famous painters and their iconic depictions of mahaprabhu| Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চিত্রকরের চোখে শ্রীচৈতন্যদেব

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে গগন-অবনের নতুন ভাবে চিত্রপ্রাণিত ছবির সঙ্গে এর সাদৃশ্য এক লহমায় বোঝা যায়। শ্রীচৈতন্যের ছবির সিরিজে রেখার জোরালো টান, তুলির ক্ষিপ্র গতি, আকারের দ্রুত নির্মাণ যেন শ্রীচৈতন্যের আবেগাপ্লুত পাগলপারা ভাবের সঙ্গে মিশে যায়। গগনের অন্তরের ভক্তিভাবের পুলকে এই ছবিগুলি প্রাণ পেয়েছে। এমনকী মায়ের মৃত্যুশোক, পুত্রের অকালে চলে যাওয়া তাঁকে যখন ভিতরে ভিতরে দিশাহারা করে তুলেছে, তখন মায়ের পূজার আসন থেকে পাওয়া বিষ্ণুর চরণটি তাঁর ছবিতে সিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

শেষ আপডেট: মার্চ ৩, ২০২৬, ১৫:০৫   
Facebook WhatsApp Messenger

শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনালেখ্যের দিকে তাকালে দেখি, কল্পনা আর বাস্তবের টানাপোড়েনে বোনা এক আশ্চর্য রূপকথা একদা ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে পরিচিত নবদ্বীপের প্রাণপুত্তলি তিনি, নদিয়ার নিমাই আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে ফাল্গুনী পূর্ণিমার এক মায়াময় সন্ধ্যায় নবদ্বীপের আকাশ আলো করে নেমে এসেছিলেন সেই নিমাই, প্রবল ডানপিটে শৈশব কাটিয়ে কৈশোরের দুর্বার অ্যাডভেঞ্চার শেষে যখন যৌবনের দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছেন– তখন শরীর-মনের সর্বাঙ্গ জুড়ে এক অনুপম দীপ্তি তপ্ত কাঞ্চনের আভার মতো গৌরবর্ণ দীর্ঘ দেহ, সতেজ বেতের মতো সুঠাম চেহারা, চোখের চাহনিতে দীপ্র অনুসন্ধিৎসা, মুখমণ্ডলে ছড়ানো মেধা আর প্রীতির ঔজ্জ্বল্য– অজান্তেই সবার সমীহ আদায় করে নিয়েছে পণ্ডিতকুলের তর্কসভায় এককালে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ক্রমে সময়ের সঙ্গে নিমাই প্রাণের ঠাকুর, প্রেমের অবতার রূপে দেখা দিয়েছেন মেতে উঠেছেন তথাকথিত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উচ্চ-নীচ সমস্ত মানুষকে এক সারিতে বাঁধার গভীর সংকল্পে। আমাদের বুকের গভীরে জ্বেলে দিয়েছেন ভালোবাসার সেই অনন্ত প্রদীপখানি আজকেও সমস্ত জগৎ চেয়ে আছে তাঁর প্রেমের অমৃতবাণীর দিকে

zoom
নন্দলাল বসুর করা পাঠভবনের দেওয়ালের বিস্তৃত মিউরালের মাঝে ‘শ্রীচৈতন্যের জন্ম’

এই মুহূর্তে যুদ্ধের উল্লাসে মত্ত পৃথিবী কি শুনতে পাচ্ছে তাঁর প্রেমের ললিত বাণী? প্রেম, ভালোবাসা, দয়া ইত্যাদি শব্দমালা কি আজ পরিহাসের মতো শোনাচ্ছে? তাঁর দিব্যজীবন থেকে যে পৃথিবী প্রতিদিন প্রাণিত হয়ে ওঠে সে কি আজ স্তব্ধ? প্রেমাতুর জীবন জুড়ে তিনি গেঁথে চলেছিলেন অনন্ত প্রেমের সেই অমৃতমাল্য– তা কি আজ পথের ধূলায় ধূসরিত? মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের পূজাপর্বের এক বহু পরিচিত গান– ‘আকাশে দুই হাতে প্রেম বিলায় ও কে’ এই গানটির সামনে দাঁড়ালে আমাদের মনের কোণে ভেসে ওঠে পাগলপারা শ্রীচৈতন্যের সেই প্রেমময় কান্তি, কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা মোহনরূপের এক পাগল প্রেমিক! যাঁর দিকে তাকিয়ে কবির মতো আমাদেরও বলতে ইচ্ছে করে, ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস–/সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো,/ পাগল ওগো, ধরায় আস’ নিজের বিরুদ্ধে উদ্ধত আঘাতের মুহূর্তেও তিনি নিশ্চল, হিংসার সামনেও নতজানু হয়ে অকাতরে প্রেম ঢেলে দিতে পারেন! হিংসার বিপরীতে হিংসা, অস্ত্রের বিরুদ্ধে উদ্যত অস্ত্রের ঝনঝন সরিয়ে রেখে প্রেমের এমন জয়গান, ভালোবাসার এমন মহোৎসবে মেতে ওঠা কি বড় সহজ? ‘বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া’– এ যে বর্ণে বর্ণে সত্য

zoom
পূজায় ব্যবহৃত বিষ্ণুর চরণটি ছবিতে সিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভেবে দেখলে, কী আশ্চর্য সময়ে শ্রীচৈতন্যের জন্ম, পাতাঝরা শীতের শেষে ডালে ডালে সবুজের সমারোহ, বাতাসে আম্রমুকুলের নেশা ধরানো সৌরভ, গাছের শাখায় সেজে উঠেছে শিমুল পলাশ বসন্তিকা আর লজ্জানত ফাগুন-বউ। মাধবীর মাতাল করা সুবাসে সুনীল কোমর-বন্ধনীতে সেজে হাজির ভ্রমরের দল। এমনই এক মায়াবি সন্ধ্যায় পূর্ণিমার চাঁদ বুঝি চমকে তাকিয়েছে মাটির দিকে। সেখানে কি তারই প্রতিবিম্ব? হয়তো তার চেয়েও বেশি, সেই স্নিগ্ধ আলোকে কে কার চেয়ে উজ্জ্বল– কে বলবে সে কথা? বসন্তের সমস্ত রং কি আজ তাঁরই গায়ে এসে পড়েছে? স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ সোনার শরীরের ভিতর দিয়ে যেন খেলে যাচ্ছে আলোবাতাস, কোমলতনু ভেদ করে দেখা যাচ্ছে এপার থেকে ওপার পর্যন্ত। তিনি তো প্রকৃত অর্থেই সোনার গৌরাঙ্গ। পীত উত্তরীয় উড়িয়ে চলেছেন পথে, তিনিই যে ঋতুরাজ। গলায় রক্ত কিংশুকের একছড়া মালা আরও রাঙা হয়ে উঠেছে তাঁর সোনার বরণ আভায়। কপালে কি চন্দনের তিলক না কি তা রাঙা আবীরে মাখানো? আজ এই দোলের উৎসবে আমরা কি বসন্তের এমন মোহনরূপের রাঙা প্রতিমাকে মনে রেখেছি? রঙের মহাউৎসবে শিল্পীরাও কি তাঁকে বিস্মৃত হয়েছেন? না, হয়তো তা নয়। আজকের শিল্পীরা তাঁকে স্মরণে না-রাখলেও কিছুকাল আগে পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র ছবি।

zoom
নন্দলাল বসুর আঁকা মহাপ্রভু

যুগ যুগ ধরে শ্রীচৈতন্যদেবের জীবন ঘিরে রচিত হয়েছে কত অজস্র আখ্যান নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস ছাড়াও আরও কত কী– আজকের ভাষায় যাকে বলতে পারি ফিকশন, ফিউশন আবার সময়ের নিরিখে আধুনিক মন নিয়ে শুরু হয়েছে তথ্যনিষ্ঠ জীবন রচনার কাজ পাশাপাশি চিত্রকররাও পিছিয়ে নেই, লোকশিল্পীদের চিত্রপট থেকে আধুনিক আর্টিস্টের ক্যানভাস পর্যন্ত এর বিস্তার অন্যদিকে ক্যালেন্ডারের পাতায় দেবদেবীর ছবির পরে বোধ করি সর্বাধিক দেখা যায় শ্রীচৈতন্যের প্রতিমা এখানে ক্যালেন্ডারের কথা আলাদা করে বলতে হয়, কারণ সে আমজনতার সবচেয়ে কাছের বিষয়কে বুঝি সর্বাধিক জনপ্রিয় করেছে এই ক্যালেন্ডার-শিল্প, একে নির্দ্বিধায় ‘পপুলার আর্ট’ বলতে পারি তবে আধুনিক শিল্পীর তুলিতে চৈতন্যদেবের ছবি প্রসঙ্গে সংখ্যার নিরিখে উঠে আসে গগনেন্দ্রনাথের নাম। শ্রীচৈতন্য সিরিজের প্রায় ১৬টি ছবি তিনি এঁকেছেন, বিষয়ের ভিন্নতায় ছবিতে চৈতন্যের জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে কোথাও তিনি শিষ্যদের পাঠদানে রত, শ্রীচৈতন্য ও ইশ্বরপুরী, গৃহত্যাগের সময় মাতা শচীদেবীর কাছে বিদায় নেওয়ার আবেগঘন মুহূর্ত, কোথাও তিনি মুণ্ডিত মস্তকে ভক্তদের মাঝে, জগন্নাথধামের পথে চলেছেন ইত্যাদি ছবি সহজেই অন্য গগনেন্দ্রনাথকে চিনিয়ে দেয় আলো-অন্ধকারে ছায়াঘেরা যে কিউবিস্টিক ঘরানা গগনেন্দ্রনাথের কাজে দেখি, তা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত

zoom
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা শ্রী চৈতন্যের নগর-সংকীর্তন

এই পর্বের কাজে দূরপ্রাচ্যের ছবির কথা মনে পড়ে যায়– যা ‘জীবনস্মৃতি’র শিল্পী গগনেন্দ্রনাথের তুলিতে প্রকাশিত জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কাকুজো ওকাকুরা প্রেরিত দুই জাপানি চিত্রকরের ছবি দেখে গগন-অবনের নতুনভাবে চিত্রপ্রাণিত ছবির সঙ্গে এর সাদৃশ্য এক লহমায় বোঝা যায় শ্রীচৈতন্যের ছবির সিরিজে রেখার জোরালো টান, তুলির ক্ষিপ্র গতি, আকারের দ্রুত নির্মাণ যেন শ্রীচৈতন্যের আবেগাপ্লুত পাগলপারা ভাবের সঙ্গে মিশে যায় শিল্পীর অন্তরের নিবেদন এখানে তুলির আঁচড়ে ভাষায় আসাধারণ গ্রাফিক প্রিসিশন হয়ে উঠেছে গগনের অন্তরের ভক্তিভাবের পুলকে এই ছবিগুলি প্রাণ পেয়েছে। এমনকী, মায়ের মৃত্যুশোক, পুত্রের অকালে চলে যাওয়া তাঁকে যখন ভিতরে ভিতরে দিশাহারা করে তুলেছে, তখন মায়ের পূজার আসন থেকে পাওয়া বিষ্ণুর চরণটি তাঁর ছবিতে সিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন এর আড়ালে প্রচ্ছন্ন ছিল গগনেন্দ্রনাথের ঈশ্বরপ্রীতি, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে ভগবান বিষ্ণুর চরণে গভীর আশ্রয় নিতে চাওয়া আমরা জানি, গগন-অবন সহজে বাড়ি ছেড়ে বাইরে যেতে চাইতেন না– এর ব্যতিক্রম ছিল দু’টি জায়গা তার প্রথমটি যদি হয় পুরীর জগন্নাথধাম, তো অপরটি দার্জিলিং

zoom
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকায় প্রাণ পেয়েছে শ্রী চৈতন্যের জীবন-ছবি

আবার দেখা যাবে, নন্দলালের ছবিতে শিল্পীর ভাবনা ও বর্ণবিন্যাস একেবারে আলাদা তাঁর আঁকা শ্রীচৈতন্যের ছবির মধ্যে গৌরাঙ্গের ন্যায়শাস্ত্র অধ্যাপনা, চৈতন্যের গৃহত্যাগ বা পুরীর মন্দিরে গরুড়স্তম্ভের নিচে আলুথালু পোশাকে প্রেমবিহ্বল শ্রীচৈতন্যের ছবিটি অন্যতম এই ছবি থেকে সহজে চোখ সরিয়ে নেওয়া যায় না ওয়াশ ও টেম্পেরার মিশ্রণে আঁকা ছবিটি অন্ধকার চিত্রপটে এক ঝলক আলোর মতো জ্বলে ওঠে ছবিতে দেখা যায়, মাটিতে ছড়িয়ে পড়া আলুলায়িত গেরুয়া বস্ত্রখণ্ডের আবরণ ভেদ করে শ্রীচৈতন্যের দেহাবয়ব যেন সোনালি আলোর উজ্জ্বল উদ্ভাস তাঁর উদাসী দৃষ্টিতে কোন মায়ামন্ত্র আঁকা, তা কে বলতে পারে! শ্রীজগন্নাথের দর্শন-আকাঙ্ক্ষায় ভক্তপ্রাণের যে আকুল আকুতি শিল্পীর চিত্রপটে ফুটেছে– তা বুঝি নন্দলালের পক্ষেই সম্ভব নন্দলালের আরেকটি ছবির বিষয় ‘চৈতন্য এবং হরিদাস’, পুরীর সিদ্ধবকুল গাছের তলায় উপবিষ্ট শ্রীচৈতন্য এবং পরম ভক্ত হরিদাস খেয়াল করলে বোঝা যায়, একটি জীর্ণ কাঁথা ছবিতে হয়ে উঠেছে শ্রীচৈতন্যের ভূমিতলের আসন এবং গায়ের শীতবস্ত্র যবন হরিদাস এখানে করজোড়ে মহাপ্রভুর কাছে পাঠ নিচ্ছেন। এ ছবির বিন্যাস, রঙের ব্যবহার আর সামগ্রিক অভিব্যক্তি অনুভূতিশীল দর্শকের হৃদয় সিক্ত হয়ে আসে ছবি দেখতে গিয়ে মনে হয়, বিশ্বজুড়ে যে-ধর্মীয় সংকট আজ আমাদের অন্তরকে মুহুর্মুহু বিদীর্ণ করে চলেছে– তার বিপরীতে এই ছবিই আমাদের ভালোবাসার বার্তা দিতে পারে। গান্ধীজির আদর্শে প্রাণিত নন্দলালের ছবিটি বিষয় ও অভিব্যক্তিতে অন্য মাত্রা স্পর্শ করেছে

zoom
পুরীর সিদ্ধবকুল গাছের তলায় শ্রীচৈতন্য এবং পরম ভক্ত হরিদাস। শিল্পী: নন্দলাল বসু

পাশাপাশি মনে পড়বে নন্দলালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ছবি ‘শ্রীচৈতন্যের জন্ম’– যা শান্তিনিকেতনে পাঠভবনের দেওয়ালের বিস্তৃত মিউরালের কেন্দ্রস্থলে অঙ্কিত মিউরালের জন্যে তৈরি এক রঙিন খসড়া দিল্লির জাতীয় সংগ্রহালয়ে রক্ষিত আগের ছবির থেকে এই ছবিটির গঠন বিন্যাস সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এ ছবি রচিত পটচিত্রের আধারে, একেবারে দ্বিমাত্রিক গড়নে জ্যামিতিক আকারের সামগ্রিক নির্মাণ উড়িষ্যার পটচিত্রের ধারা ও রাজস্থানি অনুচিত্রের ঘরানাকে স্মরণ করায়। মণ্ডনধর্মীতা থেকে সরে গিয়ে এ ছবি ফ্ল্যাট রঙের উপরে রেখা আর ডট-এর টেক্সচারে গঠিত রঙের প্যালেটও এখানে যথেষ্ট সীমাবদ্ধ, সাদার পাশাপাশি, মেটে রঙ, ধূসর, পোড়া লাল আর ঘন শ্যাওলা-সবুজে সেজে উঠেছে এই ছবি উল্লেখ্য, লোকশিল্পীর আধারে তৈরি এই ছবিতে কোনও রাসায়নিক রং নয়, ব্যবহৃত হয়েছে স্থানীয় ‘আর্থ-কালার’

zoom
ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদারের আঁকায় আশ্চর্যভাবে ধরা পড়েছে শ্রী চৈতন্যের জীবনচরিত

তবে শ্রীচৈতন্যের ছবির প্রসঙ্গ উঠলে যাঁর কথা না-বললে অসম্পূর্ণ থাকে, তিনি শিল্পী ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার সম্ভবত এই বিষয়ে তাঁর ছবিই সর্বাধিক কেবল সংখ্যার প্রেক্ষিতেই নয়, ক্ষিতীন্দ্রনাথের চিত্রমালায় পরম বৈষ্ণবের যে বিনম্র ভঙ্গি ফুটেছে, তা আর কারও ছবিতে প্রকাশ পেয়েছে কি না, জানি না শুধু চিত্রপটে নয়, ক্ষিতীন্দ্রনাথের জীবনপটের গভীরেও খোদিত ছিল খাঁটি বৈষ্ণবের সেই মন্ত্র– ‘তৃণ হতে যে বা হয় সহিষ্ণু, দীন হতে দীনতর, সেই বৈষ্ণব’ বৈষ্ণব ধর্মের গভীরে প্রবেশের জন্যে শিল্পী আজীবন নিরামিষ আহার করেছেন, কীর্তনের রসে আপ্লুত থেকেছেন, এমনকী, কীর্তনগায়ক হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন প্রখ্যাত কীর্তনিয়া নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসীর কাছে তাঁর কীর্তনের পাঠগ্রহণ এহেন শিল্পীর তুলিতে যে ভক্তিরসের মূর্ত প্রতিমা রচিত হবে, তা বলাই বাহুল্য খেয়াল করলে, তাঁর পটে রাধাকৃষ্ণ আর শ্রীচৈতন্যদেবের ছবির সংখ্যা অগণিত তার মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ছবিগুলি যথাক্রমে– চৈতন্যের গৃহত্যাগ, সংকীর্তন, যবন হরিদাসের তিরোভাব, নীলাচলে শ্রীগৌরাঙ্গ, বিরহিণী বিষ্ণুপ্রিয়া, নৃত্যরত চৈতন্য, শ্রীচৈতন্যের ক্ষমা ইত্যাদি ক্ষিতীন্দ্রনাথের ছবির বৈশিষ্ট্য হল একেবারে ফ্ল্যাট কাগজ-কাটা দ্বিমাত্রিক আকারে আলংকারিক নমনীয়তার প্রকাশ অনেক সময় তাঁর ছবিকে জাপানি উকিয়ো-ই-প্রিন্ট ইমেজের মতো দেখায় রঙের বিন্যাসেও এখানে মৃদুতার প্রাধান্য, কখনও অজন্তার বর্ণবিভার সঙ্গে মিলে যায় এছাড়াও বলতে হবে, শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনকে কেন্দ্র করে উড়িষ্যার পটচিত্রের এক বিপুল প্রবাহ প্রচলিত আছে শ্রীচৈতন্যের প্রয়াণের কাহিনি প্রসঙ্গে একাধিক মতামত ঘনিয়ে উঠেছে শিল্পীদের পটে তার ইশারা পাওয়া না-গেলেও নন্দলালের আঁকা গরুড়স্তম্ভের নিচে আলুলায়িত শ্রীচৈতন্যের সেই ছবি কি কোনও বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে? কারও কারও মতে ওখানেই শ্রীচৈতন্যের অন্তিম শ্বাস পড়েছিল। 

chaitanya dev Chaitanya Mahaprabhu Gaganendranath Tagore Indian Paintings Khitindranath Majumdar miniature Nandalal Bose Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on