Robbar

গ্রীষ্মদুপুরের ছায়াছবি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 25, 2026 7:44 pm
  • Updated:May 25, 2026 7:50 pm  

গ্রীষ্মের দুপুরের যদি ফেসবুক থাকত, অ্যাকাউন্টে নীল টিক থাকত। দুপুরের মধ্যে সে-ই একমাত্র সেলেব্রিটি। দ্বিতীয় স্থানে শীতের দুপুর। কিন্তু হেমন্ত-বসন্ত-বর্ষা এমনকী, শরতের দুপুরও তেমন আমল পায় না। এই প্রবল গরমে তাই রোববার.ইন দুপুরসংক্রান্তি।  

সৌমেন ঘোষ

তপ্ত ভীষণ চুলা জ্বালি নিজ বক্ষে
পৃথিবী বসেছে পাকে, চেয়ে দেখ চক্ষে,
আম পাকে, জাম পাকে, ফল পাকে কত যে,
বুদ্ধি যে পাকে কত ছেলেদের মগজে!

এই ক’টা পঙ্‌ক্তি ১৩২৩ বঙ্গাব্দের ‛সন্দেশ’ পত্রিকায় লিখছেন সুকুমার রায়। যতই গ্রীষ্মের দুপুরকে ‛তপ্ত ভীষণ’ বলুন, এই গ্রীষ্মকালের দুপুর-শেষের দক্ষিণ খোলা জানলার উড়ালি হাওয়া আমাকে বড় করেছে। গ্রীষ্মাবকাশ নোটিস আমাকে উপহার দিয়েছে হারমোনিয়াম বিকেল। কোচিং ক্লাসের শেষে পাশাপাশি হেঁটে গিয়েছে একজোড়া মানুষ। বোকা তাকিয়ে থাকা বাসস্টপ দূর থেকে শুষে নিচ্ছে ঘামতেল মাখা সস্তা পাউডারের গন্ধ।

জর্জ স্যুরা

গ্রীষ্ম ছিল ছেলেবেলায়। সে দুপুরছুটি বন্ধক রাখা আছে ২৫ বৈশাখের নাটক রিহার্সালে। বন্ধুরা হাতে হাত। মহলার ঘরে শপথ। বড় হয়ে আমাদের যখন অনেক টাকা, তখন আমরাও একটা নাটকের দল খুলব। গ্রীষ্ম এসেছে এই অবেলায়। টাকা আমাদের এসেছে বটে, কিন্তু সেদিনের সেই শপথ ধুলো মেখে ফসিল হয়ে গিয়েছে মহলাকক্ষের ঝুলবারান্দায়। কোনও এক বিকেলশেষের দমকা কালবৈশাখী তাকে একটু দোলা দেয় মাত্র, তবে কোনও ছিটকে আসা জলের ছিটে তাকে প্রাণ ফিরিয়ে দেয় না।

দুপুরশেষের পথ ঢেকে আছে হলুদ পাতায়। সেই পাতা আলতো করে মাড়িয়ে বেণি দুলিয়ে পড়তে যাচ্ছে রিঙ্কি। প্রখর মেধা, বীরোচিত সাহস, ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণার মতো সহজাত গুণ আমার মধ্যে নেই। রিঙ্কিকে লেখা চিঠিগুলো রাখা আছে বৈষ্ণব পদাবলির বইয়ের ভিতর।

রিঙ্কি আমাকে পাত্তা দেয় না। হেসে গল্প করে রাসুদার সঙ্গে। রাসুদা বম্বেতে জুয়েলারির কাজ করে। ওর ম্যানিব্যাগ ফুলে থাকে টাকার গরমে। হাতে সলমন খানের মতো ব্রেসলেট। মাথার চুল হালকা লালচে– হাওয়া বিলি কেটে দেয়। তাদের হেসে হেসে গল্প করতে দেখে আমার ‘ফাটি যাওত ছাতিয়া’! গ্রীষ্মদুপুরেই গ্রামের সাঁকোর ধারে আমার প্রেম ভেসে গিয়েছিল পরপুরুষের হাত ধরে। তারপর অনেক গ্রীষ্মকাল আমার জীবনে এলেও, আমাকে মনে করে কোনও কুমারী মেয়ে কোনও দিনও ভাসিয়ে দেয়নি তার কুমারী ব্রতের প্রদীপ। রিঙ্কির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল অন্য ঠিকানায়। হেরে যাওয়া সৈনিকের মতো মুখ নিচু করে হেঁটে এসেছিলাম গ্রামের তেতে ওঠা পিচরাস্তা দিয়ে।

গ্রীষ্মকালে মাঠে চাষ হচ্ছে তিল। সাগরদা মাথায় গামছা চাপা দিয়ে চাঁচুনি দিয়ে নিড়িয়ে নিচ্ছে জমির আগাছা। পাশের পাটখেতের পাতায় পাতায় ঢেউ দিচ্ছে বিবাগি হাওয়া। গেল বছর তার দাদা এই জমিতেই বিকেলে কাজ করতে করতে মারা গিয়েছিল। বজ্রাঘাতে। মৃত শরীর আমরা বয়ে এনেছিলাম গ্রামের পিচ রাস্তা দিয়ে। সাগরদার বউ জমিতে পান্তাভাত নিয়ে এসেছে, সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ। সাগরদা জমিতে বসেই পান্তাভাত খাচ্ছে। বউদি তার আদুল গায়ে গজিয়ে ওঠা ঘামাচি মেরে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে রিঙ্কির ওপর আমার আর রাগ হয় না। মনে হয় গ্রীষ্মকাল শুধু কেড়েই নেয় না, ফিরিয়েও দেয়।

গ্রীষ্মদুপুরের বিশাল রৌদ্রতাপ একদম সহ্য করতে পারে না বাবা। ঠাকুমাকে পুড়িয়ে আসার সময় বৈশাখের তাপ গলিয়ে দিচ্ছে শ্মশান থেকে বাড়ি ফেরার পিচরাস্তা। ওরে বাবা রে! ওরে বাবা রে! পায়ে ফোসকা পড়ে গেল রে– বলতে বলতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ি ফিরছেন বাবা। অশৌচ পায়ে কোনও হাওয়াই চটি পড়তে নেই। সেই সময় প্রকৃতির অনেক কাছে গিয়ে খালি পায়ে ভূমা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে হয়।

এক গ্রীষ্মকালেই বাবা মারা গিয়েছিল। যে-মানুষ তার মা’কে পুড়িয়ে ফেরার সময় পথের সামান্য গ্রীষ্মতাপ সহ্য করতে পারেনি, সে চুল্লির এক পৃথিবী তাপ হজম করে নিয়েছিল! আমি অশৌচ শরীরে পিচ রাস্তা দিয়ে কাছা-গলায় ফেরার সময় আকাশে দেখেছিলাম বিকেলঘুড়ির সুতো কেটে গিয়ে পাড়ি দিচ্ছে বিদর্ভ নগরে। সেদিন রাতে কারেন্ট চলে যাওয়ার পর ছাদে শুয়েছিলাম। পালেদের বাড়ির মাইকে হরিনাম। অন্ধকার আকাশতারার দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম মানুষ আসলেই অমৃতের সন্তান।

চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ জুড়ে শিবের গাজন চলে বাংলার গ্রামে গ্রামে। সূর্য উত্তরায়ণে গিয়েছে। রোদ সরে গিয়েছে শিবতলার ঢালাই পথে। খোলা পিচরাস্তার চৈতালি ঘূর্ণির মাঝখান দিয়ে হেঁটে আসছে একদল গাজনের সন্ন্যাসী। গ্রীষ্মের লু বয়ে আনছে ঢাকের বোল। গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাদের গলা থেকে উঠে আসছে বোলান গান। বোলান গানে ফুটে উঠছে মানুষের মঙ্গলকামনার কথা। মূল সন্ন্যাসী শম্ভুদা ধুয়ো তুলছে, বাকিরা একসঙ্গে গেয়ে উঠছে–

‘ও বাবা বুড়ো শিবের চরণে আজ করিগো প্রণাম।
সবাই বলে সুফল ফলে, নিলে বাপের নাম।’

গ্রামের মানুষ সন্ন্যাসীদের দিচ্ছেন টাকা, ফল, বাতাসা। জীবন শিখিয়ে দিচ্ছে ভোগ নয়, ভিক্ষাবৃত্তির আখ্যান।

মহাদেব বা শিব বাঙালির চিরকালের চ্যাপলিন। একই সঙ্গে সৃষ্টি আর ধ্বংসের নায়ক। যাঁর কাছে শিখতে হয় প্রেম আর ভবঘুরেপনা, প্রলয়ের নৃত্য আর উদাসীনতার কাব্য, দুঃসাহস আর কুঁড়েমি, নেশাভাং আর অলৌকিক ধ্যানের ক্ষমতা! গ্রীষ্মের দুপুরে উত্তরীয় বেশ উঠে এসেছে আমার শরীরে। অফিসের টার্গেট পূরণ, প্রমোশন, সংসারের হিসাব-নিকাশ, দিনশেষে নরম বিছানায় শান্তির ঘুমের বাইরেও আছে বৈরাগ্যের জীবন। কিছুদিন অন্তত লোভনীয় খাবার ছেড়ে দিয়ে, শুধুমাত্র আলোচালের হবিষ্যান্ন খেয়ে কেটে যায় গ্রীষ্মের দুপুর। মেঝেতে গামছা বিছিয়ে মাথার বালিশ ছাড়া শুয়ে মনে হয়– জীবনে বড় মানুষ হতে গেলে নিজেকে ফকির করতে হয়। শিব বারেবারেই মানুষকে মিলিয়ে দেন। চৈত্রের পাতাখসা দুপুরে সন্ন্যাসী রতন গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে একসঙ্গে বসে বিড়ি খাচ্ছে দিনু বাগদি। চৈত্রদুপুর আনে কৃচ্ছ্রসাধনের গল্প। দূরে খাঁ পাড়ায় শুরু হয়েছে রোজার মাস। প্রতিদিনের দিনলিপিতে ফজরের আজান থেকে মাগরিবের আজান পর্যন্ত যে দীর্ঘ দূরত্ব– তা শিখিয়ে দেয় দুপুর রোদে পুড়ে পুড়ে সোনার মানুষ ভজনা করার কথা।

‘মানিকবাবুর মেঘ’-এর একটি দৃশ্য

অবিরাম হলুদ পাতার খসে পড়া, পাতা ঝরে যাওয়া গাছের দিকে তাকালে কি অনিবার্য হয়ে আসে পৃথিবীর এই রূপ? পিচপথের ওপর দিয়ে দৃষ্টি চালিয়ে দূরের রোদ-ঝলসানো মাঠের মাঝখানে দেখতে পাওয়া যায় একটা মাটির ফাঁকা কুঁড়েঘর। এই ঘরটি দেখলেই আমার মনে ঘাই মেরে ওঠে স্বর্ণ ডাইনির কথা। রাঢ়ের বৃক্ষহীন প্রান্তরে চৈত্রের যে-বাতাস অবিরাম বয়ে যায়, তার ভিতরে লুকিয়ে থাকে মেঘনীল বিকেলের কিস্সা‌। দুপুরকে দূর থেকে বিরহতানে মায়া রেখে ভালোবাসতে হয়। কাছে গিয়ে তার শরীরে শরীর মিশিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেই বানজারা দস্যুর মতো সে ছারখার করে দেয় জীবনপথের পাঁচালি। গ্রীষ্মকালের দুপুর শেষ হলেই, একদল মেয়ে পড়া শেষ করে বাড়ি ফেরার জন্য তাড়াহুড়ো লাগিয়ে দেয়। রোদ্দুর মরে আসে তাদের স্যান্ডেল মাড়িয়ে যাওয়া ঘাসে-ঘাসে। শেষ হয়ে আসা গ্রীষ্মকাল যেন আমার জীবনে রোদে তেতে ওঠা পিচরাস্তার প্রতীকে আধো ঘুমে জেগে থাকে। দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা শেষে রাত নামলে আমি এসে দাঁড়াই পিচরাস্তার ওপর। আকাশ দিয়ে উড়ে চলে যায় উড়োজাহাজ। আমার হাতের টর্চের আলো আকাশপিদিম দেখায় ছায়াপথে উড়ে যাওয়া একদল মানুষকে।