Nababarsha in Tribes: Rituals, Heritage, and Festival । Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

প্রকৃতিবরণই আদিবাসীদের বর্ষবরণ

বাহা বা সরহুলের মতো নববর্ষের উৎসব আমাদের শেখায়, মানুষের অস্তিত্ব প্রকৃতির করুণার ওপর নির্ভরশীল; তাই প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়, বরং তাকে ভালোবেসেই প্রকৃত আনন্দ লাভ করা সম্ভব। মাদলের গুরুগম্ভীর ধ্বনি, শাল মঞ্জরির পবিত্রতা এবং সমবেত নৃত্যের ছন্দ– সব মিলিয়ে আদিবাসী সংস্কৃতি এক অনন্য সাম্যবাদ ও পরিবেশবান্ধব জীবনবোধের বার্তা বহন করে।

Published by: Robbar Digital

Posted:April 15, 2026 6:21 pm | Updated:April 15, 2026 6:46 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

বাঙালি যখন পান্তা-ইলিশ আর হালখাতায় নতুন বছরকে বরণ করে, আদিবাসী সমাজ তখন মেতে ওঠে বনের নতুন ফুল আর কুঁড়িকে স্বাগত জানাতে। তাঁদের কাছে নববর্ষের ধারণাটি মূলত প্রকৃতির পুনর্জন্মের সঙ্গে যুক্ত।

বঙ্গ-সমাজে বসন্তের বিদায় এবং নববর্ষের আগমনে যখন চৈত্র সংক্রান্তির প্রস্তুতি চলে, ঠিক সেই সময়েই সাঁওতাল আদিবাসী সমাজে পালিত হয় তাঁদের বছরের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব ‘বাহা’। সাঁওতালি ভাষায় ‘বাহা’ শব্দের অর্থ হল– ফুল। এটি মূলত এক অকৃত্রিম প্রকৃতি বন্দনা, যেখানে মানুষ ও অরণ্যের নিবিড় সম্পর্ক নতুন করে নবায়ন করা হয়।

zoom
বাহা পরবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আদিবাসী নারীরা

‘বাহা পরব’ সাধারণত ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে শুরু। যখন বসন্তের আগমনে শাল, মহুয়া আর পলাশ ফুলে বনভূমি সেজে ওঠে, তখনই এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। সাঁওতালদের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রকৃতির এই নতুন দান বা ফুলগুলি যতক্ষণ না ইষ্টদেবতাকে উৎসর্গ করা হচ্ছে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষ তা ব্যক্তিগত কাজে (যেমন চুলে পরা বা ঘর সাজানো) ব্যবহার করতে পারেন না। বাহা পরবের মাধ্যমেই প্রকৃতি ব্যবহারের এই ‘অনুমতি’ নেওয়া হয়।

সাঁওতালদের সর্বোচ্চ দেবতা ‘মারাং বুরু’, প্রধান দেবী ‘জাহের এয়ো’ এবং অন্যতম দেবতা ‘লিটা’-র উদ্দেশে এই পুজো নিবেদন করা হয়। গ্রাম-সংলগ্ন শালগাছের বাগান বা যে পবিত্র স্থানটিকে ‘জাহের থান’ বলা হয়, সেখানেই সমস্ত ধর্মীয় আচার পালিত হয়। তাঁদের বিশ্বাস, বাহা পরবের মাধ্যমে দেবতাদের সন্তুষ্ট করলে সারা বছর বৃষ্টিপাত ভালো হবে, ভালো ফসল ফলবে এবং গ্রাম রোগ-বালাই মুক্ত থাকবে।

বাহা পরব সাধারণত তিন-চার দিন ধরে চলে। প্রতিটি দিনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। উৎসবের প্রথম দিনে গ্রামের ‘নাইকে’ (পুরোহিত) এবং গ্রামের পুরুষরা জাহের থানে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। এরপর নাইকে পুণ্যস্নান সেরে দেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা করেন। এই দিনটিকে প্রস্তুতির দিন হিসেবে দেখা হয়।

তারপর সঁদি বা মূলপুজোর দিন। নাইকে জাহের থানে গিয়ে তিনটি শালফুল এবং মহুয়া ফুল সাজিয়ে দেবতাদের পুজো করেন। অনেক সময় মোরগ-বলি দেওয়ার প্রথাও থাকে। পুজো শেষে নাইকে যখন গ্রামে ফেরেন, তখন গৃহবধূরা তাঁর পা ধুইয়ে দেয় এবং নাইকে আশীর্বাদস্বরূপ প্রত্যেকের হাতে একটি করে শালফুল তুলে দেন। এই ফুল গ্রহণ করাকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়।

শেষের দিনটি হল আনন্দ ও মিলনের। এই দিনটিকে অনেকে ‘জল বাহা’-ও বলেন। একে অপরের গায়ে নির্মল জল ছিটিয়ে তাঁরা শুদ্ধতা ও মৈত্রীর বন্ধন উদযাপন করেন। (এটি অনেকটা হোলির মতো, তবে রঙের পরিবর্তে এখানে শুধু জল ব্যবহার করা হয়)।

বাহা পরবে সাঁওতাল পুরুষেরা ধুতি এবং কাঁধে গামছা নেন। মহিলারা পরেন তাঁদের ঐতিহ্যবাহী সাদা ও লাল পাড়ের ‘পাঞ্ছি-পাড়হান’ শাড়ি। চুলে গোঁজা থাকে টাটকা শালফুল। ধামসা ও মাদলের তালে তালে মহিলারা সারিবদ্ধভাবে হাতে হাত ধরাধরি করে ‘বাহা নাচ’ নাচেন। গানের সুরগুলো অত্যন্ত মধুর এবং এতে প্রকৃতির রূপ ও দেবতাদের মহিমা বর্ণিত হয়। এই উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হল– ‘হাঁড়িয়া’ (চাল থেকে তৈরি পানীয়)। দেবতাকে নিবেদনের পর এটি উৎসবের প্রসাদ হিসেবে সবাই পান করেন। এছাড়া পিঠে-পুলি এবং মাংসের বিভিন্ন পদও রান্না হয়।

আদিবাসী মুন্ডা, ওরাওঁ এবং হো সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ও বর্ণাঢ্য উৎসব হল ‘সরহুল’। এটি মূলত বসন্তকালীন নববর্ষের উদযাপন, যেখানে প্রকৃতির পুনর্জন্মকে বরণ করে নেওয়া হয়। এই উৎসবের সবচেয়ে কাব্যিক এবং আধ্যাত্মিক দিকটি হল– ‘ধরণীর বিবাহ’ বা ধরিত্রী মাতার সঙ্গে সূর্যের বিয়ে। ‘সরহুল’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে দু’টি মত আছে। মুন্ডারি ভাষায় ‘সর’ মানে শালগাছ এবং ‘হুল’ মানে পুজো; অর্থাৎ, শালগাছের পুজো। আবার অনেকের মতে, ‘সর’ মানে বছর এবং ‘হুল’ মানে শুরু; অর্থাৎ, বছরের শুরু বা নববর্ষ। চৈত্র মাসের শুক্লাতৃতীয়া তিথিতে যখন শালগাছে নতুন মঞ্জরি দেখা দেয়, তখনই এই উৎসব পালিত হয়।

সরহুল উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু হল– ধরিত্রী-মাতা এবং সূর্যদেবতার প্রতীকী বিয়ে। আদিবাসী দর্শনে পৃথিবীকে নারী এবং সূর্যকে পুরুষ-শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এই উৎসবে গ্রাম-পুরোহিত বা ‘পাহান’ সূর্যদেবতার প্রতিনিধি এবং তাঁর স্ত্রী ধরিত্রী-মাতার প্রতিনিধি হিসেবে অভিনয় করেন। আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন যে, ধরিত্রী এবং সূর্যের এই মিলন না-হলে পৃথিবী শস্যপ্রসবিনী হয়ে উঠবে না। এই বিয়ের পরেই পৃথিবী উর্বর হয় এবং নতুন কৃষিকাজের উপযুক্ত সময় শুরু হয়। বিবাহের মণ্ডপ সাজানো হয় শালফুল দিয়ে। শালগাছকে আদিবাসী সমাজ পরম পবিত্র এবং শক্তির আধার বলে মনে করে।

সরহুল উৎসব সাধারণত তিন দিন ধরে চলে: প্রথম দিন ছোট ছোট মাছ এবং কাঁকড়া ধরে তা দিয়ে পবিত্র জল তৈরি করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই জল ছিটালে ঘরে সুখ-সমৃদ্ধি আসবে। দ্বিতীয় দিন পাহান (পুরোহিত) জাহের থানে (পবিত্র শাল বাগান) দু’টি নতুন মাটির ঘড়ায় জল ভরে রাখেন। পরের দিন সকালে এই জলের স্তর দেখে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, সেই বছর বৃষ্টি কেমন হবে। জলের স্তর কমলে খরার আশঙ্কা আর স্তর ঠিক থাকলে সুবৃষ্টির সংকেত। তৃতীয় দিন পাহান বাড়ি বাড়ি গিয়ে শালফুল বিতরণ করেন। মহিলারা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই ফুল গ্রহণ করে চুলে পরেন এবং দরজায় গুঁজে রাখেন।

পুজোর পর চাল থেকে তৈরি বিশেষ পানীয় ‘হাঁড়িয়া’ বা ‘তাড়ি’– প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এটি আদিবাসী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধামসা, মাদল আর নাগাড়ার গম্ভীর আওয়াজে পুরুষ ও মহিলারা হাত ধরাধরি করে সারিবদ্ধভাবে নাচেন। এই নাচের মুদ্রাগুলো প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে (যেমন গাছপালা বা পশুপাখির ভঙ্গি) অনুকরণ করে তৈরি। সরহুল উৎসবের আগে আদিবাসী সমাজে নতুন ফল বা ফুল গ্রহণ করা নিষিদ্ধ থাকে। এই উৎসবের পরেই তাঁরা নতুন ফসল বা বনজ সম্পদ ব্যবহার শুরু করেন।

zoom
শাল গাছের ফুল

আদিবাসী সংস্কৃতির ক্যালেন্ডারে বৈশাখ মাস কেবল নতুন বছরের শুরু নয়, বরং এটি তাঁদের শৌর্য, কৌশল এবং বীরত্ব প্রদর্শনের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণ। এই বৈশাখের প্রখর রৌদ্রের মাঝেই পালিত হয় ‘বিশু শিকার’ (যাকে অনেকে ‘বিশু সঁদরা’ বা ‘অযোধ্যা শিকার’ বলেন)। মূলত সাঁওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ এবং হো সম্প্রদায়ের পুরুষদের কাছে এটি বছরের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং মর্যাদাপূর্ণ উৎসব। ‘বিশু’ শব্দটি এসেছে ‘বৈশাখ’ থেকে। সাঁওতালি ভাষায় ‘সঁদরা’ মানে শিকার। বৈশাখী পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতে আদিবাসী পুরুষরা দলবদ্ধভাবে যখন অরণ্যে শিকারে যান, তখন তাকেই বলা হয় ‘বিশু শিকার’। এটি মূলত বছরের প্রধান শিকার উৎসব হিসেবে গণ্য হয়।

আদিবাসী সমাজ বিশ্বাস করে, জঙ্গলের গভীরে বাস করেন তাঁদের আরাধ্য দেবতা ‘মারাং বুরু’ এবং ‘আয়ু বুরু’। এই শিকার উৎসব কেবল নিছক আমোদ নয়, বরং এটি দেবতাদের সন্তুষ্ট করার একটি মাধ্যম। এটি কেবল শিকার নয়, এটি একটি বিশাল মিলন মেলা বা সামাজিক সম্মেলন। প্রাচীনকালে শিকারই ছিল জীবনধারণের প্রধান পথ। বর্তমান যুগে এটি ঐতিহ্যের প্রতীক হলেও, এর মাধ্যমে যুবকদের সাহসিকতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াইকে সম্মান জানানো হয়।

বৈশাখী পূর্ণিমার কয়েকদিন আগে থেকেই সাজ সাজ রব পড়ে যায় জঙ্গলমহলের গ্রামগুলোতে। পুরুষরা তাঁদের তির-ধনুক, টাঙ্গি (কুঠার) এবং লাঠি পরিষ্কার করেন। মহিলারা শিকারে যাওয়ার আগে পুরুষদের কপালে তিলক পরিয়ে এবং মঙ্গল কামনা করে বিদায় জানান। হাজার হাজার আদিবাসী মানুষ পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়, বাঁকুড়ার শুশুনিয়া বা ঝাড়খণ্ডের দলমা পাহাড়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পাহাড়ে পৌঁছে তাঁরা সারা রাত খোলা আকাশের নিচে আগুন জ্বালিয়ে অবস্থান করেন। এই রাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বড়দের থেকে ছোটরা তাঁদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং শিকারের নিয়মাবলি শেখে।

বিশু শিকারের সবচেয়ে অনন্য দিক হল ‘লো বীর’ বা উচ্চ আদালত। পাহাড়ের ওপর রাতে যখন হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন, তখন সেখানে এক বিচারসভা বসে। সমাজের কোন‌ও অমীমাংসিত বিবাদ বা কোন‌ও গুরুতর সামাজিক অপরাধের বিচার এখানে করা হয়। এই সভার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। একে বলে আদিবাসী সমাজের ‘সুপ্রিম কোর্ট’।

পুরুষেরা যখন অরণ্যে শিকারের লড়াইয়ে মত্ত, বাড়ির মহিলারা তখন কঠোর নিয়ম পালন করেন। তাঁরা মনে করেন, বাড়ির পুরুষটি যতক্ষণ না সুস্থভাবে ফিরে আসছেন, ততক্ষণ পরিবারের নিরাপত্তা তাঁদের হাতে। অনেক গ্রামে মহিলারা এই সময় উপবাস করেন বা বিশেষ প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন। শিকার সেরে পুরুষরা গ্রামে ফিরলে তাঁদের পা ধুইয়ে বীরের সম্মানে বরণ করে নেওয়া হয়।

আধুনিক যুগে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং অরণ্য হ্রাসের কারণে বিশু শিকারের ধরন অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন আর আগের মতো বন্যপ্রাণী হত্যা করা হয় না; বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক পদযাত্রা ও মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। আদিবাসীরা মনে করেন, তাঁরা বনের সন্তান। তাই শিকারের পাশাপাশি বন যাতে রক্ষা পায়, সেদিকেও নজর দেওয়া হয়। অনেক জায়গায় এখন পশুপাখি নিধনের বদলে প্রতীকীভাবে তীর নিক্ষেপ করে প্রথা রক্ষা করা হয়।

সামগ্রিকভাবে আদিবাসী নববর্ষ এবং তাঁদের উৎসবের সামাজিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলধারার বা তথাকথিত আর্য-হিন্দু সংস্কৃতির চেয়ে মৌলিক কিছু জায়গায় সম্পূর্ণ আলাদা। এই পার্থক্য কেবল আচারের নয়, বরং জীবন-দর্শনের। আদিবাসী সংস্কৃতিতে কোন‌ও লিখিত শাস্ত্র বা ব্রাহ্মণ পুরোহিতের আধিপত্য নেই। তাঁদের ধর্ম ও উৎসব সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। গাছ (শাল), ফুল (মহুয়া) এবং জল– এগুলোই তাঁদের ঈশ্বর। প্রকৃতিকে ভোগ করার আগে তাকে সম্মান জানানোই উৎসবের মূল লক্ষ্য। আর্য বা হিন্দু নববর্ষ (যেমন হালখাতা বা পুজো) অনেক বেশি শাস্ত্রীয় নিয়ম, পঞ্জিকা এবং পুরোহিত-নির্ভর। এখানে দেব-দেবী মানুষের রূপধারী, কিন্তু আদিবাসীদের কাছে প্রকৃতি নিজেই দেবতা।

আদিবাসী উৎসবে কোনও বর্ণভেদ বা জাতিভেদ নেই। গ্রামের ‘মাঝি হারাম’ (গ্রামপ্রধান) থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ– সবাই একই সারিতে বসে উৎসব পালন করেন। আর্য প্রভাবাধীন সমাজে উৎসবে অনেক সময় উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের বিভেদ দেখা যায়। আদিবাসী নববর্ষে কিন্তু এই শ্রেণিবৈষম্যের কোনও স্থান নেই। এখানে উৎসব মানেই সমবেত অংশগ্রহণ।

বাহা বা সরহুলের মতো উৎসবে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত সক্রিয়। তাঁরাই মূলত নাচের বৃত্ত তৈরি করেন এবং পুষ্প-প্রথা পরিচালনা করেন। আদিবাসী সমাজে নারীদের সামাজিক স্বাধীনতা অনেক বেশি। অনেক শাস্ত্রীয় উৎসবে নারীদের অংশগ্রহণে বিধিনিষেধ থাকে বা তাঁরা কেবল আনুষঙ্গিক কাজ করেন। কিন্তু আদিবাসী সংস্কৃতির মূলে রয়েছে নারী ও পুরুষের সমান তালে পা মেলানো।

আর্য নববর্ষের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ‘হালখাতা’ বা ‘নতুনখাতা’ খোলার হিসাব। এটি অনেকটা বস্তুতান্ত্রিক। তাঁদের নববর্ষ কোন‌ও হিসাব মেলানোর দিন নয়, বরং এটি পৃথিবীর ঋতুচক্রের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেওয়ার দিন। নতুন ফল বা ফুল খাওয়ার আগে দেবতার অনুমতি নেওয়া– এই প্রথাটি আসলে প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের (Sustainability) একটি সামাজিক শিক্ষা।

আদিবাসী নববর্ষের উৎসব কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এগুলো একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার জীবন্ত দলিল। বাহা বা সরহুলের মতো নববর্ষের উৎসব আমাদের শেখায়, মানুষের অস্তিত্ব প্রকৃতির করুণার ওপর নির্ভরশীল; তাই প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়, বরং তাকে ভালোবেসেই প্রকৃত আনন্দ লাভ করা সম্ভব। মাদলের গুরুগম্ভীর ধ্বনি, শালমঞ্জরির পবিত্রতা এবং সমবেত নৃত্যের ছন্দ– সব মিলিয়ে আদিবাসী সংস্কৃতি এক অনন্য সাম্যবাদ ও পরিবেশবান্ধব জীবনবোধের বার্তা বহন করে, যা বর্তমানের স্বার্থকেন্দ্রিক পৃথিবীতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন আবির সরকার-এর অন্যান্য লেখা

………………….

Baha Parab Festive Tradition Nababarsha Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Tribal Culture Tribal Festival Tribal Rituals

Share this article on