kanta in human social life। Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

সব কাঁটা কি বাছতে পারে মানুষ?

‘কাঁটা কি ওরা বেছে খায়?’ উট সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন লালমোহনবাবু। ‘সোনার কেল্লা’ ছবির সেই অতিবিখ্যাত চেজ সিকুয়েন্সে। অভিনেতা সন্তোষ দত্তর ডায়লগ ডেলিভারিতে ছিল আশ্চর্য এক সারল্য। উটের কাঁটা বেছে খাওয়ার কথা আমাদের অবান্তর মনে হয়। কাঁটা যেন শুধু মানুষের জন্যই ব্যথার কারণ। মানুষের জন্যই বিপজ্জনক। আর তাকে বেছে আলাদা করে ফেলা যেন একটা ভীষণ মানবিক দক্ষতা। কিন্তু লালমোহনবাবুর মতো করে অতিসরলতায় ওই প্রশ্নটা কি করা যায় না মানুষ সম্পর্কেও?

Published by: Robbar Digital

Posted:April 23, 2026 5:14 pm | Updated:April 23, 2026 7:12 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

কাঁটা। বললেই মনে পড়ে সেই গানটা। আমরা তখন ইশকুল শেষের পথে। ইউটিউব, ফেসবুক আসেনি তখনও। ইন্টারনেট কী জিনিস, তাই জানে না কেউ! শুধু আমাদের চেনা সংস্কৃতির ছক একটু একটু করে বদলে দিচ্ছে কেবল টিভির চ্যানেলগুলো।

সেইরকমই মিউজিক চ্যানেলে এসেছিল গানটা। ‘কাঁটা লাগা! হায় লাগা!’

সেই গান যত না লতা মঙ্গেশকরের। তার চেয়ে অনেক বেশি শেফালি জরিওয়ালার। আর ‘ডিজে ডল’ নামের এক রিমিক্স আর্টিস্টের। চটুল, সুড়সুড়ি দেওয়া গান কেমন করে যেন আমাদের শেষ কৈশোরের নতুন চেনা জীবন ছন্দের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। প্রেম আর প্লেটোনিক ছিল না মোটেও। বরং শিখে ফেলেছিল যৌনগন্ধ। ফাস্ট বিটের স্পন্দ। তার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘কাঁটা লাগা। হায় লাগা।’

zoom
‘কাঁটা লাগা! হায় লাগা!’ গানে শেফালি জরিওয়ালা

কাঁটা। ফুটে গেলেই খচখচ করে। হয় তীব্র এক অস্বস্তি। রেখে দিলে পেকে ঘা হয়ে যায়। না বের করা অবধি নিস্তার নেই।

সিচুয়েশনশিপ, ন্যানোশিপের বহু আগে, নয়ের দশকের শেষ বিকেলে, প্রেম অমনই হয়ে উঠেছিল আমাদের কাছে। ভালো লাগা, আকর্ষণের তীব্র এক খচখচানি। যাকে না গিলতে পারা যায়, না ওগরানো। তার নিষ্কৃতি শুধু প্রোপোজালের পরিণতিতে। হয় বিচ্ছেদের, নয় কোচিং-ফেরতা রাস্তা ধরে সামান্য হেঁটে যাওয়ায়।

‘কাঁটা লাগা’। কিন্তু প্রেমের ওই ডাকনাম তো আরও অনেক পুরনো। ’৭০ সালের ভোর বেলায়। শেফালি নন, লতার গলা তখন আশা পারেখের। সেই গানে মাদকতা আছে। কিন্তু রিমিক্সকৃত তাল-লয়ের জবরদস্তি বাঁধুনি নেই।

zoom
‘কাঁটা লাগা’ গানে আশা পারেখ

এখন ভাবলে মনে হয়, আসলে হয়তো তাই-ই। ইন্টারনেট, গ্লোবালাইজেশনের এসে পৌঁছনোর আগে জন্মে যাওয়া আমরা হয়তো আমাদের পূর্বসূরিদের থেকে অনেক কিছু ধার করে নিতেই শিখেছিলাম। আমাদের হঠাৎ পেয়ে যাওয়া কেবল টিভি তাকে শুধুই আরও চটুল, আর দ্রুত বিটের করে দিতে শিখেছিল।

প্রেমের কাঁটা, তার যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছে আটের দশকের এক বাংলা গানেও। সেই গানের কণ্ঠ আশা ভোঁসলের। সুরকার স্বয়ং আরডি। ‘মাছের কাঁটা, চুলের কাঁটা, কাঁটা অনেকরকম/ ফুলের কাঁটার থেকেও জ্বালায় পীরিত কাঁটার জখম।’ কী আশ্চর্য সেই গানেরই শেষ লাইন– ‘ঘর ভাঙে, কপাল ভাঙে, ভাঙে না তো ভুল।’  পপ গান। তার লঘু লিরিক। কাঁটা দিয়ে শুরু হল। আর শেষ হল ভাঙন দিয়ে। কী অদ্ভুতভাবে কাঁটার সঙ্গে মিশে গেল ভাঙনের কথা। ভুলের অনুষঙ্গ।

এটা কি চেষ্টাকৃত? না কি গীতিকারের মনের গভীর অচেতন, চটুল লিরিকেও কখন যেন মিশিয়ে ফেলেছে কাঁটা নিয়ে কৌম অনুভূতির কথা? প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমা অভিজ্ঞতা।

zoom
মাছের কাঁটা

কাঁটা প্রকৃতির দেওয়া এক রক্ষাকবচ। তাকে ছুঁয়ে দিলে বিঁধে যায়। তাই সে বিপজ্জনক। ভুলেরই মাশুল।সিদ্ধার্থ, কলেজে পড়ত আমাদের সঙ্গে। আমি ফিজিক্স। ও ইকোনমিক্স। অসমের করিমগঞ্জ থেকে এসেছিল। থাকত হস্টেলেই। ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে করিডরে। ক্লাস পালানো দুপুরগুলো কলেজের পাশে চায়ের দোকানে। কখনও কখনও ক্যান্টিনেও। গিটার বাজাতো ভালো। গানও করত। লিরিক লেখার চেষ্টা করত হরবখত। কীভাবে যেন বন্ধুত্ব হয়ে গেল আমার সঙ্গে। তারপর একদিন কে যেন বলল, সিদ্ধার্থ আমায় খুঁজছে। সে না কি আমায় পেলেই মারবে! অবাক হয়েছিলাম। আমাকে মারার তো কারণ নেই সিদ্ধার্থর। তারপর ভুলেও গিয়েছিলাম। শুধু ক’দিন পরে জানতে পেরেছিলাম– কলেজ ছেড়ে ও ফিরে গিয়েছে অসমে।

সিদ্ধার্থকে ভুলেই গিয়েছিলাম বেমালুম। বছর দুয়েক পর হঠাৎ একদিন একটা ফোন পেলাম। অচেনা কণ্ঠস্বর। সিদ্ধার্থর বাবা। জানালেন, সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে সিদ্ধার্থর! চিকিৎসার জন্য ওকে তাই ব্যাঙ্গালোর নিয়ে যাচ্ছেন। ‘তোমার কথা খুব বলে সিদ্ধার্থ। বারবার। কালই আমরা চলে যাব। যাওয়ার আগে একবার কি তুমি আসতে পারবে স্টেশনে? তোমার সঙ্গে দেখা করলে ও খুশি হবে।’

বলেছিলাম যাব। কিন্তু কী যেন একটা আটকাল বারবার। বসে বসে দেরি করলাম খুব। শেষ মুহূর্তে মনে হল যাই। দেখা করেই আসি। হলুদ ট্যাক্সি নিলাম বাড়ির সামনে থেকে। কিন্তু তীব্র যানজট রাস্তায়। আমি যতক্ষণে এসপ্ল্যানেডে, ততক্ষণে ওদের ট্রেন ছেড়ে গিয়েছে। মোবাইলহীন সে-সময়ে, সে-কথা জানানোরও কোনও সুযোগ ছিল না। তারপর ফিরে ফিরে আসত স্বপ্নটা। খুব ভিড় একটা প্ল্যাটফর্ম। একটা ট্রেন চলে যাচ্ছে ছেড়ে। দৌড়নোর চেষ্টা করছি আমি। কিন্তু ধাক্কা খাচ্ছি বারবার। স্পিড তুলছে ট্রেনটা। তারপর বেরিয়ে গেল এক সময়। ট্রেন চলে যাওয়ার পর সিগন্যালটাও লাল হয়ে গেল।

কিছু কাঁটা বেঁধে গলায়। কিছু পায়ে। চোরকাঁটার মতো কিছু লেগে থাকে গায়ে। তাকে যতই ঝাড়া হোক, যায় না।

নয়ের দশকেই সেই আশ্চর্য গানটা লিখেছিলেন কবীর সুমন। তখনও সুমন চট্টোপাধ্যায় তিনি। ‘ক্যাকটাস তুমি কেঁদো না/ যিশুর মুকুটে কাঁটা।’ যিশু– ক্রিশ্চান মিথে তাঁর কাঁটার মুকুট তো আসলে মানুষেরই পাপ। দুনিয়ার সব পাপের ফল নিজের মাথায় নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। পাপবোধ যেন কাঁটার মতোই বেঁধে। তবু মনে হয়, পাপবোধে ভোগার মধ্যে একটা সন্তুষ্টি আছে। তার মধ্যে যেন কোথাও একটা প্রায়শ্চিত্ত করে নিশ্চিন্ত হওয়ার বোধ আছে।

zoom
ছবিসূত্র: ইন্টারনেট

আমার মনের মধ্যে খচখচ করে সিদ্ধার্থ। কাঁটার মতো বিঁধছে। অথচ বিঁধছে বলেই যেন নিজেকে মুক্ত করে ফেলছি আমি। ভাবছি আমার বিবেকবোধ আছে। তাই আমি নিশ্চয়ই ভালো। অথচ সেইদিন হয়তো সত্যিই সিদ্ধার্থর বাবা ভেবেছিলেন, আমি যাব। তার অসুস্থ ছেলের হয়তো একটু হলেও ভালো হবে তাতে। হয়তো ট্রেনের দরজা ধরে অনেক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তারপর ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল এক সময়।

‘কাঁটা কি ওরা বেছে খায়?’ উট সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন লালমোহনবাবু। ‘সোনার কেল্লা’ ছবির সেই অতিবিখ্যাত চেজ সিকুয়েন্সে। ‘না!’ উত্তরটা খুব টেনে, লম্বা করে বলেছিল ফেলুদা। তারপর মুখ ঘুরিয়ে মেপেছিলেন লালমোহনবাবুকে। অথচ অভিনেতা সন্তোষ দত্তর ডায়লগ ডেলিভারিতে ছিল আশ্চর্য এক সারল্য। ওই সারল্যটাই কমিক করে তুলেছিল ওই ডায়লগটাকে। হো হো করে হেসেছিল দর্শক।

zoom
‘সেনার কেল্লা’র দৃশ্যে উটের পিঠে কলাকুশলীরা

উটের কাঁটা বেছে খাওয়ার কথা আমাদের অবান্তর মনে হয়। কাঁটা যেন শুধু মানুষের জন্যই ব্যথার কারণ। মানুষের জন্যই বিপজ্জনক। আর তাকে বেছে আলাদা করে ফেলা যেন একটা ভীষণ মানবিক দক্ষতা। কিন্তু লালমোহনবাবুর মতো করে অতিসরলতায় ওই প্রশ্নটা কি করা যায় না মানুষ সম্পর্কেও?

সত্যিই কি সব কাঁটা বাছতে পারে মানুষ? না কি কখনও কখনও কোনও কাঁটা পাকাপাকি ভাবে ফুটে যায় তার শরীরে। খচখচ করে। রক্তাক্ত করে। ক্রমাগত।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন শমীক ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা

……………………..

Asha Parekh Felu Da Jesus christ Kabir suman kanta Lata Mangeshkar Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar santosh Dutta Satyajit Ray Sonar Kella কাঁটা মাছের কাঁটা

Share this article on