an article about yogurt and other buttermilk drinks | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

এক গ্লাসে গ্রীষ্মবিজয়

ঘোলের জনপ্রিয়তা বিশ্বের বহু দেশেই দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে তুরস্ক, ইরান ও লেবাননে ঘোলের চাহিদা আকাশছোঁয়া। তুরস্কে ঘোলের নোনতা শরবত ‘আয়রান’-এর প্রায় জাতীয় পানীয়র মর্যাদা বললে ভুল হবে না। দই, জল আর নুন দিয়ে তৈরি এই তরল এতটাই জনপ্রিয় যে, সেদেশে ম্যাকডোনাল্ডস বা বার্গার কিং-এর মতো আন্তর্জাতিক বিপণিতেও কোলা-র পাশাপাশি আয়রান বিক্রি হয়। অন্যদিকে, ইরান ও আফগানিস্তানে ঘোলের শরবতের নাম ‘দুগ’। ঝাঁঝালো এই পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে শুকনো পুদিনা পাতা গুঁড়ো করে মেশানো হয়। কাবাবের চর্বি হজম করতে না কি এর চেয়ে ভালো জিনিস আর নেই।

Published by: Robbar Digital

Posted:May 31, 2026 6:47 pm | Updated:May 31, 2026 6:47 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

কচিবেলায় শোনা ও পড়া অগুনতি বাংলা রূপকথার শেষে অনিষ্টকারীর শাস্তি হিসেবে বাঁধাধরা রাজাদেশ ছিল– পুরুষ হলে, হাতির পায়ের নিচে ছুড়ে ফেলা অথবা শূলে চড়ানো; আর ডাইনিবুড়ি, কুটিল ছোটরানি– এদের স্রেফ মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে গাধার পিঠে উল্টো করে বসিয়ে রাজ্যছাড়া করা। ন্যাড়াদের দুর্ভোগের কথা স্কুলবেলায় পইতে ধারণের সুবাদে জানা ছিল, অঙ্ক স্যরের দেওয়া উপাধির দৌলতে গর্দভকূলকেও আত্মজ হিসেবেই চিনেছি বরাবর, কিন্তু মাথায় ঘোল ঢেলে দেওয়ার ব্যাপারটা কেন এত বিব্রতকর, তা বুঝে উঠতে পারিনি কখনও। যদিও সহবেঞ্চীয় সুহৃদ ভেঁপু ব্যাখ্যা করেছিল, ঘেমো চামড়ায় টোকো ঘোল পড়লে না কি সাংঘাতিক কুটকুট করে, চুলকোতে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড বাধাও অসম্ভব নয়! হাতে-কলমে তেমন পরীক্ষার সুযোগ অবশ্য কস্মিনকালেও মেলেনি, তবে রোদে তেতে ওঠা দুপুরে স্কুলফেরত শ্বেতপাথরের ভারী গ্লাসে বেড়ে দেওয়া গন্ধরাজ লেবুর সুবাসমাখা ঘোলের শরবত তৃষিত চিত্তে বড়ই শান্তির প্রলেপ দেয়, এ নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। কিন্তু অমন স্নিগ্ধ পানীয় নিয়েও যে বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে, তা কে ভেবেছিল! 

zoom
দইয়ের ঘোল

কোনও এক দুর্লঙ্ঘ্য কারণে আমার সাত-আট বছর বয়সের আগে পর্যন্ত মাতুলালয় দর্শন হয়নি। সেই কারণে, একদিকে যেমন এ যাবৎ মায়ের মুখে শোনা সেই অচিনপুর সম্পর্কে মনে মনে নানা কল্পনার জাল বিস্তার হয়েছিল, তেমনই অকুস্থলে পৌঁছে বোঝা গেল, দীর্ঘ অদৃশ্যমানতার কারণে ও-তরফেও আমাদের দুই ভাই সম্পর্কে বেশ একটা ‘ভিনগ্রহী ছানা দর্শন’ সুলভ কৌতূহল দানা বেঁধেছিল। যাই হোক, দুই বাড়ির হাবভাব রহন-সহনের মধ্যে যে আসমান-জমিন ফারাক, তা ঠাহর করতে বিশেষ সময় খরচ করতে হয়নি। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুতর হয়ে উঠল রান্না-খাওয়ার বিষয়টি, যা নিয়ে একদিকে যেমন ল্যাজেগোবরে হতে থাকলেন গর্ভধারিণী, অন্যদিকে পদে পদে নাকাল হলাম আমরাও। মাতুলালয়ে মুরগির ঝোল মুখে তুলে আমরা যেমন হাপুস নয়নে কান্নাকাটি করি, তেমনই মায়ের রাঁধা টম্যাটোর চাটনি চেখে তাঁর দাদামশাই মুখ ভেটকে হুংকার ছাড়েন, ‘ইটা চুখা হইসে? ছ্যাঃ!’ এমনই আর এক বিতর্ক দেখা দিল ঘোলের শরবত নিয়ে। 

বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ঘোল নিয়ে বাঙাল-ঘটির রুচির তফাতটা বেশ স্পষ্ট, ঠিক যেমনটা চিংড়ি আর ইলিশের ক্ষেত্রে। ঘটিদের কাছে ঘোল মানে একটু মিঠে-মিঠে, মোলায়েম ব্যাপার। তাঁরা দইয়ের টক ভাবটা একটু চাপা দিতে চান। সামান্য জল, খানিকটা চিনি, এক চিমটে বিটনুন আর তার ওপরে একটু লেবুর রস বা গন্ধরাজ লেবুর ছাল কুরিয়ে দেওয়া– ব্যস, ঘটি বাড়ির ঘোলের রেসিপি তৈরি। একে তাঁরা ভালোবেসে বলেন, ‘লস্যি’র লঘু সংস্করণ বা ‘লেবু-ঘোল’। গ্রীষ্মের দুপুরে খাওয়ার শেষপাতে বা বিকেলের আড্ডার ফাঁকে এই ঠান্ডা তরল পরম তৃপ্তি দেয়। প্রায় এমনই ঘোলের স্বাদ পেয়ে আমরা ততদিনে অভ্যস্ত হয়েছি। যদিও আশৈশব মুখস্থ করা টিকা অনুযায়ী, আমরা ‘ঘটিও নই, বাঙাল তো কভি নেহি!’ তবে কি আমরা আদৌ বাঙালিই নই? অর্বাচীনের অবোধ প্রশ্নের উত্তরে মোলায়েম হেসে বাঁধাগতে জবাব ছিল, ‘আমরা আসলে উত্তরবঙ্গের লোক।’ 

zoom
‘লস্যি’র লঘু সংস্করণ ‘লেবু-ঘোল’

ওদিকে আগমার্কা বাঙাল মামাবাড়ির রসনাবিলাস আবার একটু চড়া সুরে বাঁধা। ঘোলে চিনি দেওয়ার সংস্কৃতি সেখানে কল্পনাতীত। ছোটমামি ব্যাখ্যা করেন, বাঙাল বাড়ির ঘোল হবে সাচ্চা টক দইয়ের, যাতে জলের পরিমাণ থাকবে মেপে। সেই ঘোলে পড়বে কাঁচালঙ্কা বাটা বা চটকানো নির্যাস, সঙ্গে থাকবে জিরে ভাজার গুঁড়ো আর ধনেপাতা কুচি। মায়ের মেসো আবার দাবি করে বসেন, তাঁদের বাড়িতে একটু সরষে বাটার ছোঁয়াও দেওয়া হয় ঘোলে। তাঁর ফুটনোট, ‘মিষ্টি ঘোল তো শরবত রে ভাই, ঘোলের কাম হইল মুখডারে চনচইন্যা করা!’ জ্ঞানচক্ষু প্রস্ফুটিত হলে বোধগম্য হল, ঘটিরা যেখানে ঘোলের মধ্যে এক ধরনের শান্ত, স্নিগ্ধ প্রশান্তি খোঁজেন, বাঙালরা সেখানে দুপুরের ভাতঘুম তাড়ানোর চাঙ্গায়নি সুধারূপে ঘোলবন্দনা পছন্দ করেন। তবে রুচির তফাত যাই হোক, জ্যৈষ্ঠের দুপুরে ঘটি-বাঙাল নির্বিশেষে ঘোলের গ্লাসে চুমুক দিয়ে যে একই রকম ‘আঃ’ শব্দ করে ওঠেন, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।

অবশ্য, বুরহানির কথা বাদ দিয়ে ঘোলের আখ্যান লেখা মানে খাস বিরিয়ানি থেকে আলু আর মাংসের টুকরো বাদ দিয়ে স্রেফ সাদা ভাত মুখে তোলা। এই পানীয়র সঙ্গে প্রথম পরিচয় সহকর্মী জুলুদার বাড়ির নেমন্তন্নে। সেবার তাঁর আব্বা-আম্মা হজযাত্রায় চলেছেন বলে বিরাট ভোজের ব্যবস্থা হয়েছে। ওয়াটগঞ্জের বাড়ির গলিতে ঢাউস প্যান্ডেল খাটিয়ে এলাহি ভোজের আয়োজন। বিরিয়ানির সুগন্ধে গোটা মহল্লা আমোদিত– পাড়ার কুকুররাও প্রচণ্ড উত্তেজিত। মণ্ডপ নয়, আমাদের খাতির হল খানা কামরায়। যথাসময়ে টেবিল আলো করে প্লেটভরা বিরিয়ানি আর কাবাবের তাগড়া খণ্ডরা উপস্থিত হল। তাদেরই পাশে হাজির গ্লাসভর্তি হালকা সবুজরঙা শীতল তরল। বিবিধ মশলার সুগন্ধ আর রেওয়াজি মাংসে দুরস্ত বিরিয়ানির গ্রাস স্বাদকুঁড়িদের অবশ করে ফেললে তাদের চেতনা ফেরানোর দাওয়াই হয়ে দেখা দেয় বিনম্র বুরহানি। এ হল ঘোলের সেই আভিজাত্যপূর্ণ, খোলতাই রূপ, যা ছাড়া বড়সড় ভোজ– বিশেষ করে ওপার বাংলার জামাই আদর বা বিয়েবাড়ির ভূরিভোজ এক্কেবারে অসম্পূর্ণ। ওপার বাংলার, বিশেষ করে খাস ঢাকাইয়া খাদ্য সংস্কৃতিতে বুরহানির স্থান দেবতুল্য। বিরিয়ানি, পোলাও বা কাচ্চির মতো গুরুপাক, তৈলাক্ত গুরুপাক খাবারে মুখ মেরে গেলে এক গ্লাস ঠান্ডা বুরহানি বেড়ে দেওয়াই দস্তুর।

zoom
এক গ্লাস ঠান্ডা ঢাকাই বুরহানি

বুরহানি কিন্তু সাধারণ ঘোল নয়, বরং বলা চলে ঘোলের ‘থ্রি-ডি’ সংস্করণ। টক দইয়ের সঙ্গে জল মিশিয়ে মন্থন করার সময় তার চরিত্র গড়ে দেয় পুদিনাপাতা বাটা, ধনেপাতা বাটা আর কাঁচালঙ্কার রস। এর ফলে ঘোলের শরবতে ধরে চমৎকার হালকা সবুজ আভা। সেই সঙ্গে যোগ হয় সাদা সরষেবাটা, বিটনুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, ভাজা জিরে ও ধনেগুঁড়ো। শুনেছি, কেউ কেউ আবার টক-মিষ্টি স্বাদের ভারসাম্য আনতে এতে সামান্য টক আমের আচার বা তেঁতুলের মাড়ও মেশান। রসনাতৃপ্তির পাশাপাশি বুরহানির প্রধান কাজ হজম করানো। রসিকজনের মতে, সরষে, পুদিনা আর জিরের যুগলবন্দি পেটের ভেতর এমন এক পরিপাক যজ্ঞ শুরু করে যে, চার প্লেট কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ার পরেও বুরহানির কল্যাণে না কি শরীর মনে করে, যেন স্রেফ দুই গ্রাস সেদ্ধ ভাত খেয়েছে। ঘোল যেখানে গৃহস্থের দুপুরের আরাম, বুরহানি সেখানে আইঢাই জঠরের তৃপ্তি-সুধা।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্র ও রন্ধনশাস্ত্রে ঘোলের স্থান ছিল প্রায় অমৃতের সমকক্ষ। সংস্কৃতে ঘোলের পোশাকি নাম ‘তক্র’। আয়ুর্বেদাচার্য চরক এবং সুশ্রুত– দু’জনেই তক্রের মহিমা গেয়েছেন। সুশ্রুত সংহিতায় বলা হয়েছে, দইয়ের সঙ্গে চার ভাগের একভাগ জল মিশিয়ে মন্থন করলে যা তৈরি হয়, তা-ই তক্র। প্রাচীন ভারতে দেবতারা না কি অমৃত পান করতেন, আর মর্তবাসীর জন্য ব্রহ্মা পাঠিয়েছিলেন এই তক্র। পেট ঠান্ডা রাখা, হজমশক্তি বাড়ানো এবং অর্শ রোগ নিরাময়ে তার জুড়ি মেলা ভার। আবার, শুধু ঔষধ হিসেবেই নয়, অতীতে ভারতের বিলাসী পানীয় হিসেবেও ঘোলের কদর ছিল। দইয়ের ঘোলের সঙ্গে কর্পূর, গোলমরিচ, আদা আর মধু মিশিয়ে এক ধরনের সুগন্ধী পানীয় তৈরি হত, যার নাম ছিল ‘মঞ্জুষ্কা’ বা ‘প্রপানক’। মৃগয়া থেকে ফেরার পরে রাজা-রাজড়াদের রুপোর পাত্রে এই মঞ্জুষ্কা পরিবেশন করার রেওয়াজ ছিল। 

zoom
রাজস্থান বা গুজরাটের ‘ছাঁচ’ বা ‘ছাস’

বাঙালির ঘোল-বিলাস যদি হয় ঘরোয়া, তবে উত্তর ভারতে স্থান বিশেষে আবার দইয়ের ঘোলের চরিত্রে রকমারি বদল দেখা যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সেখানে ঘোল শুধু পানীয় নয়, দৈনন্দিন আহারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অমৃতসর, লুধিয়ানা, চণ্ডিগড়, হরিদ্বার, লখনউ থেকে দিল্লি ছাড়িয়েও পালোয়ানি লস্যির দাপট কারও অজানা নয়। এই লস্যির সঙ্গে আমাদের পাতলা ঘোলের শরবতের অবশ্য কোনও তুলনাই চলে না। ঘন দইকে কাঠের ডান্ডা ঘুরিয়ে ঘুঁটে, তাতে চিনি আর বরফ মিশিয়ে তৈরি হয় তার খানদানি বদন। তার শিরোভাগে থাকে পুরু মালাইয়ের মুকুট, সঙ্গে পেস্তা আর জাফরানের কুচি। এই গুরুভার লস্যির গ্লাস শেষ করা রীতিমতো কঠিন চ্যালেঞ্জ। আবার রাজস্থান বা গুজরাতের দিকে গেলে এই লস্যিই খোলস বদলে হয়ে যায় ‘ছাঁচ’ বা ‘ছাস’। মাখন তোলার পরে যে অবশিষ্ট তরল পড়ে থাকে, তাই দিয়ে তৈরি হয় ছাস। এতে চিনি নৈব নৈব চ। জিরে গুঁড়ো, বিটনুন আর পুদিনা পাতা দিয়ে তৈরি এই পানীয় গনগনে রোদে জীবনদায়ী সুধার মতো কাজ করে। তবে, শুধু পানীয় হিসেবেই নয়, উত্তর ভারতে ঘোল দিয়ে তৈরি হয় চমৎকার নানা পদ। যেমন উত্তর প্রদেশের ‘কড়ি’। বেসন আর টক ঘোল একসঙ্গে ফুটিয়ে, তাতে মেথি আর শুকনো লঙ্কার ছোঁকা দিয়ে যে-ঝোল তৈরি হয়, তা গরম ভাতের সঙ্গে অমৃত। 

অন্যদিকে, দক্ষিণী রন্ধনশাস্ত্রে দইয়ের ঘোলের ব্যবহার এতই সূক্ষ্ম এবং গভীর যে, তা না দেখলে প্রত্যয় হয় না। সেখানে তীব্র গরম আর মশলাদার খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখতে ঘোলই প্রধান অস্ত্র। একবার ভেলোরে ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজের মূল ফটকের উল্টোদিকে ঘোলের খোঁজ করতে গিয়ে পরিচয় হল ‘মোর’-এর সঙ্গে। এর অন্য নাম ‘মজ্জিগে’। জানতে পারলাম, তামিলনাড়ু বা কেরালায় যে কোনও ঐতিহ্যবাহী থালি বা ‘সাদ্য’-র শেষে পরিবেশিত হয় এই ‘মোর’, যার ভিত্তি খুব পাতলা ঘোল। তার সঙ্গে মেশে থেঁতো করা আদা, কাঁচালঙ্কা, কারিপাতা আর সামান্য হিং। কখনও আবার তাতে সরষে আর শুকনো লঙ্কার দুর্দান্ত তড়কাও না কি পড়ে। তখন সে ‘মোর ভেট্টু’ অবতারে উন্নীত হয়। একদা কোচি শহরে এক নৈশাহারে ‘মোর কুঝাম্বু’ চেখেও মুগ্ধ হয়েছি। অনেকটা উত্তর ভারতীয় কড়ির সঙ্গে মিল থাকলেও এই ব্যঞ্জন তৈরি হয় টক ঘোল, নারকেল বাটা আর ছাঁচি কুমড়ো দিয়ে। তেল-মশলার বালাই নেই, অথচ স্বাদে অতুলনীয়। চেন্নাইয়ের সুপরিচিত খাদ্যরসিক অরবিন্দন জানিয়েছিলেন, চড়া মশলাদার খাবার খাওয়ার পরে এক গ্লাস ‘মোর’ না খেলে পেটের ভেতরের ‘অগ্নি’ শান্ত হয় না। সেই কারণেই হয়তো ভোজের শেষে সে তল্লাটে জলের চেয়ে ঘোল পান করাই রেওয়াজ।

zoom
দক্ষিণ ভারতের ‘মোর’ বা ‘মজ্জিগে’

ঘোলের জনপ্রিয়তা বিশ্বের বহু দেশেই দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, বিশেষ করে তুরস্ক, ইরান ও লেবাননে ঘোলের চাহিদা আকাশছোঁয়া। তুরস্কে ঘোলের নোনতা শরবত ‘আয়রান’-এর প্রায় জাতীয় পানীয়র মর্যাদা বললে ভুল হবে না। দই, জল আর নুন দিয়ে তৈরি এই তরল এতটাই জনপ্রিয় যে, সেদেশে ম্যাকডোনাল্ডস বা বার্গার কিং-এর মতো আন্তর্জাতিক বিপণিতেও কোলা-র পাশাপাশি আয়রান বিক্রি হয়। অন্যদিকে, ইরান ও আফগানিস্তানে ঘোলের শরবতের নাম ‘দুগ’। ঝাঁঝালো এই পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে শুকনো পুদিনা পাতা গুঁড়ো করে মেশানো হয়। কাবাবের চর্বি হজম করতে না কি এর চেয়ে ভালো জিনিস আর নেই।

zoom
তুরস্কে ঘোলের নোনতা শরবত ‘আয়রান’

আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর প্রান্তে, বিশেষ করে মিশর, মরক্কো ও সুদান অঞ্চলে ঘোলের এক চমৎকার রূপ দেখা যায়। সেখানে একে বলা হয় ‘লাবান আরবিল’ বা সংক্ষেপে ‘লাবান’। ইথিওপিয়া বা সোমালিয়ার দিকে আবার মাখন তোলার পরে যে ঘোল পাওয়া যায়, তাকে বলে ‘শেন’। আফ্রিকানরা এই ঘোলে অনেক সময় এলাচ বা দারুচিনির মতো মিষ্টি সুগন্ধী মশলা মেশাতে পছন্দ করেন। মরুভূমির রুক্ষ আবহাওয়ায় শরীরকে সতেজ রাখতে এই পানীয়র ওপরে তাঁদের পরম ভরসা। 

আবার মেক্সিকোর কিছু কিছু উপজাতীয় অঞ্চলে দইয়ের ঘোলের সঙ্গে ধনেপাতা, লেবুর রস আর সামান্য পরিমাণে স্থানীয় হ্যালাপেনো লঙ্কা মিশিয়ে খাওয়ার চল আছে বলে জেনেছি, তবে সেই স্বাদ পরখ করার সৌভাগ্য ইহজীবনে হবে কি না জানা নেই।

zoom
আফ্রিকার পানীয় ‘লাবান আরবিল’

মোদ্দা কথা হল, জীবনের চড়াই-উৎরাইয়ে নাভিঃশ্বাস ওঠা কলিজায় একফোঁটা শান্তি এনে দিতে ঘোলের বিকল্প পাওয়া শুধু মুশকিলই নয়, বলা চলে না-মুমকিন। সাধে কি ভক্তনিবাসে মহাপ্রভুর মহাপ্রসাদের আয়োজন হলে সুগন্ধি চালের অন্ন, বিভিন্ন শাক এবং ব্যঞ্জনের শেষে ঠান্ডা ঘোল বা দই পরিবেশন করা হত! প্রখর গ্রীষ্মে অবিরাম সংকীর্তনের পরে শরীর ও মন শান্ত করতে ঘোলই ছিল শ্রীচৈতন্যের প্রিয় উজ্জীবক। সংসার-ঝঞ্ঝায় বিধ্বস্ত ছা-পোষা চিত্তে মহাজনের আশীর্বাদধন্য সেই ঘোল-সুধা যে ছটাক খানেক শান্তির পরশ এনে দেয়, তা-ই পরম প্রাপ্তি।

buttermilk curd food and drinks indian food Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar yogurt

Share this article on