Poetry and film united by symbolic donkey journey | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

আনন্দ-বিষাদের যাত্রায় দুই গাধা

আন্দালুসিয়ার আকাশে উজ্জ্বল রোদ্দুর, দু’পাশে কমলালেবুর বাগান, মাঝখান দিয়ে এক কবি চলেছেন তাঁর প্রিয় গাধা প্লাতেরোর সঙ্গে— হিমেনেথ-এর ‘প্লাতেরো অ্যান্ড আই’ (মূল স্প্যানিশ ‘Platero y yo’) এই কাল্পনিক সহযাত্রার কাব্য। ব্রেসোঁর ছবিতে মারি আর তার পালিত গাধা বালথাজারের একটি সহযাত্রাই সম্ভব হয়ে উঠছে, যদিও রূপক অর্থে; পিরেনীস পর্বতের কোলে এক শহরতলির ফার্মে বালিকা মারি যেদিন গাধাটিকে ভালোবেসে নিজের করে নিয়েছিল, সেদিনই দু’জনের জার্নি শুরু।

Published by: Robbar Digital

Posted:February 18, 2026 4:35 pm | Updated:February 18, 2026 4:35 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

একটি কাব্যগ্রন্থ আর একটি সিনেমার মধ্যে আশ্চর্য একটি যোগসূত্র পেয়ে যাই যখন দেখি দু’টির কেন্দ্রেই একটি গাধা, আর ওই ‘নির্বাক’ প্রাণী ঘিরেই সম্ভব হয়ে উঠছে একটি যাত্রা দুই ক্ষেত্রেই। কালজয়ী ওই দুই নির্মাণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ৫০ বছরেরও বেশি, আর মাধ্যম, আঙ্গিক, প্রেক্ষিত অথবা অভিপ্রায়ও মেলবার নয়, তবে মুখ্য চরিত্র দুই গাধা তাদের যাত্রার সূত্রেই জড়িয়ে নিচ্ছে দেশকাল, লোকজীবনের আলো-অন্ধকারের ধারাভাষ্য। হুয়ান রামোন হিমেনেথ-এর গদ্যকবিতার বই ‘প্লাতেরো অ্যান্ড আই’ (মাদ্রিদ, ১৯১৪) আর রবার্ট ব্রেসোঁ-র সাদা-কালো ছবি ‘বালথাজার’ (ফ্রান্স, ১৯৬৬) নিয়ে ভাবছি এখানে। স্পেনের কবি হিমেনেথ (১৮৮১-১৯৫৮) আর ইউরোপের ‘মিনিম্যালিস্ট’ সিনেমা পরিচালনার একজন অগ্রপথিক ফ্রান্সের ব্রেসোঁ (১৯০১-১৯৯৯), দু’জনেই সমাদৃত স্বক্ষেত্রে; তাঁরা পাঠককে, দর্শককে সমৃদ্ধ করেছেন ভাবনায়– তাঁদের সময়পর্বে, এবং আজও। কবিতার বইটির জন্য তার বাংলা অনুবাদ (কল্যাণ চৌধুরী, সুবর্ণরেখা, ২০০২) আর সিনেমাটির জন্য তার ইংরেজি সাবটাইটেল এখানে অনুসরণ করছি।

zoom
হুয়ান রামোন হিমেনেথ

আন্দালুসিয়ার আকাশে উজ্জ্বল রোদ্দুর, দু’পাশে কমলালেবুর বাগান, মাঝখান দিয়ে এক কবি চলেছেন তাঁর প্রিয় গাধা প্লাতেরোর সঙ্গে– হিমেনেথ-এর ‘প্লাতেরো অ্যান্ড আই’ (মূল স্প্যানিশ ‘Platero y yo’) এই কাল্পনিক সহযাত্রার কাব্য। প্রকৃতি আর জীবন ছুঁয়ে ছুঁয়ে দু’জনের পথ-চলায় কবির নিজেরই গ্রাম আন্দালুসিয়ার মোগের উঠে আসতে থাকে, তার আঙুরের খেত, পাইনবন, লোনা জলাভূমি, মরু-অঞ্চল নিয়ে, তার অস্থিপ্রাঙ্গণ, চার্চ, উৎসব, মানুষজনের উচ্ছ্বাস, বেদনা, দারিদ্র, স্ববিরোধিতা সবটা মিলিয়ে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকা’-র মতোই, গদ্য আর কবিতার সীমা অবিরত মুছে দিয়ে ‘প্লাতেরো’-র লেখা কখনও হয়ে উঠছে কথিকা, কখনও নিবিষ্ট স্বকথন। তবে ‘লিপিকা’-র ভুবন বাস্তবের সত্য আর কল্পনার সত্য মিলিয়ে নিয়ে মায়াময়, আর ‘প্লাতেরো’-র পৃথিবী ছুঁয়ে যায় রোজকার জীবন, যেখানে নিষ্পাপ বালক-বালিকা, দুর্বল, রুগ্ন, প্রতিরোধহীন শিশুর পাশাপাশি ভণ্ড যাজক থেকে শুরু করে ঘেয়ো কুকুর অথবা খোঁয়াড়ে বাতিল ঘোড়া। পথ চলতে চলতে প্লাতেরোর সঙ্গে কবির যে দ্বিরালাপ, তা তাঁর নিজেরই সঙ্গে সংলাপ যেন সারাক্ষণ।

zoom
ব্রেসোঁর ছায়াছবিতে মারি আর তার পালিত গাধা বালথাজার

ব্রেসোঁর ছবিতে মারি আর তার পালিত গাধা বালথাজারের একটি সহযাত্রাই সম্ভব হয়ে উঠছে, যদিও রূপক অর্থে; পিরেনিস পর্বতের কোলে এক শহরতলির ফার্মে বালিকা মারি যেদিন গাধাটিকে ভালোবেসে নিজের করে নিয়েছিল, সেদিনই দু’জনের জার্নি শুরু। একই সঙ্গে বড় হতে হতে দু’জনেই চিনে নিচ্ছে জীবনের বহুমুখ– ক্রমাগত হস্তান্তরে বদলে যায় গাধার মালিক, ততদিনে তরুণী মারি পুরুষের ভোগ-অধিকারের সামনে প্রতিরোধহীন। প্রথম ফার্ম বিক্রির পরে নিরাশ্রয় গাধাটি এসে পড়ছে অন্য ফার্ম-মালিকের অযত্নের মধ্যে, আর তারও পরে এক স্থানীয় বেকারির কাজে; মারি ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হতে থাকে বাল্যপ্রেমের থেকে আর বালথাজারের থেকেও। একদিকে একে একে জেরার্ড, আর্নল্ড অথবা মিল-মালিকের মতো অধিকারপ্রবণ পুরুষ মারির জীবনে আসে যায়, অন্যদিকে গাধাটি কখনও ভ্রমণ সংস্থায় খাটে, কখনও সার্কাসে, কখনও মিল-মালিকের জন্য কঠিন শ্রমের বাধ্যতায়। দু’জনেই ভালোবাসার পাশাপাশি চিনেছে ‘ক্ষমতা’-র ভাষা, বশ্যতা আর অবদমন।

zoom
বালথাজার ছবির শুটিংয়ে খোদ ‘বালথাজার’-এর সঙ্গে রবার্ট ব্রেসোঁ। ছবি: জর্জেস মিনাজার (১৯৬৬)

প্লাতেরোর যাত্রাপথ মিলিয়ে নিচ্ছে সুখ, শোক, ক্রোধ, উচ্ছ্বাস, লোভ আর অমলতার দ্বৈত জীবনে, চরিত্রে। কখনও সামনে সেই যাজক, রাগে অন্ধ হয়ে যে ঢিল ছোঁড়ে নিষ্পাপ মানুষজনের দিকে, কখনও কৃষ্ণাঙ্গ গৃহভৃত্য স্যারিটো অথবা খ্যাপাটে মানুষ পিনিটোর প্রতি উপহাস, কখনও বুলফাইটে উল্লাসে মত্ত দর্শক। অন্যদিকে, নিরন্ন শিশু, ফোয়ারার জলে হাত রেখে শুয়ে থাকা দরিদ্র একলা বালক, অথবা টিলার মাথায় বাঁশি-বাজানো দুঃখী নিঃসঙ্গ মেষপালক। ব্রেসোঁর ‘পিকপকেট’, ‘এ ম্যান এসকেপড’, অথবা ‘মুশেত’-এর মতো ছবিতেও দেখছি একটি অসমঞ্জস সমাজ, যেখানে প্রতিরোধহীন মানুষ বিপন্ন, বিচ্ছিন্ন সামাজিক আর ব্যক্তিগত স্তরেও। ‘বালথাজার’ ছবিতে লোভ, প্রতিহিংসা, দেহ-রাজনীতির সঙ্গে গোষ্ঠী-সংঘাত, খুন-জখম জুড়ে গিয়ে একটি ডিসটোপিয়াই গড়ে উঠল; আশ্চর্য নয় যে মারি আর বালথাজার দু’জনেই বারবার পালিয়েছে বাধ্যতার যাপন আর অপ্রেম থেকে। শেষে জাক মারিকে ফিরে পেতে চাইলেও পুরুষের নির্যাতনে তরুণীর মৃত্যু, আর পরেই জেরার্ড বনাম বন্দররক্ষীদের সংঘর্ষে গুলির আঘাতে গাধাটির মৃত্যু; ব্যক্তির অস্তিত্ব, স্বাধীনতা আর আইডেন্টিটির প্রশ্ন নিহিত রইল।

zoom
‘বালথাজার’ ছবির পোস্টার এবং ‘প্লাতেরো অ্যান্ড আই’ বইয়ের প্রচ্ছদ

প্লাতেরো যদি এক কবির বিকল্প সত্তাই হয়ে ওঠে, বালথাজারও তাহলে মারির। দু’জনেই একদিকে যেমন শুদ্ধ-চেতনার আদিপ্রতিমা, অন্যদিকে চারিদিকের সুন্দর আর অ-সুন্দরের মধ্যে যেন ক্রমাগত একটা ভারসাম্যই গড়ে দিচ্ছে, প্রশমিতও করছে হিংসা, হিংস্রতা। প্রবাদ-প্রবচন হোক অথবা উপকথা, গাধা প্রায় সব ক্ষেত্রেই অল্পবুদ্ধির সঙ্গে জড়িয়ে; স্পেনের সাহিত্যের ইতিহাসে, ডন কিহোতের কল্পনার উচ্ছ্বাসে ভরা ‘শিভালরি’-র বিপরীতে, সাঞ্চো পাঞ্জার গাধা ড্যাপল অবশ্য সমস্ত অভিযান জুড়ে একটা ঘোর বাস্তববাদিতার প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিল। প্লাতেরো আর বালথাজার সম্ভব করে তুলছে সৌন্দর্য, অন্তর্লীন বিষাদ আর মিস্টিকাল চেতনা মিলিয়ে নিয়ে একটি দীর্ঘ যাত্রা। দু’জনেরই মৃত্যু আঘাতে, আর এর মধ্যেও ক্রিশ্চান ধর্ম-বিশ্বাসের অনুষঙ্গ থেকে যাওয়া সম্ভব।

zoom
‘বালথাজার’ ছায়াছবির একটি দৃশ্য

সমাহিত প্লাতেরোর সামনে কবির যে শান্ত প্রার্থনায় হিমেনেথ শেষ করেন, সেখানে শোক পার হয়ে যায় শান্তি, কল্যাণ। আশ্চর্য নয় যে ব্রেসোঁর জন্য শেষ দৃশ্যে মৃত বালথাজারকে ঘিরে মেষপালক আর মৃদু ঘন্টা-ধ্বনি নিয়ে তার ‘ফ্লক’-এর উপস্থিতি জরুরি হয়ে উঠছে। বিষাদের মধ্যেও দর্শক পড়ে নেয় ত্রাস থেকে ত্রাণের ইঙ্গিত। অন্তর্মুখী, অনুচ্চ স্বরে হিমেনেথ তাঁর কবিতায় আর ব্রেসোঁ সেলুলয়েডে লোকজীবনের যে আখ্যান বুনেছেন, সেখানে দুই গাধা হয়ে উঠল যেন দেশকাল, চরিত্র, মনোচেতনার আলো-আঁধারির শান্ত, অলগ্ন দুই ভাষ্যকার।

Au hasard Balthazar Juan Ramón Jiménez Robert Bresson Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on