Political party, loyalty, emotion, identity and influence by Anubrata Chakraborty
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পার্টিই প্রেম, পার্টিই ব্যর্থপ্রেম

প্রেমের আরেক রকমারি-ঝকমারি– পার্টিপ্রেম। দলের আনুগত্য থাকা। চিরকাল। দল কী দিল-টিল, সেসব হিসেবে তেমন যায় আসে না। এমনকী, ভেঙে যাওয়া, ছিন্নভিন্ন হাল সত্ত্বেও, বহু পার্টিকর্মীই মফস্‌সলে ধরে রাখে আপনপার্টি। বুকের মধ্যে, একটা নিশ্চিন্দিপুর গজিয়ে ওঠে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও পার্টি করতে করতেই তো প্রেম ঘটে যায় দুম করে। প্রেমই পার্টি, পার্টিই প্রেম। তাও, কেউ কেউ হাঁটে না মিছিলে, শোনা যায়, তারও দল আছে। কোথায়?

গ্রাফিক্স: দীপঙ্কর ভৌমিক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ২০:৫৯   
Facebook WhatsApp Messenger

জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখেছি আমাদের ভাড়াবাড়ির লাল মেঝেওয়ালা একটি ঘরের দেওয়ালে বিধান রায়ের ছবি ঝোলানো। যখন বোধবুদ্ধি হয়নি, তখন ভাবতাম– ওইটি আমার মামার ছবি। শতাব্দীপ্রাচীন বাড়ির একতলার যে-অংশে বাবা-মা-দাদার সঙ্গে ভাড়া থাকতাম, তারই সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে মামা ভাড়া থাকতেন। তিনি উত্তর কলকাতার এক নামকরা কলেজের জাঁদরেল অধ্যাপক এবং আদি কংগ্রেসের নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক। চোখ ফুটলে বুঝেছি, আমার মামা আর যেই হন ছবির ভদ্রলোক নন, কারণ ওই ছবির ভদ্রলোকের মুশকো গোঁফ নেই। পাড়ার ছেলেরা যেদিন আমার জ্ঞানচক্ষু একটানে খুলে দিল, সেদিন বুঝলাম তাঁর সঙ্গে বিধানবাবুর একটি মিল আছে বইকি, ওঁরা দু’জনেই অকৃতদার।

zoom
বিধান রায়

আরেকটু বড় হলে মামার সঙ্গে সময় বেশি কাটে। এক দৌড়ে উঠোন পেরলেই তাঁর ঠিকানা আর তার মানেই বাবা-মার বকাঝকা এবং দাদার গম্ভীর চাহনি থেকে নিষ্কৃতি। আর একটি আকর্ষণ হল বৈঠকখানা– যেখানে গান্ধিবাদী মামার শোওয়ার চৌকিও পাতা আছে বটে। ওই ঘরে প্রতিদিন সকালে পাড়ার বয়স্ক ও মাঝবয়সিরা আড্ডা মারতে আসেন। মূল বিষয়: রাজনীতি। সেখানেই জানতে পারি, আমার জন্ম হওয়ার বছরখানেক আগে নির্বাচনে মামার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল তাঁরই এক ছাত্রের কাছে, যিনি পরবর্তীকালে একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হবেন। মামা, তাঁর কয়েকজন সিনিয়র এবং খুবই অল্পসংখ্যক তরুণ ইন্দিরা গান্ধীর কলাকৌশল বুঝতে না পেরে ‘অ্যাকটিভ পলিটিক্স’ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছেন। আদি কংগ্রেস বেঁচে আছে এইরকম কয়েকটি ঘর-বারান্দায় আর হা-হুতাশে ভরা কিছু মানুষের প্রেমে, যাঁদের মক্কা হল কারবালা ট্যাঙ্ক লেনে অতুল্য ঘোষের ভাড়াবাড়ির বৈঠকখানা। সেখানে নীলম সঞ্জীব রেড্ডি বা ভি ভি গিরির মতো হেভিওয়েট আসতেন, দেখেছি, কিন্তু তখন চিনতাম না। আরও অনেক কেষ্টবিষ্টু আসতেন, যাঁরা একইসঙ্গে ধর্মে ও জিরাফে ছিলেন। গম্ভীর আলোচনা ও রোমন্থন শুরু হওয়ার আগে ছোটদের ছাদে গিয়ে খেলতে বলা হত। আমি তখন ছোট ছিলাম।  

এদিকে পাড়ায় বন্ধুরা খেপায়, ‘বিধানবাবু নাকি কল্যাণীর দুঃখে বিয়ে করেননি, তোর মামা কেন করলেন না?’ এই প্রশ্ন আরেকটু বড় হয়ে মামাকে প্রায় করে ফেলেছিলাম, শেষ মুহূর্তে সামলেছি। যেটুকু বুঝেছি, কংগ্রেসে ভাঙনের পর উনি দু’টি প্রেম নিয়ে ঘর করেছেন– কেমিস্ট্রি এবং আদি পার্টি। বামপন্থীদের আটকানোর ছক কষায় ব্যস্ত থাকাকালীন ওঁদের প্রিয় নেহরুর কন্যা দাবার বোর্ড যে উল্টে দিচ্ছেন, সেটা বুঝেও বুঝতে চাননি। সুতরাং, ব্যর্থ প্রেম বুকে নিয়ে দিনের পর দিন কাটানো। পার্টির যখন রমরমা তখন ক্ষমতার লড়াইয়ে এ ও-কে ল্যাং মেরেছেন। যখন পার্টিটাই নেই তখন তাঁরা সংঘবদ্ধ। তাস খেলছেন, একসঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছেন বছরে দু’-বার। পার্টি যেন তাঁদের সবার প্রেমিকাসম, যার কোনও আভরণ নেই। প্রেমিকা, কারণ ওই দঙ্গলে কোনও মহিলা রাজনীতিক দেখিনি কখনও। এইসব সন্ধেয় বৈঠকখানায় পার্লামেন্ট বসিয়ে তাঁরা ইন্দিরা কংগ্রেসের রাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র নীতির চুলচেরা বিচার করতেন। ’৭৭ সালে যখন মোরারজি দেশাইয়ের হাত ধরে সরকার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল, আমার মামা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। অথচ জনতা পার্টির সঙ্গে ওঁর কোনও সম্পর্ক নেই। মামার বৈঠকখানায় এক সন্ধেবেলা প্রতাপচন্দ্র চন্দর এলেন। চা-শিঙাড়া এল, সঙ্গে পাড়া ঝেঁটিয়ে জনতা। আমি চৌকির ওপর দেওয়ালের গা-সেঁটে বসেছিলাম, মনে আছে। মামা হাতজোড় করে সবাইকে বললেন সেইবারের নির্বাচনে প্রতাপবাবুকে ভোট দিতে। উত্তর কলকাতার আদি কংগ্রেসীদের ভেঙে পড়া মনকে একটু চাঙ্গা করেছিল প্রতাপবাবুর জয়। এ যেন আমার প্রেমকে অন্য কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছে বলে একজোট হয়ে তৃতীয় শক্তিকে আঁকড়ে ধরা। ক্লাস টেন-এ আমরা, উচাটন মনের কয়েকটি বালক, এই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। 

অংকের টিউশন ক্লাসে দু’টি মেয়ে পড়তে আসত। বাকি সাত-আটজন ছেলে। আমি যদিও স্যরের কাছে মাইনে দিয়ে পড়তাম না, কিন্তু কোনও একদিন মুখ ফসকে চলে আসতে বলেছিলেন। আর যায় কোথায়! দু’টি মেয়ের মধ্যে একজন গম্ভীর আর একজন চূড়ান্ত প্রাণবন্ত। আমরা তার সঙ্গেই হাঁটা লাগালাম। প্রথমদিন গলির মোড়, কয়েকদিন পর বড় রাস্তার ওপারে, তারপর একদিন সাহস করে বাড়ির দরজা পর্যন্ত এবং এক পড়ন্ত বিকেলে টুকটুক করে ছাদে। এর কিছুদিন পর আমরা একা একাই যেতে লাগলাম, যাতে নিজেদের মধ্যে ঠোকাঠুকি না লেগে যায়। সারা রাস্তা ‘তোমার পতাকা যারে দাও’ ইত্যাদি আওড়ে যাচ্ছি। কিন্তু প্রত্যেক দিনই কোনও না কোনও বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আমরা হেঁ হেঁ করি, চা খাই, কখনও সিপিএম-কংগ্রেস তরজায় মাতি। তারপর, সেই বিধ্বংসী বিকেল আসে। কনে দেখা আলো ছাদের আলসেতে কীভাবে পড়েছে দেখার জন্য মার্জারসম চরণে সিঁড়ি বেয়ে সোজা ছাদে উঠেছি। দেখি আরও দশজন শুকনো মুখে বসে আছে। এটাই আমাদের ক্যাবিনেট। কেউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কেউ স্বাস্থ্য, কেউ-বা পুলিশমন্ত্রী। তখনও আইটি মিনিস্ট্রি নামক কোনও বস্তু জন্ম নেয়নি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী– অর্থাৎ, আমাদের কন্যাটি নেই। কোথায়? পর্যটনমন্ত্রী বেজার মুখে বললেন, ও প্রেম করতে গিয়েছে। কার সঙ্গে? জেনে আশ্বস্ত হলাম আমাদের চেনা কেউ নয়। সেই সন্ধ্যায় আমরা সংঘবদ্ধ হলাম। হেদুয়ায়, জলের ধারে পা ছড়িয়ে বসলাম। বড় রাস্তায় নেমে মাটির ভাঁড়ে চায়ে চুমুক দিয়ে শপথ নিলাম আমরা আদি কংগ্রেসের কানাগলিতে হাঁটব। ওই প্রেম যেন পূর্ণতা না পায়। এইটুকু পলিটিকাল ওয়ার কি আমরা, ভগ্নহৃদয়রা, একজোট হয়ে জিততে পারব না? সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউনাইটেড স্টেটস অব আমারিকা… ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড।

ঘোরতর পলিটিক্স ও প্রেম, প্রেমহীন পার্টি এবং পার্টিহীন প্রেমের আবহে বড় হতে থেকে প্রকৃত রাজনীতি আমাকে আর টানে না। এদিকে প্রেমও আসে না। কলেজে যে জুনিয়র মেয়ের চোখে চোখ পড়ে অস্বস্তি হয়, জানতে পারি সে উল্টো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাতে অস্বস্তি বাড়ে। তবু ভাবি একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। আমি ইউনিয়নের রুলিং পার্টির স্কোয়াডে ঢুকে পড়ি। অ্যাসেম্বলি হলে একদিক দিয়ে আমাদের মিছিল, অন্যদিকে বিরোধীপক্ষ। যে দলে প্রেম আছে। স্লোগান কী, জানা নেই। জানতেও চাই না। ঠোঁট নাড়িয়ে যাই সিনেমার হিরোর মতো, আর চোখ ঘোরে এদিক-ওদিক। দেখে বুঝলাম, ওই পার্টিতে প্রমীলা সদস্য বেশি। প্রেম হলে ওদিকেই হবে। কিন্তু মাঝখানে সারি সারি বেঞ্চ ব্যারিকেড তৈরি করে। দেওয়াল থেকে যিশু আমাকেই দেখছেন নাকি? একটু পরেই দেখি একপাক ঘুরে খোলা চত্বরে এসে পড়েছি। সামনে সবুজ লন। ক্যান্টিনের দিকে হাঁটা লাগাই। কমনরুমের সিঁড়ির ওপর আত্মদা বসে আছে। ওকে আমরা আড়ালে ‘আত্মা’ ডাকতাম। ‘আত্ম’ ওর নামের প্রথম অংশ। পরের অংশ না-ই বা প্রকাশ হল। আত্মদা মানে টিংটিঙে চেহারা, সাদা রঙের ফুল হাতা শার্ট ঝুলিয়ে পরা, হাতা গোটানো। কালো ট্রাউজার। পায়ে সস্তার চটি। বিড়ি টানছে। আমায় একটা দিল। ধরালাম, ‘স্কোয়াডে ছিলে?’ ‘না, এদের কারওর সঙ্গে আমার ঠিক ইয়ে হয় না।’ ‘কিন্তু তুমি তো পলিটিক্স করো।’ ‘কাজ করি, কিন্তু সেটা গ্রামে। এই তো শনিবার চলে যাব হপ্তা খানেকের জন্য।’ আমি ছটফট করি, ‘তোমার প্রেম নেই?’ ‘আমার সময় নেই রে।’ বিড়ির ধোঁয়ায় রিং বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে আত্মদা হাত তুলে বিদায় জানিয়ে চলে যায়, ‘পারলে একবার আসিস আমার সঙ্গে।’

আমি ওকে এড়িয়ে চলি এরপর থেকে। পার্টির প্রেমে মজে থাকা কারও-র সঙ্গ প্রয়োজন নেই আমার। প্রেমের পার্টিতে নাম লেখানোর জন্য আমি উদগ্রীব তখন। মাসকয়েক পর খবর পেলাম আত্মদা আর আসবে না। ও নাকি খুন হয়ে গিয়েছে। কেউ বিশ্বাস করল, কেউ করল না। অনেকে বলল, আসলে আন্ডারগ্রাউন্ডে আছে, খুন বলে প্রচার করছে ওর পার্টি। কোন পার্টি? আত্মদা তো কোনও পার্টির স্কোয়াডেই যেত না। বাড়ি ফেরার পথে একটা বিড়ি ধরাই। নিজেকে বোঝাই আত্মদা নিশ্চয়ই ব্যর্থ প্রেমের তাড়নায় আত্মহত্যা করেছে। আচমকা, কড়া তামাকের ধোঁয়া সজোরে ধাক্কা মারে পাঁজরে।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন অনুব্রত চক্রবর্তী-র লেখা

………………….

Bidhan Chandra Roy Communist Party Indira Gandhi National Congress Robbar Digital Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on