর্তুগালের সঙ্গে শেষ ম্যাচে বিতর্কিত পরাজয়ের পর

স্কুলে শিক্ষকের গল্পের ক্লাসে তাঁর কলমে উঠে আসে শৈশবের গোলাবর্ষণের দিনগুলো। এই হিংস্র নির্মম পৃথিবীতে তাঁর নির্মল অনাবিল আত্মোপলব্ধি, যুদ্ধ কখনও কারওর জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। অস্থির সময়ে এই জীবনবোধ খানিক ভাবায়। জিতে আসা ম্যাচ শেষেও স্থানুবৎ নতজানু হতে শেখায়। তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে টিম-বাসে গান করেন, ‘নিজে উ সোলদিমা সেভ’, টাকা সবকিছু নয়!

‘ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন লুকা!’

প্রিয় গায়ক ম্লাদেন গ্রদোভিচের গাওয়া এই গান ২০ বছর আগেও তিনি গাইতেন। অনেকে প্রশ্ন করে, অশান্ত শৈশব না থাকলে তিনি কি মদ্রিচ হতে পারতেন? খানিক ঘুরিয়েও ভাবা যায়। অশান্ত শৈশব মদ্রিচকে কী করতে পারত? অস্ত্র তুলে নিতেন হাতে? পুড়তেন প্রতিশোধের আগুনে? যুদ্ধবিরোধীই থাকতেন, না কি ভালোবাসতেন হিংসাকে? না কি এমনই ফুটবলপ্রেমে আছন্ন শান্ত স্থিতধী এক পুরুষকে পেত পৃথিবী? প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তর…? ওই গ্রামের রাস্তায় ফিরে গেলে মাইনের সাবধানবাণীর পাশাপাশি পোড়োবাড়ির দরজায় আরও কিছু আঁকিবুকি খুঁজে পাওয়া যায়। যে অস্পষ্ট হরফগুলি অনুবাদ করলে, পড়া যায়, কেউ কেউ লিখে গিয়েছেন, ‘ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন লুকা!’