


অভিজ্ঞতার একত্রে, নির্দিষ্ট কোনও অর্থ আছে কি? কেবল তাদের, এক সমগ্রতায় উগড়ে দিতে পারেন কেউ কেউ। যেমন পারতেন, উৎপলকুমার বসু। অবশ্য এ-সম্পর্কে, ১৯৬৪ সালেই ‘পুরী সিরিজ’-এর চতুর্থ প্রচ্ছদ সতর্ক করেছিল আমাদের: এতে সমুদ্র, বামন, তাঁতকল, শিকারি, সতী, নপুংসক, মিসিবাবা, এয়ারোড্রোম, সুঁচ ও আত্মা, রণরক্ত ও সন্ধ্যাবাতাস, কৈবল্য ও ঈশ্বরোপাসনার কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পাঠকদের ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য এক নিষিদ্ধ পারমাণবিক চুল্লি খুলে দেখানো হল এই গ্রন্থে।
‘চিন্তা’ আর ‘অক্ষরজ্ঞান’– এ দুয়ের মাঝে সবসময় ঝুলে রয়েছে যে-সেতু, সে যদি হঠাৎ ভেঙে পড়ে তলায়। খাদের ভেতর। তখন, আমি কী বলতে চাই? সেই চাওয়ার ‘অর্থ’, যে-কোনও মসৃণ মনের কাছ শুধুই প্রলাপ– ভুল বকা।
ভুল? তার মানে কোনও এক ‘ঠিক’-এর প্রতি অজান্তেই তাকিয়ে আছে মন। আমাদের সমাজবদ্ধ মন। কেবল তাকিয়ে আছে? না কি, বাড়ির কুকুরের মতো চিন্তার পরিচিত অর্থকেই, খাদ্য ভেবে, জিভ দিয়ে চেটে যাচ্ছে রোজ!
এই একটা জীবনের ভেতর কত-কত অভিজ্ঞতা ঝাঁপ দিল। ঝাঁপ দিচ্ছে। রোজই। এই একটা জীবনের ভেতরেই কেউ চিৎকার। কেউ আনন্দ। কেউ কেউ অপমান। বিষ। কারও নাম, স্নেহ। কেউ শান্তি। কেউ কাম। যা কিছু নিষিদ্ধ। বহু গতিময় ধুলো। ইচ্ছা। হোঁচট! দুপুর। ঘন দুপুর। একলা দুপুর। কেউ কেউ, জঙ্গল। সেই জঙ্গলে শুকনো পাতার তৈরি ঘর। কারও নাম ঘুম।
আর এর মধ্যেই দু’-একজন মাত্র, স্বপ্ন!
এমনই একটা জীবন পিঠে নিয়ে যদি মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে একদিন খুলে বলতে হয় সব, আমি কী বলব? ঝড়ে ধাক্কা খাবে শব্দ। ঘটনা। একে-অপরের গায়ে আছড়ে পড়বে আমার, হ্যাঁ, আমারই জীবনের ওইসব অভিজ্ঞতা।
সেইসব অভিজ্ঞতার একত্রে, নির্দিষ্ট কোনও অর্থ আছে কি? কেবল তাদের, এক সমগ্রতায় উগড়ে দিতে পারেন কেউ কেউ। যেমন পারতেন, উৎপলকুমার বসু।

অবশ্য এ-সম্পর্কে, ১৯৬৪ সালেই ‘পুরী সিরিজ’-এর চতুর্থ প্রচ্ছদ সতর্ক করেছিল আমাদের:
এতে সমুদ্র, বামন, তাঁতকল, শিকারি, সতী, নপুংসক, মিসিবাবা, এয়ারোড্রোম, সুঁচ ও আত্মা, রণরক্ত ও সন্ধ্যাবাতাস, কৈবল্য ও ঈশ্বরোপাসনার কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পাঠকদের ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য এক নিষিদ্ধ পারমাণবিক চুল্লি খুলে দেখানো হল এই গ্রন্থে।
এই নিষিদ্ধ পারমাণবিক চুল্লির ভেতর অভিজ্ঞতার সহস্রাধিক মুখ একইসঙ্গে জ্বলতে থাকে। হয়তো তাই, এ-গ্রন্থের ‘স্মৃতি’ নামক কবিতায় উৎপল লিখছেন, ‘যদি স্পষ্ট মনে পড়ে আমার পানীয় ছিল সারাৎসার।’ বলছেন এ-কথাও:
যদি স্পষ্ট মনে পড়ে আমার গ্রন্থ ছিল জটিল ও দুর্বিষহ অথচ মলাট ছিল রঙিন, আত্মপরাঙ্মুখ, তাতে আমি ক্রমাগত খোঁজা এই শব্দটির আধিক্য দেখেছি অথচ যে-সব লোল বহুরূপী এসেছিল তাদের সংগীত হল না কারণ ওই বাড়িটির গৃহকর্ত্রীদের হারমোনিয়াম বলে যন্ত্রখানি অযৌক্তিক মনে হয়েছিল ওই বাড়িটির যৌক্তিকতা আছে?

লেখাটিতে, কেবল দু’-বার যতিচিহ্নের ব্যবহার করলেন উৎপল। এবং দু’-ক্ষেত্রেই, দু’টি কমা। যা এক প্রকার ঘিরে রাখল ‘আত্মপরাঙ্মুখ’ শব্দটিকে। কেন? কারণ, যে-কোনও দরজার সামনে এসে, আমাদের দাঁড়াতেই হয়। আত্মপরাঙ্মুখ, সেই দরজা। যে-গ্রন্থ জটিল ও দুর্বিষহ। অথচ যার মলাট রঙিন। এমনই, ঠিক এমনই জীবন কাটাচ্ছি আমরা অনেকেই। কিন্তু সেই জীবনের ভেতর ‘খোঁজা’ শব্দটির আধিক্য এল কখন? ‘আত্মপরাঙ্মুখ’ কথাটির পর। এবং লক্ষ করে দেখলে হয়তো বোঝা যাবে, এরপরই উৎপল নিয়ে আসছেন এক স্বাধীন ও গতিময় বাক্যকে, ‘যে-সব লোল বহুরূপী এসেছিল তাদের সংগীত হল না কারণ ওই বাড়িটির গৃহকর্ত্রীদের হারমোনিয়াম বলে যন্ত্রখানি অযৌক্তিক মনে হয়েছিল ওই বাড়িটির যৌক্তিকতা আছে?’ লেখাটি শুরু হয়ে যেখানে পৌঁছল, সেখানে প্রত্যক্ষ অর্থের কোনও দাবি নেই। কিন্তু একটি যুক্তির রেখা মনের লন্ডভন্ড ভূখণ্ডগুলিকে ছুঁয়ে আছে শুধু। সেই যুক্তির রেখাই এ-কবিতার গতি। একাধিক চিন্তার মধ্যেকার সম্পর্ক ও সংঘর্ষ। এই হল অযৌক্তিকতার, অসামান্য যুক্তি!
এই সংঘর্ষই জুড়ে থাকতে চায় শব্দের পরিচিত অর্থকে ভেঙে অচেনা নতুন কোনও ইশারার সঙ্গে। যদিও, এই বইতেই, উৎপল লিখেছিলেন, ‘আমার সংকেত আজও তত নেই। সবই গ্রহণীয়,/ চঞ্চলতা– বসন্তের গুঢ় ধৈর্য্য– প্রতিভা আমার/তোমার সিন্ধুর বাড়ি দেখেছিল। অস্থি কি পানীয়?’ এখানে ‘সবই গ্রহণীয়’ কথাটি মারাত্মক! অর্থাৎ নিদিষ্ট একটি অভিজ্ঞতা নয়, আমার সমস্ত অভিজ্ঞতাকেই, একত্রে, চিৎকার করে বলব। ভেঙে দেব পরিচিত অর্থের সীমা। চিৎকারের একটাই ধর্ম– চিৎকার অনেক দিনের চেপে-রাখা অগ্নিপদার্থ সত্যবৎ উগড়ে দিতে চায়। উৎপল লিখছেন: ‘আমার পৌরুষ ছিল বাস্তুসাপ, মৃত তবু পালনীয়’। কী অসামান্য এই লাইন! এর মধ্যেও কি আমরা সেই চিৎকারের উন্মুক্ত-স্বর খুঁজে পাই না?

‘পুরী সিরিজ’-এ একটি কবিতার নাম ‘বোনের সঙ্গে তাজমহলে’। কবিতাটি শুরু হচ্ছে এইভাবে:
সূর্য ডুবে যায় দ্রুত। অগ্নিনির্বাপক
জাল রসায়নরাশি ফেটে পড়ে চতুর্দিকে। আমি তাজমহলের
পৈঠায় দাঁড়িয়ে ভাবি এবার বিশ্রাম
আমি আশ্চর্য হই কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকে পৌঁছে:
এবার অদিতি আমি তোমারই কোলের কাছে সরাসরি পড়ে যেতে থাকি
ধর্মচ্যুত, আশ্রয়বিহীন
নিজেরই বোনের প্রতি যৌনতা ও উপদ্রব আমি লক্ষ্য করি
নক্ষত্রসন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে শাহীবাগ গম্ভীর আগুন
নিয়ে ক্রীড়াশীল, ক্ষমা নেই, নির্দেশ, অপরাধবোধ
দেখাও অদিতি
ভাই-বোনের যৌন আকর্ষণ, বিস্ময়ের কোনও কারণ হতে পারে না। বিস্মিত হই, সেই আকর্ষণকে, পরস্পরের কাছে আসাকে, যেভাবে বলছেন উৎপল, সেই ইশারার সংগঠন দেখে। প্রথমেই বলছেন, ‘সূর্য ডুবে যায় দ্রুত। অগ্নিনির্বাপক/ জাল রসায়ন রাশি ফেটে পড়ে চতুর্দিকে।’ সূর্যের ডুবে-যাওয়া, অগ্নিনির্বাপক– এই কথাগুলিকে সংকেতভূমিকা হিসেবে প্রথমে রেখে, তারপর শরীর-অগ্নির কথা বলতে শুরু করলেন উৎপল। এই দ্বিতীয় স্তবকে দু’টি জিনিস আমাকে বিশেষভাবে অবাক করে দেয়। ‘নিজেরই বোনের প্রতি যৌনতা ও উপদ্রব আমি লক্ষ্য করি’। শুধু যৌনতা লক্ষ করি, এ-কথা বলছেন না কিন্তু। পাশে রাখছেন, ‘উপদ্রব’ শব্দটিকেও। উপদ্রবের মধ্যে আছে তীব্রতা। যখন তখন, ভেঙে পড়া। ভেঙে দেওয়া। লন্ডভন্ড করার ইচ্ছে– তীব্র যৌনতা, যাকে সমর্থন করে।
স্বাভাবিকভাবেই যৌন-আকর্ষণ সব সময় অস্থির। যাঁদের এমন অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরা জানেন, সে-সময় মাথার ভেতর সমাজের শৃঙ্খলা এবং দেহের নিষ্পাপ চাহিদা একইসঙ্গে ঘূর্ণি পাকাতে থাকে। সেই অসম্ভব ঘূর্ণিকেই, একটি লাইনে রাখছেন উৎপল। লিখছেন:
ক্রীড়াশীল, ক্ষমা নেই, নির্দেশ, অপরাধবোধ

এগুলি কেবল শব্দমাত্র নয়। নিজের বোনের সঙ্গে শারীরিকভাবে সংযুক্ত হওয়ার সময়, এসবই মনের একেকটি অবস্থানভূমি! সেই সমস্ত অবস্থানকে পেরিয়ে, প্রায় বিস্ফোরণের মতো, আকাশে লাফিয়ে ওঠে একটাই ইচ্ছে, মিলন। ‘দেখাও অদিতি’, এইখানে পৌঁছে, মিলনের সেই ইচ্ছাকে মন সব থেকে বেশি মূল্য দিতে চায়। চাওয়াই উচিত!
কবিতাটি শেষে পৌঁছে স্থির হয়ে দাঁড়ায় একটি শব্দের ভেতর। ‘হৃদয় তোমারই প্রতি যেতে থাকি নর’। কে কার বোন? কে-বা ভাই? এসব কিছুই নয়। পুরুষের আদি-পরিচয়, সে কেবল পুরুষ। নর।
এমন কত-কত সংকেত-প্রাচুর্য উৎপল কুমার বসু-র কবিতায় যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে!
সকলেই জানেন, ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘পুরী সিরিজ’। উৎপল এই কবিতাগুলি লিখেছিলেন প্রধানত ’৬২-’৬৪ সালের মধ্যে। সেই সময়-সীমার আরও কিছু কবিতা নিয়ে ১৯৭৮ সালে বেরয়, ‘আবার পুরী সিরিজ’। ফলে, দু’টি বইয়ের প্রকাশকাল আলাদা হলেও, তাদের মনোভাব কিন্তু একটিই কবিতাগ্রন্থকে নির্ভর করে আছে।
উৎপলকুমার বসু-র বহু বিখ্যাত কবিতা এই দু’টি বইয়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়, যা আজ প্রায় আমাদের মুখস্থ! যেমন, ‘তোমার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি হারিয়েছ বাদামপাহাড়ে/আমার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমা আমি হারিয়েছি বাদামপাহাড়ে’। কিংবা, ‘কংগ্রেস আমলে বহু ভালবাসাবাসি হল/আমার ও মাধবীর’। কিন্তু এর পাশেই এমন কবিতাও এখানে খুঁজে পাই:
একাকী ভ্রূণের শিশু শুয়ে আছো তুমি। তোমাকে চুম্বন।
নর্মদার জলে আমি অব্যবহৃত ভ্রূণ জলে ভেসে যেতে দেখি।
তোমাকে নদীর বাঁকে কাঠি দিয়ে তুলে নেয় বাগদি কিশোর। তাঁহাকে চুম্বন।
চাঁদে ওই জ্যোতিষ্মান ভয়াবহ গর্ত দেখে আমি ভাবি গর্ভের দুয়ার।

এ-কবিতায়, চাঁদের ভয়াবহ গর্ত আর গর্ভের দুয়ার একাকার হয়ে আছে। কী অসামান্য কবিত্ব! মনে পড়ছে, ‘বোনের সঙ্গে তাজমহলে’ উৎপল লিখেছিলেন:
…তুমি সমসাময়িক জাল রসায়ন দিয়ে
স্পষ্ট করে তোলো, কোলে পড়ে আছে গ্রীষ্মের ক্রোড়পত্রখানি
ক্রোড়পত্রের প্রচলিত অর্থ কী, তা আমরা জানি। কিন্তু সেই অর্থেই কি শব্দটি এখানে সীমাবদ্ধ? তা বোধহয় নয়। ‘ক্রোড়পত্র’ কথাটিকে ভাঙলে প্রথমেই দেখা দেয়: ‘ক্রোড়’। অর্থাৎ, কোল। খেয়াল করুন, উৎপল ঠিক তিনটি শব্দ আগেই লিখেছেন, ‘কোলে’। কিন্তু ‘কোলে’ শব্দটি একা গ্রীষ্মের অগ্নিদাহকে, পুরুষের সেই লন্ডভন্ড করার ইচ্ছেকে, একা ধারণ পারল না। তাই এল, ক্রোড়। উৎপল এর সঙ্গে যোগ করলেন, ‘পত্রখানি’। ক্রোড়পত্রখানি। পত্র, মানে পাতা। কোল বা ক্রোড়ের পত্র। এখানে, ঠিক এখানেই এক নিবিড় ইশারায় আমি ‘যোনি’ শব্দটিকে দেখতে পাই। আর, নিরন্তর উৎপলের কবিত্বের প্রতি উন্মাদগ্রস্থ হই!

একজন কবি কী বলতে চান? তা তিনি নিজেও কি পুরোপুরি জানেন? যে-ক’-জন ভাগ্যবান কবি সেই জানা-অজানার মধ্যে বসে চিন্তার সেলাই মেশিন থেকে সুতো খুলে আকাশে-আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছেন, আর আমরা ভাবছি এই বুঝি নীল মেঘের রেখা, সূর্যাস্তের শেষতম রং কিংবা চিতার ঊর্ধ্বগামী ধোঁয়া। উৎপলকুমার বসু, সেই সংকেতে-মোড়া প্রকৃতি নির্মাতাদেরই একজন!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved