


যে শহর মির্জা গালিবের, সেখানে সমর সেন বন্ধ লেখা আর খুলতে পারলেন না। নিজের কাছে দরকার কমে গেল কবিতার। কিন্তু সেটা কি শুধুই নিজের? দাঙ্গা-হাঙ্গামায় যে নতুন রাজধানীর জন্ম হল, সেখানে সমর সেন কী দেখলেন? একটা আগ্রাসী রাষ্ট্র চোখের সামনে তৈরি হল। এ যেন আপতকালীন দরকারে নিজের কাজ তুলে রাখা। নিজের বাড়িতে আত্মীয়কে থাকতে দেওয়া। কিন্তু এ বাড়ি যে ভাষার, কল্পনার।
আমি চলে আসি তাঁর এলাকায়। সাবধানে। বা নিয়ম মেনে। তিনি তো পরোয়া করেননি নিয়মের, কিন্তু আমি ভিতু। অন্য অনেকের মতো। এই শহরটার বাড়িগুলোর মায়া, আর মানুষ একেবারে ভালো না লাগা সত্ত্বেও আমি থেকে যাই। আমি জীবিকাকে সমীহ করি। তাঁর মতো নয়। তিনি ছেড়েছেন। এমনকী কলকাতাও। এই দিল্লিও। এমনকী সেই মস্কোও। অনেকরকম ছেড়ে আসা, যাওয়া করেছেন জীবিকা থেকে প্রতিনিয়ত সত্যের দিকে। অন্তত তাঁকে সামনে থেকে না দেখা আমাকে সে ধারণা দেয়।

সেই ১৬ বছর আগে দুম করে হাজরার বিখ্যাত হাসপাতালে দূরতর আত্মীয়ের মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে সে তার বিষণ্ণ নার্স দেখে চিরতরে মাথায় গেঁথে যাওয়া সদ্যপরিচয় ‘চিত্তরঞ্জন সেবাসদনে যেমন বিষণ্ণ মুখে/ উর্বর মেয়েরা আসে’। আমি তাকিয়েছি আরও অনেকবার। অনেকরকমের সাদা পোশাকের দিকে। কিন্তু আর বিষণ্ণ মুখের অন্য অর্থ আমি পাইনি। হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালের চেহারা বদলেছে, এমনকী রঙও। বিকেল হর্ষতর হয়ে উঠেছে। পেয়েছি বছরের উত্তরাধিকার সূত্রে বিষাদবন্ধুদের মুখ। ক্রমশ উর্বরতা ঢাকতে এসেছে নোট। ক্রমশ বিষণ্ণতা ঢাকতে এসেছে অন্য চাবুক। ক্রমশ আনন্দের দিকে চলে গিয়েছি আমরা। ভুবনছাড়া যোগাযোগের দেশে ভেসে গিয়েছি। অন্য শহরে আসা আর কিছু কঠিন নয়। কিন্তু তিনি যখন এসেছিলেন, এই দিল্লিতে, তখন কি কঠিন ছিল? আমি ভাবি আমার সমস্যা তো অন্যত্র। বন্ধু। লেখা। এইসব। তিনি? আমি তাঁর দিল্লির পাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকি। ভাবি এই এলাকাটা তাঁর থাকার সময় থেকে বদলে গেছে আকাশপাতাল। যেমন বদলেছে তাঁর কলকাতার আড্ডাখানাগুলো। দিল্লিতে আর কেউ কি আড্ডা দেয়? যারা দেয় তারা সময় মেপে। আবার মনে পড়ে গেল তাঁর লাইন ‘আমাদের কলুষিত দেহে/ আমাদের দুর্বল ভীরু অন্তরে/ সে উজ্জ্বল বাসনা যেন তীক্ষ্ণ প্রহার’। আমি আমার বাঙালির স্বভাব-ন্যাকামি নিয়ে আবারও দেখি চারপাশ। খুঁজতে শুরু করি তাঁর ঠিকানা। ১২ নম্বর দরিয়াগঞ্জ। পাই না। তখন হয়তো গোটা পাড়াতে রাস্তার নাম ছিল না। এখন আছে। তিনি থাকতেই তো সব বদলে যেতে শুরু করে। এখন এই অর্ধশতক পার করা দূরত্বে আর কিছুই কি থাকে? দিল্লি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় এখান থেকেই তাঁর জমানায় টাঙায় চড়ে কখনওবা দূর দেখতে যাওয়া। তাঁর বাবু বৃত্তান্তে পাওয়া। আমার সামনে এখন জ্যাম। নতুন মেট্রোর লাইনের ঝামেলা। খুব কাছেই নতুন দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন। পুরনো দিল্লিও। এখন আর টাঙা চলে না। দূরস্মৃতি না নিকট– কোনটা বেশি জোরালো আমি বুঝতে পারি না। আমি দেখি, আমাদের বাঙালিদের মজ্জাগত স্মৃতিবিভ্রমের মধ্যে তিনি একটা সাদাকালো চেহারায় হাঁটছেন। এই দিল্লি গেট থেকে হয়তো তিনি কনট প্লেসের দিকে যাবেন। দিল্লির কেন্দ্র। শহরের প্রাণভূমি। বইয়ের দোকান ইত্যাদি। বার। রেস্তোরাঁ। যতবার মনে পড়ে তাঁর তীক্ষ্ণ চেহারা, আমার মনে হতে থাকে– তিনি সেই ব্যক্তি যিনি নিজের ইচ্ছের ভরে হেঁটেছিলেন এই গোষ্ঠীময় দেশে। বস্তুত আমি তাঁকে একাই হাঁটতে দেখি।

আড্ডাফেরত অভ্যস্তে নেতিয়ে যাওয়া মানুষ তিনি। অথচ তাঁর কাজের জীবন ও পরিধি তা বলে না। আমার কেন এমন মনে হয়! একটা ফর্সা লোক একা হাঁটছে। দেখছে এই শহরে তাকিয়ে। এই শহরের চেহারা পরিবর্তন তাঁকে বিব্রত করছে না। যেন অর্ধশতাব্দী আগেকার একটা মানুষ বর্তমান সমকালে। বয়স বাড়েনি। শহরান্তর তাঁকে স্পর্শ করলেও, বাবু বৃত্তান্তের যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় লেখা ছোট গতিশীল বাক্যে তিনি সব সহজে শেষ করেছেন। যেভাবে তাঁর কাছে স্থানান্তর। কবিতাও কি তাঁর কাছে স্থান ছিল? ছেড়ে গিয়েছিলেন। যেমন নানা শহর, এমনকী দেশ। উড়ো খৈ-তে বলছেন: ‘সংবাদের চাপে, দেশে দাঙ্গা হাঙ্গামায় আস্তে আস্তে কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে এল– ছক মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছিল।’ তবে দেশান্তরেও তো তিনি থাকেননি। ফিরে এসেছেন। দেশে। দেশ তো ভিতরের। দেশ তো শিরায়। তেমনই কি কবিতাও নয়? যেভাবে আমরা তস্য সাধারণেরা বাড়ি ফিরি। অথচ প্রতিদিনের অধরায় বাড়িটা হারিয়ে যায়। আমরা তাকে স্পর্শ করতে পারি না। যে ঘর বাঁধা হয়েছিল উচ্চগ্রামে, আজ তাকে ব্যবধানে দেখি ফাঁকা হয়ে এসেছে। স্পর্শ করা হয়নি, হয়ে ওঠে না। তেমনই কি তিনি ফিরেছিলেন?

আমি ছবি তুলি এলাকাটার। ব্যস্ততার দিকে প্রতিদিন একটু করে বেড়ে উঠছে এ শহর। বিশ্রামহীন। নিদ্রাহীন। আমার সঙ্গে সহকর্মী ভাষাতাত্ত্বিক বন্ধু। তাকে বলতে থাকি সমর সেনের কথা। এই দরিয়াগঞ্জে আছে বইয়ের দোকান। রবিবার হাট বসে বইয়ের। সেখানে ইশকুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বইয়ের রবরবা। আমার বন্ধু বলে এই ভয়ংকর দিল্লি শহরে না এলে কি তিনি লেখা ছাড়তেন? আমি বোঝাই তাকে– বোধহয় না। কারণ তখন এ শহর এমন ছিল না। তবে হ্যাঁ, তিনি নিজেই বলেছেন দাঙ্গা-হাঙ্গামার কথা। সেই একই হাঙ্গামার পরে তো জীবনানন্দ দাশ ১৯৪৬-’৪৭ লিখেছিলেন। তাহলে? সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পঙ্ক্তি মনে পড়ে– ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ কবিতা বা লেখার প্রয়োজন তো নিজের কাছে। সেটা ফুরিয়ে গেলে আর কোনও উত্তর নেই। যেমন ফরাসি দেশের আর্তুর রাঁবোর ক্ষেত্রে ঘটেছিল। সেটা সমর সেনের সঙ্গেও ঘটেছিল। তিনি কবিতা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু ততদিনে কবিতা তাঁকে ছেড়ে গিয়েছে।

আজ এই নরম দুপুরের দরিয়াগঞ্জে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছে উড়ো খৈ-এর লেখাগুলোর কথা। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এই শহর যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে নানা কবির সমাহার। যে শহর মির্জা গালিবের, সেখানে সমর সেন বন্ধ লেখা আর খুলতে পারলেন না। নিজের কাছে দরকার কমে গেল কবিতার। কিন্তু সেটা কি শুধুই নিজের? দাঙ্গা-হাঙ্গামায় যে নতুন রাজধানীর জন্ম হল, সেখানে সমর সেন কী দেখলেন? একটা আগ্রাসী রাষ্ট্র চোখের সামনে তৈরি হল। এ যেন আপতকালীন দরকারে নিজের কাজ তুলে রাখা। নিজের বাড়িতে আত্মীয়কে থাকতে দেওয়া। কিন্তু এ বাড়ি যে ভাষার, কল্পনার। উনি হয়তো টের পেয়েছিলেন। কিন্তু ওই, মনে হওয়া, কবিতার আগে দরকারকে বসিয়ে দেওয়া। বাহ্যিকতা ঢেকে দিল কবিতাকে। আজ এই দরিয়াগঞ্জকেও প্রতীকী মনে হয়। প্রায় সমস্ত বইয়ের দোকান তথা প্রকাশক ভিতরে চলে গিয়েছেন। সামনে শুধু বাহারি পশরা। আজ শুধু কবিতা নয়, গোটা বিদ্যাচর্চাই পিছনের সারিতে। আজ সমর সেন কী করতেন ভাবি… একটু বদলে আবার লিখি পঙ্ক্তিটা– সে উজ্জ্বল বাসনা যেন তীক্ষ্ণ প্রহার।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved