


মোগল সম্রাট আকবর ছিলেন কৌশলপ্রিয় মানুষ। তাঁর আমলে দাবা খেলার নাম ছিল ‘চতুরঙ্গ’। তাঁর রাজপ্রাসাদের মেঝেতে রঙিন পাথর গেঁথে গেঁথে তৈরি করা হয়েছিল বিশাল চতুরঙ্গের ছক। কখনও কখনও সেই ছকের ওপর জীবন্ত মানুষকে ঘুঁটি হিসেবে দাঁড় করিয়ে তিনি মানব চতুরঙ্গের খেলা উপভোগ করতেন। সেই একই কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এবার দেখা যাক, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’র কোন চরিত্রকে তিনি কোন ঘুঁটির মতো চেলেছিলেন।
সম্রাট আকবর যে কৌশলে দাবা খেলতেন, সেই পথেই হেঁটেছিলেন সত্যজিৎ ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’র চিত্রনাট্য লেখার সময়। তাই তাঁর এই ছবিতে সব চরিত্রকেই তিনি দাবার ঘুঁটির নিয়ম মেনে চালনা করেছেন। এটাই আশ্চর্য! লর্ড ডালহৌসি থেকে শুরু করে দুই দাবাড়ু পর্যন্ত সব চরিত্রই দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠেছিল সত্যজিতের কলমের ডগায়। মাত্র একটি চরিত্র দাবার ঘুঁটির নিয়ম ভেঙেছিলেন। তিনি হলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্। আর কী আশ্চর্য, নিয়ম ভাঙার পরদিনই তাঁর পতন হয়েছে।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, নবাব ওয়াজিদ আলি কোন নিয়মটা মানতে রাজি হননি? কী সেই নিয়ম?
আর অন্য সব চরিত্র দাবা খেলার কী কী নিয়ম মেনে চলেছিলেন?
এই সমস্ত প্রশ্নের জবাবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ ছবিটার জাদু।

তার আগেই অবশ্য বলে নেওয়া দরকার, সম্রাট আকবরের দাবা খেলা কী কী কারণে অন্যরকম ছিল!
সম্রাট আকবরের দাবা
মোগল সম্রাট আকবর ছিলেন কৌশলপ্রিয় মানুষ। তাঁর আমলে দাবা খেলার নাম ছিল ‘চতুরঙ্গ’। তাঁর রাজপ্রাসাদের মেঝেতে রঙিন পাথর গেঁথে গেঁথে তৈরি করা হয়েছিল বিশাল চতুরঙ্গের ছক। কখনও কখনও সেই ছকের ওপর জীবন্ত মানুষকে ঘুঁটি হিসেবে দাঁড় করিয়ে তিনি মানব চতুরঙ্গের খেলা উপভোগ করতেন।

খেলোয়াড়ের নির্দেশ অনুযায়ী প্রত্যেকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে হেঁটে চলে যেত। ফলে পুরো খেলাটি রূপান্তরিত হত এক জীবন্ত দৃশ্যে।
এই অভিনব খেলা আকবরের চিন্তাধারার একটি দিক আমাদের সামনে তুলে ধরে। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন সাহসী সেনাপতি ছিলেন, তেমনই ছিলেন বিচক্ষণ কূটনীতিবিদ। তিনি বহু যুদ্ধ করেছেন সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য। আবার অনেক সময় দূরদর্শিতা, আলোচনা ও কূটনৈতিক দক্ষতার সাহায্যে রক্তপাত এড়িয়েও গেছেন। তাঁর কাছে শক্তি ও বুদ্ধি– দু’টিই ছিল শাসনের কৌশল।
চতুরঙ্গের খেলাতেও একই ভাবনা দেখা যায়। এখানে প্রতিটি চাল আগে থেকে ভেবে নিতে হয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেমন পুরো খেলাকে বদলে দিতে পারে, তেমনই জয়ের পথ খুলে দেয় একটি বিচক্ষণ চাল। বাস্তব রাজনীতিও অনেকটা এমনই। একজন শাসককে কখন শক্তি প্রয়োগ করতে হবে, আর কখন ধৈর্য, আলোচনা ও কৌশলের পথ বেছে নিতে হবে– সেই বিচারই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে। মনোবিজ্ঞানী ড্যাচার কেল্টনার বলেছেন, ‘ক্ষমতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল অন্য মানুষের কাজ, সিদ্ধান্ত ও আচরণকে প্রভাবিত করার সামর্থ।’ [দ্য পাওয়ার প্যারাডক্স: হাউ উই গেইন অ্যান্ড লুজ ইনফ্লুয়েন্স, ২০১৬]
তাই মানব চতুরঙ্গ কি শুধুই একটি রাজকীয় বিনোদন?
একজন শাসকের কৌশলপ্রিয় মন, কল্পনাশক্তি এবং যুদ্ধ ও কূটনীতি জুড়ে জুড়ে তৈরি হয়েছিল আকবরের খেলার কৌশল।
সেই একই কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এবার দেখা যাক, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’র কোন চরিত্রকে তিনি কোন ঘুঁটির মতো চেলেছিলেন।
লর্ড ডালহৌসি– দাবার ঘোড়া
চতুরঙ্গ থেকে আজকের দাবা– খেলাটির এই বিবর্তন হাজার বছরের। কিন্তু একটি ঘুঁটির চাল প্রায় একই রয়ে গেছে। সেটি হল ঘোড়া। সেই সময়, দাবার অন্য কোনও ঘুঁটি সামনের ঘুঁটিকে টপকে যেতে পারত না। কিন্তু ঘোড়া পারত।

একটি দার্শনিক ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে ঘোড়ার চালে। জীবনের সব পথ সোজা নয়। বড় লক্ষ্য পূরণ করতে পরিচিত পথের বাইরেও যেতেই হয়। খুঁজতে হয় নতুন পথ। দাবার ঘোড়া তাই নিয়ম ভাঙার প্রতীক নয়। একই নিয়মের মধ্যে থেকেও বিকল্প চিন্তার প্রতীক।
রাজনীতির মাঠে হামেশাই দেখা যায় এমন ঘটনা। চোখের পলকে বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি। তখন বিলেত থেকে আসা নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করলে কলকাতার রাজভবনের বাসিন্দা বড়লাটের সুবর্ণ সুযোগটাই হারিয়ে যাবে। তাই স্থানীয় শাসক, মানে বড়লাট, নিজস্ব বিচারবুদ্ধির ওপর নির্ভর করতেন বহু সময়। হয়তো বাধ্য হয়েই। কিংবা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জন্য।
অবশ্য এই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে, সাফল্য আর ব্যর্থতা দুটোই আসতে পারে। তাই ভারতের সব ইংরেজ বড়লাটের জীবনেই ঝুঁকি আর দায়িত্ব জড়িয়ে থাকত একসঙ্গে।
‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ ছবিটার কথা উঠলেই, সবসময় ১৮৫৬ সালের একটি ঘটনা আলোচনায় উঠে আসে। সেই সময়, ইংল্যান্ড থেকে সমুদ্রপথে, অনেকগুলো পাল-তোলা জাহাজে চড়ে, ভারতে খবর পৌঁছতে মাস দেড়েক পেরিয়ে যেত। সমুদ্রে ঝড় উঠলে তো কথাই নেই। অগত্যা ভারতের গভর্নর জেনারেল বহু জরুরি সিদ্ধান্ত নিজেই নিতেন। কী রকম সিদ্ধান্ত?

লর্ড ডালহৌসি যখন অযোধ্যা (আওধ) রাজ্যটিকে লাল চেরি ফলের মতো গিলে খাবার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে সিংহাসনচ্যুত করার ফন্দি আঁটতে শুরু করলেন, ঠিক তক্ষুনি তিনি হয়ে উঠলেন দাবার ঘোড়া। কেন? কীভাবে?
বিলেতের মহারানি আর তাঁর মন্ত্রীদের প্রায় সবারই মাথার উপর দিয়ে উনি টপকে গেলেন ঘোড়ার মতোই। দাবার ঘোড়ার নিয়ম তো এটাই। সুতরাং উনি অফিসের নিয়ম বা ভদ্রতার রীতি না মানলেও, দাবার নিয়ম মানলেন অক্ষরে অক্ষরে। বড়লাট ডালহৌসির স্বভাবের এই দিকটাকে বিরাট গুরুত্ব দিয়ে দেখালেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর চরিত্রের অন্য সব দিক রেখে দিলেন আড়ালে। তাই বলছিলাম, সত্যজিৎ নিজেই হাতে কলম তুলে নিয়ে দাবা খেলতে লাগলেন ইতিহাসের জীবন্ত চরিত্রদের নিয়ে। জীবন্ত মানুষকে নিয়ে ঠিক এভাবেই চতুরঙ্গ খেলতেন সম্রাট আকবর।
সত্যজিৎ রায় মনে করতেন, ডালহৌসির এই ঘটনাটা লন্ডনে কেন্দ্রীভূত রানির ক্ষমতা ও কলকাতায় বড়লাটের ক্ষমতার মধ্যে গোপন অথচ ভীষণ টানাপোড়েনের চমৎকার একটা দৃষ্টান্ত। একথা আমায় বলেছিলেন আমার মাস্টারমশাই, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’র সিনেমাটোগ্রাফার সৌম্যেন্দু রায়!
তবে একটাই কথা। দাবার ছকে একটি চাল শুধু খেলার হারজিত নির্ধারণ করে। কিন্তু ইতিহাসে এইরকম ঘোড়া-মার্কা সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকেই আমূল পালটে দেয়। তাই ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’তে ডালহৌসি-রূপী ‘ঘোড়ার চাল’ শুধু কৌশলের গল্প নয়। দায়িত্বজ্ঞানহীনতারও গল্প।
লর্ড জেমস উট্রাম (রিচার্ড অ্যাটেনবরো)– দাবার পেয়াদা
১৮৫০ দশকে, লক্ষ্ণৌয়ের নবাবি দাবা ও ইংরেজি দাবার মধ্যে একটি ছোট কিন্তু গভীর পার্থক্য ছিল। নবাবি দাবায় পেয়াদা বা বোড়ে প্রাচীন চালে মাত্র এক ঘর এগত। কিন্তু ইংরেজি দাবায় পেয়াদা চাইলে শুরুতেই দু’ ঘর এগিয়ে যেতে পারত। ছোট এই নিয়মের স্বাতন্ত্র্য আমাদের ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

এক ঘর করে এগনো মানে ধীরে, সাবধানে এবং প্রতিটি পদক্ষেপ বিচার করে এগিয়ে যাওয়া। লক্ষ্ণৌয়ের নবাবি সমাজে আলোচনা, কূটনীতি এবং ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। তাই পেয়াদার ধীর অগ্রগতিকে দেখা হত নিরুদ্বিগ্ন সেই মানসিকতার প্রতীক হিসেবে।
অন্যদিকে ইংরেজি দাবায় প্রথম চালেই দুই ঘর এগনো যেন নতুন যুগের আত্মবিশ্বাস। দ্রুত উদ্যোগের পরিচয়। উনিশ শতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নতুন অঞ্চল দখল, চটজলদি প্রশাসন গঠন এবং বাণিজ্যের প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছিল। তাই, শুরুতেই দাবার পেয়াদার দু’ ঘর চলার নিয়ম সেই পরিবর্তিত সময়ের গতিশীল মনোভাবের সঙ্গেও খাপ খায় চমৎকার।
সত্যজিৎ রায়ের কলমে আর ক্যামেরায়, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ ছবিতে, লক্ষ্ণৌয়ের ইংরেজ শাসক লর্ড জেমস উট্রাম (রিচার্ড অ্যাটেনবরো) হয়ে উঠেছেন দাবার পেয়াদা। খেলার শুরুতেই দু’ ঘর এগিয়ে যাওয়ার জন্য উনি মুখিয়ে আছেন। নবাবের সঙ্গে দেখা করেই, বড়লাটের সিদ্ধান্ত গড় গড় করে শুধু শুনিয়েই গেলেন। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্ একটিও শব্দ উচ্চারণের সুযোগ দিলেন না। এটাই হচ্ছে ইংরেজি স্টাইলের দাবা খেলার শুরুতেই পেয়াদার দু’ ঘর এগিয়ে চলা। নবাবের সঙ্গে মিটিঙের শুরুতেই উট্রাম এক তরফা এগিয়ে চললেন। নবাব আর তাঁর মন্ত্রীরা পাথর!

আরও একটি কথা ভাবার আছে। নবাবি দাবায় রাজা যেমন একবারে মাত্র এক ঘর চলতেন, তেমনই পেয়াদাও প্রথম চালে এক ঘরই এগত। যেন রাজা আর সাধারণ সৈনিক চলেছেন খেলার একই নিয়ম মেনে। এই মিল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের নেতৃত্ব মানে শুধু হম্বিতম্বি করে ক্ষমতার পরিচয় দেওয়া নয়, সংযমও তার সবচেয়ে মূল্যবান গুণ। সম্রাট এবং সৈনিক– দু’জনেরই এগিয়ে চলার মূল্য নিহিত আছে ধৈর্য ও বিচক্ষণতার মধ্যে।
দাবার ইতিহাসবিদ এইচ. জে. আর. মারের ‘A History of Chess’ (১৯১৩) বইয়ে দেখানো হয়েছে, দাবার নিয়ম যুগে যুগে মানুষের রুচি ও সমাজের প্রয়োজন অনুসারে পাল্টে পাল্টে গেছে। তাঁর একটি মন্তব্য মনে গেঁথে যায়– ‘দাবার নিয়মের পরিবর্তন সমাজের রুচি ও খেলার চাহিদার পরিবর্তনের পরিচয়।’
আজ আন্তর্জাতিক দাবায় সব দেশ একই নিয়ম অনুসরণ করে। তাই এখন কোনও দেশের প্রতিযোগিতামূলক দাবায় পেয়াদা শুধু এক ঘর চলার নিয়ম আর নেই।
নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্ (আমজাদ খান)– দাবার রাজা
চতুরঙ্গ থেকে আধুনিক দাবা পর্যন্ত একটি নিয়ম হাজার বছর ধরে অপরিবর্তিত। রাজা একবারে মাত্র এক ঘর এগতে পারেন। তিনিই কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী নন। অথচ তাঁকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই খেলাও শেষ।

দাবার এই নিয়ম কী শিখিয়েছে আমাদের? রাজার আসল শক্তি তাঁর নিজের হাতের মুঠোয় থাকে না, থাকে তাঁর চারপাশের মানুষ, সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রের ঐক্যের মধ্যে। তাই নিজের ইচ্ছে হলেই রাজা দূরে ছুটে যেতে পারেন না। নিজের ঘরে তিনি ধীরস্থির থাকেন। সমগ্র রাজ্য মিলেমিশে কাজ করে তাঁকে ঘিরে।
পৃথিবীর বহু পুরাণেও দেখা যায় এই একই ভাবনা। দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গের অধিপতি। তবু তিনি বিষ্ণু বা মহাদেবের ঊর্ধ্বে নন। গ্রিক পুরাণে দেবরাজ জিউসও নিয়তির নিয়ম সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারেন না। পুরাণের মধ্যে দিয়েও যেন মানবসভ্যতা বহু যুগ ধরে একটি কথাই বলে চলেছে– শাসকের মর্যাদা বড়। কিন্তু তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন নয়।
১৮৫৬ সালে আওধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাপের মুখে লক্ষ্ণৌ ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। রাজ্য হারালেন। তবু সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুললেন না। দাবার রাজার সেই প্রাচীন শিক্ষা যেন হঠাৎ ভুলে গেলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্।
সংকটের সময় একজন শাসকের প্রথম দায়িত্ব নিজের সিংহাসনের মর্যাদা রক্ষা। কারণ, অনেক সময় রাজার উপস্থিতিই সৈন্যদের সাহস, মানুষের বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখে।

মনস্তত্ত্ববিদরা বলবেন, প্রবল সংকট মানুষের বিচারশক্তিকে অসাড় করে দিতে পারে। তখন আগুয়ান বিপদকে এমন বিভীষিকা মনে হয়, ভবিষ্যতের ভালো কোনও সম্ভাবনা আর দেখাই যায় না। ফলে সংঘাত এড়িয়ে নিরাপদ রাস্তা বেছে নেওয়ার প্রবণতাও তখন জোরালো হয়ে ওঠে। হয়তো নবাব নিজের হাতে রক্ত মেখে কবি ও গায়ক হিসেবে তাঁর যে মর্যাদা, সেটা নষ্ট করতে চাননি।
এবার একটি পরিস্থিতি কল্পনা করুন। যদি ওয়াজিদ আলি শাহ লক্ষ্ণৌর সিংহাসন ছেড়ে না যেতেন, যদি তিনি প্রাসাদেই থাকতেন এবং নিজের সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধের আদেশ দিতেন– তাহলে আওধ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে আরও শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠত। নবাবের উপস্থিতি বহু সিপাহীর মনে নতুন সাহস জাগিয়ে তুলত। আরও সুসংগঠিত হত বিদ্রোহ। আরও দীর্ঘ আর কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হত ইংরেজদের। কখনও কখনও একটি মানুষের স্থির হয়ে বসে থাকা হাজার মানুষের হৃদয়ে ঝড় তুলতে পারে।
দাবার রাজা তিনি দূরে যান না, জোরালো আঘাতও করেন না। তবু তাঁর নীরব উপস্থিতিই সমগ্র খেলার ভারসাম্য রক্ষা করে। সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস যেন বারবার একই কথাই বলে– যে শাসক নিজের সীমা জানেন, তিনিই তাঁর মানুষদের শক্তিকে সবচেয়ে বড় শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারেন।
দুই দাবাড়ু: মির্জা সাজ্জাদ আলি (সঞ্জীব কুমার) ও মীর রওশন আলি (সয়ীদ জাফরি)– দাবার হাতি
ছবির শেষে এমন একটি ঘটনা ঘটিয়ে দেন সত্যজিৎ, যার জন্য আমরা আদৌ তৈরি ছিলাম না। দুই দাবাড়ু হঠাৎ নবাবি নিয়ম ত্যাগ করে ইংরেজি নিয়মে দাবা খেলতে শুরু করেন। কেন?

কারণ, সত্যজিৎ রায়ের কলমে তাঁরা তখন হয়ে উঠেছেন দাবার হাতি। এই ঘুঁটি সবসময় একই রঙের ঘরে আবদ্ধ। সেখানে দাঁড়িয়েই হাতি পুরো বোর্ডের অবস্থা স্পষ্ট দেখতে পায়। বুঝতেও পারে।
দাবার হাতি সবসময় কোনাকুনি চলে। যে রঙের ঘরে দাঁড়িয়ে খেলা শুরু করে, তার রং কখনও বদলায় না। সাদা ঘরের হাতি সারা খেলা জুড়ে শুধু সাদা ঘরেই থাকে। কালো ঘরের হাতিও কখনও সাদা ঘরে যেতে পারে না।
প্রথমে মনে হতে পারে, এটি হাতির সীমাবদ্ধতা। সে বোর্ডের সব ঘরে যেতে পারে না। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার একটি বিশেষ শক্তি। নিজের রঙের ঘরে দাঁড়িয়ে হাতি অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পায়।
এখানেই হাতিকে একটি বিশেষ ধরনের মানুষের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কিছু মানুষ একটি বিষয় নিয়ে এত গভীরভাবে ডুবে থাকে যে অন্য অনেক কিছুর দিকে তাদের মন সহজে যায় না। কেউ সারাদিন দাবা নিয়ে ভাবে। কেউ রহস্য উপন্যাস পড়তে পড়তে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়। কখনও কখনও তাদের পৃথিবীকে ছোট করে দেয় এই গভীর মনোযোগ।
কিন্তু তার অন্য একটি দিকও আছে।
যে মানুষ কোনও একটি বিষয়কে দীর্ঘ সময় ধরে মন দিয়ে দেখে, সে সেই বিষয়ের ছোট ছোট পরিবর্তনও বুঝতে শেখে। তাই পরিবর্তন যখন আসে, সে অনেক সময় অন্যদের চেয়ে দ্রুত বুঝতে পারে কী ঘটছে।

লক্ষ্ণৌর ইতিহাসে আমরা এর একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ দেখতে পাই।
১৮৫৪, ১৮৫৫ এবং ১৮৫৬ সালের লক্ষ্ণৌতে অনেক মানুষ নিজেদের নির্দিষ্ট জগতে গভীরভাবে ডুবে থাকতেন। কেউ কত্থক নৃত্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কেউ রঙিন পায়রা breed করাতেন। কেউ দাবা খেলতেন। তাঁদের জীবনের আনন্দ ও মনোযোগ সীমায়িত ছিল অনেকটাই এই বিশেষ জগতগুলির মধ্যে।
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশরা আওধ অধিগ্রহণ করলে লক্ষ্ণৌর বড় পরিবর্তন এসেছিল নবাবি দুনিয়ায়। সেই সময়ের দাবাড়ুরাও খুব দ্রুত নিজেদের খেলার নিয়ম বদলাতে শুরু করেন। তাঁরা পুরনো নবাবি নিয়ম আঁকড়ে থাকেন না। তাঁরা ইংরেজি নিয়মে দাবা খেলতে শুরু করেন।
এর একটি মূল পরিবর্তন ছিল পেয়াদার প্রথম চাল। আগে পেয়াদা এক ঘর এগত। আর ইংরেজি দাবার নিয়মে পেয়াদা প্রথম চালে এগতে পারত দুই ঘর। ফলে দাবার খেলার গতি হঠাৎ বেড়ে গেল।
এখানেই বৈপরীত্য।
যে মানুষটি নিজের একটি ছোট জগতে বহু দিন নিমগ্ন, পরিবর্তন এলে সে-ই কখনও কখনও চট করে নতুন নিয়ম শিখে নেয়। কারণ সে নিজের বিষয়টি গভীরভাবে জানে। তাই পুরনো আর নতুন নিয়মের পার্থক্য তার চোখ এড়ায় না।
দাবার হাতিও নিজের রঙের ঘর বদলাতে পারে না। কিন্তু বোর্ডের পরিস্থিতি বদলে গেলে তার চলার অর্থ বদলে যায়।

‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’র দুই দাবাড়ু একটি কথা আমাদের মনে গেঁথে দেন চিরকালের জন্য। সেটা হল, কোনও বিষয়ে গভীর জ্ঞান মানুষকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। আবার সেই গভীর জ্ঞানই সবার আগে পরিবর্তনকে চিনতেও সাহায্য করে।
ঠিক সেই কারণেই, ইংরেজ সেনাবাহিনী লক্ষ্ণৌয়ের দিকে এগিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই এক ঘণ্টাও সময় নষ্ট করেননি ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’র দুই দাবাড়ু। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই তাঁরা দাবা খেলতে শুরু করেন ইংরেজি নিয়মে। ঝটপট বাজি! তেজ রফতার!
ওদিকে, নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্ সব নিয়ম হঠাৎ ভেঙেছিলেন একদিন সন্ধ্যায়! কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ ঘোষণা করলেন– যুদ্ধ হবে না। তিনি লক্ষ্ণৌ নগরী ছেড়ে চলে যাবেন। সত্যজিৎ রায়ের কলমে নবাবের পতন হয়েছিল পরদিন।
নবাবও সত্যজিৎ রায়ের কলমে হয়ে উঠলেন দাবার ঘুঁটি– দাবার রাজা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved