

তখন বিজ্ঞাপন স্কিপ করা যেত না। আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞাপন এলে আমাদের প্রথম ইচ্ছা, স্কিপ অ্যাড, কিন্তু আশির দশকে সেই সুযোগ ছিল না। বিজ্ঞাপন চলবে। দেখতেই হবে। অথবা উঠে গিয়ে অন্য কাজ করতে হবে। আর এই ‘বাধ্যতামূলক দেখা’-টাই হয়তো বিজ্ঞাপনকে আমাদের স্মৃতিতে আরও গভীরভাবেঢুকিয়ে দিয়েছিল। আজ আমরা হাজার হাজার বিজ্ঞাপন দেখি। কিন্তু মনে থাকে কতগুলো? আশির মানুষ হয়তো দিনে অনেক কম বিজ্ঞাপন দেখত। কিন্তু তার মধ্যে কয়েকটি বিজ্ঞাপন মনে গেঁথে যেত সারাজীবনের জন্য।
আশ্বিনের বাজনা বেজে উঠতে তখনও মাসদুয়েক দেরি। আশির দশকে এক বিজ্ঞাপনসংস্থা। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে নোটপ্যাড, কলম আর পুরনো সব গার্ডবুক সামনে নিয়ে বসে ভুরু কুঁচকে চেয়ে আছে রূপা। কিউবিকলের পাশেই রাখা টেলিফোন বেজে উঠল। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অপারেটরের গলা, ‘হোমকল, ডিয়ার।’ তারপরই ঝনঝন করে মায়ের গলা, ‘পুজোর বাজার করতে যাব। বাড়ি ফিরবি কখন?’ রূপা চেঁচিয়ে উঠল, ‘মা প্লিজ! পুজোর বিজ্ঞাপন অনেক বেশি ইম্পরট্যান্ট।’

এখন হয়তো কিছুটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু আশির দশক এমনটাই ছিল। যেমন কুমোরটুলিতে, বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোতেও তেমন শিউলিফুল ফুটব কি ফুটব না করতে করতেই সাজো সাজো রব পড়ে যেত। লে-আউটে রোজই কাটাকুটি, বাঙালি জীবনের সেন্টিমেন্ট, উৎসব, বিউটি টিপস, মা আসছেন– সব মিলিয়ে সাহিত্য ও পণ্যের ভোজ জমিয়ে তুলতে হবে তো!
একের পর এক ক্লায়েন্ট। রংবেরঙের বিজ্ঞাপন। এলআইসি বলছে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। সঙ্গে মা দুর্গা আর ঈশ্বরী পাটনীর চারকোল স্কেচ। ফিলিপস বলছে, ‘মাতুন পুজোর রঙ্গে ফিলিপসেরই সঙ্গে’। আছে, মানানসই ইলাস্ট্রেশন। সিইএসসি-ই বা কম যাবে কেন! হুতোম প্যাঁচার নকশা থেকে প্রসঙ্গ তুলে এনে মিলিয়ে দেওয়া হত সমসময়ের সঙ্গে। তৈরি হয়ে গেল চিরকালীন বিজয়ার বিজ্ঞাপন।

মনে পড়ছে আশিতে ডানলপ জমজমাট। ঠাকুর দেখতে দেখতে গাড়ির টায়ার ছুটবে খাবারের খোঁজে। সারা কলকাতা ঢুঁড়ে নিয়ে আসা হত, কোথায় কী খাওয়াদাওয়া। কালিকার তেলেভাজা থেকে শুরু করে পিটার ক্যাটের চেলোকাবাব অবধি গড়াত সে খোঁজ। তৈরি হত খবর কাগজের আস্ত পাতা জোড়া ইয়াব্বড় ভোজনরসিক একখানা বিজ্ঞাপন। আই সোয়্যার, জনগণ ওই পাতাখানা সন্তর্পণে কেটে নিয়ে পকেটে রাখতেন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরার সময়।

আশির বিজ্ঞাপন: যে বিজ্ঞাপনগুলো আসলে আমাদের শৈশবের গল্প বলত! কিছু কিছু বিজ্ঞাপন কখনও পুরনো হয় না। বহু বছর কেটে যায়। মানুষ বড় হয়ে যায়। বাড়ি বদলে যায়। শহর বদলে যায়। হাতে চলে আসে স্মার্টফোন, এক ক্লিকেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া যায়। টেলিভিশনের জায়গা নেয় মোবাইলের স্ক্রিন, ইউটিউব, ওটিটি, সোশাল মিডিয়া। তবু হঠাৎ কোনও একদিন পুরনো একটি বিজ্ঞাপনের সুর কানে আসে।

ব্যস! মুহূর্তের মধ্যে সময়টা পিছিয়ে যায়। মনে হয়, আবার সেই ছোট্ট ঘরটায় বসে আছি। সামনে পুরনো টেলিভিশন। পাশে মা-বাবা। বাইরে সন্ধে নামছে। পড়ার খাতা হয়তো খোলা আছে, কিন্তু চোখ আটকে আছে টেলিভিশনের পর্দায়। অনুষ্ঠান চলছে, তার মাঝখানে বিজ্ঞাপন শুরু হয়েছে। আর আশ্চর্যজনকভাবে বিজ্ঞাপনটাও যেন অনুষ্ঠানেরই অংশ। সেই ছিল আশির দশক। একটা সময়, যখন বিজ্ঞাপন শুধু বিজ্ঞাপন ছিল না– বিজ্ঞাপন ছিল আমাদের জীবনের অংশ। টেলিভিশনের সামনে সেই সন্ধেগুলো!

আশির দশকে টেলিভিশন ছিল ঘরের একটা গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। আজকের মতো প্রত্যেক মানুষের হাতে আলাদা স্ক্রিন ছিল না। একই টেলিভিশনের সামনে পরিবারের সবাইকে বসতে হত। কোন অনুষ্ঠান দেখা হবে, সেটা নিয়েও আলোচনা চলত। কারও পছন্দ সিনেমা, কারও সিরিয়াল, কারও খেলা। আর অনুষ্ঠান চলার মাঝখানে যখন বিজ্ঞাপন শুরু হত, তখন অনেকেই উঠে যেতেন জল আনতে বা রান্নাঘরে। কিন্তু কিছু বিজ্ঞাপন শুরু হলেই সবাই আবার তাকিয়ে বসত। কারণ বিজ্ঞাপন তখন বিরক্তিকর বিরতি ছিল না। বিজ্ঞাপন নিজেই ছিল বিনোদন। একটা ছোট্ট গল্প। একটা সুন্দর সুর। কয়েকটা পরিচিত মুখ। একটা মজার পরিস্থিতি। তারপর শেষে পণ্যের নাম। কখনও একটি শিশু তার সরল কথায় সবাইকে হাসিয়ে দিচ্ছে। কখনও মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। কখনও বাবা অফিস থেকে ফিরেছেন। কখনও বন্ধুরা মাঠে খেলছে। কখনও বৃষ্টির মধ্যে গরম খাবার। সেইসব বিজ্ঞাপনে মানুষগুলোকে খুব চেনা মনে হত। কারণ তারা আমাদের মতোই ছিল।

আশির দশক শুধু বিজ্ঞাপনের দিক থেকে নয়, ভারতীয় সমাজের দিক থেকেও ছিল পরিবর্তনের সময়। অর্থনীতি বদলাচ্ছিল। বাজারে নতুন নতুন পণ্য আসছিল। মানুষের সামনে খুলে যাচ্ছিল নতুন ধরনের জীবনযাপনের সম্ভাবনা। এই পরিবর্তনের ছাপ বিজ্ঞাপনেও স্পষ্ট ছিল। বিজ্ঞাপন তখন যেমন একদিকে বলবে, ‘তুমি যেমন আছ, তেমনই থাকো।’ আবার অন্যদিকে বলছিল, ‘তোমার জীবনকে আরও সুন্দর করার সুযোগ আছে।’ একটি শ্যাম্পু শুধু চুল পরিষ্কার করার জিনিস নয়, তা হয়ে উঠল আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। একটি টুথপেস্ট শুধু দাঁত পরিষ্কারের পণ্য নয়, তা হয়ে উঠল স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর জীবনের প্রতীক। একটি কোমল পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটানোর পানীয় নয়, তা হয়ে উঠল বন্ধুত্ব, তারুণ্য আর স্বাধীনতার প্রতীক। বিজ্ঞাপন বুঝেছিল, মানুষ শুধু পণ্য কেনে না। মানুষ একটা অনুভূতি কিনতে চায়।

জিঙ্গেল– যে গান বিজ্ঞাপন শেষ হওয়ার পরেও থেকে যেত! বিজ্ঞাপনের কথা বলতে গেলে জিঙ্গেলের কথা না-বললে যেন গল্পটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আজ বিজ্ঞাপনের গান আসে, কয়েক সেকেন্ড থাকে, তারপর হারিয়ে যায়। কিন্তু তখনকার অনেক জিঙ্গেল ছিল অন্যরকম। একবার শুনলেই মাথায় ঢুকে যেত। তারপর স্কুলে বন্ধুরা গাইত। বাড়িতে ভাই-বোন গাইত। কেউ পণ্যের নাম বললেই জিঙ্গেলের সুর মনে পড়ে যেত। তখন তো সোশাল মিডিয়া ছিল না।

তাই একটা বিজ্ঞাপন জনপ্রিয় হওয়ার পর সেই মডেলকে রাতারাতি সোশাল মিডিয়ায় খুঁজে বের করার সুযোগও ছিল না। তবু মানুষ তাকে চিনত। পাড়ায় আলোচনা হত। স্কুলে আলোচনা হত। ‘ওই বিজ্ঞাপনটা দেখেছিস?’ ‘ওই বাচ্চাটার কথা শুনেছিস?’ এইভাবেই একটা ছোট্ট বিজ্ঞাপনের চরিত্র মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নিত।
আশির বিজ্ঞাপনে সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও বদলাতে শুরু করেছিল। বিজ্ঞাপন বলল: নিজেকে ভালোবাসো। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করো। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসী হও। সেই সময়ের বিজ্ঞাপনগুলো বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে দিয়েছিল। ফ্যাশন, চুলের স্টাইল, পোশাক, সাজসজ্জা– সব কিছুতেই বিজ্ঞাপনের প্রভাব পড়তে শুরু করল।

বিজ্ঞাপনে মা ছিলেন আলাদা এক চরিত্র! আশির বিজ্ঞাপনে মায়ের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। মা মানেই যত্ন। মা মানেই সেলাইমেশিন। মা মানেই রান্নাঘর। মা মানেই সন্তানের স্বাস্থ্যচিন্তা। মা মানেই পরিবারের জন্য সঠিক জিনিসটি বেছে নেওয়া। অনেক বিজ্ঞাপনে মায়ের হাতে পণ্য তুলে দেওয়া হত, যেন তিনি পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। আর দর্শকের কাছে সেই মা ছিলেন খুব পরিচিত। কারণ তিনি বিজ্ঞাপনের চরিত্র হলেও তাঁর মধ্যে নিজের মাকে দেখা যেত। একইভাবে বাবাও ছিলেন পরিচিত চরিত্র– অফিস, দায়িত্ব, সন্তানকে নিয়ে চিন্তা, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা। এই পরিচিত সম্পর্কগুলোই বিজ্ঞাপনকে আবেগের জায়গায় নিয়ে যেত।

আশির বিজ্ঞাপনের একটা বড় অলংকার হল– সেখানে স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পুরোপুরি ‘অচেনা’ নয়। একটা সাধারণ পরিবার। ছোট্ট একটা বাড়ি। সন্তানের স্কুল। বাবার চাকরি। মায়ের সংসার। বন্ধুদের আড্ডা। ছুটির দিন। উৎসব। এর মধ্যেই একটু ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা। বিজ্ঞাপন সেই আকাঙ্ক্ষাটাকেই ধরেছিল। একটা নতুন ফ্রিজ। একটা নতুন টেলিভিশন। একটা স্কুটার। একটা ভালো শ্যাম্পু। একটা পছন্দের বিস্কুট। একটা নরম পানীয়। এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই তখন জীবনের আনন্দের অংশ ছিল।

তখন বিজ্ঞাপন স্কিপ করা যেত না। আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞাপন এলে আমাদের প্রথম ইচ্ছা, ‘স্কিপ অ্যাড’, কিন্তু আশির দশকে সেই সুযোগ ছিল না। বিজ্ঞাপন চলবে। দেখতেই হবে। অথবা উঠে গিয়ে অন্য কাজ করতে হবে। আর এই ‘বাধ্যতামূলক দেখা’-টাই হয়তো বিজ্ঞাপনকে আমাদের স্মৃতিতে আরও গভীরভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আজ আমরা হাজার হাজার বিজ্ঞাপন দেখি। কিন্তু মনে থাকে কতগুলো? আশির মানুষ হয়তো দিনে অনেক কম বিজ্ঞাপন দেখত। কিন্তু তার মধ্যে কয়েকটি বিজ্ঞাপন মনে গেঁথে যেত সারাজীবনের জন্য। পিছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, আশির দশকের বিজ্ঞাপন আসলে সেই সময়ের সমাজের একটা দলিল। মানুষ কী খেত। কী পরত। কীভাবে নিজেদের ঘর সাজাত। কীভাবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভাবত। কীভাবে সৌন্দর্যকে দেখত। কীভাবে আধুনিক হতে চাইত। সবকিছুরই একটা ছবি বিজ্ঞাপনে পাওয়া যায়। তাই পুরনো বিজ্ঞাপন দেখা মানে শুধু পুরনো পণ্য দেখা নয়। এ যেন একটা পুরনো ভারতকে দেখা। একটা ভারত, যে তখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। একটা ভারত, যে পুরনো অভ্যাস আঁকড়ে ধরেও নতুন পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর তাই বিজ্ঞাপনগুলো আজও মনে পড়ে। সময়ের সঙ্গে পণ্য বদলে যায়। ব্র্যান্ড বদলে যায়। প্যাকেট বদলে যায়। বিজ্ঞাপনের প্রযুক্তি বদলে যায়। কিন্তু স্মৃতি বদলায় না।

আশির বিজ্ঞাপনগুলো আজ তাই আমাদের কাছে পণ্যের বিজ্ঞাপন নয়। ওগুলো যেন পুরনো অ্যালবামের ছবি। একটা ছবি উল্টোলেই আরেকটা ছবি আসে। একটা জিঙ্গেল শুনলেই একটা বিকেল ফিরে আসে। একটা পুরোনো সংলাপ শুনলেই মনে পড়ে যায় বন্ধুর মুখ। তাই আজ এত বছর পরে দাঁড়িয়ে বলা যায়– আশির দশকে, বিজ্ঞাপনগুলো আমাদের কিছু বিক্রি করতে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের দিয়ে গিয়েছে তার চেয়েও মূল্যবান কিছু স্মৃতি। যে স্মৃতি কিনতে পাওয়া যায় না। যে স্মৃতির কোনও এক্সপায়ারি ডেট নেই।
আর একটা ব্যাপার, একটি মেয়েশরীরকে পণ্য করার খেলাধুলো সেই আশির দশকের বিজ্ঞাপনেও ছিল বইকি। যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সে গল্প তো এখানে করার কথা নয়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved