April Fool’s Day and Politics: Who’s Fooling Whom?। Robbar
Robbar
  • ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতিতে কেউ ‘রাম’, কেউ ‘বোকারাম’

রাম বলতে আমরা মুখের বাংলায় বুঝি ‘বড়’। সেই বড় অর্থাৎ রাম পূর্বে বসিয়ে বাংলা ভাষায় আমরা রাম ছাগল, রাম বোকা-র মতো শব্দ ব্যবহার করেছি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাংলাভাষা-পরিচয়-তে ভাষার এই কাণ্ডকারখানা লক্ষ করে লিখেছিলেন, “হাঁদারাম ভোঁদারাম বোকারাম ভ্যাবাগঙ্গারাম শব্দগুলোর ব্যবহার চূড়ান্ত মূঢ়তা প্রকাশের জন্যে। কিন্তু ‘সুবুদ্ধিরাম’ ‘সুপটুরাম’ বলবার প্রয়োজনমাত্র ভাষা অনুভব করে না। সবচেয়ে অদ্ভুত এই যে ‘রাম’ শব্দের সঙ্গেই যত বোকা বিশেষণের যোগ, ‘বোকা লক্ষ্মণ’ বলতে কারও রুচিই হয় না।”

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১, ২০২৬, ১৯:১২   
Facebook WhatsApp Messenger
April Fool’s Day and Politics: Who’s Fooling Whom?

‘বোকা’ শব্দের সঙ্গে দুটো ক্রিয়াপদের যোগ বেশ গভীর। বোকা ‘বনা’ আর বোকা ‘বানানো’। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে বিলেত ফেরতা অমিত রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে একজন কবিকে খাড়া করেছিল, নাম তার নিবারণ চক্রবর্তী। সেই নিবারণ চক্রবর্তীর নতুন কবিতা শুনে সবার তাক লেগে যেত। ছুঁচলো জুতো পরা রমণীয় নব্যবঙ্গীয় ললনা সিসি অবশ্য ধরতে পেরেছিল অমিতের চমকে দেওয়া চালাকি। বলেছিল, ‘একখানা আস্ত নিবারণ চক্রবর্তী তুমি নিশ্চয় আগে থাকতে গড়ে তুলে পকেটে করে নিয়ে এসেছ, কেবলমাত্র ভালোমানুষদের বোকা বানাবার জন্যে।’ অমিত বোকা ‘বানানো’-র দলে, আর সভাসুদ্ধ বাকিরা যারা না কি রবি ঠাকুরের দল তারা বোকা ‘বনা’-র দলে। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাস পড়ে রবীন্দ্র-পরবর্তী নব্য প্রজন্মের প্রতিনিধি স্থানীয় কবি বুব মানে বুদ্ধদেব বসু মুগ্ধ হয়েছিলেন। এমন প্রেমের উপন্যাস কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! ‘শেষের কবিতা’-কে রক্ষণশীলদের মধ্যে কেউ কেউ ‘কেমন একটা’ প্রেমের উপন্যাস বলে ভাবতেন। তবে নব্যরা অথবা রক্ষণপন্থী প্রবৃদ্ধ কেউ একে কখনও ভুলেও ‘রাজনৈতিক উপন্যাস’ বলে ভাবতেন না। বিশেষত বুদ্ধদেবের তো ‘পলিটিক্স’ সম্বন্ধে এলার্জিই ছিল। কিন্তু কী জানি! অন্য একটা কারণে, বোকা বনা আর বোকা বানানোর কৌশলের জন্যই বোধহয়, আজকাল এই উপন্যাসটিকে কখনও কখনও ‘পলিটিক্যাল’ বলে মনে হচ্ছে। এ ঠিক ‘দ্য পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ মার্কা পলিটিক্যাল নয়, একেবারে দলগত পলিটিক্যাল।

zoom

পলিটিক্সের আজকাল হদ্দমুদ্দ যে নীতি তাকে বলা চলে ‘পলিটিক্যাল সিমুলেশন’ (Political Simulation)। একে বলতে পারি রাজনৈতিক গুগলি। ক্রিকেটের পিচে এককালে গুগলিসিদ্ধ পুরুষেরা পকেটে উইকেট ঢোকাতেন। আপাত দৃষ্টিতে যা লেগব্রেক তাই শেষ অবধি হঠাৎ অফব্রেক। বল বুঝতে না পেরে বোকা বনে ব্যাট বগলে প্যাভিলিয়নে প্রত্যাবর্তন। পলিটিক্যাল সিমুলেশনও এইরকম। শুনে মনে হবে আহা-বাহা। কিন্তু কার্যত দেখা যাবে রাজনীতির খেলুড়ে আপাত ভালোর ছদ্মবেশে নিজের পকেটে কিংবা দলের পকেটে সুবিধে ঢোকাচ্ছেন। জনগণের হাতে রইল পেনসিল। জনগণ সেটা প্রথমে বুঝতে পারছিলেন না, শেষে যখন বুঝলেন তখন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দলের কার্যসিদ্ধি হয়েছে। কথায় বলে বটে ‘জনগণেশ’, কিন্তু সেই গণেশের কপালে সিদ্ধি কোথায়! সিদ্ধি নেই। জনগণেশ উলটে পড়ল। পুঁজিবাদীরা রসিক মানুষ তারা এই সব নিয়ে ভিডিও গেমস বানিয়েছে। রিয়েল পলিটিক্স ৩, জিও-পলিটিক্যাল সিমুলেটর ৫ বাজার চলতি জনপ্রিয় গেমস। স্ক্রিনে খেলে মজা পান, বাস্তবে ঠকে যান। এই আমাদের জনতা জনার্দনের কপাল। রাজনৈতিক নেতারা মনে মনে বলেন, “ওই মেয়েটা ‘বোকা ভাই’/ ওই ছেলেটা ‘বোকা ভাই’/ যেদিকে তাকাই বোকারাই।” যদি জিগ্যেস করেন ‘বোকা ভাই’ আবার কী? তাহলে উত্তরে বলি এই এক কাল্পনিক সম্বোধন। এর জাতি নেই, লিঙ্গ নেই, ধনী নেই, গরিব নেই এর শুধু ঠকে যাওয়া আছে, বোকা বনে যাওয়া আছে। বেচারা জনতার নির্ভেজাল আত্মা। সেই আত্মা যাকে পলিটিক্যাল অমিতরা আগে থেকে বুক পকেটে আস্ত একটা নিবারণ চক্রবর্তী মাফিক স্ক্রিপ্ট তৈরি করে এনে, হঠাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে সেটি পড়ে শুনিয়ে, বোকা বানায়। 

zoom

তবে কি না মাঝে মাঝে বোকা বনতে বনতে বোকাদেরও খুব রাগ হয়।

খেয়াল করে দেখেছি বাংলা একটি আজব ভাষা। এই ভাষায় আমরা যে কত কিছু করেছি। ত্রিগুণাতীত রামকে আমরা বিশেষণ বানিয়ে দিয়েছি। রাম বলতে আমরা মুখের বাংলায় বুঝি ‘বড়’। সেই বড় অর্থাৎ রাম পূর্বে বসিয়ে বাংলা ভাষায় আমরা রাম ছাগল, রাম বোকা-র মতো শব্দ ব্যবহার করেছি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাংলাভাষা-পরিচয়-তে ভাষার এই কাণ্ডকারখানা লক্ষ করে লিখেছিলেন, “হাঁদারাম ভোঁদারাম বোকারাম ভ্যাবাগঙ্গারাম শব্দগুলোর ব্যবহার চূড়ান্ত মূঢ়তা প্রকাশের জন্যে। কিন্তু ‘সুবুদ্ধিরাম’ ‘সুপটুরাম’ বলবার প্রয়োজনমাত্র ভাষা অনুভব করে না। সবচেয়ে অদ্ভুত এই যে ‘রাম’ শব্দের সঙ্গেই যত বোকা বিশেষণের যোগ, ‘বোকা লক্ষ্মণ’ বলতে কারও রুচিই হয় না।” এই বাক্যের সূত্রে একটা টীকা যোগ করতে ইচ্ছে করে। মা তাঁর সন্তানকে যখন হাঁদারাম ভোঁদারাম বলেন তখন তার মধ্যে স্নেহমিশ্রিত প্রশ্রয় থাকে। বোকা যেন সেখানে তিরস্কার নয়। এই জগতের গলা-কাটা চালাকদের প্রতিযোগিতায় তাঁর ভালো ছেলেটি আনফিট, ভালো বলেই সে চালাক হতে পারেনি। যেন-তেন-প্রকারেণ সিদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। তাই মা তাঁর হেরে যাওয়া সন্তানকে বোকারাম বলে গাল টিপে দিয়ে আদর করলেন। বললেন মনে মনে, ‘সোনা আমার মন খারাপ করিস না।’ একই ভঙ্গিতে অনেক সময় ভালো মেয়েদের বোকা মেয়ে বলা হয়। তবে বোকারাম আর রাম বোকা এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। ‘রাম’ যখন সামনে তখন তা প্রশ্রয়বাচক নয়, তিরস্কারমূলক। বিশেষ করে বাঙালির সেকালের পাঠশালায় ও তৎপরবর্তী ইস্কুলে বেত্রধারী শিক্ষকেরা যতদিন প্রতাপশালী ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত ‘রাম বোকা’, ‘রাম ছাগল’ এই তিরস্কারবাক্য শোনা যেত। তারপর পড়ুয়ার কপালে ‘নিল-ডাউন’, ‘চেয়ার হওয়া’ জাতীয় শারীরিক শাস্তি জুটত। 

zoom
শিল্পী: নারায়ণ দেবনাথ

এই রামময় বাংলা ভাষায় ইস্কুলে শাস্তি পাওয়া ও রাজনীতির কৌশলে ঠকে যাওয়া জনতা যদি ঠকতে ঠকতে হঠাৎ রেগে যায় তখন? ওই যে তবে কি না মাঝে মাঝে বোকা বনতে বনতে বোকাদেরও খুব রাগ হয়।

পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদেরা অনেকটা পরশুরামের ‘মহাবিদ্যা’ গল্পের আমেরিকা থেকে আসা ভ্যান্ডারলুটের মতো চরিত্র। তার সঙ্গে বিরিঞ্চিবাবা পাঞ্চ। কে এই ভ্যান্ডারলুট? স্বয়ং শয়তান (devil himself)। এই ডেভিলরা নির্মম রকমের নির্মোহ। নিজের স্বার্থে লোক ঠকাতে এদের দোসর মেলে না। এই ডেভিলদের বাণী, ‘বৎস, কেড়ে নেওয়াটা রূপকমাত্র। সাদা কথায় এর মানে হচ্ছে– সংসারের মঙ্গলের জন্য লোককে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কিছু আদায় করা।’ সংসারের মঙ্গল অর্থাৎ নিজের বা নিজেদের মঙ্গল। তবে যদি হাওয়া ঘুরে যায়, বিপদে পড়ে তখন সেই বিপদকালে হাসতে হাসতে নিজেকে সর্বহারা ভেবে কেটে পড়তে পারে। ‘মহাবিদ্যা’ নাটুকে-গপ্পের শেষে কাঙালি জিগ্যেস করেছিল, যদি মহাবিদ্যা অর্থাৎ চুরিবিদ্যা ধরা পড়ে তখন কী হবে? পরশুরাম লিখেছেন, জগদ্‌গুরু ভ্যান্ডারলুট ‘ঈষৎ হাসিয়া বেদী হইতে নামিয়া পড়িলেন।’ এখানেই ডেভিলের ডেভিলত্ব। এরা হিটলারের মতো আত্মহত্যা করে না, মুসোলিনির মতো জনরোষের শিকার হয় না, বিপদকালে এদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয় না, এরা ঈষৎ হেসে বেদী থেকে নেমে সাধারণে মিশে যায়। 

zoom
বিরিঞ্চিবাবা

বোকারা রেগে গেলে আত্মরক্ষার জন্য পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদদের এই ঈষৎ হেসে বেদি থেকে নেমে পড়া নয়া কৌশল। অমিত-র মতো তারা তখন বলে নিবারণ চক্রবর্তী নেই, মুখ লুকিয়েছে, মারা গেছে। রেগে যাওয়া জনগণ এই পালাবদলে শান্ত হয়। এই ঈষৎ হেসে নেমে যাওয়া জগদ্‌গুরু রাজনীতিবিদদের জন্য তাদের কারও কারও মন একটু খারাপও হয়। তাদের আবার বোকা বানিয়ে এই নির্মম নির্মোহ ডেভিলের আত্মরক্ষা। তাদের কপালে সেকালের মতো জনরোষের কর্মফল নেমে আসে না। 

এই যে বোকা বনা আর বোকা বানানো তারই এক মহাযজ্ঞশালা এই রাজনৈতিক পৃথিবী।

বোকাদের মধ্যে কেউ কেউ গান গায়। ‘আমাকে বোকা বোলো না।’ কেউ কেউ মানুষের পৃথিবীর বাইরে না-মানুষী প্রাকৃতিক পৃথিবীর অপরূপের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে ‘এসব দেখতে তো আর পয়সা লাগে না।’ আর কী আশ্চর্য ঠিক তখনই তার পিছনে এসে দাঁড়ায় ট্যুরিজমপন্থীরা। প্রকৃতিকে পুঁজির উপায় করা তাদের লক্ষ্য। হোটেল বানাও, সুইমিং পুলে শুয়ে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখো পয়সা দিয়ে। এসব দেখতে পয়সা লাগে।

zoom

তবে এত কিছু করেও যাকে বোকা বানানো যায় না তার নাম প্রকৃতি, তার নাম বসুন্ধরা। প্রকৃতি রেগে গিয়ে মহাপ্রলয় জাগিয়ে তোলেন। আর শেষ অবধি রাম-সাম্রাজ্যকে প্রত্যাখ্যান করে যার কাছে সীতা আশ্রয় নেন তিনি মা বসুন্ধরা। পৃথিবী রাম সাম্রাজ্যকে আর ফসল দেবেন না। মরুভূমির সামনে ভূমিকম্পের পর ধ্বংসের আগে বোকা রাম বসে আছেন, তাঁর আত্মারাম এবার তাঁকে ছেড়ে যাবেন।

AprilFools Democracy MediaAndPolitics PoliticalHumor PoliticalSatire Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on