Sumit Sarkar: The Historian Beyond Ideology| Robbar
Robbar
  • ৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২২ আগস্ট ২০২৬

তাঁর বামপন্থায় আপস নেই

ইতিহাসবিদ হিসেবে সুমিত সরকার ছিলেন আপসহীন। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে ইতিহাস চর্চার মূল পদ্ধতির কোনও সংঘাত তিনি হতে দেননি। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠিত মার্কসবাদীদের সম্বন্ধে ওঁর একটা বীতরাগ এসে গিয়েছিল। তাই বোধহয় ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’-র জন্য পাওয়া রবীন্দ্র পুরস্কার নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সময় উনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।  

Published by: Robbar Digital

Posted:August 22, 2026 8:48 pm | Updated:August 22, 2026 9:24 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

সুমিত সরকারের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই আধুনিক ইতিহাস চর্চার যে-ধারা ভারতে প্রচলিত হয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটছে– এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। তার কারণ, ইতিহাস চর্চা যাঁরা করেন, তাঁরা সুমিত সরকার এবং তাঁর সমসাময়িকদের তৈরি করে যাওয়া ট্র্যাডিশনটার দিকেই তাকিয়ে থাকবেন। ধারা অনুসরণ করেই তো ইতিহাস চর্চা করতে হয়।

সুমিত সরকার একজন ‘কমিটেড হিস্টোরিয়ান’ ছিলেন। তাঁর একটা রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতাদর্শ ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে, এরিক হবসবম যেমন বলেছিলেন যে, তিনি পার্টিজান বটে, কিন্তু তিনি পার্টি-অন্ধ নন, যুক্তিহীন সমর্থনে তিনি বিশ্বাসী নন। অর্থাৎ, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে ইতিহাস চর্চার মূল যে পদ্ধতি– তথ্যের অনুসন্ধান– তার কোনও সংঘাত তিনি নিজে যেমন দেখেননি, তেমনই সুমিত সরকারও দেখেননি। সেই প্রজন্মের যাঁরা মার্কসবাদী ঐতিহাসিক, তাঁরাও এ ব্যাপারে দ্বিমত হননি। যদিও যাঁরা মার্কসবাদী ঐতিহাসিক নন, তাঁরাও ওই একই পথের পথিক। এ তো সত্যি কথাই, আমাদের যদি ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু বলতে হয়, তাহলে প্রামাণ্য সূত্র থেকে আমাকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এই মূল সত্য থেকে কোনও ঐতিহাসিকেরই বিচ্যুত হওয়ার কথা নয়।

zoom
সুমিত সরকার(১৯৩৯-২০২৬)

অথচ, সম্প্রতি অনেকে বলছেন যে, ইতিহাস এক ধরনের বিশ্বাসের মতো ব্যাপার। কিন্তু বিদ্যায়তনিক চর্চার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিকরা একথা মেনে নেবেন না মোটেই। কিংবা পুরাণের কোনও মহান চরিত্রকে ইতিহাসের সমান মর্যাদা দেওয়াটাও তাঁরা মেনে নেবেন না। ঐতিহাসিকদের এদেশে কিংবা বিদেশে– সর্বত্রই কাজ করার একটা নিজস্ব পদ্ধতি আছে। উত্তর আধুনিকতার প্রভাব এক সময় ইতিহাস চর্চায় এসে পড়েছিল। তা আমাদের শেখাল যে, নানা বিষয়ে চর্চা করতে হবে, কারণ ইতিহাসের বহুমাত্রিকতা রয়েছে। উত্তর-আধুনিকতা কিন্তু ইতিহাসের পদ্ধতি বদলে ফেলতে বলেনি বা চিরাচরিত যে-পদ্ধতি আমরা অবলম্বন করি, বলেনি তাকে বর্জন করতে হবে।

zoom
ইতিহাসচর্চার মূল পদ্ধতির প্রতি চিরকালই ছিলেন আপসহীন

ইতিহাসে কল্পনা তো ঐতিহাসিকের অঙ্গ, ঐতিহাসিকের ভাবনার অঙ্গ। ঐতিহাসিক কল্পনার নিশ্চয়ই একটা গুরুত্ব আছে, যেটাকে আমরা ‘হিস্টোরিক্যাল ইমাজিনেশন’ বলছি। সেটিকে পুঁজি করে নিয়েই তো একটা তথ্যকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্নভাবে দেখেন। কিন্তু ইতিহাসের বাঁধন যেখানে প্রামাণ্য তথ্যের অনুসন্ধান, সেখানে কিন্তু সুমিত সরকার কখনও কোনও সমঝোতা করেননি।

zoom
সুমিত সরকারের লেখা দু’টি আকরগ্রন্থ

সুতরাং, ইতিহাসকে যাঁরা ‘সাহিত্য’ হিসেবে দেখেন, তাঁদের চিন্তার মধ্যে এক ধরনের অস্পষ্টতা আছে। আবার ইতিহাস সাহিত্যগুণ-সমন্বিত হবে, এটাও আমরা মানি। সুমিত সরকারের লেখার মধ্যে সেটা ছিল পুরোমাত্রায়। তাঁর ইতিহাসের মনন-চিন্তন ক’টি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথমে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন গবেষণা করছেন, তখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাব খুব বেশি তাঁর মননে। এবং স্বদেশি আন্দোলনের ওপর তিনি যে লেখাটা লিখলেন, তা প্রামাণ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। সাহিত্য, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান এবং নানা বিচিত্র ধরনের উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। গড়ে তুলেছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের একটা আস্ত ছবি! এবং সেই আন্দোলন কতভাবে বিভক্ত ছিল, কত ধরনের প্রবণতা ছিল তার অন্তরালে– তাও দেখিয়েছিলেন সুমিত সরকার। এটা ১৯৭৩ সালের কথা। তখন আমরা প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র।

zoom
সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের সঙ্গে তাঁর দার্শনিক পার্থক্যেরস্মারক ছিল এই দু’টি বই

পরে, নিম্নবর্গের ইতিহাসের দিকে যখন তাঁর ঝোঁক– যার কথা আগে অনেকেই বলেছিলেন, কিন্তু লেখেননি কেউ, এক সময় আপন গরজেই সুমিত সরকার ও তাঁর সমসাময়িকরা এই ইতিহাস লিখতে হবে, অনুভব করেছিলেন। অনুভব করেছিলেন যে, সাধারণ মানুষের ইতিহাস লিখতে গেলে মধ্যবিত্ত, উচ্চবর্গীয় মানুষদের যে ধ্যান-ধারণা– এই গতানুগতিক বৃত্তের বাইরে থেকে দেখতে হবে বিষয়টাকে।

যদিও একথাটা শেষ পর্যন্ত সুমিত সরকার কতটা মানতেন, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। পরে ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ ওই মূল ইতিহাস চর্চা ছেড়ে যখন টেক্সচুয়াল অ্যানালিসিস, কালচারাল স্টাডিজের দিকে ঝুঁকল, দেখা যাবে সুমিত সরকার তখন আবার ফিরে আসছেন মূলস্রোতের ইতিহাসে। তখন সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের সঙ্গে তাঁর কতকগুলো দার্শনিক পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, যেটা দুটো বইয়ের মধ্যে খুব স্পষ্ট। সেই দুই বই– ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’ (২০০৫ ) এবং ‘বিয়ন্ড ন্যাশনালিস্ট ফ্রেমস’ (২০০২)।

zoom
শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত থেকেও পেয়েছিলেন উপাদান

এই বইগুলিতে সুমিত সরকার কাস্ট নিয়ে লিখছেন, কলকাতার শহর নিয়ে লিখছেন, গুরুত্ব দিচ্ছেন সামাজিক ইতিহাসকে। তার ফলে ইতিহাসের ব্যাপ্তি বেড়ে যাচ্ছে অনেকটাই। ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’-তে ‘কথামৃত’র বিশ্লেষণ করছেন তিনি। সুতরাং, ‘কালচারাল হিস্ট্রি ’র দিকে তিনি অবশ্যই ঢুকছিলেন, তবে এই ‘কালচারাল হিস্ট্রি’ আদৌ ‘কালচারাল স্টাডিজ’ নয়। কালচারাল হিস্ট্রির একটা মেটেরিয়ালিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, কনটেক্সট আছে, রয়েছে একটা গূঢ় বাস্তব ভিত্তিও– সেই দিকেই সুমিত সরকারের দৃষ্টি পড়েছিল। উনি খুব স্পষ্টভাবে সেটা নির্দেশ করে গিয়েছেন, লিখে গিয়েছেন।

zoom
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাজ ইতিহাস চর্চায় সাময়িক বদল এনেছিল

পার্থ চট্টোপাধ্যায় কালচারাল স্টাডিজের দিকে ইতিহাস চর্চাকে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আশানুরূপ হয়নি। ওঁর প্রথম ঐতিহাসিক প্রবন্ধের বই ‘বেঙ্গল (১৯২০-১৯৪৭) দ্য ল্যান্ড কোশ্চেন’–  তার সঙ্গে সুমিত সরকার যে পদ্ধতিতে স্বদেশি আন্দোলনের বিচার করছেন, কিংবা সেসময়ে যাঁরা গ্রামীণ ইতিহাসের চর্চা করছেন (বিনয় চৌধুরীর মতো কেউ কেউ)– তাঁদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য কিন্তু ছিল না। পার্থ চট্টোপাধ্যায় পরে ভূমিজ সংস্কৃতি ও সেখানে বিদেশি শিক্ষার ছোঁয়ায় কী ধরনের কৃত্রিমতা প্রবেশ করেছিল– তা নিয়ে অনেক লিখেছেন। দীপেশ চক্রবর্তীর লেখা ‘প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ’-এও দেখা যাচ্ছে যে, আমরা ইউরোপকে আমাদের মতো করে গ্রহণ করছি। ইউরোপের দিকে ঝুঁকতে গিয়ে দেশজ শিক্ষা, ইতিহাস, সংস্কৃতিকে একটা পর্যায়ে হয়তো খানিক অমর্যাদাই করেছি। কিন্তু যখন আমাদের সেই চেতনাটা এসেছে, তখন আমরা দুই সংস্কৃতির মধ্যে একটা সেতুবন্ধনের চেষ্টা করেছি। দীপেশও করেছেন। যদুনাথ সরকারের ওপর দীপেশ চক্রবর্তীর যে বই, তা একটা ইতিহাসেরই বই– ‘বায়োগ্রাফি অব আ গ্রেট হিস্টোরিয়ান’।

zoom
দীপেশ চক্রবর্তীর কাজের ধরন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মধ্যে সেতু গড়ে দিয়েছিল

সুতরাং, ইতিহাসে নানা ধরনের মতের উত্থান ঘটে, নানা ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়, দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক থাকে। কিন্তু একটি মৌলিক একাত্মতাও থাকে ঐতিহাসিকদের। এঁরা প্রত্যেকেই মনে করছেন যে, একটা সেক্যুলার হিস্ট্রি দরকার। ইতিহাস আসলে মানুষের জীবন নিয়ে কারবার করে। শুধুমাত্র স্বপ্ন নিয়ে কারবার করে না; জীবন, স্বপ্ন– সব মিলিয়েই ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি। ইতিহাসে যেরকম একটা আদর্শের বিশ্লেষণ প্রয়োজন, সেরকম বাস্তব জীবনেরও বিশ্লেষণ জরুরি।

ইতিহাসবিদদের মতপার্থক্য অনেক সময়ই ঘটে, সেই তফাতটা প্রফেশনাল হিস্ট্রিতে আকছার ঘটছে। অমলেশ ত্রিপাঠী একটু মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে ছিলেন, তাই বলে কি অমলেশ ত্রিপাঠী স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে কিছু বলেননি? কেমব্রিজ স্কুলের ইতিহাসবিদরা যখন সাতের দশকে আমাদের ঐতিহাসিক মহল দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁরা বলছেন যে, ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকারীদের কোনও মতাদর্শই ছিল না, তাঁরা স্বার্থের প্রকোপে রাজনীতি করতেন। একরকমভাবে তো ওঁরা ঠিক কথাই বলেছিলেন! আমরা যে রাজনীতি দেখছি, সেখানে স্বার্থ, ব্যক্তি-স্বার্থ, গোষ্ঠী-স্বার্থ– এগুলোর ভূমিকা প্রবল। কিন্তু তাই বলে কি মতাদর্শের কোনও স্থান ছিল না? এই নিয়ে জমে উঠেছিল বিতর্ক। সাতের দশকে সুমিত সরকার, অমলেশ ত্রিপাঠী– প্রত্যেকেই ওই মতের বিরুদ্ধে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু এঁদের বিরোধী অবস্থানের মধ্যেও পার্থক্য আছে। অমলেশ ত্রিপাঠী সেভাবে কোনও মার্কসবাদী শ্রেণিকে অত গুরুত্ব দিচ্ছেন না, মতাদর্শকে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন। সুমিত সরকারের মতাদর্শের পার্থক্য কিংবা বৈচিত্রের মধ্যে যে শ্রেণিগত ভিত্তি রয়েছে, সেখানে শ্রেণি এবং চেতনা– দুয়ের মধ্যে একটা সাজুয্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কারণ উনি মার্কসবাদী ছিলেন, তঁার কাছে শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যাঁরা মার্কসবাদী নন, তাঁরা অতটা শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণ করছেন না। কিন্তু তাই বলে যখন জাতব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সাতের দশক থেকে, তখন কি শ্রেণি ছাড়া জাতব্যবস্থা আলোচনা হয়নি?

২১ শতকের গোড়ায় সুমিত সরকার যখন ‘বিয়ন্ড ন্যাশনালিস্ট ফ্রেমস’ বা এই জাতীয় বইগুলো লিখছেন, তখন কাস্ট নিয়ে লিখছেন। কিন্তু কাস্টকে কি ক্লাসের বাইরে দেখছেন? না। বরং কাস্ট-ক্লাসের মধ্যে যে একটা সূক্ষ্ম ও বহুস্তরীয় সম্পর্ক রয়েছে, একটা জটিল টানাপোড়েন রয়েছে– তা বোঝার চেষ্টা করছেন। সুমিত সরকার যখন বাংলার নবজাগরণের ওপর যখন লিখছেন, তখন তিনি ওই মার্কসীয় পথেই যাচ্ছেন।

zoom
অমলেশ ত্রিপাঠীর ঐতিহাসিক দৃষ্টি ছিল ভিন্ন

পরে, যখন সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের দিকে হাঁটা দিলেন সুমিত সরকার তখন ‘ক্লাস’ জায়গায় ‘কমিউনিটি’ গুরুত্ব পেতে শুরু করল। একইসঙ্গে ক্লাস ও কমিউনিটির পারস্পরিক যে জটিলতা, তা নিয়ে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। কাস্ট নিয়ে যে আলোচনাটা তিনি করেছেন ‘বিয়ন্ড ন্যাশনালিস্ট ফ্রেম’-এ কিংবা ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’-তে, সেখানে এই জটিলতা দেখতে পাওয়া যাবে স্পষ্ট করেই।

সুতরাং, ভারতে বামপন্থী কিংবা মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চার একরকমের রূপান্তর ঘটেছে। অমিয় বাগচী মার্কসবাদী ছিলেন, কিন্তু অমিয় বাগচীর ‘প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’ তো একটা জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক ইতিহাসের অঙ্গ। সেখানে একদল মার্কসবাদী জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের অংশীদার। একদল মার্কসবাদীকে আবার বৈপ্লবিক রাজনীতির দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। এবং সেই মার্কসবাদী চেতনা থেকেই তো নিম্নবর্গের ইতিহাসের উত্থান।

zoom
ক্লাস ও কমিউনিটির পারস্পরিক জটিলতা ধরা দিয়েছে ইতিহাসের আয়নায়

একদল ঐতিহাসিক ভাবতে শুরু করলেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক মার্কসবাদী পথ ভারতে ব্যর্থ হয়েছে। তখন তাঁদের দৃষ্টি গেল ওই সমস্ত আন্দোলনের দিকে– যেখানে সংগঠিত রাজনীতির বৃত্তের বাইরে কৃষক-শ্রমিক নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলেছিল। এই যে সংগঠন, এর মধ্যে মার্কসবাদী স্বপ্ন বা শিক্ষা কি মিশে ছিল না একটুও? খুব কি দূরত্ব রয়েছে মার্কসবাদী পথ থেকে? তা নয়। ইমোশন হিসেবে তা তো রয়েইছে।

zoom
অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চায় অমিয়কুমার বাগচির অবদান অপরিসীম

এখানেই মূল কথাটা– মার্কসবাদ তো শুধুমাত্র একটা ‘টেকনিক্যাল অ্যানালিসিস’ নয়, তার সঙ্গে ‘ইমোশন’ জড়িয়ে আছে। একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, ব্রাহ্ম আন্দোলনের সময় তার একটা বড় অংশ বাংলায় মার্কসবাদী পথের দিকে যাচ্ছিল। কেন যাচ্ছিল? কারণ রক্ষণশীল সমাজের যে নানারকম প্রতিবন্ধকতা ছিল স্বাধীনতার পথে, তা অতিক্রম করার জন্য মার্কসবাদ মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল। অন্যদিকে ব্রাহ্ম আন্দোলনের যাঁরা প্রবক্তা, তাঁরাও মনে করছে যে, ওই উপনিষদের পথ পরিহার করে এখন আমরা যদি এই পথে যাই, তাহলে তার মধ্যে কোনও দোষ নেই। ভেবে দেখুন, জীবন উপান্তে এসে রবীন্দ্রনাথের মনেও ধর্ম সম্বন্ধে নতুন চিন্তা এসেছিল। এবং অনেকে ভেবে থাকেন যে, উনি অনেকটা নিরীশ্বরবাদী পথের দিকেই হয়তো যাচ্ছিলেন। এ সম্বন্ধে কোনও স্থির সিদ্ধান্ত সম্ভব নয়।

zoom
শেষ জন্মদিনের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ(১৯৪১); ছবি: শম্ভু সাহা

মনে রাখতে হয় ‘ইউরো-কমিউনিজম’-এর কথাও। যা একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল ক্লাসিক্যাল মার্কসিজমে। সেজন্য এক সময়ে হল কী, মার্কসবাদী পথ যাঁরা অনুসরণ করছেন, তাঁরা কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দিলেন ব্রিটেনে। ক্রিস্টোফার হিল, ই.পি. থম্পসন– এঁরা। সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরির ইনভেশনের পরে। তেমনই প্রতিষ্ঠিত মার্কসবাদীদের, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সম্বন্ধে একটা বীতরাগ এসে গিয়েছিল সুমিত সরকারের। মনে পড়ে, একদিকে নন্দীগ্রামের আন্দোলন চলছে। তার বেশ আগেই উনি রবীন্দ্র পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওঁর বই ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’-র জন্য। তিনি কিন্তু সেই রবীন্দ্র পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে স্পষ্টতই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যে অবস্থান ছিল, তা তিনি মানতে পারেননি। প্রায়োগিক দিক থেকে নানা প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর মনে।

zoom
নন্দীগ্রামের ঘটনা গভীর প্রভাব ফেলেছিল সুমিত সরকারের মনে

সুতরাং, এই যে ইতিহাসের ও ইতিহাস বিচারের বহুমাত্রিকতা ও বৈচিত্র– এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি বিচার করি, তাহলে যাঁদের আমরা ‘মার্কসীয় ঐতিহাসিক’ বলছি আর যাঁদের ‘নন-মার্কসিস্ট’ বলছি– তাঁদের মধ্যে কতকগুলো জায়গায় দেখতে পাব ‘কমন পয়েন্টস’‌ রয়েছে। মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরাও ‘জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক’ ছিলেন। অমিয় বাগচীর ‘প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট’ একটা দৃষ্টান্ত, এরকম দৃষ্টান্ত আরও রয়েছে। বিপন চন্দ্র– উনি মার্কসিস্ট না হলেও মার্কসবাদীরা মনে করতেন উনি তাঁদেরই একজন সহযোদ্ধা। রামশরণ শর্মার ক্ষেত্রেও তা সত্য, তবে যেভাবে অমিয় বাগচী মার্কসবাদী ছিলেন, রামশরণ সেরকম নন।

zoom
দুই ইতিহাসবিদ– বিপন চন্দ্র ও রামশরণ শর্মা

ইউরোপে সাবঅল্টার্ন ইতিহাস লেখার যে আগ্রহ, তা সাতের দশক থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেটাকে ওরা বলছে ‘হিস্ট্রি ফ্রম দ্য বটম আপ’, ‘হিস্ট্রি ফ্রম বিলো’। সেটা ইপি থম্পসনের ক্লাসভিত্তিক ‘হিস্ট্রি ফ্রম বিলো’ নয়। অনেকেই যাঁরা শ্রমিক ইতিহাসের চর্চা করেছেন ইউরোপে, তাঁরা বলছেন যে, সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণিই যে সবসময় মুক্তিকামী, তা নয়। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে মুক্তমন কতটা আছে, তা বিচার করতে গেলে স্বগৃহে তাঁরা কীরকমভাবে থাকেন, সেটাও দেখতে হবে। একজন সংগঠিত শ্রমিক নেতা খুব একটা অত্যাচারী স্বামীও হতে পারেন। জেন্ডার স্টাডিজের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নটা অন্যরকম হয়ে যায়।

zoom
জেন্ডার স্টাডিজের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের চর্চা

ইতিহাসের এই অমোঘ বৈচিত্র সম্বন্ধে সুমিত সরকার সচেতন ছিলেন। ‘স্বদেশি মুভমেন্ট অব বেঙ্গল’ লেখার পর, সমগ্র ভারতের দিকে তাকিয়েছিলেন এই ইতিহাসবিদ। লিখেছিলেন ‘মডার্ন ইন্ডিয়া’। ইতিহাসের বৈচিত্র কী হতে পারে, এই বইটাই তার আস্ত প্রমাণ। খানিক পরে, বাংলার ইতিহাসেও ফিরে আসছেন তিনি– ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’-তে। বরাবর বিষয় ও বহুমাত্রিকতার সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন নিজেকে। আর তা করেছেন বলেই আমাদের মতো যাঁরা– যাঁরা অত উচ্চ মাপের ঐতিহাসিক নই, সাধারণ ইতিহাসের মাস্টারমশাই, আমরা, সুমিত সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত পাই। যে ইঙ্গিতময় সম্ভাবনা থেকে শুরু হতে পারে ইতিহাসের নতুন অভিযাত্রা।

   সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক অনুলিখন

Amalesh Tripathy Amiya Kumar Bagchi Bipan Chandra Colonial Bengal colonial india Cultural Studies Dipesh Chakrabarty Gender Studies Historiography History Marxist Historian nandigram Partha Chatterjee Rabindranth Tagore Ramakrishna ramakrishna kathamrita Ramsharan Sharma Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Subaltern studies Sumit Sarkar Tradition

Share this article on