Haren Das’s Fish-Themed Art and the Soul of Bengal। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মৎস্য মারিব আঁকিব সুখে

জাপানিদের সঙ্গে বাঙালিদের অন্যতম প্রধান মিল হল– তাঁরা উভয়েই প্রবল রকমের মৎস্যভুক। অতএব দৈনন্দিন জীবনের ভাসমান দৃশ্যাবলি আঁকতে গিয়ে হকুশাই, হিরোশিগের মতো জাপানি শিল্পগুরুদের কাজের মধ্যে যেমন বারবার ফিরে এসেছে জলের ওপর দিয়ে জেলে নৌকা বেয়ে যাওয়া আর মাছ ধরার দৃশ্য, হরেন দাসের ছবির মধ্যেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। জেলে নৌকা বা মাছধরার দৃশ্য অতি স্বাভাবিকভাবেই এসেছে বাংলার প্রকৃতি আর মানুষের দৈনন্দিন যাপনের অঙ্গ হিসেবে।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১৭:৪৪   
Facebook WhatsApp Messenger

এ-লেখা মাছ খাওয়া, মাছ ধরা নিয়ে, না কি হরেন দাসের কাঠখোদাই ছবি নিয়ে, না কি জলের মধ্যে মাছের মতো ভেসে বেড়ানো দূর প্রাচ্যের দৈনন্দিন দৃশ্যের শিল্প, জাপানি ভাষায় যাকে বলে ‘উকিও ই’ তাই নিয়ে– এইসব কিছু না ভেবে-টেবেই লিখতে বসা।

সেই ছোটবেলায় একবার গল্প শুনেছিলাম, এক ছাত্র না কি বাংলা পরীক্ষায় কয়লাখনি রচনা মুখস্ত করে গিয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে লিখতে বলা হয় বিদ্যাসাগর সম্পর্কে! ছেলেটি একটুও না-ঘাবড়ে বিদ্যাসাগরের বাড়ির কাছে একটি কয়লাখনি ছিল– এইরকম দাবি করে এবং রচনার বাকিটা কয়লাখনি বিষয়ে লিখে দিয়ে চলে আসে। এই গল্প গত চার দশক ধরে আমাকে এমনভাবে অনুপ্রাণিত করে আসছে যে, প্রায় দুপুর-রাত্রে সম্পাদক-মশাইয়ের কাছে লেখার অনুরোধ পেয়ে বেমালুম রাজি হয়ে গেলাম। অতএব হাতে রইল মাছ, হরেন দাসের ছবি, আর মাছখেকো জাপানি শিল্পী হকুশাই, হিরোশিগে এবং তাঁদের ‘উকিও ই’।

zoom
শিল্পী: হরেন দাস

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘সহস্র বিস্মৃতিরাশি/ প্রত্যহ যেতেছে ভাসি/ তারি দু-চারিটি অশ্রুজল’ আর জাপানিরা বলে, ‘ইমেজেস ফ্রম দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড, উকিও ই’। আমি যখন হরেন দাসের কাঠখোদাই ছবি দেখি, তখন কেবলই মনে হয়, এ যেন ওই দুইয়ের এক অনায়াস ‘সিন্থেসিস’।

হরেন দাস জন্মেছিলেন দিনাজপুরে, অবিভক্ত বাংলায়। কাঠখোদাই করে ছাপাই ছবি নির্মাণের করণকৌশল শেখেন শিক্ষক এবং আর এক বিখ্যাত কাঠখোদাই শিল্পী রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছে। তাঁর সমসাময়িক শিল্পী চিত্তপ্রসাদ বা সোমনাথ হোর যখন কাঠখোদাই ছবির মধ্য দিয়ে সমকালীন অশান্ত সময়ের ইতিহাস এবং দ্রোহের প্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন, ঠিক ওই একই সময়, হরেন দাস উড এনগ্রেভিংয়ের নিপুণতায় এবং পরম মমতায় নিজের কাজের ভিতর ধরে রাখছিলেন বাংলার নদী, মাঠ, গাছপালা আর মানুষের এমন এক দৈনন্দিন যাপনদৃশ্য। যেখানে বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা, তত্ত্ব বা উপদেশ কিছুই নেই। হরেন দাসের ছবিতে যা আছে, সে-সম্পর্কে জীবনানন্দ বলেছেন, “পৃথিবীর এইসব গল্প বেঁচে র’বে চিরকাল।” তাই হরেন দাসের ছবি আবহমান সময়ের ছবি হয়ে থেকে যায়। বাংলার মাটির সঙ্গে নাড়ির যোগ আছে, এমন দর্শককে তা গভীরভাবে স্পর্শ করে।

zoom
শিল্পী: হরেন দাস

কাঠখোদাই করে ছাপাই ছবি নির্মাণের সূত্রপাত হয় চিনে। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে ছাপা ‘ডায়মন্ড সূত্র’ এর প্রাচীনতম উদাহরণ। পরবর্তীকালে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে কাঠখোদাই ছবির কৌশল। একদিকে জার্মানিতে মহাশিল্পী আলব্রেখট ড্যুরারের হাতে যেমন এর বিস্তার ঘটে, তেমনই কয়েক শতাব্দী পরে জাপানে ‘উকিও ই’ নাম নিয়ে হকুশাই, হিরোশিগে, সারাকু, উটামারো প্রমুখ দিকপাল শিল্পীদের হাতে পৌঁছে যায় অভাবনীয় উচ্চতায়।

কাঠখোদাইয়ের কৌশল মূলত দু’রকম। ‘উড কাট’ এবং ‘উড এনগ্রেভিং’। লম্বালম্বিভাবে যখন গাছের গুঁড়িকে চিরে ব্লক তৈরি হয়, তখন সেই ব্লক কেটে ‘উড কাট’ ছবি করা হয়। লম্বালম্বিভাবে চেরা কাঠে যেহেতু কাঠের আঁশগুলি একমুখী ফলে তাতে খুব সূক্ষ্ম কাজ করা বেশ মুশকিল। অন্যদিকে গাছের গুঁড়িকে আড়াআড়ি বা ক্রস সেকশন করে চিরে বের করা যে ব্লক, সেখানে কাঠের আঁশগুলির চক্রাকার গঠন অবিকৃত থাকে। ফলে বিশেষভাবে নির্মিত যন্ত্রের ব্যবহারে অতি সূক্ষ্ম ডিটেলের কাজ এই ধরনের ব্লকের ওপরে করা সম্ভব। একে বলে ‘উড এনগ্রেভিং’।

zoom
জাপানি শিল্পী হকুশাইয়ের ছবি

কাঠখোদাই ছবি ছাপার কৌশলও নানারকম। ইউরোপে তা ছাপা হয়েছে তেলমিশ্রিত কালি রোলারের সাহায্যে ব্লকের ওপরে লাগিয়ে, তার থেকে ছাপ তুলে। মূলত কালো রঙে। কিন্তু কাঠখোদাই ছবির প্রিন্ট করতে জাপানি ‘উকিও ই’ শিল্পীরা ব্যবহার করেছেন জল মিশ্রিত রং এবং ভাতের মাড়। জাপানি কাঠখোদাই ছবি বহুরঙা। প্রতিটি আলাদা আলাদা রঙের জন্য আলাদা আলাদা ব্লক তৈরি করা হত এবং রেজিস্ট্রেশন মেনে একের পর এক রঙের ব্লক ছেপে সমগ্র রঙিন ছবিটি নির্মিত হত। ব্লকে রং লাগানোর জন্য ব্যবহার করা হত জুতোয় কালি লাগানোর বুরুশের মতো ছোট ছোট বুরুশ। আর একাধিক রংকে একটি ব্লকেই সূক্ষ্মভাবে মিশিয়ে তৈরি করা হত হাতে আঁকা ছবির বিভ্রম। জাপানি কাঠখোদাই ছবিতে একই ব্লকে এই দুই রংকে পাশাপাশি রেখে মিশিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিকে বলা হয় ‘বোকাশি’। আশা করি, প্রিয় পাঠক এবার বুঝতে পারছেন শুরুতেই কেন বিদ্যাসাগর এবং কয়লাখনি রচনার উল্লেখ করেছিলাম।

হরেন দাস যে-কাঠখোদাইয়ের করণকৌশল রপ্ত করেছিলেন, তা ছিল ইউরোপীয়। তাঁর সাদা-কালোয় ছাপা ছবিগুলোতে আলোছায়ার অসামান্য বিন্যাসে পশ্চিমি ধারার উৎকর্ষের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ছবির বিষয়বস্তু সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বাংলার দৈনন্দিন বয়ে চলা জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, ‘ইমেজেস ফ্রম দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’। সেখানে পেলব রঙের ছোঁয়া না-থাকলে যে তার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় না। অতএব, পশ্চিমি কৌশলে দক্ষ হরেন দাস ফিরে গেলেন রঙের জাদুকর জাপানি ‘উকিও ই’ শিল্পীদের কাছে। উদ্ভাবন করলেন নিজস্ব রঙিন কাঠখোদাই ছবির কৌশল, যেখানে ইউরোপ এবং জাপানি ছবির এক আশ্চর্য সংশ্লেষ ঘটে গেল।

জাপানিদের সঙ্গে বাঙালিদের অন্যতম প্রধান মিল হল– তাঁরা উভয়েই প্রবল রকমের মৎস্যভুক। অতএব দৈনন্দিন জীবনের ভাসমান দৃশ্যাবলি আঁকতে গিয়ে হকুশাই, হিরোশিগের মতো জাপানি শিল্পগুরুদের কাজের মধ্যে যেমন বারবার ফিরে এসেছে জলের ওপর দিয়ে জেলে নৌকা বেয়ে যাওয়া আর মাছ ধরার দৃশ্য, হরেন দাসের ছবির মধ্যেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। জেলে নৌকা বা মাছধরার দৃশ্য অতি স্বাভাবিকভাবেই এসেছে বাংলার প্রকৃতি আর মানুষের দৈনন্দিন যাপনের অঙ্গ হিসেবে। হরেন দাসের সরু নদী বা জলাভূমির ওপর দিয়ে একাকী লগি ঠেলে নৌকা বেয়ে চলার ছবি দেখতে দেখতে অবচেতনে শোনা যায় শচীনদেব বর্মনের গলা– ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া।’ কিন্তু চমক লাগে এর ১০০ বছর আগে হিরোশিগের রঙিন কাঠখোদাই ছবিতে নৌকা বেয়ে চলা একাকী জাপানি মাঝিকে দেখে। এই আশ্চর্য মিল কি কাকতালীয়? উত্তর মেলে না।

বাংলায় বলা হয়– ‘মৎস্য মারিব খাইব সুখে’। কিন্তু সেই সুখ কি আর একা একা পাওয়া সম্ভব? তাই হরেন দাসের রঙিন ছবিতে দেখি বৃত্তাকার মাছ ধরার জাল হাতে করে মৎস্য-শিকারে চলেছে গ্রামীণ যুগল। খেতে দাঁড়িয়ে যাওয়া বর্ষার জলের মধ্যে থাকা মাছগুলি ধরে জিইয়ে রেখে নিয়ে যাওয়ার জন্য সঙ্গে রয়েছে হাঁড়ি। বৃত্তাকার মাছ ধরার জালের মধ্যে দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে সুজলা, সুফলা বাংলার প্রকৃতি। সবাই দেখছেন ছবি, আমি দেখছি– অসামান্য এক মাস্টারের হাতের কারিকুরি! ‘উড এনগ্রেভিং’-এর খোদাইয়ের সূক্ষ্ম খেলায় আর জাপানি শিল্পীদের মতো অত্যন্ত কাছাকাছি হালকা রঙের নিপুণ টোনে বাংলার প্রকৃতির নির্যাসকে নিখুঁতভাবে ধরে রাখার প্রয়াস। মাছ ধরার জালের অর্ধস্বচ্ছ বুননের মধ্যে দিয়ে দেখা, প্রকৃতির উপস্থাপনার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি হকুশাইয়ের ‘থার্টি সিক্স ভিউজ অফ মাউন্ট ফুজি’ সিরিজের মাছ ধরা জালের মধ্যে দিয়ে দেখা মাউন্ট ফুজির দৃশ্য। ‘উকিও ই’ মাস্টারকে এইভাবে আত্মস্থ করে, জাপানি এবং ইউরোপীয় পদ্ধতির সংশ্লেষ ঘটিয়ে বাংলার প্রকৃতির এমন উপস্থাপনা আমাকে বিস্মিত করে দেয়!

আমি যখন এই বলে খুঁজতে থাকি ‘কী মাছ ধরেছ বঁড়শি দিয়া, ও গুরুজি’ তখন গুরু থুড়ি, গুরুর ছবি বলে, ‘মিথ্যা নয়, চ্যাং ধরেছি গোটা ছয়…’ । ওদিকে আবার ‘দেখুক পাড়া পড়শিতে কেমন মাছ গেঁথেছি বঁড়শিতে’– এই গান গেয়েই আমাদের মহানায়ক গোপন কথাটি সর্বসমক্ষে ফাঁস করে দিয়েছেন। নচেৎ, সেই আদ্যিকাল থেকে মাছ-ধরার ছুতোয় বেশ তো চলছিল অভিসার। হরেন দাসের ছবিতে নির্জন পুকুরের ধারে বাঁশঝাড়ের ছায়ায় প্রিয় মানসীকে পাশে নিয়ে ছিপ ফেলে বসে আছে যে মানুষটি, সে কি কেবল মাছই ধরছে, ভেজে খাবে বলে? অথবা উটাগাওয়া কুনিওশির কাঠখোদাই ছবির সেই জাপানি যুগল? এই মাছ কি সেই মাছ? মাছ ধরার ছুতোয় গোপন অভিসারে যাওয়ায় বাঙালি বা জাপানি– কেউ-ই কম যায় না দেখি।

zoom
শিল্পী: হরেন দাস

এই পর্যন্ত লিখিয়া কলম থুড়ি, কি-বোর্ড থামাইয়া শেষ পর্যন্ত কী পাইলাম, তাহার অনুসন্ধানে রত হইয়াছিলাম। যাহা পাইলাম, তাহা এইরূপ– বাঙালির জীবনযাপন মানে– ‘মৎস্য মারিব খাইব সুখে’, বাঙালির ‘ইমেজেস ফ্রম দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’ মানে জেলে নৌকো আর মাছ ধরার দৃশ্য, বাঙালির প্রেমের অভিসার মানে পাড়াপড়শির অগোচরে নির্জনে ছিপ ফেলে বসে থাকা, আর বাঙালি এবং জাপানি শিল্পীদের মনের কথা হল– মৎস্য খাইব আঁকিব সুখে।

অলমিতি বিস্তারেন।

Albrecht Dürer Chittaprosad Bhattacharya CreativeIndia Fish Tradition FishInArt fishing Haren Das HarenDas Hokusai Printmaking Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Somnath Hore Thirty-six Views of Mount Fuji Ukiyo-e Utagawa Hiroshige কাঠখোদাই মেছো

Share this article on