

বীরেন দে-র আন্তঃসংলাপের দৃশ্যায়িত বয়ানটি ধরা থাকে এক অতীন্দ্রিয় বোধভাষ্যে। তিনি তৈরি করেন তাঁর একান্ত নিজস্ব প্রতীক, নিজস্ব বিন্যাস এবং এক গভীর অন্তর্লীন খননে। সেই সত্য যা গুহায় নিহিত, কিন্তু যার দ্যুতিরেখা সদা প্রোজ্জ্বল– সেই গহীনেই তাঁর আত্ম-অন্বেষণ। এজন্যই তাঁর ছবিতে থাকে এক নিস্তরঙ্গ উপলব্ধির আকাশ, যার সামনে নতজানু হতে হয়।
‘Symbols are like sounds I hear inside me, inside my loneliness to which I am united. When I paint Purusha and Prakriti, this is not a subject, it is a continual movement and quest in life.’
–Biren De
এই পৃথিবীর রূপ রস গন্ধে জারিত হয় মানুষের হৃদয়। সামাজিক, রাজনৈতিক দোলাচলে আন্দোলিত হয় মানুষের মন। কখনও-বা আধ্যাত্মিক চেতনার টানে উদ্বোধিত হয়। কিন্তু তবু সকলেই কবি বা শিল্পী হয়ে ওঠেন না, এমনকী শিল্প বিদ্যালয়ের পাঠক্রম শেষ করলেও শিল্পের সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন না সবাই। সব সাধনার মতোই শিল্পসাধনা এক দীর্ঘ পরিক্রমা, আর সেই পথে, সেই একক যাত্রাপথে অন্তরের তীব্র তাগিদ, সেই ধেয়ানের আলোকরেখাকে সম্বল করে এগিয়ে যেতে হয়। সহায় শুধু সৃজন-বেদনা অথবা সৃষ্টির আনন্দ। কিছু কিছু শিল্পী এমন এক অন্তর্লীন গভীরতা নিয়ে জন্মান, যা তাঁদের পক্ষ থেকে পক্ষান্তরে, রূপ থেকে রূপান্তরের সন্ধানে ছুটিয়ে নিয়ে যায় সমস্ত জীবন ধরে। যা যা পরিচিত, যা দু’চোখ মেলেই দেখা যায়– তার চাইতে যা অনাহুত, কোনও কোনও সময় হয়তো তা-ই ধরা দেয় তাঁদের ছবির রূপে বর্ণে ছন্দে– কখনও রূপকে, কখন প্রতীকে, কখনও-বা এক বিমূর্ত রঙিন ছন্দোবন্ধনে। তাঁদের কাজ আমাদের ভাবায়, কাজের অভিনবত্ব ধাক্কা দেয় দর্শক-মনকে। বোঝা-না-বোঝার দোলাচলে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের বলি যুগাগ্রবর্তী বা আভাগার্দ। এমনই এক শিল্পী– বীরেন দে। শতবর্ষের বিনম্র আলোয় আজ আবার তাঁর চিত্রকর্মের দিকে তাকালে ধরা দেয় এমন কিছু ভাবনা, দর্শন– যা দর্শকমনে নিয়ে আসে অনুভূতির এক অন্যতর দ্যোতনা।

দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর শিল্পী-জীবনের বৈচিত্র ও বিস্তারও বহুস্তরীয়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে ভাবনার, দর্শনের সমন্বয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন যে অন্বিষ্ঠ শৈলী, কালক্রমে তা পরিণত হল এক সজীব ধারায়– যা সমকালীন ভারতশিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সংযোজন। বহু সমকালীন এবং অনুজ শিল্পীর নিঃশব্দ প্রাণনা। শিল্প-ঐতিহাসিকরা তাঁর ছবিকে আখ্যা দিয়েছেন নিও-তান্ত্রিক বা নব্য তান্ত্রিক। অথচ বীরেন দে-র জন্মশতবর্ষে তাঁর কাজগুলি দেখতে দেখতে এই একক যাত্রার কথাই মনে হয়। তাঁর কাজ– অনেকটাই যেন না-জানা না-বোঝা। জীবৎকালে তিনি যথেষ্ট খ্যাতিলাভ করেছিলেন, তবু যেন মনে হয়, তাঁর ছবি বা শিল্পভাষার গভীরে না গিয়ে, কোথাও যেন ‘তান্ত্রিক অনুশীলন ও ধর্মগ্রন্থ দ্বারা প্রভাবিত’ এই তকমায় আড়াল করে রাখা হয়েছে তাঁর চলমান অনুসন্ধিৎসাকে। কোথায় যেন অস্বীকার করা হয়েছে তাঁর সোচ্চার ঘোষণাকে: “I am an agnostic… I don’t talk about these [tantric] things, but I know about energy.”

শুধু তো এই ঘরানার ছবি নয়। অল্প হলেও এঁকেছেন কিছু দৃশ্যচিত্র। বেশিরভাগ কাজ তেলরঙে করা হলেও প্যাস্টেল এবং জলরঙের কিছু কাজ রয়েছে তাঁর। এই দীর্ঘ শিল্প অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর। বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন বীরেন দে। কলকাতায় চলে আসেন এবং ১৯৪৪ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। সালটা লক্ষ করার মতো, কলকাতা তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমাতঙ্কে কাবু। শহর জুড়ে গ্রাম থেকে আসা মন্বন্তর-ক্লিষ্ট অভুক্ত রোগগ্রস্ত মানুষের ভিড়। ছবির ভাষাও দ্রুত বদলাচ্ছে এই কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে। জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ, কামরুল হাসান কিংবা সোমনাথ হোরের মতো তরুণ শিল্পীরা এঁকে চলেছেন সাদাকালো মৃত্যুর দিনলিপি। আর্ট স্কুলের পাঠ শেষ করলেন ১৯৪৯-এ। আর্ট স্কুলে থাকাকালীন তিনি প্রতিকৃতি ও ল্যান্ডস্কেপ রচনায় যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেন। এছাড়াও কিছু রূপকধর্মী ছবিও আঁকেন। যদিও সেগুলিতে পোস্ট-ইমপ্রেসনিস্ট ছবির প্রভাব লক্ষ করা যায়।

এরপর ১৯৪৯ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ম্যুরাল আঁকার বরাত পেয়ে দিল্লিতে চলে যান। চার-পাঁচের দশকে করা সব ছবিতেই শুধু নয়, তাঁর এই ভিত্তিচিত্রটিতেও তাঁর অতীন্দ্রিয় ভাবনা, জগৎ ও জগতের রহস্যানুসন্ধানের ইচ্ছা চিনে নেওয়া যায়। অজিত মুখার্জির দেওয়া ভিত্তিচিত্রের বর্ণনাটি উদ্ধৃত করা হয়তো এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না:
‘In this mural he had placed somewhat symbolic human figures representing the arts and sciences together with the four elements earth water fire and air against the backdrop of cosmos.’

১৯৫১ সালে প্যারিসের স্যালন ডি’মাই-তে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর দিল্লির কলেজ অফ আর্টে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন বীরেন দে এবং ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত সেখানেই কাজ করেন। দিল্লির কলেজ অফ আর্ট-এ থাকাকালীন ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে নিউ ইয়র্কে বছর খানেক কাটান এবং সেখানকার মিউজিয়ামগুলিতে সমকালীন পাশ্চাত্য শিল্প-সহ নানা দেশের শিল্পবস্তুর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। এই দীর্ঘ চিত্রজীবনে শুধু ভারতবর্ষ নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তিনি একক প্রদর্শনী করেছেন। এবং নানা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন ভারতীয় শিল্পী হিসেবে। সমকালীন শিল্পবিশ্বে তাঁর এই ব্যাপক পরিচিতির সূচনা ১৯৫১ সালে প্যারিসের স্যালন ডি’মাই-তে একক প্রদর্শনীর মাধ্যমে। আর আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে, তাঁর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ১৯৬২ সালে অনুষ্ঠিত ভেনিস বিয়েনালে, যেখানে তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এই ১১ বছরেও বহু প্রদর্শনী হয়েছে তাঁর। এরপরেও গত দশকের শেষ পর্যন্ত দেশে-বিদেশে বহু প্রদর্শনী হয়েছে– একক বা যৌথ। প্রদর্শনী করেছেন জাপান, ব্রাজিল, অস্ট্রিয়া; আবার ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শহরে। দিল্লিতে প্রতিবছর একাধিক একক ও সম্মিলিত প্রদর্শনী তো হতই, তাছাড়া বম্বে এবং দেশের নানা যৌথ প্রদর্শনীতেও কাজ থাকত তাঁর।

লক্ষ করলে দেখা যাবে যে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত তাঁর এই প্রথম প্রদর্শনীর ক্যাটালগে ছাপা ছবিটি ফিগারেটিভ। আসলে দিল্লিতে বসবাস শুরু করার পর থেকে এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন। একদিকে ছুটি পেলেই ছুটে যেতেন শহর থেকে অনেক দূরে সাঁওতাল গ্রামে, জীবনযাত্রার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে। যেন সেই আদিম বিশ্বাসের, যাপনের স্বাদ তাকে নিয়ে যাবে মাটির কাছাকাছি– জীবনের ঘ্রাণ দেবে, শরীরী চেতনাকে পূর্ণ উপভোগের মাধ্যমে যুক্ত করবে প্রথম আদি শক্তির সঙ্গে– যেখানে শরীরের আবেদনই চরম আনন্দের উৎস, যেখানে প্রকৃতির উদ্দাম সৌন্দর্য জোগায় জীবনীশক্তি। এই পর্যায়ের ছবিগুলি দেখলে এই শরীরী মাদকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়।

আপাতদৃষ্টিতে ছবিটি ইউরোপীয় শৈলীতে করা ন্যুড স্টাডির মতোই। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যায়, চিত্রপটে প্রায় পুরোটা জুড়েই এই শায়িত মানবী, শরীরে একটি সুতোও নেই, কিন্তু চুলে গোঁজা ফুল, যা প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বোঝাচ্ছে। লাল, সবুজ, গোলাপি কোনাচে টুকরোর বিছানা এবং তার বিপরীতে পিঠ এবং কোমরের অংশ কালো রেখা দিয়ে যেন চিহ্নিত করা হয়েছে। ফিগারটিতে ভাস্কর্য সুলভ মডিউলেশন, কিন্তু ভঙ্গিটি যেন একটু আড়ষ্ট, যেন খেলাশেষে ছুড়ে ফেলা পুতুলের মতো, পাশের পুতুলটিও যেন সেই একাত্মকরণের ইঙ্গিতবাহী। বীরেন দে-র এই পর্যায়ের ছবিতে এরকম কালো রেখার ব্যবহার, যা এক অদৃশ্য জলের মতো ঘরে রাখে এই ফিগারগুলিকে। তীব্র, উজ্জ্বল, শক্তিশালী হলুদ, সবুজ এমনকী সাদা রঙের আশ্চর্য আবেদন পাঁচের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আঁকা ছবিতে। কিউবিজম ও অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেসনিজমের শৈলীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাদৃশ্য থাকলেও বিষয় ও আঙ্গিকে তিনি বারবার ফিরে যান শিকড়ের কাছাকাছি। এই পর্যায়ে আঁকা তাঁর ছবিগুলির মধ্যে জীবন ও জগৎ নিয়ে এক গভীর অন্বীক্ষা দেখা যায়, যা ক্রমশ তাঁর ছবিকে আকার থেকে আকারহীনতার দিকে নিয়ে যায়। খানিক আশ্চর্য লাগে– যখন জানা যায় যে, যখন তিনি আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করছেন, তখনই আবার তিনি ছুটছেন বিভিন্ন মঠে, মিশনে– কথা বলছেন নানা সাধকের সঙ্গে, জগৎ জীবন চৈতন্য দেহবাদ ও অতীন্দ্রিয় অনুভূতি নিয়ে তাঁর নানা প্রশ্ন ও সংশয়ের নিরসন করতে। তাঁদের নিয়ে আঁকলেনও বেশ কিছু ছবি। ‘Vaishnavites’ শীর্ষক ছবিটি উল্লেখযোগ্য।

আসলে এগুলি বিপরীতধর্মী নয়, পরস্পরের পরিপূরকও বটে। এই ছবিগুলি অনেকটা যেন পটচিত্রের আদলে আঁকা। ত্রিমাত্রিকতার আভাস থাকলেও গাঢ় এবং হালকা ফ্ল্যাট রঙের স্পেসগুলো সবই কালো রঙের লাইন দিয়ে ঘেরা। হাফ প্রোফাইলে আঁকা চরিত্রগুলির অর্ধনিমীলিত চোখ বা মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই, গড়ন অনেকটাই অনড়, টুকরো-টুকরো জ্যামিতিক বিভাজন তাদের সর্বাঙ্গে। তিনটি ফিগার তিন রঙে আঁকা, কিন্তু নিচের হালকা হলুদ আর ওপরের টানা লাল রং এদের এক করে দিয়েছে। কেন্দ্রে রয়েছে এক টুকরো উজ্জ্বল হলুদ আলো, যা আত্মজ্ঞান বা চৈতন্যের দ্যোতক। বীরেন দে-র ছবির কেন্দ্রে থাকে এক গভীর অনুভূতি, আর এই উজ্জ্বল রঙের সম্মেলনে তার খানিক স্পর্শ ছুঁয়ে যায় দর্শক-মনকে। মনে হয় যেন এক তীব্র সংরাগ তাঁকে জীবন ও অস্তিত্বের রহস্য-সম্পর্কিত অজস্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাড়না করছে, আর সেই খোঁজ এবং পথের, যাত্রার এবং প্রশ্নের এক চমৎকার প্রতিফলন ধরা দেয় তাঁর এই সময়কার ছবিতে।

আত্মা বা চৈতন্যের প্রকাশ দেহে। দেহকে জানলে তবেই তাকে অস্বীকার করে চৈতন্যের উপলব্ধি করা যাবে। দেহ যে ‘আমি’ নই, ‘আমি’র স্বরূপ যে চৈতন্য– সেই জ্ঞানের পথটি তো সহজ নয়। তাঁর সে সময়কার মানসিক দোলাচলের খানিকটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাঁর নিজের লেখায়:
‘As an artist I had to follow my own path and whatever was happening inside me had to come out on my canvases. In my own way I was trying to assimilate these two seemingly disparate experiences, of one with the tribal folks and other with the seekers of truth, one vital and raw, the other austere and serene. To me the synthesis of the two was the ideal, as I felt they were two different manifestations of the same source-energy.’

১৯৫৬-র পর থেকে তাঁর যাত্রার অভিমুখ বদলাবে, ধীরে ধীরে তিনি সেই উপলব্ধি ফুটিয়ে তুলবেন তাঁর ছবিতে। কিন্তু তার আগে ১৯৪৯ সালে করা দু’টি ছবি দেখে নিতে হয়।
কালো রেখার বাঁধন নেই, এক অদ্ভুত আলোর আভা সমস্ত ছবি জুড়ে, ছবিটির নাম ‘মাদার স্যাকরিফাইসিং দি চাইল্ড’। কোনও এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত রয়েছে ছবিটিতে। এক আধ্যাত্মিক প্রশ্নও। মা, যিনি জন্মদাত্রী, তিনিই আবার মৃত্যুদূত যেন। এই সম্পর্কের দ্বন্দ্ব আলোকিত প্রেক্ষাপটে কালচে নীল ফিগারটির উপস্থিতিকে ফুটিয়ে তুলেছে।

আবার ‘এনকাউন্টার ইন দি ডার্ক’ ছবিটির নামখানাও খুব ব্যঞ্জনাময়! এ ছবিটি প্রায় তাঁর আগের পর্যায় এবং পরবর্তী পর্যায়ের ছবির মধ্যে এক সেতুবন্ধনের মতো। একই ধরনের জ্যামিতিক ফিগার; কিন্তু তারা যেন জীবনের আলো-আঁধারিতে দেখা চিরন্তন নারীপুরুষের প্রতীক। এই অন্ধকারে তাদের দেখা যেন নিয়তি নির্ধারিত। ছবিটির কোনায় হাতের আভাসটি যেন তারই ইঙ্গিত করে। তিনটি উল্লম্ব কালো পিলার চিত্রপটকে তিন ভাগে ভাগ করেছে। মাঝখানে একটি সবুজ চারাগাছের আভাস, নতুন সৃষ্টির দ্যোতক। একদিকে আলোর হলুদ, অন্যদিকে রাত্রির গাঢ় নীল চিরন্তন পুরুষ ও প্রকৃতির রূপক। এর পরের পর্যায়েই তিনি ফিগারের ব্যবহার পুরোপুরি ছেড়ে দেবেন, এই নীল-হলুদ রংগুলি হয়ে যাবে বিমূর্ত রঙের জ্যামিতি, সৃষ্টিরহস্য ও তার উদ্ভাসের দীপ্তি।

এই সময়কার ছবিগুলি সম্বন্ধে তিনি বলেছেন:
‘The architectonic principle on which these compositions were based were a recurring factor in all my works, the figures and the environment would be bound together by a story grid constituted out of different arrangement of black lines, vertical horizontal elliptical…’
ওঁর এই পর্বের ছবি এবং শিল্পীর বক্তব্য যে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ– তা আর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। ছবিগুলি তাঁর এই ভাবনার সার্বিক প্রতিফলন।

পাঁচের দশকের মাঝামাঝি থেকেই তাঁর ছবিতে রদবদল চোখে পড়ে। নারীপুরুষের যৌথ উপস্থিতি পাঁচের দশক থেকেই তাঁর ছবির অঙ্গ হয়ে উঠছিল। বিভিন্ন ছবিতে তাদের উপস্থিতি দুই বিপরীত শক্তির প্রকাশ হিসেবেই উঠে আসছিল। আস্তে আস্তে ফর্ম ভাঙতে লাগল, স্বেচ্ছাকৃত গাঠনিক শৈথিল্য দেখা দিল, অনুপুঙ্খ বিবরণ প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ঠাঁই নিল আর পরিশেষে কৌণিক এবং শঙ্কুর আকারের ফর্মগুলি বদলে গোলাকৃতি, ডিম্বাকৃতি, কখনও অষ্টকৌণিক জ্যামিতিক আকার দেখা দিল তাঁর চিত্রপটে। যে শক্তির কথা বারবার ফিরে আসে তাঁর বক্তব্যে বা লেখাতে, সেই আদি শক্তির উৎস অনড় প্রকৃতি, যা পুরুষের বীজ ধারণ করে সৃজনলীলায় মেতে ওঠে– তাকেই যেন বারবার নানা প্রতীকে নানা রূপকে ফুটিয়ে তুললেন। তাঁর ছবিকে সমালোচকরা নব্য তান্ত্রিক ছবি আখ্যা দিয়েছেন। তন্ত্র অর্থাৎ তনু-কে যা ত্রাণ করে বা বিস্তারিত করে; অর্থাৎ আত্মজ্ঞান লাভের জন্য প্রথমে দেহজ্ঞান লোপ পেতে হবে। আর সেই জ্ঞানের আলোকরশ্মি ধরে জাগ্রত হবে চৈতন্য, উপলব্ধি হবে দেহ ও আত্মার একাত্মতা। এই যে অন্তহীন যাত্রা, অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের জ্যোতির দিকে, এই যে জীবনের চিরন্তন খোঁজ– একেই তিনি ধরেছেন তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে। প্রথম আদিশক্তির উৎসারণ ও বিস্তার, মিলন ও সৃজন– এ-ই তাঁর বাকি জীবনের সৃষ্টিকর্মের মূল সুর। তাঁর ছবির থেকেও যেন বিদায় নিল দেহভাব, ইঙ্গিতে, দ্যোতনায় অন্তঃশায়ী অবিনির্মাণের প্রক্রিয়া। তিনি বলছেন:
‘From around the end of 1957 the human figures in my compositions started getting disembodied and turning into free shapes and units, and these shapes were placed on a darkness, foreground denoting earth, they would often group together in the form of a womb opening up to the light in the horizon, holding inside it the promise of a new birth.’

এই ছবিগুলো পরপর দেখলেই বদলটা স্পষ্টভাবে চোখে পড়বে। দু’টি ছবিতে মানুষের ফিগার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। প্রথমটি তাঁর বিখ্যাত ‘জেলে’ সিরিজের অন্যতম। তিনি বলেছিলেন বাদামি রঙের সাহায্যে তিনি মাটিকে বা পৃথিবীকে বোঝান– দু’জন মাটির খুব কাছাকাছি থাকা মানুষ, মাঝের উজ্জ্বল লাল রঙের মাছটি ছবিটির কেন্দ্রবিন্দু। আস্তে আস্তে এইভাবেই মানুষগুলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জ্যামিতিক আকারের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন। এর অনেকটাই স্থির, জীবনের উচ্ছ্বাস ধরা আছে মাছটির উজ্জ্বল রঙে। দ্বিতীয় ছবিটি সেই সময়কার, যখন তিনি তাঁর সবচেয়ে জোরালো ফিগারেটিভ কাজগুলি করছেন। চোখগুলি পটচিত্রের ধরনে আঁকা, কিন্তু শূন্য দৃষ্টি। মুখোমুখি লাল সবুজ রঙের ব্যবহারে যেন প্রতিফলিত হয়েছে টানটান উত্তেজনার মুহূর্তটি। চিত্রপট জুড়ে আছে গভীর উদ্বেগ ভয় আর তীব্র জমাট নৈঃশব্দ্য। আর অদ্ভুতভাবে সমস্ত ছবিটিকে জলের মতো জড়িয়ে রয়েছে কালো রেখার ছায়া। মাঝখানে হলুদের ব্যবহার যেন হঠাৎ আলোর বিচ্ছুরণ, যা এক অন্তর্লীন সংলাপের ছুটে যাওয়া। শেষ ছবিটি কিন্তু, যে এককের কথা তিনি বলেছিলেন, সেই বিচ্ছিন্ন এককে ভাঙা। তারা এখন মুক্ত, কালো গ্রিড নেই, মডেলিং-এর ত্রিমাত্রিকতা নেই, অনায়াস চলনে ওপরের নীল মিশে যায় নিচের গেরুয়া হলুদে। মাঝখানের ছোট ছোট লাল-কালো টুকরোগুলো– ওগুলোই পরবর্তীকালে হয়ে যাবে তাঁর যন্ত্রবীজ বা চক্র। এখনও তাদের সেভাবে চেনা যাচ্ছে না। তবে সামনের সাদা ইউ আকৃতিটি এরপর বারবার তাঁর ছবিতে যোনিচিহ্নরূপে ফিরে ফিরে আসবে। এই ছবির যে বিপুল শূন্যতা– তা তাঁর আগের কম্পোজিশনের থেকে একদম আলাদা। এই শূন্য এক অতীন্দ্রিয় শূন্যতার প্রতীক হিসেবে দেখা দেবে তাঁর পরবর্তী ছবিতে। যে শূন্যতা আসলে পূর্ণতারই আখর। পরপর এই ছবিগুলো দেখলে তাঁর ছবির বিমূর্তায়নের যাত্রাটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই নব পর্যায়ের ছবিতে বীরেন দে– অর্ধচন্দ্র, সমকেন্দ্রিক বলয় এবং মণ্ডলের মতো জ্যামিতিক আকার ব্যবহার করেছেন। তাঁর ‘নব্য-তান্ত্রিক’ শিল্পকর্মে প্রায়শই গাঢ় নীল এবং উজ্জ্বল লাল রঙের ব্যবহার দেখা যায়। বীরেন দে-র কিছু শিল্পকর্মে লিঙ্গ ও যোনি প্রতীকের মাধ্যমে মহাবিশ্বের পুরুষ ও নারী শক্তির মিলনকে ব্যঞ্জিত করা হয়। প্রকৃতি ধারণ করে পুরুষের বীর্য। তার প্রতীক হিসেবে ইংরিজি ইউ অক্ষরের মতো আকার বারবার দেখা যায়। আর পুরুষের লিঙ্গের প্রতীক কখনও দণ্ড, কখনও বা আলোকরশ্মি।

তন্ত্রসাধনার আবশ্যিক অঙ্গ যে যন্ত্র, প্রকৃতপক্ষে তা উচ্চতার চেতনায় পৌঁছবার দ্বার হিসেবে গণ্য করা হয়। তন্ত্রকে ভারতীয় সাধকেরা কেন্দ্রোত্থিত আদিশক্তির সঙ্গে মিলিত হওয়ার, কুলকুণ্ডলিনী চক্রকে জাগ্রত করার বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করেন; আর যন্ত্র হচ্ছে সেই যাত্রাপথে মানচিত্র এবং দর্পণ। মানচিত্র, কেননা সেটি সাধকের মনকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগত থেকে সরিয়ে বিন্দুস্থিত বা কেন্দ্রস্থিত করে। আর দর্পণ, কারণ তা বিশ্বনাচের লীলাছন্দকে একীভূত করে চৈতন্যের সঙ্গে যোগ স্থাপন করায়। অর্থাৎ সংযম (যম) আর মুক্তি (তন)– এই দু’য়ের সম্মেলন হচ্ছে যন্ত্রের আদি ও অন্ত। তাই যন্ত্র ব্যবহৃত প্রতীক– চক্র, সূর্য, পদ্ম এবং বীজ– বারবার ফিরে আসে তাঁর ছবিতে।

ফিরে আসে চক্রের শৈল্পিক রূপায়ণ। তন্ত্রের ভাষায় এর নাম ‘চতুষ্কোণ’। এখানে আলোআঁধারির মধ্যে একটি শিবলিঙ্গের আদল আসছে। এ সেই কালচক্র, যার ঘূর্ণিতে সৃষ্টি এবং প্রলয় হয়ে উঠছে অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু।
এইসব পুনরাবৃত্ত প্রতীক, যেগুলি শিল্পী তাঁর অভিব্যক্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন– সেগুলি যেন কালচক্রের, আত্মানুসন্ধানের একেকটা পর্যায়কে ব্যাঞ্জিত করে। তিনি প্রায়শই তাঁর শিল্পকর্মে হলুদ, নীল এবং লালের মতো রং ব্যবহার করেন, কিন্তু তাঁর কেন্দ্রে থাকে এক উজ্জ্বল আলোকদ্যুতি, তন্ত্রের ভাষায় বীজ, যা এক কেন্দ্রীয় উৎসরণ। চিত্রকর্মে প্রাণবন্ত রং এবং মুক্ত আকৃতি ব্যবহার করে অনায়াসে আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে প্রদর্শন করেছেন বীরেন দে; যা দর্শককে প্রাণিত করেছে তাঁর অন্তরাত্মার গভীরে তাকাতে, আমন্ত্রণ জানিয়েছে আত্মচৈতন্যের উপলব্ধিতে। পাঁচের দশকের মানব-মানবীরা, ছয়ের দশকে যারা বিমূর্ত রঙের অবয়ব মাত্র, সাতের দশকে সেই ভাঙন পৌঁছল তাঁর গন্তব্যে। ঘনসংবদ্ধ, গম্ভীর আঁধারের কন্দরে লুকোনো সৃষ্টির বীজ।

আটের দশকে করা আরেকটি ছবি যেন একটা গুহার কথা মনে করায়। এখানেও যোনি এবং লিঙ্গের প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। রেখার পর রেখার আবর্তে সৃষ্টি করা হয়েছে সুড়ঙ্গের বর্ণমালা। কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রদীপ। একটু উঁচু হয়ে থাকা অংশটি শিবলিঙ্গের প্রতীক। কালো থেকে লাল, লাল থেকে কমলা, কমলা থেকে উজ্জ্বল হলুদ– ছবিটির যে অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় উত্তরণ– এ সেই জ্ঞান যা এক নতুন জন্মের সূচক, আত্মজ্ঞান। এ যেন সেই আলোর পানে প্রাণের চলা– ভারতীয় দর্শনের বীজমন্ত্র: ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ’।
এ কিন্তু এক গভীর উদ্ভাবনার ফসল। তাঁর ভাষায়:
‘I think I lose myself in a state of intense concentration, then come to a point of climax, which I find irrepressible, and start working to release the new realised energy.’
এই যে ধ্যান, মনন, উন্মোচন– এই পদ্ধতির তীব্র অনুভব খানিকটা হয়তো বোঝা যায় তাঁর প্যাস্টেলে করা প্রাথমিক খসড়াগুলি দেখলে। এক প্রচণ্ড অস্থিরতা– যা কেন্দ্রীয় ঘূর্ণনের দৃশ্যরূপ হয়ে ধরা দেয় শান্ত স্থিতিশীল এক চূড়ান্ত প্রকাশে।

বীরেন দে-র এই আন্তঃসংলাপের দৃশ্যায়িত বয়ানটি ধরা থাকে এক অতীন্দ্রিয় বোধভাষ্যে। তিনি তৈরি করেন তাঁর একান্ত নিজস্ব প্রতীক, নিজস্ব বিন্যাস এবং এক গভীর অন্তর্লীন খননে। সেই সত্য যা গুহায় নিহিত, কিন্তু যার দ্যুতিরেখা সদা প্রোজ্জ্বল– সেই গহীনেই তাঁর আত্ম-অন্বেষণ। এজন্যেই তাঁর ছবিতে থাকে এক নিস্তরঙ্গ উপলব্ধির আকাশ, যার সামনে নতজানু হতে হয়। মনে হয়, কিছু ছবি তিনি এঁকেছিলেন এক ঘোরের মধ্যে; যেন বলে চলে: ‘আলো-অন্ধকারে যাই– মাথার ভিতরে/ স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে’।

গুহা– শান্ত, স্নিগ্ধ, পূর্ণ জ্যোতি, পূর্ণ উপলব্ধি, অন্ধকার মিথ্যা, আলোই সত্য, সেই পুরুষ প্রকৃতি, মিলন ও সৃষ্টির নানা উদ্ভাস এভাবেই ঘুরে ঘুরে আসে তাঁর ছবিতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় উপলব্ধির রং, লাল কমলা হলদে সবুজ বদলে যায় নিবিড়, নিতল নীলে– শুধু অন্তর্লীন দীপশিখাটি থাকে অনির্বাণ।
তথ্যসূত্র:
১। Ajit Mookherjee, Biren De, Lalit Kala Akademi (monograph)
২। Prananath Mago, Contemporary Indian Art, National Book Trust
চিত্রসূত্র: তুলি রিসার্চ সেন্টার
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved