


সুন্দরবনের মধু শুধু একটা পণ্য নয়– এটা একেকটা জীবনের গল্প। প্রতিটি ফোঁটা মধুর মধ্যে লুকিয়ে থাকে অরণ্যের গন্ধ, একটা পরিবারের আশা, আর একটা মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত। জীবনে চলার পথে কত কত মউলে বাঘের থাবায়, সাপের ছোবলে, কুমিরের মুখবিবরে হারিয়ে গিয়েছে তার হিসেব নেই। এই জীবন-সংগ্রামে তাঁরা শিখে নিয়েছেন জঙ্গলের ভাষা, মৌমাছির আচরণ, জোয়ার-ভাটার ছন্দ। এই জ্ঞান কোনও বইয়ের অক্ষর থেকে আহৃত নয়, এই জ্ঞান তাঁরা অর্জন করেছেন জীবনে চলার পথের ধুলোমাটি থেকে, যা মিশে আছে তাঁদের শরীরে-মননে-চেতনায়। হয়তো সেই কারণেই, এত বিপদের পরেও তাঁরা ফিরে আসেন। আবার যান। শুধু মউলেদের জীবনের গল্পগুলো সুন্দরবনের জলেই ভেসে থেকে যায়, শেষমেশ মিলিয়ে যায় বঙ্গোপসাগরে।
প্রচ্ছদের ছবি: শফিকুল আলম কিরণ
‘সুন্দরবন। নামটি লোকে সাধে দেয়নি। ভারি সুন্দর দেখতে এই বন। … শুধু গাছের সারিতে সুন্দর নয়। অগুনতি নদনদী যেন জালের মতো ঘিরে রেখেছে এই বনকে। … সুন্দরবনের উপকূলবাসীরা কিন্তু খোদ অরণ্যে বাস করে না। এরা জীবিকার তাগিদে আর মনের তাড়নায় অবাধ বনচারী। এদের মানসিকতা ও লড়াকু মনোভাবের তুলনা নেই। যেমন ব্যাঘ্রসম তেজোময়, তেমনি এরা একে অন্যের প্রতি ভালোবাসায় ভরপুর। … সুন্দরবনের শৌর্য, বীর্য, সৌন্দর্য, মাধুর্য– সবই প্রতিফলিত হয়ে আছে এদের জীবনে।’
শিবশঙ্কর মিত্র, ১৯৮৮
সুন্দরবন– পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য। রহস্য, ভয় আর জীবনের ঝুঁকিতে ঘেরা এই বনে জীবন বাজি রেখে একদল মানুষ জীবিকার সন্ধানে প্রবেশ করেন গভীর অরণ্যে, তাঁরা মউলে– মধু সংগ্রহকারী শ্রমজীবী মানুষ। ‘মউলে’ একটি বিশেষ বৃত্তির নাম। সুন্দরবনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পেশা মউলেদের। ডাঙায় বাঘের হুঙ্কার, বিষধর সাপের ছোবল, জলে কুমিরের লোলুপ দৃষ্টি, জোয়ার-ভাটার অনিশ্চয়তা আর পায়ের নিচে চোরাবালির ফাঁদ– সব বিপদকে তুচ্ছ করেই চলে তাঁদের জীবনসংগ্রাম। তবুও মানুষ বনে যায় মধু ভাঙতে, মোম আনতে আর কাঠ কাটতে। সুন্দরবন যেন তাঁদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাঁরা যেন শুনতে পান অপ্রতিরোধ্য বনানীর ডাক। শিবশঙ্কর মিত্র ‘সুন্দরবনে আর্জান সর্দার’ উপন্যাসে লিখছেন, ‘…বন তাকে ডাকে– তার নিবিড় ঘন সবুজ রঙে, তার নিদারুণ গভীর স্তব্ধতায়, তার ভীত পলাতক হরিণের পদশব্দে, তার হিংস্র ব্যাঘ্রের লোলুপ গর্জনে, তার নিঃসঙ্গ শিকারী জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি বারুদের গন্ধের নেশায়।’

নোনাজল আর নোনামাটির দাপটে সুন্দরবনের জমি একফসলি। এতে এই অঞ্চলের মানুষের বছরভর ভাত জোটে না। তাই কিছু মানুষ মাছ ধরাকে বিকল্প পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু মাছের প্রজননের জন্য তিন মাস নদী-খাঁড়িতে মাছ ধরা নিষেধ। মউলেদের কথায়, ‘মধু সংগ্রহে না গেলে সংসার চলবে কীভাবে?’ তাই জঙ্গলে বিপদ থাকলেও পেটের তাগিদেই মধু সংগ্রহে বাধ্য হন তাঁরা। অন্ত্যজ হিন্দু ও মুসলমান মানুষ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণবঙ্গে নমঃশূদ্র, মাহিষ্য, পৌণ্ড্র প্রভৃতি তফশিলি জাতি ও উপজাতির মধ্যে এই পেশা প্রসারিত। মউলেদের বাস মূলত কুলতলি, জয়নগর, বাসন্তী, গোসাবা, ক্যানিং, হাসনাবাদের কাটাখালি প্রভৃতি এলাকায়। এপ্রিল-মে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মধু সংগ্রহের মরসুম। বন থেকে মধু সংগ্রহকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘মহাল’ এবং যারা মধু সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে যায়, স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘জঙ্গল করতে গিয়েছে’।

প্রতি বছর ১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মধু সংগ্রহ শুরু হয়। স্থানীয় বন দপ্তরের কাছ থেকে প্রতি ১৫ দিনের জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। যাত্রার সাজ-সরঞ্জাম, নৌকা জোগাড়, পারমিট বের করার দায়িত্ব বেশিটাই দলনেতার। নৌকায় নিতে হয় দা, লাঠি, খেপজাল, কাস্তে, আড়ি বা ধামা, জলের ব্যারল, রান্নার সরঞ্জাম, টর্চ, দেশলাই, পটকা, গ্যাসলাইটার ইত্যাদি। সঙ্গে থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল, ডাল, তেল, পানীয় জল, পেঁয়াজ, লঙ্কা ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী। এসব জিনিসপত্র কোন নৌকা কী কী নিল সেসব বন অফিসের বাবুরা ‘পাসবুক’-এ লিখে নেয়। বাঘকে বিভ্রান্ত করতে বনদপ্তর মউলেদের মাথার পেছনে পরার এক মুখোশ দেয়। কিন্তু এই কৌশল বাঘের আজ অজানা নেই। বাঘ এখন মুখোশ আর মুখের পার্থক্য বুঝতে পারে। জল-জঙ্গলের বাঘ, সাপ, কুমিরের মতো শ্বাপদ জীবের থেকে আত্মরক্ষায় মউলেদের ভরসা রাখতে হয় লোকবিশ্বাসে, গুনিনের মন্ত্র-তন্ত্রে আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতা-সমৃদ্ধ জ্ঞানের ওপর।

সাধারণত ১৫ দিনের জন্য একটি দল বনে যায়। নৌকার পরিবহন ক্ষমতা অনুযায়ী দলে ৭, ৯ বা ১১ জন করে মউলে থাকে। দলে থাকে দেয়াসি বা বহরদার (দলনেতা)– যে দলকে বুক চিতিয়ে রক্ষা করবে, তেমনই থাকতে হবে জল-জঙ্গলের জ্ঞান। থাকে বাউলে (গুনিন), যিনি মন্ত্র দেন– বাঘের মুখ বন্ধ করা, বাঘ তাড়িয়ে দেওয়ার মন্ত্র। এছাড়া থাকে গাছি (যে গাছে ওঠে), আড়িদার (গাছের নিচে দাঁড়িয়ে যে মধু ভর্তি চাক পাত্রে লুফে নেয়), গাঙনেয়ে (যে নৌকায় রান্নার কাজ করে)। মউলেরা পাহাড়িয়া জংলি মৌমাছিকে ডাঁশ, বাঘা, মাছি, পোকা নামে অভিহিত করে। মউলেরা তাঁদের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারেন মৌমাছির গতিবিধি, তাঁরা জানেন কোন বনে মধু আছে, চাকে মধু আছে কি না। মউবনের হাওয়া শুঁকেই অনেকে বলে দিতে পারেন মৌমাছির মুখে কোন ফুলের রস। এসবই তাঁদের বংশ পরম্পরায় যাপিত জ্ঞান-এর পরিচয়।

মউলে– প্রান্তিক এই বৃত্তিতে জীবনকে চেয়ে থাকতে হয় দৈবশক্তির ওপর। জল-জঙ্গলে যাতায়াতের জন্য নৌকো একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু সুন্দরবনে নৌকো শুধুমাত্র একমাত্রিক পরিবহন যানই নয়, বাঁচা-মরার জিয়নকাঠিও। কাঠের নৌকো রূপান্তরিত হয় ‘কাষ্ঠদেবী’তে। ‘কাষ্ঠদেবী’কে খুশি রাখা মউলেদের অবশ্য কর্তব্য, শুধু জীবিকার তাগিদে নয়, প্রাণের তাগিদেও। মহলে যাওয়ার আগে নৌকো পরিষ্কার করে সাজানো হয়। বাড়ির মহিলারা নৌকোর গলুইয়ে তেল-সিঁদুর মাখিয়ে ফুলের মালা পরায়। ধুপধুনো প্রজ্বলন করে। মউলেরা গলুইকে ‘চণ্ডী’ রূপে পুজো করে। প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয় সন্দেশ, বাতাসা, ফলমূল। নৌকোর খোলের মধ্যে বসানো হয় মঙ্গলঘট– ‘সাজন কলসি’। যাত্রার আগে উপস্থিত মহিলারা উলুধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে নদীর ঘাট। শঙ্খ ও কাঁসর-ঘণ্টা বাজে। মউলেরা প্রত্যেকে নৌকো প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়ে শুদ্ধ চিত্তে নৌকায় ওঠে। বাদাবনের উদ্দেশ্যে নৌকো চলার শুরুতে বাউলে প্রার্থনা করে–
ভাটি গাঙে চাটিয়া
পাঁচ ফুট দরিয়া
গাজী গঙ্গা বদর বদর।।
নৌকার বাকি মউলেরা দোহা দেয়–
বনবিবির নাম করে আল্লা আল্লা বল।
সত্যপীরের নাম করে হরি হরি বল।
রায় ঠাকুরের নাম করে হরি হরি বল।।

এই প্রার্থনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় হিন্দু-মুসলিম লোকদেবতা। মুসলিম মউলেরাও তেল, সিঁদুর, ধুপধুনো নিতে ভোলে না। বনের দেবী বনবিবি যেমন আছেন, আছেন দক্ষিণরায়, শাহজঙ্গুলি, সুফি পীর, জলের মালিক কালু রায়ও।
বাদাবনের রক্ষাকর্ত্রী বনবিবি। সুন্দরবনের দিন-আনি-দিন-খাই মানুষ, যাঁদের জল আর জঙ্গলে পদার্পণ করা ছাড়া এক লহমা দিন চলে না, তাঁদের জীবনে আড়ম্বরের জায়গা নেই, মা বনবিবির পুজো পদ্ধতিও অনাড়ম্বর। ‘জলজঙ্গল’ উপন্যাসে মনোজ বসু-র বর্ণনায়– ‘করুণাময়ী বনবিবি। বাদাবন তাঁর রাজ্য। হিংস্র বাঘ, কুমির ও দাঁতাল তার কাছে পোষা মেয়ের মতোন। খলসি ফুল, হেঁতাল ফুল, গরান ফুল– এই তিন ফোটে চৈত্রমাসে। … সেই মধু মায়ের পুজোয় দাও, মা বড় খুশি হবেন।’ মউলেরা জঙ্গলে প্রবেশের আগে বনবিবির থানে সিন্নি মানত করে, প্রতিশ্রুতি মতো মানসিক পরিশোধে জঙ্গলে মুরগি ছেড়ে দেয়। জঙ্গলজীবী মানুষের এই দৈববলই হাতিয়ার।

বিশ্বাসে ভর করে বিপদমুক্ত থাকতে মউলেরা ধারণ করে হাজিসাহেবের তাবিজ। তাবিজ ঘিরে শুদ্ধাচার মেনে চলতে হয় হিন্দু-মুসলমান সবাইকেই। জঙ্গলে প্রবেশের সময়ে বন বেঁধে দেয় বাউলে। মধু ভাঙতে দ্বীপের মাটিতে প্রথম পা রাখে বাউলে। তারপর দলনেতা। তাঁর পেছনে থাকে অন্যান্যরা। সবাই স্মরণ করে বনবিবিকে। বাউলে খাঁড়ির জলে হাত রেখে মন্ত্র উচ্চারণ করে– ‘জ্বালান’, ‘চালান’ এবং ‘খিলেন’ মন্ত্র। চরা থেকে তুলে নেয় একটু মাটি। এই মাটির ফোঁটা এঁকে দেয় সবার কপালে– এই হল বাউলেদের ‘বন বন্ধন’। তাঁদের বিশ্বাস, বন্ধন করলে হিংস্র প্রাণী চলে যাবে ঐ বন ছেড়ে। নির্ভয়ে মউলেরা ভাঙতে পারবে মধু।
সুন্দরবনের নদী-খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময়ে মৌমাছির গতিবিধি লক্ষ করেন মউলেরা। এরপরে নদীর পাড়ে নৌকো বেঁধে, মৌমাছির পিছু নিয়ে গভীর জঙ্গলে চলে মৌচাকের খোঁজ। যখন মৌমাছি মধু বহন করে, তখন তারা নিচু স্তরে ধীরে উড়ে যায়। সেই উড়ানের দিক অনুসরণ করেই মউলেরা মৌচাকের অবস্থান নির্ণয় করে। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার কারণে তাঁরা আশপাশের পরিবেশ লক্ষ করতে পারে না, ফলে অনেক সময় বাঘের শিকার হয়ে পড়েন। এই সময়েই বন্য প্রাণীর আক্রমণের প্রবণতা থাকে বেশি।

মধু সংগ্রহের ক্ষেত্রে দলগত ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহালের সময়সূচি সাধারণত নির্দিষ্ট থাকে। সকাল ৬-৭টার মধ্যে তাঁরা জঙ্গলে প্রবেশ করেন এবং ১১-১১.৩০টার মধ্যে নৌকায় ফিরে আসেন। দুপুরের আহারের পর আবার বিকেল পর্যন্ত (প্রায় ৪-৪.৩০টা) তাঁরা মধুর সন্ধানে যান। দলের এক-একজনের আলাদা আলাদা দায়িত্ব। যিনি চাকের খোঁজ করেন, তিনি টানা জঙ্গলের উপরের দিকে নজর রাখেন। সেই সময়ে যাতে বাঘ বা কোনও হিংস্র জন্তু আক্রমণ করতে না পারে, সে দিকে খেয়াল রাখেন দলের অন্যেরা। অনেক সময়ে জঙ্গলের মধ্যে মৌচাক খুঁজতে গিয়ে একে অন্যের থেকে দূরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে জঙ্গলের ভেতরে তাঁরা প্রায় ৩০ হাত (প্রায় ৪৫ ফুট) দূরত্ব বজায় রাখেন, যাতে পথ হারানোর সম্ভাবনা কমে। এই দূরত্বকে ওঁরা ‘কু-ভোর’ বলেন। নৌকার সঙ্গী কিছু সময় অন্তর অন্তর ‘কু’ ডাক ডাকতে থাকেন। এটা একটা সংকেত। এর অর্থ– ডাক শোনার পরিধির বাইরে মউলেরা গেলে পথ হারিয়ে ফেলতে পারে গভীর অরণ্যে। মউলেরা অরণ্যে একটা বৃত্ত বজায় রেখে পথ চলেন। বৃত্তপরিধির ভেতরে কিংবা বাইরে বিপদ থাকতেই পারে। এই বিপদ এড়াতে গুনিনের ওপর ভরসা রাখেন মউলেরা। গুনিন ‘বন্ধন’ করে দেন মধু সংগ্রহের এলাকা। এটা হল বনবিবির বরাভয়।

মৌচাকের সন্ধান পেলে প্রথমেই তৈরি করতে হয় এক ধরনের মশাল– বোলান। গরান কাঠের লগি। মাথায় হেতালের বেগো দিয়ে তৈরি হয় বোলান। বোলানের ওপরে দিতে হয় হেঁতাল গাছের শুকনো পাতা, নিচে কাঁচা সবুজ পাতা। এতে আগুন ধরিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়। মৌমাছি তাড়িয়ে গাছে উঠে যান একজন মউলে। দা বা কাটারির সাহায্যে মধুভর্তি চাকের অংশ কেটে নেন, তবে অক্ষত রাখা হয় ডিমভর্তি অংশ। কৌশলী আড়িদার ধামাতে তা সংগ্রহ করে নৌকায় নিয়ে যান। মোমজাতীয় চাক হাতে চেপে বের করা হয় মধু। রীতি অনুযায়ী, প্রথম সংগৃহীত মধু জঙ্গলের পূর্বদিকের একটি গাছের গোড়ায় বনবিবিকে নিবেদন করা হয়। মধু সংগ্রহ শেষে তাঁরা সাধারণত একই পথ ব্যবহার না করে, অন্য পথে ফিরে আসেন। কারণ বিপদের আশঙ্কা থাকে। দিনের শেষে মধু ও মোম আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয়।

মূলত চৈত্র-বৈশাখ মাসে সুন্দরবনের খলসে গাছে ফুল আসে। এই খলসে ফুলের মধুই সব থেকে সুস্বাদু বলে দাবি মউলেদের। খলসে ছাড়াও বাইন বা কেওড়া (বনিহার মধু), হেঁতাল (বোগড়া মধু)– অন্যান্য মধুও পাওয়া যায়। এর মধ্যে দু’টি বিশেষ ধরনের মধুর চাহিদা বেশি– খলসে এবং গরান ফুলের মধু। খলসে ফুলের মধু সাদা রঙের এবং একে ‘ফুলপাতি মধু’ও বলা হয়। অন্যদিকে গরান ফুলের মধু গাঢ় লাল রঙের।
সুন্দরবন-এ মধু সংগ্রাহকেরা সাধারণত এক থেকে দু’টি ‘চাকা’ (চাকের অংশ) সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতিটি চাকায় প্রায় ৫ থেকে ১০ কেজি মধু থাকে, এবং একটি দল মাসে প্রায় ১৮,০০০ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করতে পারেন। বনদপ্তর জানিয়েছে, ২০২৩-এ ২৫ মেট্রিক টন মধু সংগৃহীত হয়েছিল সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প এলাকা থেকে। West Bengal Forest Development Corporation Ltd. (WBFDCL) মধু সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সরাসরি সংগৃহীত মধু ক্রয় করে, যেখানে গ্রেড A মধুর জন্য প্রতি কেজি ৩০০ টাকা এবং গ্রেড B মধুর জন্য প্রতি কেজি ২৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি অংশ পর্যটক বা অন্যান্য ক্রেতাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। কখনও মউলেরা গ্রামে একটি চাক প্রায় ৪০০ টাকায় বিক্রি করেন।

মধু সংগ্রহে যাওয়ার দিন থেকে মউলেদের বাড়ির মহিলারা বাড়িতে নানা নিয়মকানুন পালন করেন। মাথায় আর তেল পড়ে না মউলের মা ও বধূর। সিঁথিতে সিঁদুর পরেন না। মউলেদের স্ত্রীরা বিধবার ব্রত পালন করেন ঘরের মানুষটির ফেরার দিন পর্যন্ত। ঘরে ঝাঁট পড়ে না। সূর্যোদয়ের আগে রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া সেরে নেন সকলে। পূর্বপুরুষের এই রীতি মেনে চলেন তাঁরা আজও।
মউলেদের কথায়, ‘এই পেশা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ … একদিকে বাঘ, অন্যদিকে জলদস্যু।’ মউলেদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে বনদপ্তর। ‘অপারেশন গোল্ডেন হানি’ নামে বিশেষ ব্যবস্থা গত ২০২৩ সাল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মউলেরা সুন্দরবনের যে এলাকায় মধু সংগ্রহ করেন, বনদপ্তরের একটি টহলদারি দলও সেখানে থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশি জলদস্যুদের হাত থেকে মউলেদের রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা। এছাড়া বিমার সুবিধাও প্রদান করা হয়। তবে নিয়ম ভাঙলে জরিমানা দিতে হয়। অনেক সময় বেশি মধুর আশায় মউলেরা কোর এলাকায় প্রবেশ করে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সুন্দরবন-এর সোনালি ফুলের বনমধু সারা বিশ্বে পৌঁছেছে, জিআই ট্যাগ পেয়েছে সুন্দরবনের মধু। কিন্তু মধু সংগ্রাহকদের জীবন কতটা মধুর? কতটা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ? বর্ষায় তাঁদের খড়ের চাল থেকে বৃষ্টির জল পড়ে। মাটির মেঝে ভিজে স্যাঁতস্যাঁত করে। বেশিরভাগ মউলেদের জীবনই দারিদ্রসীমার নিচে। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে জানা গিয়েছে, জঙ্গলের যে কোনও অংশে বাঘের আক্রমণে মৃত ব্যক্তি পাঁচ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু টাকা কখনই মানুষের জীবনের বিকল্প হতে পারে না। তাই জঙ্গলজীবী মানুষের বিকল্প জীবিকার কথা অবশ্যই ভাবতে হবে। জঙ্গলে মধু সংগ্রহে না গিয়ে গ্রামের মানুষদের বাক্সের মধুচাষে প্রশিক্ষিত ও উৎসাহিত করতে হবে। বিকল্প জীবিকাও যে এই মৃত্যুমিছিল পুরোপুরি আটকাতে পারবে, তা সম্ভব নয়। যেসব গ্রামে এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে, সেখানে ব্যাপক সতর্কতামূলক প্রচার দরকার। জঙ্গলে অবৈধভাবে প্রবেশ করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকাও প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, সুন্দরবনকে ঘিরে বসবাসকারী কয়েক লক্ষ মানুষের সুস্থভাবে বাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বাঁচিয়ে রাখতে হবে সুন্দরবনকে এবং সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী রয়েল বেঙ্গল টাইগারকেও।
সুন্দরবনের মধু শুধু একটা পণ্য নয়– এটা একেকটা জীবনের গল্প। প্রতিটি ফোঁটা মধুর মধ্যে লুকিয়ে থাকে অরণ্যের গন্ধ, একটা পরিবারের আশা, আর একটা মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত। জীবনে চলার পথে কত কত মউলে বাঘের থাবায়, সাপের ছোবলে, কুমিরের মুখবিবরে হারিয়ে গিয়েছে তার হিসেব নেই। এই জীবন-সংগ্রামে তাঁরা শিখে নিয়েছেন জঙ্গলের ভাষা, মৌমাছির আচরণ, জোয়ার-ভাটার ছন্দ। এই জ্ঞান কোনও বইয়ের অক্ষর থেকে আহৃত নয়, এই জ্ঞান তাঁরা অর্জন করেছেন জীবনে চলার পথের ধুলোমাটি থেকে, যা মিশে আছে তাঁদের শরীরে-মননে-চেতনায়। হয়তো সেই কারণেই, এত বিপদের পরেও তাঁরা ফিরে আসেন। আবার যান। শুধু মউলেদের জীবনের গল্পগুলো সুন্দরবনের জলেই ভেসে থেকে যায়, শেষমেশ মিলিয়ে যায় বঙ্গোপসাগরে।

তথ্য সহায়তা:
১. শিবশঙ্কর মিত্র, ১৯৮৮, সুন্দরবন সমগ্র, ১ম সংকলন। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
২. শিবশঙ্কর মিত্র, ১৯৮৮, ‘সুন্দরবনে আর্জান সর্দার’। সুন্দরবন সমগ্র। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
৩. মনোজ বসু, ২০০৯, ‘জলজঙ্গল’। সুন্দরবন অমনিবাস। কলকাতা: বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
৪. সুরেশ কুণ্ডু, ২০১০। সুন্দরবনের মউলি। এবং আমরা। ষষ্ঠ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা। কলকাতা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved