Robbar

শিক্ষা ক্রমশ গেরিলা যুদ্ধ হয়ে উঠছে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 3, 2026 4:27 pm
  • Updated:May 3, 2026 4:27 pm  

রিচার্ড ডকিন্স-এর ‘দ্য সেলফিশ জিন’ মনে আছে? জিনে গণ্ডগোল, স্বার্থপরতা। পিয়ের কর্নেই-এর ওই কথাটা ‘Cette obscure clarté’ (এই অন্ধকার স্বচ্ছতা) আমাকে দীপ্তি দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় কাম্যুই ঠিক বলেছেন… এটা একটা সিসিফাসের গল্প। একটা নিরন্তর প্রচেষ্টা। জীবনানন্দের ‘আদিম দেবতারা’ কবিতার লাইনগুলো একেবারে মোক্ষম। উনি ইতিহাসকে পড়তে পেরেছিলেন। চিন্ময় গুহ বলছেন, শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কথোপকথনে সায়ন ভট্টাচার্য

সায়ন ভট্টাচার্য

শিক্ষা যে জীবনের চলার পথে অলংকার ও হাতিয়ার, মান ও মানচিত্র– এই ভাবনার ক্ষেত্রটা, আপনার গড়ে ওঠার শুরুর দিনগুলোয় কেমন ভাবে তৈরি হয়েছিল?

কথাগুলো এই মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রায় রসিকতা বলে মনে হয়। কারণ ‘শিক্ষা’ জিনিসটা সম্পূর্ণ পার্শ্বরেখায়িত হয়ে গিয়েছে। একটা সম্পূর্ণ ফোঁপরা হয়ে যাওয়া প্রণালী, যাতে কোনও স্বপ্ন নেই, ‘ভিশন’ নেই। কী ভয়ংকর! অথচ কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। কয়েকজন শিক্ষক শুধু লড়ে যাচ্ছেন ডন কুইক্সটের মতো। কোনও প্রাপ্তির আশা তাঁরা রাখেন না।

আমি হলফ করে বলতে পারি যে, ছাত্রছাত্রীদের মৌলিক ভালোত্ব কিন্তু আগের মতোই আছে। পৃথিবীর এত পরিবর্তন সত্ত্বেও এটা সম্পূর্ণ সত্য। শুধু তারা এক পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থার শিকার। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আমরা স্তূপ উঁচা করিতেছি, নির্মাণ করিতেছি না।’ কী আধুনিক ছিলেন মানুষটি!

সরকারের পর সরকার এসেছে, কেউ ভাবেনি কী করা যায়! কোনও আইডিয়া নেই। কেন সিলেবাসের পরিবর্তন করা হচ্ছে, কেউ জানে না। করা হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের বিশেষ কোনও ভূমিকাই নেই। চতুর্দিকে রাজনীতিবিদদের করাল থাবা। শিক্ষা এবং রাজনীতির এমন কুৎসিত যোগ আর কোথাও নেই।

চিন্ময় গুহ

ভারতের সারফেস এরিয়া জিগ্যেস করলে, লোকে ক’টা ভাষায় কথা বলে জিগ্যেস করলে– অধিকাংশ সাংসদ কেঁদে ফেলবে। এই বহুস্তর, বহুভাষিক, বহুমাত্রিক দেশের কিছুই না-জেনে শিক্ষাব্যবস্থায় হাত দিলে কার লাভ?

আমি মনে করি, শিক্ষকদের দোষ এতে কম নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু আছে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব, প্রাথমিক সহমর্মিতার অভাব। ছাত্রছাত্রীদের শ্রদ্ধা না-করলে শ্রদ্ধা পাওয়া যায়? লেখাপড়ার কালোবাজার একটা ভয়ংকর চক্র। সবকিছু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। স্কুল-কলেজে ভালো পড়ানো হয় না-বলে এই টিউশনি-নির্ভরতা। টিউশনি জাল বুনে রেখেছে, পড়ানো নিম্নমানের। এ এক অচ্ছেদ্য চক্র।

যাই হোক, তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি। ভালোবাসা দিলে ভালোবাসা পাওয়া যায়, কিন্তু সেটির বড় অভাব। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এটাই প্রধান সমস্যা– আমি বলতে চাইছি, পাঠ্যক্রম নিয়ে নয়ছয় বাদ দিলে এটা প্রধান সমস্যা।

আপনার নিজের ব্যাপারটা তো একেবারেই আলাদা–

আমি অসাধারণ সব ছাত্রছাত্রী পেয়েছি। নিরন্তর তাদের কাছে শিখেছি। শিখেছি, মানুষকে বিশ্বাস করতে। শিখেছি কোমলতা। তাদের মধ্যে আমি নীলাকাশ দেখি। প্রতিদিন ক্লাসের ঢোকার আগে বলেছি: যোগ্য হও। যেমন কেমব্রিজের কর্পাস ক্রিস্টি কলেজে দেখেছি সাত শতাব্দীর পুরনো কলেজের ক্লাসঘরের দরজা নীচু, অর্থাৎ, মাথা নীচু করে ঢুকবে, ছাত্র ও অধ্যাপক উভয়েই।

কেমব্রিজের কর্পাস ক্রিস্টি কলেজ

আমি ছয়ের দশকের মাঝামাঝি এমন এক সময়ে ইশকুলে পড়েছি, যখন স্বপ্নভঙ্গ হয়নি। খাদ্য আন্দোলন, বাম আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন… যাই হোক, আমি খুব লাজুক ছিলাম। প্রথমে একটা কিন্ডারগার্টেনে, যার অধ্যক্ষ ছিলেন ‘পদ্মা–প্রমত্তা নদী’-র লেখক সুবোধ বসু। সেই স্কুলের শিক্ষিকারা অদ্ভুত নিবেদিত-প্রাণ ছিলেন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিক্ষিকা ছিলেন কয়েকজন। পরে জগদ্বন্ধু ইনস্টিটিউশনে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হই। ভীষণ ভীতু ও কুণ্ঠিত ছাত্র ছিলাম। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, সে-আমলেও খুব কম ভালো শিক্ষক পেয়েছি। তার থেকে একটা জিনিস শিখেছি: তাঁদের মধ্যে সেরা শিক্ষকদের সেরাটুকু নিতে চেষ্টা করেছি। পেরেছি বলব না, কিন্তু চেষ্টা করেছি। আর খারাপ শিক্ষকদের কাছে শিখেছি– কী কী করব না।

যেমন?

একদিকে অবজ্ঞা, তৈরি না-হয়ে আসা, সোজা কথায় ফাঁকিবাজি। অন্যদিকে স্নেহ, তৈরি হয়ে ক্লাসে আসা, বোঝানোর ক্ষমতা ও ধৈর্য। অনুসন্ধিৎসা জাগানোর দায়িত্ব শিক্ষকের। আত্মমর্যাদা তৈরি করার দায়িত্ব। চিন্তা করতে শেখানোর দায়িত্ব। ছাত্রদের হৃদয়, মন জয় করার জন্য কথন-ক্ষমতা। শব্দশিল্পের ওপর একজন শিল্পীর মতো দক্ষতা থাকবে একজন অধ্যাপকের। সংযোগ করতে না পারলে তিনি অযোগ্য শিক্ষক।

সংযোগ-দক্ষতা যে কত দরকারি, আমি সেটা মর্মে মর্মে জানি। বলতে পারো, এভাবেই আমি তিলে তিলে নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা করেছি, নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছি।

সুবোধ ঘোষ

পড়াশোনার একটা মানবিক পরিবেশ আপনার কাছে কেমন? সেই ছবিটা একটু দেখতে ইচ্ছে করছে।

বললাম তো! মানবিক ছাড়া হতে পারে না। ওটা কেন্দ্রকোরক বলতে পারো… যেটা একেবারে অপরিহার্য। যে কোনও অবস্থাতেই। আমি আধুনিকতার প্রাণপুরুষ বিদ্যাসাগরের ভক্ত, আবার হাবেরমাস-এর ভক্ত। আমি মনে করি, মানবিকতা আধুনিকতার একটি প্রধান দিক।

এদেশে না বুঝে, জোর করে নতুন শিক্ষানীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা নিশ্চয়ই ফ্যাসিবাদ। চিন্তাভাবনার কোনও সূত্রই সেখানে পাইনি। কল্পনা করতে পারো, এই বিপুল বিচিত্র জনসংখ্যার বার্ষিকের বদলে সেমেস্টার সিস্টেম এল বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে! … এখন কৃত্রিম বুদ্ধি দরজায় এসে গিয়েছে। কাজেই আমাদের মতো দেশে সেটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে… ভয়ংকর চিন্তার কথা। অধ্যাপকের দায়িত্ব দশগুণ বাড়বে। অথচ তাঁরা ভাবলেশহীন।

পাওলো ফ্রেইরি বলছেন, ‘আধুনিক সময়ের একজন শিক্ষক গেরিলা যোদ্ধার মতো।’ আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, শিক্ষকদের সম্পর্কে বেশ একটা দেবত্বের ছবি তৈরি করার চেষ্টা। কিন্তু আপনি প্রথম আমাকে বলেছিলেন– ‘হেজিওগ্রাফিস্ট বা গুরুবাদী হ‌বে না, চশমা খুলে দেখতে শেখো।’ একুশ শতকের শিক্ষকের কাঠামোটা আপনার কাছে কেমন?

পাওলো ফ্রেইরি

এখন যা দাঁড়িয়েছে, গেরিলা যোদ্ধাই। ফ্রেইরি ঠিক বলেছেন। চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি চাপ। অমানবিকীকরণের যুগে চোয়াল শক্ত করে… পারা যাবে এই আশায়। চশমা খুলে। কিন্তু সেটা সহজ নয়। সময়ের চাপের কথা ভুললে চলবে না। বাজার অর্থনীতির যুগে, যখন আমাদের মলিকিউলার বায়োলজি বদলে গিয়েছে, তখন এটা প্রায় একটা অসম্ভব প্রকল্প। তবু কেউ কেউ লড়ছে… সারা পৃথিবী জুড়ে। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বে।

স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার কাঠামোতে আদ্যন্ত গোলমাল। শিক্ষাকে বিভিন্ন স্ট্রিমে ভাগ করে তার দফারফা করা হয়েছে। বিজ্ঞানের ছাত্র– দেশের ইতিহাস, পৃথিবীর ইতিহাস জানবে না! তার নিজের দেশের ইতিহাস, পৃথিবীর ইতিহাস? সে যদি ডাক্তার হয়, সে তো অপদার্থ ডাক্তার। আইন কলেজে না পড়লে আইন জানবে না? কেউ আইন জানবে না, তার নিজের দেশের আইন? সেটা জানা থাকলে অকারণে আক্রান্ত হতে হয় না, বিভ্রান্ত হতে হয় না। কিন্তু এগুলোকে সুচতুরভাবে পাঠ্যক্রমের বাইরে রাখা হয়েছে। যার অর্থ শিক্ষাকে পঙ্গু করে দেওয়া। রুমানিয়ান-ফরাসি নাট্যকার য়্যজেন ইওনেস্কোর একটি অ্যাবসার্ড নাটক আছে, যেখানে পড়াশোনার সার্টিফিকেটের ভেতর গর্ত বাড়ছে। আমাদের চতুর্দিকে শুধু গর্ত। চশমা খুললেই বোঝা যাবে। তবে চশমাটা খুলতে হবে।

আপনি বিশ্ব সাহিত্যের অন্দরমহলে যত প্রবেশ করেছিলেন, আপনার ভিতর থেকে পরিবর্তন ঠিক কেমন হয়েছিল?

আমার বাবা সারা পৃথিবীর সাহিত্য পড়তেন। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, তিনি সারাদিন খেটেখুটে ফিরে বিশ্বসাহিত্য নিয়ে বসছেন। শিক্ষিত বাঙালির এই ব্যাপারটা উনিশ শতক থেকেই ছিল। গোলকায়নের পর থেকে তাদের কঙ্কাল বদলে গিয়েছে। বাবা পড়তেন পিথাগোরাস, সক্রাতিস, প্লেটো, আরিস্ততল…। নাটক পড়তেন সফোক্লেস, এউরিপিদেস, এস্কাইলাস, আরিস্তোফানেস-এর। গ্রিক পুরাণ পড়তেন। বার্নার্ড শ খুব প্রিয় ছিল তাঁর। ইবসেন থেকে ওনিল। ব্রেশট থেকে বেকেট… শন ওকেসি। উপন্যাস প্রায় সব। এসব এ যুগের মতো লোকদেখানি ছিল না। আমি তার মধ্যবিত্ত লাইব্রেরি থেকে ন্যুট হামসুন পড়েছি। ‘জাঁ-ক্রিস্তফ’ পড়েছি। পাশাপাশি অন্নদাশঙ্করের ‘বিনুর বই’, বা ‘রত্ন ও শ্রীমতী’– কোনও বিরোধ ছিল না। এরিক বেন্টলির ‘দ্য প্লেরাইট অ্যাজ থিঙ্কার’ পড়তে দেখেছি। রবীন্দ্রনাথ আর তলস্তয়… প্লেটো আর কনফুশিয়াস…। আবার থ্রিলার, গোয়েন্দা কাহিনিও পড়তেন। নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু সব ধরনের ধর্মগ্রন্থ খুঁটিয়ে পড়ে মনটাকে খুলে রেখেছিলেন। এসব কাছ থেকে দেখে শিখেছি।

ভেতরে ভেতরে কোষগুলো বদলে গিয়েছে। তত্ত্ব কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু জোরটা ছিল টেক্সটের সত্যমূল্যের ওপর।

এ কথাটা আপনি বলেন…

হ্যাঁ। আগে সফোক্লেস, পরে আরিস্ততল।

জ্যোতিভূষণ চাকী

যাই হোক, স্কুলে আমি জ্যোতিভূষণ চাকীকে পেয়েছিলাম, তিনি ছিলেন আলোর ফোয়ারার মতো। পেয়েছিলাম অধীর পাল নামে এক শিক্ষককে, যাঁর মতো আন্তরিক ইংরেজি পড়ানো আমি কখনও দেখিনি।

কলেজে পি লাল এবং আরও দু’-একজনকে, যেমন গৌতম কুণ্ডু…। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতি ভট্টাচার্য এবং ভবতোষ চট্টোপাধ্যায়। এবং ছাত্রবন্ধু দীপেন্দু চক্রবর্তী। তাঁরা পথ বাতলেছিলেন, আমি চিন্তা করে নতুন পথ খুঁজেছি।

বিশ্বচেতনা একটা উন্মীলীয়মান ফুলের মতো। প্রথম দিন থেকে আলো জ্বালতে হয়। পাঠ্যবস্তুর অন্দরমহল একটা সাতমহলা বাড়ি। আমরা দু’-চারটে জানলা খুলেছি মাত্র। খুলেছি যে, ছাত্রছাত্রীদের রেসপন্স দেখলে বোঝা যায়। পরীক্ষকের উদাসীনতা বা মূর্খতাকে অতিক্রম করে এখনও যে যুদ্ধ করা যায় তাতে সন্দেহ নেই। রক্ত লাগবে গায়ে, তবু।

আমি তো আপনার ক্লাস করেছি, আমি জানি।… ফরাসি ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাস পাঠের মধ্যে দিয়ে আপনার মধ্যে একটা নবজাগৃতির বিকাশ ঘটল, না কি বিশ্বচরাচরের সংকেত আনবার জন্য একটা মুক্ত জানলা আপনি খুঁজছিলেন?

অরুণ মিত্র

ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন আদ্যন্ত ফরাসিতে ডুবে থাকা কবি অরুণ মিত্র, আমার মেন্টর। সেটা যে কতখানি কাজ করেছিল আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি না। তাঁর একটা কথা ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল। ফরাসি সাহিত্য জীবনের ‘প্রতিলিপি’ নয়, জীবনের সাক্ষ্য। একথা আমাকে নতুন করে দেখতে শেখাল। ফরাসি সাহিত্যে এমন সাহসিকতা দেখেছি, যা অন্য সাহিত্যের কাছে অকল্পনীয়। কবি আঁরি মিশো বলেছিলেন, কবিতা লেখা মানে নিজের নাড়ি টিপে দেখার মতো। ব্যোদল্যের ধুলিমুঠিকে সোনামুঠি করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তাঁদের ভাষ্যের সাংকেতিকতা নতুন করে জন্ম দিয়েছিল সাহিত্যকে।

ফরাসিদের শিল্পিত উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে বিশ্বচরাচর আমাকে ছোঁয়। তুমুল পরীক্ষানিরীক্ষা করতে কোনও অবস্থাতেই ভয় পাননি। জীবনকে অনমনীয় ভাবে খুঁড়ে গিয়েছেন। গদ্য-পদ্যের বিভাজন গিয়েছে মুছে। কথাকে নিবেদন করেছেন অব্যক্তের কাছে।

আমার গদ্যে এর ছাপ পড়েছে: ‘ঘুমের দরজা ঠেলে’, ‘বিন্দু থেকে বিন্দুতে’, ‘অন্ধ আয়না’… যদি আমার কবিতার বই ‘পাথরের ফণা ও ঈশ্বর’ পড়ে থাকো, যেটা সম্পূর্ণ আলাদা।

বইপত্র, চিন্ময় গুহ

২০২০ তে আপনার একটি লেখা, ‘এই অন্ধকার স্বচ্ছতা’র একটা লাইন মনে আসছে– ‘আমরা ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যাই।’ কোথাও আমার মনে হয়, ভারতীয় ফ্যাসিবাদের একটা প্রকট মুখ এই ‘ব্যবহৃত হ‌ওয়া’ আর ‘ব্যবহৃত হতে দেওয়া’– শিক্ষায় এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই বিষয়টা আপনি কেমন করে দেখেন?

ফ্যাসিবাদ সর্বত্র, নানা পোশাকে। ওটা যেমন শাসকের কাজে, বড় প্রতিষ্ঠানের কাজে, ব্যক্তিমনেও…। রিচার্ড ডকিন্স-এর ‘দ্য সেলফিশ জিন’ মনে আছে? জিনে গণ্ডগোল, স্বার্থপরতা। পিয়ের কর্নেই-এর ওই কথাটা ‘Cette obscure clarté’ (এই অন্ধকার স্বচ্ছতা) আমাকে দীপ্তি দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় কাম্যুই ঠিক বলেছেন… এটা একটা সিসিফাসের গল্প। একটা নিরন্তর প্রচেষ্টা। জীবনানন্দের ‘আদিম দেবতারা’ কবিতার লাইনগুলো একেবারে মোক্ষম। উনি ইতিহাসকে পড়তে পেরেছিলেন।

মিথ অফ সিসিফাস, আলব্যের কাম্যু

সামাজিক বয়ানের চাপের কাছে মাথা নুইয়ে পৃথিবীটা চলছে। শিক্ষা-সংস্কৃতি জগতে একটা বানানো গল্প তৈরি করা হয়। সেই গল্পের কাছে আমরা ব্যবহৃত হই। ধরো, গল্পে বলা হল যে অমুক অমুক খুব বড় সাহিত্যিক, বাকিরা হয় নেই, নয় মার্জিনে। আমি তো অনেক সময় ভেবে পাই না, কীভাবে একজন সত্যিকারের প্রতিভাকে অম্লানবদনে চেপে দেওয়া হল। আমার ধারণা আমাদের আধুনিকতা ছয়ের দশকে শেষ হয়। তারপর পোস্টমডার্ন। আমি সরলীকরণ করছি, তবু মোটের ওপর এইরকম। এখন লড়াইটা মারাত্মক। শহরের একটা গোষ্ঠীর বিচারে কেন ‘ক’ আর ‘খ’, ‘চ’ আর ‘ছ’-র চেয়ে বড়– কেউ জানে না। একটা ‘fake narrative’। চ্যালেঞ্জ আসে, আসছে।

সম্পাদকদের মধ্যে খুঁজে বের করার আকাঙ্ক্ষা দরকার। নতুন কিছু প্রকাশক অসম্ভব ভালো কাজ করছেন। ওই যে বললে, গেরিলা লড়াই।