significance of the paintings depicting kiss in the art history| Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিল্পিত চুম্বন

চুম্বন দীর্ঘদিন ধরেই ভালোবাসা, আবেগ এবং ঘনিষ্ঠতার প্রতীক। ইতিহাস জুড়ে শিল্পীরা তাঁদের কাজে এই মুহূর্তগুলিকে ধারণ করেছেন। কোমল আলিঙ্গন থেকে শুরু করে আবেগপূর্ণ অধরে চুম্বন। শারীরিক প্রেমের যে আকার, অবয়ব বা দৃশ্য প্রদর্শনীতে আছে তার অধিকাংশই দেখলাম বোধহয় ‘কিস’ আর ‘লাভার্‌স’। সেখানে শরীর, প্রণয়, অন্তরঙ্গতা এবং একটা সর্বজনীন ভিস্যুয়ালের আবেদন আছে। তবে বিষয়ের উপস্থাপনা, পরিবেশনা ইত্যাদির ব্যাপারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশকালে আলাদা আলাদা শিল্পীর আলাদা আলাদা অভিব্যক্তি।

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ১৪:৩৯   
Facebook WhatsApp Messenger

‘প্রেম’ শব্দটার অর্থের গভীরতা যাই হোক, একে টিকিয়ে রাখার একটা ভয় কিন্তু শুরু হয়েছে আমাদের সবার মনে। আধ্যাত্মিক, মানসিক স্তর পেরিয়ে শারীরিক স্তর পর্যন্ত এসে প্রেম কি সহজ থেকে সহজতর হয়ে উঠেছে? এ বিষয়ে শিল্প-সাহিত্যের কোনও দায় আছে কি না কিংবা এর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে শিল্প সাহিত্য বা অন্য সৃজনশীল কাজ রক্ষাকবচ কি না সে ব্যাপারে আমরা চিন্তিত। তবুও প্রেম ছাড়া শিল্প নীরব, আর শিল্প ছাড়া প্রেম অদৃশ্য।

zoom
দ্য কিস। শিল্পী: অগুস্ত রদ্যাঁ। ১৮৮২

প্রেম নিয়ে এই যে ঢাক পিটিয়ে এটাকে ‘ব্যক্তিগত’ থেকে ‘সর্বজনীন’ করে তোলার আপ্রাণ প্রচেষ্টা, তাতে কি প্রেমের মর্যাদা বাড়ছে? না কি এটাকে পণ্য করে তোলা হচ্ছে? এই যে প্রেম উৎসব, প্রেমের মেলা, ভালো প্রেম, খারাপ প্রেমের মধ্যে প্রতিযোগিতা, প্রেমের পাত্র-পাত্রীদের মধ্যে যে নিরন্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তার মধ্যে থেকে কি এটাকে একটা সর্বজনীন অথবা গণতান্ত্রিক করে তুলে আরও বেশি সহজলভ্য করা যাবে? প্রশ্ন অনেক।

তাহলে প্রেম মানে কী? আসলে প্রেমের ঠিক মানে করা যায় না। আর মানে করা যায় না বলেই বোধহয় আমরা বেঁচে গিয়েছি। কারণ প্রেম এমন একটা জিনিস, সেটার সত্যিকারের অর্থ খুঁজতে খুঁজতেই সারাজীবন। প্রেম কোনও গল্প নয় যার শেষ আছে। প্রেম একটি বহমান অভিজ্ঞতা, অর্থ জেনে গেলেই বোধহয় আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। তাই প্রেমের মানে খুঁজতে যাওয়া বাতুলতা। এটা একটা বোধ। তবুও কিছু মানুষের এটাকে নিয়ে ক্লাস খুলে বসার স্বভাব।

zoom
শিল্পী: সনৎ চট্টোপাধ্যায়। সময়কাল অজ্ঞাত

প্রেম নিয়ে কাটাছেঁড়া। কতটা প্রেম, কতটা অপ্রেম, কতটা শুদ্ধ, কতটা নিষিদ্ধ তারও নানারকম ব্যাকরণ খুলে বসা। প্রেম যদি শারীরিক, তার মধ্যেও কিছু আইনি আচরণ। কাকে বলে বৈধ স্পর্শ, কাকে অবৈধ। সতর্কতা? সাবধানের মার নেই। তাছাড়া কোনও কিছুই সঠিক শেখানোর আগে মানতেই হবে প্রতিটি বিষয়েরই একটা সীমাবদ্ধতা আছে।

zoom
চেনা চুম্বন, চিনে চুম্বন

পুরাকালে অর্থাৎ পৌরাণিক যুগে প্রেম-প্রণয়-প্রজনন এইসব বিষয়ের পুরোটাই প্রায় ঈশ্বরের হাতে সঁপে দেওয়া হয়। তার যত কিছু বহিঃপ্রকাশ সব কিছু ঐশ্বরিক। যা কিছু সব ঈশ্বরের হাত ধরেই, ঈশ্বরের সঙ্গে। দেশে দেশে, কালে কালে, নানা দেব-দেবতা। ওদের কিউপিড তো আমাদের কৃষ্ণলীলা। প্রেম তখন ভক্তি। প্রেম মানে শুদ্ধতা, সামঞ্জস্য, এক অলৌকিক আকর্ষণ। ভারতীয় শিল্পেও প্রেম কখনও আলাদা করে উচ্চারিত নয়, সেও মিশে থাকে আধ্যাত্মিকতায়। দেহ ছুঁয়ে আত্মার দিকে যায়। সেখানে প্রেম মানে মিলন নয়, অপেক্ষা। করুণা, ভক্তি ও ত্যাগের প্রতীক।

zoom
কিউপিড। সূত্র: ইন্টারনেট

মাঝে এটা চলে এল ঈশ্বরের হাত থেকে মানুষের হাতে, মানুষের ক্ষমতার মধ্যে। সোজা বলতে গেলে প্রেম, প্রণয়, প্রজনন– বিষয়টা প্রায় ঈশ্বরের হাত থেকে রাষ্ট্রের হাতে চলে গেল। একটা আইনি বেড়ার মধ্যে। কী ভীষণ দিন গিয়েছে যখন মানুষ মানুষের দাস। মানুষ পণ্য, বেচাকেনা।

zoom
খাজুরাহোর চুম্বনশিল্প

শিল্পীর হাতে পড়লে প্রেম আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে সভ্যতার ভাষা, সময়ের প্রমাণ। তাই পৃথিবীর শিল্পকলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, রেনেসাঁস থেকে রোমান্টিক যুগে এল মানবিক প্রেম। রেনেসাঁসের শিল্পীরা প্রেমকে নামিয়ে আনলেন দেবতার স্বর্গ থেকে মানুষের চোখে। রাফায়েলের ‘দ্য লাভারস’ বা টিশিয়ানের প্রেমদৃশ্যে প্রেম হয়ে উঠল স্পর্শযোগ্য, হাত, চাহনি, নীরবতা। আর রোমান্টিক যুগে এসে প্রেম মানে আবেগের বিস্ফোরণ। প্রেমের সাহসী উচ্চারণ। এখানে প্রেম আর লজ্জা মানে না, সে সমাজের চোখে চোখ রাখে।

zoom
শিল্পী: রাজা রবি বর্মা

আমার মধ্যত্রিশে গিয়েছিলাম প্যারিসে, কারণ এক হাটেই সব। প্যারিস তখন পৃথিবীর শিল্পের রাজধানী। আমি মনোযোগী দর্শক মাত্র। চাক্ষুষ করতে গিয়েছিলাম শিল্পের ইতিহাস কিংবা ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম। তিনটি ভাগের যে কথা বলছিলাম– আধ্যাত্মিক, সামাজিক, শারীরিক, তার সার্বিক ধারক তখন মনে হয়েছিল– প্যারিস। বিশ্বের শিল্পকলা ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র।

বিশ্বের বৃহত্তম আর্ট মিউজিয়াম, ল্যুভ-এ দেখেছি প্রাচীন ধ্রুপদি শিল্প, রেনেসাঁস, বারোক, রোকোকো ইত্যাদি। আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক যদি কিছু হয়, তা যেন সব ওখানেই। মনের কথা যদি বলি, তখন ওখানে গিয়ে এতই বিস্মিত হয়েছিলাম যে, কোনও শিল্পকর্ম– সে চিত্রকলা, ভাস্কর্য বা যা কিছু তাতে মানুষের ছোঁয়া পাচ্ছিলাম না। ছবির কাছে গিয়ে প্রায় নাক ঠেকিয়েও কোনও তুলির আঁচড় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এ যেন সত্যিকারের ঐশ্বরিক কাজ, একটা অজানা শক্তির কীর্তি।

zoom
দ্য কিস। পাবলো পিকাসো। ১৯৬৬

শিল্পে মানুষের ছোঁয়া পেলাম যেখানে তার নাম, ‘মিউজে দ্য অরসে’। ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পের খনি। এবং পম্পিদু সেন্টারে অঢেল আধুনিক শিল্প। এছাড়া অগুস্ত রদ্যাঁ মিউজিয়াম, পিকাসো মিউজিয়াম এবং অপেক্ষাকৃত ছোট গ্যালারিগুলো শিল্পপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়। পাগলের মতো দেখেছি, শিল্পের বিষয় চিন্তা, করণকৌশল, শিল্পসামগ্রী এবং সরঞ্জামের ব্যবহার, পেশিশক্তি, শিল্পীর মানসিক তৃপ্তি এবং অসহায়তা। কখনও অসম্পূর্ণ কাজ। সব মিলিয়ে মানুষের ছোঁয়া। সংগ্রহালয়গুলোতে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি থেকে শুরু করে পিকাসোর মতো শিল্পীদের কালজয়ী শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে।

এবার একটু গুটিয়ে এনে চলে আসি শিল্পকলায় প্রেমবিষয়ক আখ্যানে। প্রেমের যেন মানে খুঁজে পাচ্ছি এখন। মানে, কোনও ব্যক্তি, প্রাণী বা জিনিসের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, গভীর স্নেহ, মানসিক সংযুক্তি এবং ভালোবাসার অনুভূতি। যা আনন্দ, যত্ন ও শ্রদ্ধার মতো বিভিন্ন আবেগ ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যা কেবল রোমান্টিক আকর্ষণ নয়, বরং গভীর আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক বা রোমান্টিক অনুরাগ। এমনকী, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিকেও বোঝায়।

zoom
দ্য বার্থডে। শিল্পী: মার্ক শাগাল। ১৮৮৭

প্রেমের দৃশ্যায়নে দেখলাম ‘চুম্বন’-এর আধিক্য। চুম্বন দীর্ঘদিন ধরেই ভালোবাসা, আবেগ এবং ঘনিষ্ঠতার প্রতীক। ইতিহাস জুড়ে শিল্পীরা তাঁদের কাজে এই মুহূর্তগুলিকে ধারণ করেছেন। কোমল আলিঙ্গন থেকে শুরু করে আবেগপূর্ণ অধরে চুম্বন। শারীরিক প্রেমের যে আকার, অবয়ব বা দৃশ্য প্রদর্শনীতে আছে তার অধিকাংশই দেখলাম বোধহয় ‘কিস’ আর ‘লাভার্‌স’। সেখানে শরীর, প্রণয়, অন্তরঙ্গতা এবং একটা সর্বজনীন ভিস্যুয়ালের আবেদন আছে বলে মনে হয়। তবে আকারে, অবয়বে, শৈলীতে, আঙ্গিকে বিষয়ের উপস্থাপনা, পরিবেশনা ইত্যাদির ব্যাপারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশকালে আলাদা আলাদা শিল্পীর আলাদা আলাদা অভিব্যক্তি। এখানে আমার নিজের দেখা শিল্পকর্মের কিছু উদাহরণ দিতে চাই। সেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং আবেগের যে ভূমিকা থাকছে সেটা বোধহয় জরুরি।

zoom
দ্য কিস। গুস্তাভ ক্লিম্ট‌। ১৯০৭-’০৮
zoom
দ্য কিস: অ্যান আর্ট ফিলোজফি। গুস্তাভ ক্লিম্টে‌র ফোটোগ্রাফিক অনুবাদ। শিল্পী: আন্দ্রে কেজিন। ২০২২

আমার প্রিয় চুম্বন বিষয়ক ছবি বলতে প্রথমেই বলব গুস্তভ ক্লিম্টের ‘দ্য কিস’। সোনালি আবরণে মোড়া, তবু ভিতরে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা। এখানে প্রেম সুন্দর, কিন্তু স্থায়ী নয়। ১৯০৭-’০৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আঁকা অস্ট্রিয়ান প্রতীকবাদী চিত্রশিল্পী গুস্তভ ক্লিম্টের একটি বিখ্যাত তৈলচিত্র, যাতে সোনা, রূপো এবং প্ল্যাটিনামের পাত ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে, ক্লিম্ট আমার একজন প্রিয় শিল্পী, কারণ ক্যানভাসে মানুষের স্পর্শ আছে, এইটার স্পষ্ট অনুভূতি হয়। ক্লিম্টের বেশিরভাগ ক্যানভাস ছিল সাদা নয় একটা ধূসর বর্ণের। খানিকটা আমাদের মোটা দানার চটের মতো। কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার। এটি ওঁর গোল্ডেন পিরিয়ডের অন্যতম সেরা কাজ, যেখানে ভালোবাসার তীব্রতায় আলিঙ্গনরত এক দম্পতিকে সোনালি ও জটিল নকশাঘেরা পোশাকে দেখেছি আমরা। ছবিতে থাকা দম্পতিকে অনেকে ক্লিম্ট নিজে এবং তাঁর আজীবন সঙ্গী এমিলি ফ্লোজ বলে মনে করেন। এটি ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পের একটি অন্যতম আইকন এবং বর্তমানের প্রেমের প্রতীক হিসেবেও সমাদৃত।

zoom
দ্য কিস টু। শিল্পী: তুলুস লোত্রেক। ১৮৯২

প্যারিসের আর একজন হিরো, আমার ফেভারিট, তুলুস-লোত্রেক। ওঁর বেশ কয়েকটি ছবি, বিশেষ করে সমকামী নারীদের এবং বিছানায় প্রেমের দৃশ্য, বেশ জনপ্রিয়। তুলুস-লোত্রেকের নেশা হয়ে গিয়েছিল প্যারিসের রাত জীবন দেখার। বিশেষ করে পতিতালয়। তাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা কাজকর্মের দৃশ্য আঁকার কাজে অনেক সময় ব্যয় করেন তিনি। ‘দ্য কিস টু’ সেই সময়ের একটা উল্লেখযোগ্য কাজ।

এই স্বল্প পরিসরে অনেক রথী-মহারথীদের কাজের কথা আমি এড়িয়ে যাব কিন্তু পাবলো পিকাসোকে এড়াই কীভাবে! পিকাসোর হাতে প্রেম ভেঙে যায় জ্যামিতিতে। রোমান্টিক সিম্ফনি। ‘দিস কিস’-এ প্রেম নেই, আছে আকর্ষণের হিংস্রতা। আধুনিক মানুষের প্রেম আত্মকেন্দ্রিক, টুকরো টুকরো। পিকাসো তার আকৃতির মাধ্যমে এমন আবেগ ফুটিয়ে তুলেছেন যা দেখে আপনার মনে হবে প্রতিটি তুলির আঁচড় যেন একেকটি চুম্বন। পিকাসোর ‘দিস কিস’ কেবলমাত্র দু’টি মাথাকে একটি রেখা দ্বারা সংযুক্ত যা সমগ্র চিত্রের স্থান দখল করে আছে। পিকাসো তাদের কাছাকাছি আনার জন্য মুখগুলিকে বিকৃত করতে দ্বিধা করেননি। চুম্বনের সময় ঘটে যাওয়া অন্তরঙ্গ সংমিশ্রণ প্রকাশ করার জন্য তিনি দু’টি মুখ তৈরি করেছেন। নাকগুলো নিজেদেরকে একটি পারস্পরিক কনট্যুরে পরিণত করে আর মুখগুলো যেন একে অপরকে কামড়াচ্ছে।

zoom
দ্যা কিস। শিল্পী: পাবলো পিকাসো। ১৯৬৯

ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর, অগুস্ত রদ্যাঁ। তিনি নিটোল কোমলের ধার ধারতেন না। শিল্পে মানুষের উপস্থিতি আর পেশিশক্তি সাংঘাতিকভাবে স্পষ্ট। কাজগুলো কখনও মোলায়েম ফিনিশ নয়, যেন সবসময় মনে হয় একটা ধারালো শক্তিশালী স্কেচ। কলকাতায় প্রদর্শনীতে ওঁর কাজ চাক্ষুষ করেছেন অনেকে। রদ্যাঁ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, নারীদের ভাস্কর্য তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাদের এবং তাদের দেহের প্রতি শ্রদ্ধা, কেবল পুরুষদের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয় বরং আবেগের পূর্ণ অংশীদার হিসেবে। ভাস্কর অগুস্ত রদ্যাঁ-র জীবনের অন্যতম গভীর, আবেগপূর্ণ ও ট্রাজিক প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাঁর ছাত্রী ও সহযোগী ক্যামিল ক্লদেল-এর সঙ্গে। রদ্যাঁর বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘দ্য কিস’-এ প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসার অবিনশ্বর আবেশ ফুটে উঠেছে, যা তাঁদের নিজেদের সম্পর্কের আবেগকেও প্রতিফলিত করে।

পশ্চিমের কথা বলতে বলতে পুবের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। বিশেষ করে চিন। চিন দেশে বড় বড় শহরে দারুণ সুন্দর সব শিল্পবিষয়ক মিউজিয়াম আছে। সেখানে সাংঘাতিকভাবে ওদের নিজেদের এবং প্রাচ্যের শিল্পকর্মের উদাহরণে ভরা। তবে লক্ষ করা গিয়েছে, চিনে দীর্ঘকাল ধরে শিল্প এবং সাহিত্যে চুম্বন ব্যাপারটাকে ভীষণভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখা হয়েছে, সেটাকে প্রদর্শন করতে ওরা চায় না। এমনকী, রাশিয়াতেও সেন্ট পিটার্সবার্গের বিখ্যাত মিউজিয়াম ‘হার্মিতাজ’ বা ওদের স্টেট মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে তেমন কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। অর্থাৎ শারীরিক প্রেম এবং চুম্বনের দৃশ্যায়ন সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছেন রাশিয়ান শিল্পীরাও। তবে ‘কিসিং সেরিমনি’ শিরোনামের একটা ছবির কথা মনে পড়ছে। ছবিটাতে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান, বলা ভালো, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এক যুবতী মেয়ে বিয়ের আগে বিশেষ পোশাকে চুম্বনের অনুষ্ঠানের জন্য আসছে।

zoom
দ্যা কিসিং সেরিমনি। শিল্পী: কনস্টান্টিন মাকোভস্কি

এখানে আমাদের দেশের কথাও তো বলা দরকার। আমাদের দেশের শিল্প সাহিত্যে কিন্তু শৃঙ্গার রসের কোনও অভাব নেই। চিত্রকলায় হোক কিংবা ভাস্কর্যে, বিশেষ করে মন্দির ভাস্কর্যে রতি, লীলার উদাহরণ ঝুড়ি ঝুড়ি। খাজুরাহো এবং সারা ভারতের মন্দিরের মূর্তিকলা যেমন, তেমনই মিনিয়েচার চিত্র এবং লোকশিল্পের ক্ষেত্রেও অসাধারণ সব কাজ দেখে মুগ্ধ হই।

zoom
কিষাণগড় চিত্রকলা। শিল্পী: অজ্ঞাত

আমাদের দেশের শিল্পীদের কাজ বলতে মনে পড়ছে, কিষাণগড় চিত্রমালা। কিষাণগড়ের রাধার অবয়বে অ-পূর্ব আঙ্গিকে যেন রেখার প্রেম। বাংলার পটচিত্রেও বাদ যায়নি প্রেম এবং চুম্বন।

zoom
বাংলার পটচিত্রে চুম্বন। শিল্পী: অজ্ঞাত

আধুনিক শিল্পীদের মধ্যে ফ্রান্সিস নিউটন সুজার কাজ মনে পড়ছে। বিশেষ করে তাঁর ‘দ্য লাভার্‌স’ ভারতীয় ছবির বাজারে ভীষণ মূল্যবান। ১৯৬০ সালে আঁকা ছবিখানি ‘ক্রিস্টিজ’-এর নিলামে ৪০ কোটি টাকায় বিক্রিত।

zoom
দ্যা লাভারস। শিল্পী: ফ্রান্সিস নিউটন সুজা। ১৯৬০

চিত্তপ্রসাদ। ওঁর ছবিতে দুর্ভিক্ষ, জীবন যন্ত্রণায় ভরা। তাঁর মধ্যেও জীবনে কি প্রেম নেই! নানা বিষয়ে তাঁর কাজের মধ্যেও চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য এঁকেছেন প্রেম। ১৯৬৫ সালে ‘শিল্পায়ন’ পত্রিকার পাতায় নিজের কবিতার সঙ্গে আঁকেন উন্মুক্ত প্রেমের ছবি, ‘চুম্বন’। ওঁর প্রিয় লিনোকাট মাধ্যমে করা কাজটিতে বলিষ্ঠ রেখা এবং কম্পোজিশনের অন্তরঙ্গতা মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো।

zoom
কিস। শিল্পী: চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য। ১৯৬৫

যাঁকে কোনও বিষয়ে বাদ দেওয়া যায় না তাঁর নাম, রবীন্দ্রনাথ। ‘লাভার্‌স’ শিরোনামের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিত্রকর্ম যেন চুম্বনেরই ছবি। শিল্পকর্মটি, অন্যান্য শিল্পকর্মের সঙ্গে, ডার্টিংটন ট্রাস্টকে উপহার দেওয়া হয়েছিল এবং সদেবি’স লন্ডনের প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। তাঁর চিত্রকর্মগুলিতে প্রায়শই রহস্যময় মানব মুখ এবং ভূদৃশ্যের মধ্যেও দেখা যায়, চাপা আবেগ এবং গভীর আত্মদর্শন।

zoom
লাভার্স। শিল্পী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্রেম বিষয়ে আজকের এই আলোচনার শেষে আরেকটা বিষয় মাথায় ঢুকছে। বিভিন্ন শিল্পীদের প্রেম জীবনের গল্পও কিন্তু কম আকর্ষণীয় না। রবীন্দ্রনাথের প্রেমে স্পর্শ আছে, কিন্তু দখল নেই। রামকিঙ্করের শিল্প এবং প্রেমের চর্চায় কোনও রাখঢাক ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত সততা ও প্রাণস্পন্দন, যা তাঁকে সমসাময়িক শিল্পীদের থেকে আলাদা করেছে। ইউরোপীয় শিল্পে অসফল প্রেমিক, ভ্যান গঘ প্রেমকে খুঁজেছেন রঙের উন্মাদনায়। ফ্রিদা কাহলো খুঁজেছেন শরীরের যন্ত্রণার ভেতর। প্রেম সেখানে সুখের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং টিকে থাকার কারণ। পল গগ্যাঁ। গুস্তভ ক্লিম্ট। ফ্রান্সিস নিউটন সুজা। অমৃতা শেরগিল। নাম অনেক। জীবনের গল্প অনেক।

zoom
দ্য টু ফ্রিডাস। শিল্পী: ফ্রিডা কাহলো। ১৯৩৯

প্রেম প্রায়শই যন্ত্রণার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে। তবু মানুষ ভালোবাসা ত্যাগ করে না। বলা যায়, যন্ত্রণাই প্রেমকে গভীর করে তোলে। প্রেম আসলে একটি অবস্থান– নিজের সীমা পেরিয়ে অন্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস।

auguste rodin chittaprosad Francis Newton Souza Frida Kahlo Gustav Klimt Haren Das Henri de Toulouse-Lautrec Kalighat Patachitra khajuraho Kishangarh painting Konstantin Makovsky Marc Chagall Pablo Picasso painting of rabindranth Rabindranth Tagore raja ravi varma sanat chattopadhyay Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on