Naughty Riddles: The Art of Double Meaning। Robbar
Robbar
  • ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ১ অক্টোবর ২০২৬

শ্লীল-অশ্লীল গোলকধাঁধা

আপাত আমিষগন্ধি হেঁয়ালিগুলোর উত্তর বড়ই নিরামিষাশী। লোকজীবনে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যেও এগুলি ছড়িয়ে গিয়েছে। আপাত অশ্লীল ধাঁধাগুলোর মধ্যে দিয়ে তারা অনেক বেশি লিবারেল, অনেক বেশি সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে যেখানে কোনও বিধিনিষেধ থাকে না। এটাই লোকমানুষের জীবন শৈলীর বড় বৈশিষ্ট্য। যৌনতা নিয়ে যে কড়াকড়ি বা বিধিনিষেধ তা খুব সহজ ভাবে জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় এখানে।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১, ২০২৬, ১৬:৫৮   
Facebook WhatsApp Messenger

শ্রাবণের শেষ। জমিতে ধান রোয়ার কাজ হল সারা। কর্মহীন দিনযাপনের সন্ধ্যায় একদল ষাটোর্ধ্ব পুরুষ হরিমন্দিরের চাতালে দেদার আড্ডা দিচ্ছে। চুরুটের ধোঁয়ায় জমে উঠেছে মজলিশের আসর। একদল এঁচোড় পাকা ছেলে তাঁদের ঘিরে রেখেছে ভাঙানি শুনবে বলে। এমন সময় রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল কুমারপাড়ার তাপস। সদ্য-বিবাহিত যুবা। ইশকুল মাস্টারি করে বলে বউ নিয়ে শহরে থাকে। সেইও আজ গ্রামের রাস্তায় যেতে যেতে থমকে দাঁড়াল। দাঁড়ানোটাই তার কাল হল! তাকে পেয়ে দাদুদের কী আনন্দ!– ‘এসো এসো মাস্টার! কেমন চালাচ্ছ হে! বউয়ের সঙ্গে ভাব কেমন জমেছে? একটু বুদ্ধির পরীক্ষা করি এসো।’

zoom

এমন ধারা অভ্যর্থনা উপেক্ষা করে কার সাধ্যি! তাছাড়া এ বয়সে যৌন সুড়সুড়ি কথাবার্তা শুনতে কার না ভালো লাগে! সেই লোভে তাপস দাঁড়িয়ে গেল কিছুক্ষণ।

যৌনগন্ধি ভাঙানি বা ধাঁধা বয়স্করা ফিসফিস করে আউরায়। এগুলি আপাত অশ্লীল হলেও প্রকৃত অর্থে তা নয়। আড়ালে লুকিয়ে থাকে সম্পূর্ণ পরিশীলিত যাপনকথা। সেরকম কয়েকটি ধাঁধা তাপসের দিকে দ্রুত গতিতে ছুটে এল। হিন্দু মেয়েদের সিথির সিঁদুর’ নিয়ে একটি প্রচলিত হেঁয়ালি–

‘বিয়ের সময়ে দাদা দেয় একবার।/ সারাজীবন বউদি দেয় বারবার।’

পুরনো সময়ে, লোকসমাজে নারীরা শ্বশুর-ভাসুরদের সম্মান জানানোর জন্য ঘোমটা মাথায় দিয়ে বিশেষ আচার পালন করে। তাদের সমানে গেলে ঘরের বউরা ঘোমটা টানে। কিন্তু বাপের বাড়িতে এই ধরনের তেমন কোনও আচার মেয়েদের পালন করতে হয় না। এই নিয়ে একটি হেঁয়ালি,

‘দিই তো দিই শ্বশুরঘরে দিই।
দিই তো দিই পরপুরুষে দিই।
বাপের ঘরে দেব কারে লজ্জা করেছি।
তুমি আমার নিজের লোক তোমায় দেব কী।’

zoom

আবার কিছু যৌন সম্পর্কিত ধাঁধা আছে যেগুলি আদিরসের। প্রাপ্তবয়স্কদের আড্ডার রঙ্গরসিকতা থেকে সেগুলোর উদ্ভব,

‘বারো মাসের কচি মেয়ে তের মাসেই পড়ে।
ডাইনে বাঁয়ে গণ্ডা গণ্ডা ছেলে প্রসব করে।’
(উত্তর: কলাগাছ)

চিৎ করে ফেলে উপুড় হয়ে করে।
এমন করা করে গহনাসুদ্ধ নড়ে।

(উত্তর: শিলনোড়া)

……………………………………………….

zoom
……………………………………………….

প্রথম শ্রবণে এসব কথা শ্রোতার কর্ণকুহ্বর কাঁপিয়ে ব্রহ্মতালু নাড়িয়ে দেয়! লোকলজ্জার সীমানাকে আলতো ছুঁয়ে সামাজিক নিয়মের কঠোরতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক যৌনগন্ধি প্রশ্নবাণে বিধ্বস্ত হয় তাপস। কিন্তু অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে পারার মুহূর্তেই লজ্জিত পর্দাটা সরে যায়। এক লহমায় জাদুকরি স্পর্শে সেসব হেঁয়ালি রূপান্তরিত হয় অতি চেনা, অতি সাধারণ আটপৌরে জীবনের ছন্দময় আলাপে।

ভাদ্র মাসে তালগাছের তলায় দাঁড়িয়ে ফুলেশ্বরের বাবা ভাঙানি কাটে,

‘উপোরনু পড়ল দুম্।
দুম্ বলে মোর পঁদ সুঙ।’

‘গিলগিল’ করে হাসতে হাসতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বিটিছানা’গুলা উত্তর দেয়– পাকা তাল, পাকা তাল।

আবার ওপাড়ার পরান দাদুর মুখে খড়কুটোটির বাছবিচার নেই!  বউঝিদের সামনে গলা ছেড়ে বলে ওঠে,

‘‘চিৎ করে ফেললাম
দু’হাত দিয়ে ধরলাম।
হস্ হসিয়ে করলাম,
যখন হয়ে গেল,
তখন নিলাম ধুয়ে।’’

বল তো এটা কী?

খড়ের চালার নিচে এতক্ষণ চুপ করে ছিল বামুন-বুড়ি। এবার সে বতর পেয়েছে। উত্তর তার আগে ভাগে জানা! চেঁচিয়ে বলে উঠল– শিল ও নোড়ায় বাটনা বাটা।

zoom
দেওয়ালগাত্রে যৌন মোটিফ

সঙ্গে সঙ্গে পরাণবুড়ো আরেকটা মিসাইল ছুড়ে দিল,

‘নারীর উপর পুরুষের হাত
হোল ঘষাঘষি।
একজনা খুশি,
অন্য জনা কষ্ট পেয়েও খুশি।’

এ উত্তর অনেকেরই জানা। বিশেষত বিবাহিত মেয়েদের। সমস্বরে বউঝিরা বলে ওঠল, পুরুষ ফেরিওয়ালার কাছে কাচের চুড়ি পরা।

সেবার ভাদুদার বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে কনেপক্ষের কয়েকজন তাদের ঘিরে ধরল বাসর-রাত জাগবে বলে। ঢুলুঢুলু দু’নয়ন! তবু বাসর জাগার কৌতূহল কম ছিল না। সেই বাসরের অন্যরকম আকর্ষণ ছিল অশ্লীল ভাঙানি লড়াই। কন্যাপক্ষ ছড়া কেটে বলল,

একহাত গাছটা, কোমর বেঁধে নাচটা
ভেতর দিয়ে রসটা,
টানলে বের হয় ছিবড়াটা’

( উত্তর: আখ চিবানো)

……………………………………………….

zoom

……………………………………………….

ছেলেপক্ষ সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। তবে তাদের হেঁয়ালিতেও কনেপক্ষ কুপোকাত,

‘ছোট ফুটো দিয়ে ঢোকে,
লাল হয়ে বের হয়।’
(উত্তর: সুঁই ও লাল সুতো)

এই ধরনের ধাঁধার সবচেয়ে বড় শৈল্পিক দিক হল– এর ভাষার বুনন ও শব্দচয়ন। লোকসমাজের বোদ্ধারা এমন কিছু শব্দ বা ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেন, যার দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ তৈরি হয়। একটি অর্থ মানুষের অবচেতনে থাকা আদিম জৈবিক-চেতনাকে আলোড়িত করে, আর অন্য অর্থটি কোনও আটপৌরে বস্তুকে নির্দেশ করে।

‘কাঁচা আমটি টিপলে পরে টক রসটি ঝরে,
রসুই ঘরের মা-বোনেরা কতই আদর করে।’

(উত্তর: লেবু)

এখানে ‘টেপা’ এবং ‘রস ঝরা’-র মতো শব্দবন্ধের মাধ্যমে যে চতুর বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তা ভাষাতাত্ত্বিক অলংকরণ ও বাকচাতুর্যের এক চমৎকার নিদর্শন। গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় যেখানে যৌনতা বা নারী-পুরুষের জৈবিক সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলা নিষিদ্ধ, সেখানে এই ধাঁধাগুলো এক ধরনের ‘সেফটি ভালভ’ বা মানসিক মুক্তি হিসেবে কাজ করে। সমাজ যাকে সোজা কথায় বলতে দ্বিধা করে, ধাঁধার ছলে তাকেই এক ধরনের শৈল্পিক রূপ দেওয়া হয়।

……………………………………………….
শ্রোতার আগে থেকে উত্তর জানা না-থাকলে সে একটি জটিল আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খায়। ধাঁধার ইঙ্গিতটি ধরতে না পারলে নানা ধরনের ভুল উত্তর মনে আসে। হেঁয়ালির মধ্যে দিয়ে একটি সমাজের এবং সমাজ মধ্যস্থিত মানুষগুলির পরিণত শিল্প ও রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। একটি মাত্র ভাব রূপকের সাহায্যে, জিজ্ঞাসার আকারে এটি প্রকাশ করা হয়। পরিশীলিত সমাজ শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানচর্চায়  এগিয়ে থাকলেও অনেক সময় তারাও এই একটি ক্ষেত্রে এসে মাথা নত করে।
……………………………………………….

খাবারের স্বাদ বা ফলমূল নিয়েও গ্রামীণ সমাজে এমন অনেক ধাঁধা প্রচলিত, যা কানকে লজ্জিত করে, কিন্তু মনকে আনন্দ দেয়:

‘উপরে লোমশ জঙ্গল, ভেতরে রসাল চেরা,
তার ভেতরে লুকিয়ে আছে কালো এক কীরা (পোকা)।
মুখ দিলে রস ঝরে, চুষে চুষে খায়,
হাঁটু গেড়ে বসে লোকে তার স্বাদ পায়।’

উত্তর: তালশাঁস বা কচি ডাব। এখানে তালের ওপরের আঁশালো অংশকে ‘লোমশ জঙ্গল’ এবং ভিতরের নরম অংশকে ‘রসাল চেরা’ বলে যে মাংসল ও জৈবিক বিভ্রম তৈরি করেছে, তা এক লহমায় শ্রোতাকে ধাক্কা দেয়। কিন্তু গ্রামীণ মেলায় বা গরমের দুপুরে মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে কচি তালের শাঁস খাওয়ার যে আদিম তৃপ্তি, এটি আসলে সেই চমৎকার রসনাবিলাসেরই এক নিখুঁত প্রাকৃতিক চিত্রায়ণ।

আপাত আমিষগন্ধি হেঁয়ালিগুলোর উত্তর বড়ই নিরামিষাশী। লোকজীবনে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যেও এগুলি ছড়িয়ে গিয়েছে। আপাত অশ্লীল ধাঁধাগুলোর মধ্যে দিয়ে তারা অনেক বেশি লিবারেল, অনেক বেশি সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, যেখানে কোনও বিধিনিষেধ থাকে না। এটাই লোকমানুষের জীবনশৈলীর বড় বৈশিষ্ট্য। যৌনতা নিয়ে যে কড়াকড়ি বা বিধিনিষেধ তা খুব সহজভাবে জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় এখানে।

zoom
শিল্পী: পাবলো পিকাসো

ধাঁধা লোকসাহিত্যের বাক্-শিল্পের অন্যতম অঙ্গ। তার একটি নান্দনিক দিকও আছে। সূক্ষ্ম বুদ্ধি ও চিন্তার অনুশীলন থেকে ধাঁধার উদ্ভব। সেখানে শ্লীল-অশ্লীল বলে কোনও ব্যাপার নেই। সবটাই আপাত। একটি প্রচ্ছন্ন বক্তব্যের আড়ালে ধাঁধার উত্তর লুকিয়ে থাকে। সে উত্তর জীবনবোধের। শ্রোতার আগে থেকে উত্তর জানা না-থাকলে সে একটি জটিল আবর্তের মধ্যে ঘুরপাক খায়। ধাঁধার ইঙ্গিতটি ধরতে না পারলে নানা ধরনের ভুল উত্তর মনে আসে। হেঁয়ালির মধ্যে দিয়ে একটি সমাজের এবং সমাজ মধ্যস্থিত মানুষগুলির পরিণত শিল্প ও রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। একটিমাত্র ভাব রূপকের সাহায্যে, জিজ্ঞাসার আকারে এটি প্রকাশ করা হয়। পরিশীলিত সমাজ শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় এগিয়ে থাকলেও অনেক সময় তারাও এই একটি ক্ষেত্রে এসে মাথা নত করে। এখানেই তাদের সর্ববুদ্ধির নাশ ঘটে। লোকমানস উন্মুক্ত প্রকৃতির কাছে থেকেও আজীবন ধরে হেঁয়ালিগুলি লালন করে। জনশ্রুতিমূলক এসব হেঁয়ালি লোকসমাজে দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত হয়ে আসছে। শুনতে অশ্লীল হলেও সেসব ধাঁধাই লোকসমাজের অহংকার, সমস্ত প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার বিকশিত রূপ।

adult riddles dirty riddles erotic riddles Indian folk culture Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sexual humor

Share this article on