Robbar

মৃণালের অঞ্জন, অঞ্জনের মৃণাল

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 23, 2026 7:49 pm
  • Updated:July 23, 2026 7:49 pm  

গদার বলেছিলেন, ‘আলোকচিত্র সত্য। সিনেমা সেকেন্ডে চব্বিশবার সত্য।’ ছদ্মবেশের ভ্রান্তিবিলাসই কি সেই সত্য? ‘ওডিসি’তে লুপিতা নিয়ঙ-ও, গ্রিক হেলেনের চরিত্রে তাঁকে মানায় কি না– অভিনেত্রীর সুদক্ষ উপস্থাপনায় সে-তর্ক নস্যাৎ করেছেন। ঐ সত্যের মর্মবাণী কি তবে আরও গভীরে, মনের মধ্যে, বোধের মধ্যে, যে ‘চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুণি উঠল রাঙা হয়ে’? সাতাশ বছর বয়সী অঞ্জনের দৃষ্টি নিয়ে সেইভাবেই বয়স্ক মৃণাল সেনের আবির্ভাব।

অনমিত্র বিশ্বাস

–‘তুমি কম্যুনিস্ট?’

প্রশ্নটা দুই জায়গায় করেছিল। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’তে সিদ্ধার্থ ইন্টারভিউ প্যানেলকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিয়েছিল, ‘আমার মনে হয় না ভিয়েতনাম দ্বারা মুগ্ধ হতে গেলে কম্যুনিস্ট হতে হয়।’ সম্পাদক উৎপল দত্তর সেক্রেটেরিয়াট টেবিলের উল্টোদিকে বসে ফরমায়েশি লেখার ডেডলাইন ফেল করা অঞ্জনের মুখে প্রত্যুত্তর জোগায়নি। কলকাতার নিম্ন-মধ্যবিত্ত সমাজের ‘চালচিত্র’ আঁকতে গিয়ে তার মাথায় ঘুরে-ফিরে পাক খেয়ে গিয়েছিল উনুনের ধোঁয়া। উঠোনে-উঠোনে। পথের ধারে দোকানে। কয়লার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া। সুখী বাতানুকুল ঘরে ফুসফুস আর চোখকে বিব্রত করা ধোঁয়া। কলকাতার ভাড়াবাড়ি-কণ্টকিত অলিতে-গলিতে দুটো চাল ফোটাবার আয়োজন।

‘চালচিত্র’ ছবির একটি দৃশ্যে অঞ্জন দত্ত ও গীতা সেন

অঞ্জন (‘চালচিত্র এখন’ ছবিতে অল্টার-ইগো ‘রঞ্জন’ নামে উপস্থাপিত) মৃণাল সেনকে স্পষ্ট বলেছিল, ‘আমি কম্যুনিস্ট হতে পারব না।’ কিন্তু তাই বলে সে মৃণাল সেনের দলের আড্ডাটাও ছাড়তে পারবে না। সে কি তার মতো করে সেই মেলার সদস্য হতে পারে?

পারবে না কেন? গোল্লায় যাক মাও-ৎসে-তুং, মৃণাল সেন তো ফ্যাসিস্ট নন।

গুরুর কাছে অঞ্জন দত্ত এইটা নিয়েছেন। তাঁর এত ছবিতে এত গভীর সামাজিক আলোচনা, কোথাও কোনও মতাদর্শের প্রক্ষেপ নেই। মৃণাল সেনও এতদূর নির্লিপ্ত হতে পারেননি। অঞ্জন দত্ত পেরেছেন। গুরু-মারা বিদ্যা যাকে বলে।

‘চালচিত্র এখন’ ছবির শুটিং-এ

মৃণাল সেনের ছবিতে অঞ্জন দত্ত সেই যুগের উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাঙালি তরুণের ভূমিকায় কতবার, কতভাবে। যারা দুনিয়াটাকে জেনেছে, শুনেছে। বুঝবার তাগিদ বোধ করেনি। বিপথচালিত বিদ্রোহের প্রতি তারা বীতশ্রদ্ধ। রাজনৈতিক মতামত, সমাজনৈতিক মতামত থাকলেও তারা তা জাহির করতে ভালোবাসে না। তারা আপনার মধ্যে সংকুচিত, অন্তর্মুখী।

কিন্তু কোথাও মৃণাল সেন তাঁর protégé-কে গোষ্ঠীতান্ত্রিকের ভূমিকায় নিক্ষেপ করেননি।

অঞ্জন দত্ত, মৃণাল সেন হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি। সিনেমার পর্দায় যদি মৃণাল সেনের বিশ্লেষণ করবার ইচ্ছা থাকত, হয়তো তিনি নিজে সেই ভূমিকায় অভিনয় করতেন না। ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’তে তাঁর বাবার ভূমিকায় তিনি অভিনয় করেছিলেন। বাবার সঙ্গে প্রায় তাঁর কোনও মিলই নেই। তিক্ততা যে কিছু ছিল দো-তরফা, ছবিতে তা দেখানো হয়েছে। কিন্তু অন্তঃসলিলা অনুভূতিও ছিল, যার আঁজলা ভরে ওই ছবিটি, ঐ অভিনয়টি অঞ্জনের আপন ভাষায় তর্পণ। ‘চালচিত্র এখন’ও তাই।

একালে জীবনী-নির্ভর ছবিতে প্রতিবিম্বের চেয়ে প্রতিকৃতির দিকে জোর দেওয়া হয় বেশি। এমনকী ‘গুমনামী’র প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মেকআপ-নেওয়া ছবি আর নেতাজির মূল প্রতিকৃতির মধ্যে একজন পোর্ট্রেট-আঁকিয়ে ও তাঁর দর্শকেরা গুলিয়ে ফেলেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, পোর্ট্রেটটা টাঙানো ছিল প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির দফতরে, সেই নিয়ে যত শোরগোল। বাচনভঙ্গিতে মৃণাল সেনের কিছুটা আভাসের মধ্যেও এই ছবিতে অঞ্জন দত্তর স্বাক্ষর স্পষ্ট চেনা যায়।

তাই অভিনেতার ক্যানভাস রঙিন হয়ে উঠেছে অঞ্জনের চোখে ‘মৃণালদা’র যে প্রতিফলন হয়েছিল, তাই দিয়ে। সম্পূর্ণ মানুষটাকে নয়, বরং তাঁদের নিবিড় গুরু-শিষ্যের সম্পর্কটিকে অঞ্জন দত্ত তুলে ধরতে চেয়েছেন। তা ছাড়া, তাঁর থেকে ভালো করে মৃণাল সেনকে আর ক’জন চিনতেন? মৃণাল সেনের ভূমিকায় তাঁর মেকআপের দরকার কী? রামের ভূমিকায় মদ্যপ গিরীশ ঘোষের পরচুলা গেছে খসে। দর্শকাসন থেকে কোনও শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করালে, নাট্যাচার্য ধমক দিয়ে উঠলেন, ‘ওরা গিরীশ ঘোষের পরচুলা দেখতে আসেনি, অভিনয় দেখতে এসেছে!’

গদার বলেছিলেন, ‘আলোকচিত্র সত্য। সিনেমা সেকেন্ডে চব্বিশবার সত্য।’ ছদ্মবেশের ভ্রান্তিবিলাসই কি সেই সত্য? ‘ওডিসি’তে লুপিতা নিয়ঙ-ও, গ্রিক হেলেনের চরিত্রে তাঁকে মানায় কি না– অভিনেত্রীর সুদক্ষ উপস্থাপনায় সে-তর্ক নস্যাৎ করেছেন। ঐ সত্যের মর্মবাণী কি তবে আরও গভীরে, মনের মধ্যে, বোধের মধ্যে, যে ‘চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুণি উঠল রাঙা হয়ে’? সাতাশ বছর বয়সী অঞ্জনের দৃষ্টি নিয়ে সেইভাবেই বয়স্ক মৃণাল সেনের আবির্ভাব।

ছেলের বন্ধুরা মৃণাল সেনকে ‘মৃণালদা’ বলে ডাকতেন। মৃণাল সেন বুড়ো হতে চাননি। তিনি নবীনের চোখ দিয়ে ঘুরে-ফিরে কলকাতাকে বারবার দেখে, বারবার শহরটার প্রেমে পড়তে চেয়েছেন। মৃণাল সেনের শিষ্যত্বে অঞ্জন দত্ত এই ধাতটিও রপ্ত করেছেন। তিনিও বুড়ো হবেন না। ৭০ বছর বয়স হলেও বুড়ো হবেন না। বস্তুত, সুমন ‘চল্লিশ পেরোলেই চালশে’র অপেক্ষায় থাকুন, অঞ্জন চল্লিশ পেরিয়েই বয়সের বালিঘড়ি উল্টে দিয়েছেন। সুকুমারের সুকুমার মনন নিয়ে, আবহমানের নতুনত্বে তাঁর ঝোঁক।

অঞ্জনের মৃণাল

‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’তে মুসলমান দর্জি জামার মাপ নিচ্ছে, আর পক্ককেশ পিতামহ নাতির সঙ্গে শূকরমাংস রান্নার পরামর্শ করে বেচারাকে বিড়ম্বিত করছেন। জানি, এতে বিদ্বেষ বা সংঘাতের লেশমাত্র নেই। খোঁচা দেবার একটা নির্মল ছেলেমানুষি। ইলিশের গন্ধ আমার সহ্য হয় না বলে তুতো দাদারা ক্ষ্যাপাত, ‘তুই ফ্যামিলির ব্ল্যাক শিপ, নির্ঘাৎ মোহনবাগানের সাপোর্টার।’ সেইরকম।

অঞ্জন দার্জিলিঙের বোর্ডিং স্কুলের হস্টেলের বয়স পেরবেন না ঠিক করেছেন। ভালোই করেছেন। প্রবীণ দার্শনিকের তো অভাব নেই। ভারি ভারি বিষয়ে ফোড়ন কাটা তাঁদের ব্যবসা। অমিত রায় বলেছিলেন, ‘কবিমাত্রের উচিত পাঁচ-বছর মেয়াদে কবিত্ব করা, পঁচিশ থেকে ত্রিশ পর্যন্ত।’ অঞ্জনের গান গুনগুন করতে করতে না-হয় ‘আরো কত ছেলে-মেয়ের বয়স বেড়ে যাবে, আরো কত দিনের অবসান’। চ্যাপ্‌টা গোলাপ হাতে অঞ্জন তাঁর ছেলেমানুষি গানে, সংলাপে বাংলা ভাষার ধূসরত্বের গ্লানি মুছে দিতে থাকুন।