

২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে শিল্পী দেবাশীষ দেবের আমন্ত্রণে তাঁর লেক গার্ডেনসের বাড়িতে সস্ত্রীক উপস্থিত হয়েছিলেন আরও দুই প্রখ্যাত শিল্পী সুধীর মৈত্র ও সমীর সরকার। হাজির ছিলেন আরেক শিল্পী প্রণবেশ মাইতিও! জলখাবার এবং মধ্যাহ্নভোজের বিরতি বাদে সেদিনের পুরোটা জুড়েই চলেছিল অলংকরণ নিয়ে চার শিল্পীর নির্ভেজাল আড্ডা। ২১ বছর আগের সেই দুর্লভ সাক্ষাৎকার এই প্রথম প্রকাশিত হল।
২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি ঝলমলে দিন সাক্ষী ছিল এক আশ্চর্য আড্ডার। শিল্পী দেবাশীষ দেবের আমন্ত্রণে তাঁর লেক গার্ডেনসের বাড়িতে সস্ত্রীক উপস্থিত হয়েছিলেন আরও দুই প্রখ্যাত শিল্পী সুধীর মৈত্র ও সমীর সরকার। হাজির ছিলেন আরেক শিল্পী প্রণবেশ মাইতিও! জলখাবার এবং মধ্যাহ্নভোজের বিরতি বাদে সেদিনের পুরোটা জুড়েই চলেছিল অলংকরণ নিয়ে চার শিল্পীর নির্ভেজাল আড্ডা। এই সম্মেলনের গুরুত্ব বুঝে গোটা আড্ডার ভিডিও রেকর্ডিং করিয়েছিলেন দেবাশীষ দেব। সেদিনের আয়োজনের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন পাপড়ি দেব। ২১ বছর আগের সেই দুর্লভ সাক্ষাৎকার এই প্রথম প্রকাশিত হল…

দেবাশীষ: সুধীরদা, আজকে আপনি আমাদের সঙ্গে রয়েছেন, শুধু সেটা নয়, আজ আমরা সমীরদাকেও পেয়েছি। সুতরাং, একটা জিনিস আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগছে এবং জানতে ইচ্ছে করছে যে– আপনারা দু’জনেই প্রথম আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে ইলাস্ট্রেশন নিয়ে আলোচনা করবেন এবং আড্ডা দেবেন, এটা আপনাদের কীরকম লাগছে? ইলাস্ট্রেশন নিয়ে কি আপনারা এর আগে কখনও মত বিনিময় করেছেন?
সুধীর: এর আগে সেরকম তো কিছু হয়নি। তবে…
সমীর: যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে একবার একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। যদিও সেখানে মূলত প্রশ্নোত্তরের মতো ব্যাপার…
দেবাশীষ: মানে ধরে নিতে পারি আজকের দিনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ…
সুধীর: হ্যাঁ, সব মিলিয়ে ধরতে গেলে মোটামুটি এটাই আমাদের দু’জনের প্রথম আড্ডা। এর আগে যদিও কথাবার্তা অনেকবারই হয়েছে।
দেবাশীষ: হ্যাঁ, কথাবার্তা হবে সে তো খুবই স্বাভাবিক। না, আমার একটা জিনিস জানতে ইচ্ছে করছে, আপনাদের ব্যক্তিগত জীবনের থেকেও বেশি ইম্পর্ট্যান্ট আপনাদের কর্মজীবন। সমীরদার কর্মজীবনে যেমন বিজ্ঞাপনের জগৎ একটা বড় অংশ ছিল, কিন্তু সুধীরদা, আপনি আমাদের কাছে একজন কমপ্লিট ইলাস্ট্রেটর যাকে বলে, তাই। আপনাদের কাজ আমাদের যে কীভাবে ইনস্পায়ার করেছে সেটা আর নতুন করে বলার নেই। আমার একটা জিনিস খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, ইলাস্ট্রেশন তো একজন শিল্পীর কর্মজগতের একটা ছোট অংশ। কিন্তু এই ইলাস্ট্রেশন নিয়েই আপনি সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন। একজন শিল্পীর পক্ষে কি শুধুমাত্র ইলাস্ট্রেটর হিসেবে সম্পূর্ণ ক্রিয়েটিভ স্যাটিসফ্যাকশন পাওয়া যায়? বা আপনি কি তা পেয়েছেন?
সুধীর: দেখো, আমি ছিলাম ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজের ছাত্র। তা আর্ট কলেজে এসে, শিখতে শিখতে একটা কোর্স যখন শেষ হয়ে গেল, তখন তো পেটের ধান্দা করতেই হয়। সোজা কথা। তা সেটার জন্য কোথায় কীভাবে চেষ্টা করব-না করব আমাদের কোনও আইডিয়াই ছিল না। এই করতে করতেই পত্রপত্রিকা, খবরের কাগজে ছাপা ছবি বা ইলাস্ট্রেশন দেখে মনে হল, এই কাজটা হয়তো করা যায়।
প্রণবেশ: কোন সালের কথা এটা?
সুধীর: এটা ১৯৫০। যদিও ১৯৪৮-৪৯ থেকেই ধরতে পারো। তখনকার খবরের কাগজের যে ধারা, তা দেখতে দেখতেই তো আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন ওটাই করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। তা এই ইলাস্ট্রেশন কিছু করা যায় কি না কাগজের অফিসে গিয়ে গিয়ে খোঁজ নিয়ে…
দেবাশীষ: কাজের সুযোগটা পাওয়া যেত?

সুধীর: হ্যাঁ, আসলে সুযোগ তো একটা জায়গায় পেতেই হবে। অল্পবয়সে ধারণা ছিল ভাসা ভাসা। মানে তখনও আমার এমন মনে হয়নি যে, অমুক স্ট্রিমে যাব না, বা তমুক জায়গায় কাজ করব না– এরকম কোনও ইয়ে ছিল না। কাগজের ক্ষেত্রে এখন যেমন ‘আনন্দবাজার’, তখন কিন্তু ‘যুগান্তর’ পত্রিকার জনপ্রিয়তা ছিল অনেক বেশি।
প্রণবেশ: হ্যাঁ, যুগান্তর ছিল তখন একেবারে প্রথম সারির কাগজ…
দেবাশীষ: ‘অমৃত’ তখন ‘দেশ’-এর কম্পিটিটর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটগল্পগুলো অমৃত কাগজেই ছাপা হত।
সুধীর: একটা জিনিস আমি আমি উল্লেখ করে রাখি, কারণ এটা রেকর্ড হয়ে থাকছে। আমাদের সময়ে ফাইনাল ইয়ারে কলেজের ছাত্রদের একটা বার্ষিক এগজিবিশন হত, তার একটা রিভিউ যুগান্তরে বেরিয়েছিল। তখন মেইনলি ওয়াটার কালারই ছিল আমার পছন্দের। ওতেই কাজ করতাম, খুব মন দিয়েই করতাম। তা সেই রিভিউতে যিনি সমালোচক ছিলেন, তিনি খুব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন আমার ছবির– যে সুধীর মৈত্রর ছবি দেখে মুগ্ধ হলাম, এ খুব বর্ণনাময়, অমুক-তমুক… প্রশংসাসূচক রিভিউ। তো সেই বয়সে ন্যাচারালি খুবই ভালো লেগেছিল। প্রথম প্রথম যা হয়…
দেবাশীষ: প্রাউড ফিল করলেন।
সুধীর: হ্যাঁ, এটা অদ্ভুত! কী করব, কী করব করে এই রিভিউটা কে লিখেছেন, সেইটা পাত্তা লাগানোর চেষ্টা করলাম। জানা গেল সেটার লেখক ছিলেন কৃষ্ণ ধর।
প্রণবেশ: ওহ্! কবি কৃষ্ণ ধর?

সুধীর: হ্যাঁ, পরে জেনেছিলাম উনি খুবই বিখ্যাত এবং বড় মাপের কবি। কৃষ্ণ ধর তখন ফ্রিল্যান্সিং করছেন যুগান্তরে, ফিল্ম বা প্রদর্শনীর সমালোচনা ইত্যাদি নিয়মিত লিখছেন ওখানে। তখন আমি যুগান্তর দফতরে গিয়ে একদিন সরাসরি ওঁর সঙ্গে দেখা করলাম। রিভিউয়ের কাটিংটা দেখিয়ে ওঁকে বললাম যে, ‘এরকম বিস্তারিতভাবে আপনি রিভিউ করেছিলেন আমার ছবির, কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমার তো কিছু হয়নি।’ তখন উনি বললেন, ‘না না, ছবি সত্যিই খুব ভালো! কিন্তু তোমায় চেষ্টা তো করতে হবে ভাই।’ আমি সাহস করে বললাম, ‘চেষ্টাটা কী করে করব? দেখুন, আপনি তো যুগান্তরে আছেন, আপনিই একটু দেখুন না যদি আমাকে দিয়ে কিছু হয়…’ তখন উনি বললেন যে, ‘আচ্ছা, এসো।’ তখন যুগান্তরে দক্ষিণারঞ্জন বসু ছিলেন নিউজ এডিটর। উনি আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অতি চমৎকার লোক। তখন পার্টিশন হয়ে গিয়েছে। যুগান্তরে তখন ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’ বলে একটা ফিচার রেগুলার বের হত। সেই ফিচারে তখন গ্রামের নানা ছবি এঁকে চলেছেন কালীকিঙ্কর ঘোষ দস্তিদার। অন্যান্য শিল্পীরাও কেউ কেউ আঁকতেন, তবে কালীকিঙ্করবাবুই ছিলেন প্রধান। তা এসব ছবি দেখতে দেখতে আমি একদিন ওঁকেই গিয়ে বললাম যে, ‘আমি ছবি আঁকি, ইলাস্ট্রেশন করতে ইচ্ছুক।’ উনি কাজ দেখতে চাওয়ায় স্কেচ-টেচ দেখালাম। দিনকয়েক পরে উনি দু’-একটা স্কেচ করে আনতে বললেন। এই করতে করতে, কিছুদিন বাদে ওই ‘ছেড়ে আসা গ্রাম’-এই আমার একটা ছবি ছাপা হল। আবার উনি ওটা দেখেও ভুলচুক ধরিয়ে দিয়ে বললেন যে, ‘এই তোমার হাতটা না ঠিক আঁকা হচ্ছে না’, বা ‘তোমার ছবিতে এই ভুল থেকে যাচ্ছে…’ যাই হোক, তাও শেষমেশ ছাপা হল। এই যে ছাপা হল, এতেই আমি খুব ভরসা পেলাম। মাথায় ভাবনা এল যে, এবার কতদূর এগনো যায়! সব জায়গায় যে কাজ পাওয়া যাবেই এমন নয়। আমি তো তখন যত্রতত্র চেষ্টা করে যাচ্ছি। সেভাবেই যুগান্তরে কাজ করা শুরু। তবে ওদের রবিবাসরীয়তে, মানে যেখানে গল্প উপন্যাস ছাপা হত, সেখানে আমি কখনওই কাজটাজ করিনি।

দেবাশীষ: আর এই যে আপনি যে ফুলটাইমার হয়ে গেলেন… এইটা কবে শুরু হল? এরকম শুরু অনেকেরই হয়, পরে আবার তারা অন্যদিকে চলে যায়।
সুধীর: না না, এই কন্টিনিউইটি রাখতে গিয়ে আমাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কাজ করতে হয়েছে সমান তালে। আমি যুগান্তর থেকে আনন্দবাজারে ঢুকেছি। আনন্দবাজারেও তো ওই কাজের জন্যই গিয়েছি। ওঁরা বললেন যে, ‘না, এখন তো আমাদের এখানে কালীকিঙ্করবাবু কাজ করছেন, শৈল চক্রবর্তী, সূর্য রায় এঁদের মতো প্রতিষ্ঠিতরাও রয়েছেন। ফলে এক্ষুনি কিছু হবে না। আচ্ছা, তুমি কিছু কাজ রেখে যাও…’ তখন মন্মথ সান্যাল ছিলেন ম্যাগাজিন এডিটর। রবিবাসরীয়টা উনিই দেখতেন। তা আমি আবার স্কেচটেচ নিয়ে মন্মথবাবুর সঙ্গে দেখা করলাম। ওই স্কেচের মধ্যে একটা তালগাছের ছবি ছিল। সেটা দেখে মন্মথবাবুর পাশে বসা ওঁরই সহকারী, যতীনবাবু বলে উঠলেন, ‘আরে, এটা তো আমাদের কাজে লেগে যাবে!’ বোধহয় তালগুড় বা কোনও বিজ্ঞাপনে স্কেচটা কাজে লেগে গেল! এরপর কখনও একটা প্রবন্ধ হয়তো বেরচ্ছে, তখন ওঁরা আমার একটা স্কেচ হয়তো নিলেন। তার ওপরে মন্মথবাবু একদিন আমাকে একটা গল্প দিয়ে বললেন, ‘তুমি এটা পড়ে একটা ছবিটবি করে আনো। দেখেছ তো আমাদের কাগজে কীভাবে বেরয়-টেরয়? সেইভাবে মাপটাপ করে…’ আমি যথারীতি এক সপ্তাহ পর ছবি নিয়ে গেলাম। মোটামুটি পছন্দ হয় ওঁদের, ছেপে বেরয়। আনন্দবাজারে এই আমার প্রথম ব্রেক।
দেবাশীষ: ইলাস্ট্রেশনই করবেন এই ব্যাপারটা তখন স্থায়ী হয়ে গিয়েছে মনে?
সুধীর: তা নয়, আসলে আমি তখনও স্থায়ী চাকরি-বাকরি কিছুই পাচ্ছি না, একটা কিছু তো করতে হবে!
প্রণবেশ: এজেন্সির কথা ভেবেছিলে তখন?
সুধীর: এজেন্সির কথা… না আসলে…
দেবাশীষ: অর্থাৎ আপনি তখন পুরোপুরি ইনভলভড্ না হয়েও ইলাস্ট্রেশন করছিলেন! অন্য কিছু পেলে কি সেখানে চলে যেতেন?

সুধীর: হ্যাঁ, সেটা হতেই পারত। তবে প্রণবেশ যেটা বলল, এজেন্সি… এজেন্সির কথা যে ভাবিনি তা নয়। তখন এজেন্সি বলতে কত নামকরা সংস্থা, যেমন ক্ল্যারিয়ন ছিল, ওয়াল্টার থমসন ছিল… আসল কথা কী, বিজ্ঞাপনের ব্যাপারটা আমাকে কোনওদিনই খুব একটা আকর্ষণ করেনি। তার কারণ হচ্ছে আমি… কী বলব, আমি…
দেবাশীষ: আপনি পিওর ছবিটাই ভালোবাসেন।
সুধীর: হ্যাঁ, ওয়াটার কালার করছি, আঁকছি… এতেই আমার আনন্দ।
প্রণবেশ: আর্ট কলেজে আপনার সাবজেক্ট কী ছিল?
সুধীর: সাবজেক্ট যদিও কমার্শিয়াল আর্টই ছিল, অ্যাপ্লায়েড আর্ট বলে তখন কিছু ছিলও না। সে সময় কমার্শিয়াল বা ফাইন আর্টসের পার্থক্য যে কী তা বুঝিনি… কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে কিছুদিন যখন কেটে গেল, তখন একরকম মানিয়ে নিয়েছিলাম।

দেবাশীষ: আপনি কোন সময়ে এসে রিয়ালাইজ করলেন যে, আপনি এই ইলাস্ট্রেশন নিয়েই থাকবেন এবং দিস ইজ ইওর জব?
সুধীর: সেটা আরও কিছুদিন পরে…
দেবাশীষ: মানে তখন কি আপনার নাম হয়ে গিয়েছে? মানে অ্যাকসেপ্টেন্স পেয়ে গিয়েছেন?
সুধীর: নাহ, সেটা আরও পরে।
প্রণবেশ: আচ্ছা, বেতার জগতের কাজটা কি আনন্দবাজারে কাজ শুরুর আগে না পরে?
সুধীর: বেতার জগৎ অবশ্যই আগে। বেতার জগতে যখন কাজ করেছি সেটা ওই ১৯৫২-‘৫৪…
সমীর: বেতার জগতের সম্পাদক ছিলেন রোগামতো, চশমা পরা এক ভদ্রলোক। নামটা ভুলে গিয়েছি…

সুধীর: না, উনি পরে এসেছিলেন। মানে উনি যখন রিটায়ার করলেন, তখন আমি স্টেটসম্যানে। একদিন আমার অফিসে উনি এসেছিলেন। এসে আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং অনেকক্ষণ আলোচনা হয়েছিল।
সমীর: আচ্ছা। তখন অবশ্য বেতার জগতে রেডিও প্রোগ্রামের তালিকা ছাড়াও গল্প, ছবি ইত্যাদি নিয়মিত ছাপা হত। এবং গল্পগুলোয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেতারের সঙ্গে একটা সংযোগ থাকত। বেতারে যে গল্পগুলো পড়া হত, সেগুলোও সুন্দর ইলাস্ট্রেশন-সহ ছেপে বেরত। সত্যিই এইসব কাগজগুলোর যে কী হল শেষটায়…
দেবাশীষ: আচ্ছা সমীরদা, আপনি এই যে এত বছর ধরে কাজ করছেন, এখনও করছেন, অ্যাজ অ্যান ইলাস্ট্রেটর আপনার কি মনে হয়, মানে একটা বিরাট চেঞ্জ হয়েছে? আপনার শুরুর সময় থেকে নিয়ে আজ অবধি এই এডিটোরিয়াল সিস্টেম, কাগজের বিক্রি, কাগজের পপুলারিটি… আপনি নিজেই বলছিলেন যে ইলাস্ট্রেশনের জন্য আগে কত লোকের কত ফিডব্যাক পেতাম, এখন পাই না। মানে এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? কতটা বা কী কী চেঞ্জ আপনি দেখছেন?

সমীর: সেভাবে চেঞ্জ খুব একটা কিছু হয়েছে? মানে…ফিডব্যাকের কথা বাদ দিয়ে, আমি বলছি যে, এখানে কাজের ধরন খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। অন্তত আমার তা মনে হয় না। মজার ব্যাপার এই যে, ৫০ বছর আগে যে আঙ্গিকে কাজ হত, এখনও যদি কেউ ইচ্ছে করে সেই একই আঙ্গিকে দিব্যি কাজ করে যেতে পারবে।
প্রণবেশ: অ্যাকচুয়ালি যে কথাটা আপনি বললেন, এইটা আমার মনে হয় লঙ্গেস্ট এরা (era), এইভাবে ইলাস্ট্রেশন করে যাওয়া… এখনও পর্যন্ত কিন্তু একই ট্রেন্ড চলে আসছে। এটাই ‘লঙ্গেস্ট ট্রেন্ড’ বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে– একটা মানুষকে রিয়েলিস্টিক আঙ্গিকে দেখা। মানে ইলাস্ট্রেশন করতে গেলে সাধারণত এরকমভাবে দেখানো যায়– সেই পরিসরে আপনারা অনেক চেঞ্জ করেছেন।
সমীর: চেঞ্জ বলতে কী ধরনের?
প্রণবেশ: চেঞ্জ বলতে স্টাইল চেঞ্জ করেছেন। আপনি যেহেতু আঙ্গিকের কথা বললেন, আমি সেই হিসেবে বলছি স্টাইলে চেঞ্জ করেছেন, তারপর ধরুন কম্পোজিশনে চেঞ্জ করেছেন, একটা ফটোগ্রাফিক অ্যাঙ্গেল…
দেবাশীষ: এটা কি আপনারা ভেবেচিন্তে করেছিলেন? কনশাসলি?
সমীর: নিশ্চয়ই একটা ভাবনা ছিল। যে গল্পের ছবি করা হচ্ছে, সেই গল্প কী ডিমান্ড করে, কী ধরনের ট্রিটমেন্ট ডিমান্ড করে সেটাই আসল কথা। এখন গল্পটা যদি ছবিতে বলতে হয়, তাহলে কী ধরনের কম্পোজিশন হওয়া উচিত, কী ধরনের ট্রিটমেন্ট হওয়া উচিত, কী ধরনের লাইন হওয়া উচিত– ব্রাশ লাইনে না মোটা কলমে হওয়া উচিত, না কি বেশি কালো দিয়ে করা উচিত– সবই গল্পের যে থিম বা স্পিরিট, তার ওপর নির্ভর করবে। আর সেটা নিয়ে তো ভাবনাচিন্তা করতেই হবে।
প্রণবেশ: হ্যাঁ, যেমন আপনার ধরুন ‘যদুবংশ’– আন্ডারওয়ার্ল্ডের গল্প। ওখানে আপনি ট্রিটমেন্ট অন্যরকমভাবে করছেন…
সমীর: হ্যাঁ, একটু ডার্ক…
সুধীর: নাহ্, ওর ‘যদুবংশ’ বা আন্ডারওয়ার্ল্ডটা কিন্তু পরে আসছে। প্রথম যেটা মনে হয়, সেটা হল কাজটা অন্যরকম। চোখ টানছে।

দেবাশীষ: না, একটা জিনিস এখানে বলা দরকার, এই যে ট্রিটমেন্ট, এটা কিন্তু সমীরদা ভেবেছেন। কিন্তু সেটা এগজিকিউট করতে গেলে যথেষ্ট মুনশিয়ানা দরকার কিন্তু। আমি ভাবলাম, আমি পাঁচটা গল্পে পাঁচরকম আঁকব, এটা সবার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। আজকে আমি দেখছি অনেকেই তো এটা করতে পারছে না। বা সে সময়ও পারেনি। ভার্সেটাইল না হলে… এই যে আপনি নিজেকে মোল্ড বা চেঞ্জ করছেন, সত্যজিৎ রায়ও এটা করেছেন! ইচ্ছেমতো কখনও ব্রাশে, কখনও কলমে… তার জন্য কি আপনাকে আলাদা করে তৈরি করতে হয়েছে নিজেকে?
সমীর: কিছুটা প্রস্তুতি তো নিশ্চয়ই থাকে, অনেকটা আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবেও এসে যায়।
দেবাশীষ: আমি এই এক্ষুনি দেখছিলাম ‘বিবর’-এ আপনি একটা অদ্ভুত এফেক্ট এনেছেন এবং কোথায় ওই লাইনটা দেব, একটা লাইনে ওই মেয়েটার মিডরিফটা বোঝা যাচ্ছে, পা-টা হাঁটুর পথে… এটা কিন্তু ড্রয়িং না জানলে হয় না।

প্রণবেশ: অবশ্যই। ইলাস্ট্রেশনে বেসিক ড্রয়িংটা জানা খুব দরকার।
দেবাশীষ: কম ড্রয়িং জেনে ভালো ইলাস্ট্রেটর হওয়া যায় না। ড্রয়িংয়ে যারা দুর্বল, তারা কি খুব ভালো ইলাস্ট্রেটর হতে পারবে?
প্রণবেশ: শোনো, পূর্ণ চক্রবর্তী বা প্রতুল ব্যানার্জি খুব ভালো ড্রয়িং জানতেন, কিন্তু ওঁরা সেই একই পুরোনো জিনিসে আটকে গিয়েছেন। ইলাস্ট্রেটর হিসেবে…
দেবাশীষ: পুরনো বলে খারাপ বলব কেন? সেটা আদৌ খারাপ কি?
প্রণবেশ: খারাপ কখনওই নয়, তবে…
সমীর: আমি একটা কথা বলতে পারি– প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াটার কালারে গল্পের যে ইলাস্ট্রেশন করেছেন সেই একই টোন অব্যর্থভাবে কিন্তু লাইনেও এনেছেন! এটা এককথায় অভাবনীয়! নারায়ণ দেবনাথ বা অন্য যাঁরা ওঁকে অনুসরণ করেছেন, তাঁদের কাজেও সে দক্ষতা দেখা গিয়েছে। সে সময় আরও কয়েকজন শিল্পী ছিলেন এই ঘরানার…

দেবাশীষ: বলাইবন্ধু রায় ছিলেন…
সুধীর: এন দত্ত বলে একজন ছিলেন।
সমীর: ঠিক।
সুধীর: এন দত্ত অবশ্য ওয়াশটাই বেশি করেছেন।
সমীর: একদম। তবে ফাদার ফিগার যদি বল, ওই সময়কার বাচ্চাদের গল্পের ইলাস্ট্রেশনে ফাদার ফিগার হচ্ছেন প্রতুল ব্যানার্জি।
সুধীর: একদম। আমার মতে, সেদিক থেকে প্রতুল ব্যানার্জির কোনও তুলনা নেই! ওই ড্রয়িং এবং ওই লাইনের ধরন…

সমীর: তবে, হ্যাঁ, প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর যে গল্প– চৈনিক গুন্ডাদের নিয়ে, তার ইলাস্ট্রেশনের যে স্টাইল, আবার কৃষ্ণা নামে ওঁর যে মহিলা গোয়েন্দা, প্রতুলবাবুর আঁকার স্টাইল কিন্তু একই। পারিপাট্য অতুলনীয়, কিন্তু ভেরিয়েশন সেভাবে নেই।
দেবাশীষ: ভ্যারাইটি কম।
প্রণবেশ: শুধু তাই নয়, একটা লোকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো ফিগারটাকে নিয়ে কিন্তু ওঁরা কাজ করে গিয়েছেন। আপনারা যেমন অ্যাঙ্গেলের ক্ষেত্রে ক্লোজে বা মিড-এ, অথবা লং-এ গিয়েছেন।
সমীর: একটা জিনিস তো থাকেই যে, যখন ছবির কাজ করা হয়– সে গল্পের ইলাস্ট্রেশনই হোক বা এমনি ছবি আঁকা হোক– জিনিসটা কিন্তু সৃজনধর্মী। সেখানে নিজের ভেতরের যে সৃজনশৈলী, সেটা খানিকটা বেরিয়ে আসবেই এবং সেটা পরিস্থিতি অনুযায়ী আসে। যেমন ‘বিবর’ যে স্টাইলে করা, সমরেশ বসুর অন্যান্য গল্পের অলংকরণ তো অন্য স্টাইলে করা… যে গল্পের সঙ্গে যে স্টাইলটা ফিট করে…

সুধীর: তোমার করা ‘প্রজাপতি’-র ইলাস্ট্রেশন যেমন পুরোপুরি অন্যরকম। প্রত্যেকটাই ডিফার করছে, স্টাইল দিয়ে ডিফার করছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমাদের হ্যান্ডিক্যাপ যেটা ছিল, সেটা প্রিন্টিংয়ে। লেটারপ্রেস এবং ম্যাক্সিমাম ট্রাইকালার হাফটোনে ছাপা। এই যে ব্যাপারটা, তার একটা লিমিটেশন ছিল। সেই লিমিটেশনটা আমাদের আগের প্রজন্মের শিল্পীদের অনেকখানি ওভারকাম করতে হয়েছে, আমাদেরও হয়েছে। আমাদের পরের প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এই সমস্যা অনেকখানি কমেছে। প্রযুক্তি আগের চেয়ে এখন অনেক উন্নত।

দেবাশীষ: তাহলে ধরুন ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’-র ছবি আপনাকে যদি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রঙিন করে আঁকতে দেওয়া হত, আপনি হয়তো আরও ডিটেইলে, লার্জ স্কেলে আঁকতে পারতেন! শাড়ির রংটংগুলো আরও ইন্টারেস্টিং হত!
সুধীর: না, খালি রং নয়, এই যে ওয়াশ দেওয়া– ওয়াশ দিয়ে তখনকার দিনে খবরের কাগজে কোনও এফেক্টই পাওয়া যেত না। একটা জমাট স্ক্রিনের মতো দেখাত ছাপার পরে…
প্রণবেশ: না, আমার এই প্রসঙ্গে সমীরদার একটা ইলাস্ট্রেশনের কথা মনে পড়ছে– শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রিমিঝিম’। ওইখানে উনি কিন্তু স্ক্রিনের ব্যবহার দারুণভাবে করেছিলেন। সেই সময়ের নিরিখে অভাবনীয়।
দেবাশীষ: সত্যজিৎ রায়ও ব্যবহার করেছেন।
প্রণবেশ: না না, সমীরদা ‘রিমিঝিম’-এ ওই টোনাল ব্যাপারটা এনেছেন।
সমীর: হ্যাঁ, মনে আছে। লাল রং ব্যবহার করে একটা হাফটোনের মতো ভাব নিয়ে আসা গিয়েছিল তখনকার ব্লক সিস্টেমে…
প্রণবেশ: তাছাড়া স্ক্র্যাপারবোর্ড ছিল তখন। ‘বেদে’-র ইলাস্ট্রেশনে মাখনবাবু স্ক্র্যাপারবোর্ড ব্যবহার করেছেন।

সুধীর: কিন্তু তাতে করে তো হাফটোন হচ্ছে না, ফুলটোনই থাকছে..
প্রণবেশ: না না, স্ক্র্যাপারবোর্ডের ইলাস্ট্রেশন মূলত হাফটোনের এফেক্ট আনার জন্য ব্যবহৃত হত। কাজটা লেটারপ্রেসেই হচ্ছে, শুধু টোনটা আনার জন্য এটা ইউজ করা হত।
সুধীর: হ্যাঁ, তবে এখন অফসেটে ওয়াশের যতরকম ভ্যারাইটি আনা যায়, তা তখন সম্ভব ছিল না।
সমীর: স্ক্র্যাপারবোর্ড বলতে মনে পড়ল, কয়েক বছর আগে দেশের একটা গল্পে সুব্রত চৌধুরী কিছু চমৎকার ইলাস্ট্রেশন করেছিল– কালো কালো প্যাচ দিয়ে ফ্ল্যাট স্ক্র্যাচ করে করে ফোক স্টাইলে করা। ব্লেড দিয়ে চেঁছে চেঁছে, কোথাও কালো, কোথাও আবার সাদা বেরিয়ে গিয়েছে, খুব সুন্দর একটা এফেক্ট এসেছিল।

প্রণবেশ: ‘যদুবংশ’-এর ইলাস্ট্রেশনেও কি আপনি এই ধরনের ট্রিটমেন্ট করেছিলেন?
সমীর: না। ওই ছবিগুলোর ক্ষেত্রে কী হত বলছি। প্রথমে যেখানে টোন থাকবে সেটা করা হল, তারপর ট্রান্সপারেন্ট পেপার নিচে রেখে দিয়ে সাদা অংশটায় সাদা পোস্টার কালার লাগানো হল। তার ওপর আবার চাইনিজ ইংক চাপানো হল, তারপর সেটা শুকিয়ে গেলে, ধুয়ে ফেলা হল কলের নিচে। তারপর হিটারে শুকিয়ে নেওয়া। জলে ধোওয়ার যে ব্যাপারটা, এতেও আবার মজা আছে। যেখানে কালো কম রাখতে চাও, সেখানে বেশি ধুয়ে নিলেই তারতম্যে কালোর কমবেশি মিলিয়ে একটা চমৎকার এফেক্ট পাওয়া যেত। এগুলো আসে মূলত শিল্পীর নিজের ভাবনা থেকেই। কাজ করতে করতে বোঝা যায়।
প্রণবেশ: গল্পের মেজাজের সঙ্গে ওই কালোর এফেক্টটা সত্যিই ভীষণরকম মানানসই হয়েছিল।

সুধীর: সমীর যেটা আগে বলছিল, ওই টেকনিক আমিও দু’-একবার করার চেষ্টা করেছি। আগে যে আর্টবোর্ড পাওয়া যেত, তাতে কালো রং মাখিয়ে তারপর ব্লেড দিয়ে চাঁছলে কিন্তু ওই ডিসায়ার্ড এফেক্টটা পাওয়া যেত। আমি করেওছি বেশ কয়েকবার।
সমীর: সুব্রত চৌধুরীর ওই ইলাস্ট্রেশনগুলো দেখার পরে আমি কিন্তু দফতরে খোঁজও নিয়েছিলাম। এগুলো তো এখন ট্রেড সিক্রেটের মতো হয়ে গিয়েছে, কেউ বলতে চায় না। আমাকে বলা হয়েছিল, এই আর কী!
প্রণবেশ: ‘কোরাল’ করতে গিয়ে আপনাকে নিশ্চয়ই তখনকার ইতিহাস সম্পর্কে পড়তে হয়েছিল?
সমীর: হ্যাঁ, তখনকার দিনের ছবি তো দেখতে হয়েছিল…
দেবাশীষ: রেফারেন্স দরকার হত নিশ্চয়ই। কীভাবে পেতেন?
সমীর: খুঁজতে হত। একাধিক লাইব্রেরিতে যেতাম, চেনাশোনা লোকের বাড়ি যেতাম।
দেবাশীষ: লেখকরা এ ব্যাপারে কখনও হেল্প করেননি?
সমীর: হ্যাঁ, শাঁটুলবাবু মানে রাধাপ্রসাদ গুপ্তর বাড়িতে গিয়েছি। উনি খুব সাহায্য করেছেন।

সুধীর: আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল নিখিল সরকার (শ্রীপান্থ), ওর কাছ থেকেও বহুসময়ে অনেক হেল্প পেয়েছি। আমাদের শুরুটা ভারি অদ্ভুত ছিল।
সমীর: শ্রীপান্থ মানে হিস্টোরিয়ান যিনি? আলাপ কীভাবে হল?
সুধীর: আমরা একেবারে একসঙ্গে বড় হয়েছি বলা যায়। তখন ওয়াটারলু স্ট্রিট থেকে একটা কাগজ বেরত– ‘চাষ ও চাষী’ বলে, তাতে আমরা দু’জনেই কাজ করেছি অল্পদিন। সেই থেকে শুরু।
দেবাশীষ: সুধীরদা, একজন ছবি-আঁকিয়ে হিসেবে জিজ্ঞেস করছি, আপনি যখন একটা গল্প পড়েন, নিশ্চয়ই পাঠক হিসেবে পড়েন না, একজন ইলাস্ট্রেটর হিসেবে পড়েন? কোথায় ছবি আঁকার সুযোগ পাওয়া যাবে, সেটা কি মাথায় থাকে?
সুধীর: এখানে একটা ব্যাপার বলা প্রয়োজন। এখন যেমন তোমরা দেখ যে পুরো গল্প বা উপন্যাস একসঙ্গে হাতে পাওয়া যায়, আমরা কিন্তু বহুদিন অবধি এমনটা দেখিনি। প্রথমদিকে আমরা যখন ইলাস্ট্রেশন করতাম, কপি আমরা একবারে কখনও পুরোটা হাতে পেতাম না। সমীরও বোধহয় একমত হবে। লেখকরা একসঙ্গে দিতেন না, কিস্তি অনুযায়ী দিতেন।
সমীর: সে সময় লেখকরা খানিক অলসও ছিলেন। লিখতেও বোধহয় চাইতেন না।
দেবাশীষ: লিখতে চাইতেন না বলতে, ডিটেইলস কম থাকত?
সমীর: ডিটেইল না, লেখার ক্ষেত্রে তিন স্লিপ হয়তো একসঙ্গে ধরিয়ে দিল, ব্যস্…
সুধীর: তবে, আগেকার দিনে যেটা বলছ, যে খুব স্পিডে লিখে যাওয়া, আজ মানে আজকেই শেষ করে দেওয়া, কি পনেরো দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়া, এরকমটা কিন্তু হয়নি।
সমীর: না, তবে সম্পাদক যদি বলত যে এইদিনের মধ্যে আমার লেখাটা চাই, তারা তখন কিন্তু লেখাটা ঠিকই দিয়ে দিত।

সুধীর: সবক্ষেত্রে নয়। যেমন সুবোধ ঘোষের কথা বলি। আমি তখন আনন্দবাজারে নিয়মিত কাজ করছি। তখন সেই একই ব্যাপার। ফর্মা ছাড়া আছে সুবোধবাবুর জন্য। সুবোধবাবু হয়তো ৮-১০ পৃষ্ঠা লিখবেন, তা যদি না হয়, তাহলে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা ছবি দিয়ে ম্যানেজ করতে হবে। এবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যেত সুবোধবাবুর লেখা হয়নি। মনে আছে, প্রথম ফর্মার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু দিতেন। তার মধ্যে ছবি এঁকে দেওয়া হত। আমার সঙ্গে সুবোধবাবুর এই সূত্রে একটা পরিচয় গড়ে উঠেছিল। সুবোধবাবু থাকতেন নর্থে, কাজেই আমাদের ওদিক থেকে খুব দূরে নয়। আনন্দবাজারে হয় নীরেনদা (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী), নয় রমাপদবাবু (রমাপদ চৌধুরী) আর নয়তো সাগরবাবুর (সাগরময় ঘোষ) কাছে আমায় রিপোর্ট করতে হত। একবার বোধহয় সাগরদাই বললেন, ‘সুধীর, এবারে সুবোধবাবুর লেখার ছবিটা তোমায় করতে হবে। তুমি একটু ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসো।’ তখন সুবোধবাবু অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, আলাদা একটা ঘরে বসেন। তা আমি গেলাম সেখানে। ওঁকে বললাম যে, আপনার গল্পের ছবি আঁকতে হবে, যদি একটু বলেন আপনার গল্পের বিষয়বস্তু। উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, জোর তাগাদা আসছে। আমি এখনও কিছু ভেবে উঠতে পারিনি। তুমি কালকে এসো বরং।’ পরের দিন যখন গেলাম, সুবোধবাবু থিমটা বলে দিলেন, পুরনো বাড়ি-টাড়ি, অমুক চরিত্র থাকবে ইত্যাদি। পরের দিন আমি ওঁর নির্দেশ এবং নিজের বুদ্ধিমাফিক ছবি এঁকে ফেললাম ওঁর গল্প লেখার আগেই! একটা হেডপিস আর ভেতরের দু’-একটা ইলাস্ট্রেশন করে নিয়ে গেলাম। উনি দেখে বললেন, ‘ঠিক আছে। কিন্তু হেডপিসে ওই পোড়োবাড়িটাকে এনেছ! ওটা তো আমার গল্পে ছিল না।’ আমি থতমত। বললাম, ‘এটা কি তবে অফ্ করে দেব?’ উনি বললেন, ‘নাহ্, থাক। ও আমি গল্পে ঢুকিয়ে দেব।’
প্রণবেশ: ওহ্, গল্প লেখার আগেই তার ইলাস্ট্রেশন তৈরি হয়ে গেল!
সুধীর: আর কীই বা উপায় বলো…

দেবাশীষ: সমীরদা, আপনার ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে কখনও? সাহিত্যিকদের সঙ্গে আপনার কোনওরকম ইন্টার-অ্যাকশন হয়নি?
সমীর: যখন পরাশর বর্মার ছবি আঁকতে গিয়েছিলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে দু’-একবার কথাবার্তা হয়েছিল। চরিত্রের চেহারাটা কীরকম হওয়া উচিত সেই বিষয়ে।
দেবাশীষ: পরের দিকে শীর্ষেন্দুদা, সুনীলদা, বা শংকর এঁদের সঙ্গে কখনও যোগাযোগ হয়নি?
সমীর: নাহ্। অন্তত আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি।
দেবাশীষ: সে কী! শংকরের এত লেখায় ছবি এঁকেও ওঁর সঙ্গে কোনও ইন্টার-অ্যাকশন কিছু হয়নি? বা আপনার ছবি ওঁদের ভালো লাগে কি না তাও ওঁরা জানাননি কোনওদিন?
সমীর: উঁহু। কোনওদিন না। ওঁরা কেউই আমায় কিছু জানাননি কখনও।
প্রণবেশ: কখনও দেখাও হয়নি ওঁদের সঙ্গে?
সমীর: দেখো, লেখকরা আমার ধারণা, খুব অবজ্ঞার চোখে দেখে ইলাস্ট্রেটরদের। এ বিষয়ে আমার মনে অন্তত কোনও সন্দেহ নেই।
প্রণবেশ: এক্স্যাক্টলি! কিছুদিন আগে রামানন্দবাবুও কী লিখেছিলেন মনে আছে?
সুধীর: আমার ক্ষেত্রে কিন্তু সমীর যেটা বলছিল, তা হয়নি। বরং সাহিত্যিকদের সঙ্গে ইন্টার-অ্যাকশনটা আমার কীভাবে যেন একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল সেটা আমি নিজেও সঠিক জানি না।
সমীর: তোমার বোধহয় মেলামেশাটা একটু বেশি ছিল।
সুধীর: না, মেলামেশার জন্য না।
প্রণবেশ: আপনারা কারও লেখায় ছবির কাজ করেছেন, সেই নিয়ে কোনওদিন লেখক আপনাদের জানিয়েছেন?
সুধীর: হ্যাঁ, সেরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে।

দেবাশীষ: রমাপদবাবু, বুদ্ধদেব গুহ এঁরা তো বলেইছেন সুধীরদাকে নিয়ে! বিশেষত বুদ্ধদেববাবু তো…
সুধীর: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। একশোবার…
সমীর: লেখকরা যদি নাও বলে থাকে, একজন ইঞ্জিনিয়ার, যার সঙ্গে সাহিত্যের কোনও সম্পর্ক নেই; একজন ডাক্তার, একজন অ্যাডভোকেট– এরা অন্তত এসে আমায় বলেছে, ‘আপনার ছবি দারুণ হয়েছে।’
দেবাশীষ: না না, সেটা ঠিক আছে। এঁরা তো পাঠক।
সমীর: কোনও লেখক… ধরা যাক একটা পুজোসংখ্যা বেরিয়েছে, তাঁর উপন্যাসের ছবি আমি এঁকেছি। এক সপ্তাহের মধ্যে ধরো যদি সেই লেখকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, সে ভুলেও একবারও বলেনি যে ছবি কেমন হয়েছে। এটা আমি বরাবরই দেখছি। নতুন কিছু নয়।
প্রণবেশ: সমরেশ বসুর কাছে কোনওদিন প্রশংসা পাননি?
সমীর: সমরেশ বসুর ব্যাপারটা আলাদা। ওঁর সঙ্গে একটা পার্সোনাল অ্যাটাচমেন্ট ছিল আমার।

সুধীর: এই যে দেখো, এই পার্সোনাল অ্যাটাচমেন্টের জন্যই বলছি, ওভারঅল নেগলিজেন্স বা আন্ডারএস্টিমেট করা বা ইয়ে করা, এটা কিন্তু হয়েছে বলে আমার মনে হয় না…
সমীর: নাহ্, এটা তো তুমি তোমার কথা বলছ। আমি তো আমার সঙ্গে যা ঘটেছে সেটাই বলব… তুমি তো সেটা ফিল করোনি।
প্রণবেশ: কিছুদিন আগে আনন্দবাজারে রামানন্দবাবু একটা কলাম লিখেছিলেন। সেখানে উনি লিখেছিলেন যে, সুকুমারী ভট্টাচার্যের একটি বই ‘থ্যাকার স্পিঙ্ক’ থেকে বোধহয় বেরিয়েছিল– রামানন্দবাবু তাতে অনেকগুলো ছবি এঁকেছিলেন। খুবই ভালো সেসব ছবি। ছবিগুলো আলাদা করে বেরিয়েওছিল একটা পত্রিকাতে। ওটার যেন নামটা কী বেশ? ওই যে ছিল না ট্যাংরাতে অফিস? নামটা মনে পড়ছে না।
দেবাশীষ: যাক ওটা ছেড়ে দিন, নামটা এত ইম্পরট্যান্ট নয়।

প্রণবেশ: যাই হোক, সেই কাগজে রেগুলার… সানডে-তে ফার্স্ট পেজে আর্ট পেপারের উপরে ছাপা হত। তারপর পাবলিশার্স খরচ কমাতে ওটা বন্ধ করে দিল। যাই হোক, সেটা নিয়ে কথা না। আমি যেটা বলছিলাম, বইটা… ছবিগুলো এত সুন্দর হয়েছে, চারদিক থেকে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সুকুমারী দেবী একবারও মনে করলেন না যে, আমি আমার আর্টিস্টকে একবার কিছু বলি! পরে ওই লেখাটা বের হবার পরে উনি না কি রামানন্দবাবুকে ফোন করেছিলেন!
দেবাশীষ: আচ্ছা সুধীরদা, একটা প্রশ্ন আপনাকে এবং সমীরদাকেও করছি যে, আপনারা কি ইলাস্ট্রেশনের ক্যাটেগরি ভাগ করে নেন? যে সিরিয়াস, হাসির গল্প, আবার ছোটদের জন্য সিরিয়াস, ছোটদের জন্য হাসির গল্প? এইভাবে কি কখনও ভাগ করে ছবি আঁকার কথা ভাবেন বা ভেবেছেন?
সুধীর: না, হাসি বা সিরিয়াস ওটা তো গল্পের থিম অনুযায়ী বুঝে তবে ছবি করতে হয়।
দেবাশীষ: হ্যাঁ, কিন্তু সেটাকে কীভাবে আপনারা অ্যাডাপ্ট করেছিলেন?
সমীর: সেটা বোধহয় আদতে সিরিয়াস হওয়ারই জন্য… সেখানে আর্ট ইন্টারপ্রিটেশন অনুযায়ী ছবি করতে হবে। এমনও আছে যে আপাত দৃষ্টিতে বা গল্পটা পড়লে পরে মনে হবে এটা সিরিয়াস গল্প, কিন্তু তার আন্ডারটোন হচ্ছে কমিক।
দেবাশীষ: হুম। তা বটে।

সমীর: সেখানে ওই সিরিও-কমিক একটা চরিত্র… বা সেই ধাঁচের ছবি…
প্রণবেশ: কিছুক্ষণ আগেই আমরা সরলাক্ষ হোমের কথা ভাবছিলাম।
সমীর: রাইট! ওইটাই বলছিলাম।
দেবাশীষ: আচ্ছা। তা আপনি তখন স্টাইলটাকে বোঝেন অর্থাৎ ধরুন হাসির যে স্টাইলটা, সেটাকে তখন কীভাবে অ্যাডাপ্ট করেন? কার্টুন তো একে বলা যাবে না।
সমীর: না, তা কখনওই নয়।
দেবাশীষ: মানে আপনাদের কি মনে পড়ছে যে, আপনারা কীভাবে হাসির গল্প বা এই যে কমিকাল ব্যাপারটা ছবিতে আনার চেষ্টা করেছিলেন বা কীভাবে এনেছিলেন? মানে আপনাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে তখন সে ধরনের কোনও ইলাস্ট্রেটরের কাজ ছিল কি?
সুধীর: না না, এক্ষেত্রে তো থাকেই, কারও না কারও ইনফ্লুয়েন্স থাকেই।

দেবাশীষ: আপনাদের দুজনেরই ভীষণ ডিসটিংক্টলি আলাদা স্টাইল হাসির। সুধীরদা, আপনি যেমন ছবিতে চোখটা গোল গোল করে দেন, বা নাকটা। তো সেটা কি এমনিই হয়ে গিয়েছিল, না কোনও পার্টিকুলার কাজ… যেমন আমরা আপনাদের বা বিমলদার কাজ দেখেই এগিয়েছি…
সুধীর: শৈলদা তো অবশ্যই খানিকটা উদাহরণস্বরূপ ছিল আমাদের সময়ে। শৈলদার তো…
সমীর: শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পের ইলাস্ট্রেশন?
সুধীর: হ্যাঁ। শৈল চক্রবর্তী নিঃসন্দেহে একজন গ্রেট ইলাস্ট্রেটর।
প্রণবেশ: শৈল চক্রবর্তীর এই মজার গল্পের ড্রইংগুলো সম্পর্কে আমরা সকলেই অল্পবিস্তর জানি, কিন্তু শৈল চক্রবর্তীর সিরিয়াস ড্রয়িংও দেখার মতো। রবীন্দ্রনাথের গল্পেও ছবি এঁকেছেন…
দেবাশীষ: না, আমার বরং সুধীরদার কাজকে কীভাবে শৈলদা ইনফ্লুয়েন্স করেছেন, সেটা জানতে ইচ্ছে করছে।

সুধীর: খানিকটা তো বটেই। বিশেষত ড্রইংয়ের দিকটায়। ইনফ্লুয়েন্স অনেকেই করেছেন আমাকে। যা বললাম, শিল্পীদের কেউ না কেউ অনুপ্রাণিত করবেই।
সমীর: শৈল চক্রবর্তীর যে কাজ তা মূলত তুলির। ওঁরা তখন ড্রয়িং পেন অতটা ইউজ করতেন না, ম্যাক্সিমাম কালি-তুলির কাজ।
সুধীর: আমি আবার গোড়ায় তুলি বেশি ইউজ করলেও, পরে পেনের দিকেই বেশি ঝুঁকে গিয়েছি। ইদানীং আরওই।
সমীর: প্রবোধ সান্যালের ‘বনহংসী’ বলে একটা লেখায় শৈল চক্রবর্তীর ইলাস্ট্রেশন সে সময় আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। তখনকার শিল্পী বলতে কালীকিংকর ঘোষ দস্তিদার, শৈল চক্রবর্তী আরও অনেকেই ছিলেন।
সুধীর: আরেকজন ছিলেন মাখন দত্তগুপ্ত।
প্রণবেশ: মাখন দত্তগুপ্ত খুব একটা বেশি কাজ করেননি। কিন্তু উনি যে ক’টা করেছেন, দুর্দান্ত করেছেন। আর একজন ছিলেন আমাদের রণেন আয়ান দত্ত।

সমীর: মাখনবাবু আমার কলেজের মাস্টারমশাই ছিলেন। হ্যাঁ, আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি যে, আমার মাস্টারমশাইও যেখানে কাজ করেছেন, আমিও সেখানে কাজ করেছি।
প্রণবেশ: কিন্তু ওঁর কাজের প্রভাব আপনার ওপরে সেভাবে পড়েনি।
দেবাশীষ: তখন ওঁর কোনও স্কেচ করেননি কেন? তাহলে আমরা দেখতে পেতাম। কালীকিংকর বাবুর কোনও ছবিই আজ আর প্রায় পাওয়াই যায় না।
প্রণবেশ: না, পরিমল গোস্বামীর তোলা ছবি আছে।
দেবাশীষ: ছবি না, স্কেচ বলছি।
সুধীর: না না, তুমি পুরনো যুগান্তর ঘাঁটলে অবশ্যই ওঁর ছবি পাবে। আচ্ছা, একটা জিনিস তোমরা প্রশ্ন করছিলে যে, হিউমারাস আর সিরিয়াস ছবির ফারাকের ব্যাপারটা, সেই প্রসঙ্গে একটা কথা আমার মনে পড়ল। পরিমলবাবুর কথাও যেহেতু উঠল, তাই বলি– পরিমলবাবু ছিলেন যুগান্তর সাময়িকীর সম্পাদক। ওঁর সম্বন্ধে তো অনেকেই জানেন, সাহিত্যিক হিসেবেও জানেন, সম্পাদক হিসেবেও জানেন। এবং…
প্রণবেশ: ফটোগ্রাফার হিসেবেও।

সুধীর: ফটোগ্রাফার হিসেবে ওঁর বিরাট খ্যাতি তো সুবিদিত। তো এই পরিমলবাবু শিল্পী অহিভূষণ মালিককে দিয়ে অসাধ্যসাধন করিয়েছিলেন…
দেবাশীষ: অহিদা…
সুধীর: হ্যাঁ, অহিদা যে তোমারও খানিকটা ইনস্পিরেশন সে তো বলতেই পারি, সবটা না হলেও…
দেবাশীষ: অবশ্যই। আমায় অনেক হেল্প করেছেন, আমাদের অনেক শিখিয়েছেন, গাইড করেছেন।
সুধীর: তা অহিদা যখন যুগান্তরে কাজ করতেন, তখন উনি কিন্তু সবসময়ই ওই ক্যারিকেচার ড্রইংই করতেন। কিন্তু পরিমলবাবুর একটা মজা ছিল, আমি দেখেছি। পরিমলবাবু কিন্তু সিরিয়াস গল্পের ইলাস্ট্রেশনও অহিভূষণকে দিয়ে করিয়েছেন। বলতেন, ‘থাক না।’ আমি পরে কারণটা জিজ্ঞেস করেছিলাম পরিমলবাবুকে, ওঁর সঙ্গে পরে আমার খুব আঁতাঁত হয়ে গিয়েছিল। সিরিয়াস গল্পে কমিকাল ছবি কতটা যুক্তিযুক্ত জিজ্ঞেস করায় পরিমলবাবু একটা আশ্চর্য কথা বলেছিলেন, ‘না, এরকম ভাবার কিন্তু কোনও মানে নেই। উনি আঁকুন না ওঁর মতো করে। আমার গল্পের কিন্তু কোনও ক্ষতি এটা করছে না। পাঠক কিন্তু পড়তে পড়তে ওই চরিত্রগুলিকে ওইভাবেই নিচ্ছে।’

দেবাশীষ: আচ্ছা!
সুধীর: এটা কিন্তু পরিমলবাবু ভেবেছিলেন। সুতরাং, তুমি যদি সিরিয়াস গল্পেও তোমার নিজস্ব স্টাইলে আঁকো, তাতেও কিন্তু খুব ক্ষতি নেই।
প্রণবেশ: না না, অবশ্যই করা যায়।
দেবাশীষ: তবে ছবির স্টাইলটা তো গল্পকে খানিকটা ডিফাইন করে দেয়। তা আমি যদি একটা সিরিয়াস গল্পের ছবি মজার স্টাইলে করি, তবে তো গল্পের মেসেজটাই ভুল হয়ে যাবে!
সুধীর: না না সিরিয়াস মানে কী? চরিত্রগুলো তো ঠিকই আসছে।
প্রণবেশ: হ্যাঁ। পাঠককে কাতুকুতু দিয়ে তো আর হাসানোর কথা না!
দেবাশীষ: সুধীরদা, আপনি একদিন বলেছিলেন যে, আপনি না কি ঠিক আইডিয়াল ছোটদের ইলাস্ট্রেটর নন। এটা শুনে যদিও আমার খুব আশ্চর্য লেগেছিল! আজকে আপনি সবার সামনে যদি এটাকে একটু এক্সপ্লেন করেন… আপনি এ-ও বলেছেন যে, আপনি না কি খুব ভালো অ্যানিম্যাল ড্রইং পারেন না। সমীরদাও সামনে রয়েছেন– আচ্ছা, সমীরদা আপনার কী মনে হয়?
সমীর: আমিও খুব একটা পারি না…

দেবাশীষ: না, সুধীরদা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছি আপনাকে। আপনার সম্বন্ধে তো আমি আসছি। আপনার কি সত্যিই মনে হয় যে সুধীরদার অ্যানিম্যাল ড্রইং…
সমীর: না, আমি সুধীরের করা সেরকম ছোটদের কাজ খুব একটা কিন্তু দেখিনি।
দেবাশীষ: ‘আনন্দমেলা’-য় দেখেননি?
সমীর: আনন্দমেলায়? নাহ্, অতটা খেয়াল করিনি।
দেবাশীষ: ‘রাজা হওয়ার ঝকমারি’, ‘হরিণের দুধ’, ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’… কত নাম করব!
সমীর: আসলে তখনকার দিনের ‘দেশ’ আর ‘আনন্দবাজার’ দেখেই তো মন ভরে যেত। আর আমি যেহেতু আনন্দমেলায় তেমন কাজ করতাম না গোড়ার দিকে, ফলে চোখে পড়েনি। সুধীর সেখানে অনেক আগে থেকে কাজ করছে।
সুধীর: হ্যাঁ, গোড়ার দিকেই আমি এঁকেছি বেশি। আনন্দমেলায় পরের দিকে বরং আমার কাজ কম। তখন নীরেনদা ছিলেন সম্পাদক। ওঁকে একদিন আমিই বললাম, ‘নীরেনদা, ওই ছোটদের ছবি আমার আর আঁকতে ভালো লাগছে না। আমি ঠিক পারছি না বলে আমার মনে হয়…’ পরে যদিও আবার করেছি।
দেবাশীষ: আচ্ছা, আমার তো ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় যে ছোটদের ছবিতে মানে অনেক কিছু দেখানোর সুযোগটা মানে স্কোপটা অনেক বেশি। আপনাদের কখনও এটা মনে হয়নি?

সমীর: এখন ছোটদের বলতে কোন বয়স অবধি বলবে?
দেবাশীষ: ১৫ বছর?
সমীর: উঁহু। আজকালকার ১৫ বছর বয়সী ছেলেমেয়ে তো সিরিয়াস ইলাস্ট্রেশন ছাড়া বুঝবে না।
দেবাশীষ: কিন্তু সমীরদা, আমি একটা জিনিস দেখেছি যে, বড়রাও, মানে কলেজ পড়ুয়া থেকে আপ টু ৩০ বছর বয়সিরা কিন্তু মজার এলিমেন্ট বেশি খোঁজে। মানে একটু লাইট এলিমেন্ট ছবিতে খুব বেশি খোঁজে, বিশেষ করে খবরের কাগজের পাঠকরা।
সমীর: হ্যাঁ। ব্যাপার হচ্ছে সেটাও তো গল্পের উপর নির্ভর করে। সেটা ছোটদের গল্প বলে নয়, বড়দের জন্যও যদি সেটা হাসির খোরাক দিতে পারে, এবং সেটা যদি কেউ যথাযথভাবে ইলাস্ট্রেট করে, তাহলে বড়রাও এনজয় করতে পারে। এই যে দুলেন্দ্র ভৌমিকের গল্পের ছবি তুমি নিয়মিত আঁকো…
দেবাশীষ: হ্যাঁ, দুলুদার গল্প তো বটেই।
সমীর: সে ছবি তো আমার মনে হয় বড়রাও এনজয় করবে, ছোটরাও এনজয় করবে। সেইজন্যই বলছি আমি যে, দুলেন্দ্র ভৌমিকের গল্পের যেসব ছবি করো তুমি, তাতে গল্পের ছবিতে যেসব ইনপুটগুলো লাগাতে… নানা ধরনের ডিটেইল, নানা এলিমেন্ট। সবগুলোই কি গল্পে থাকত?
দেবাশীষ: না। কখনওই না।
সমীর: তাহলে সেগুলো তো তোমার নিজস্ব ইনপুট…
দেবাশীষ: না, সমীরদা, এটা কিন্তু দুলুদার গল্পের জন্য আলাদা করে নয়, আমি সচরাচর প্রথমে ঠিক করে নিই যে আমি কী করব। মানে আমি কোন অ্যাঙ্গেলে ছবিটাকে ভাবব, কী কী রাখব। গল্পে সবসময় সাপোর্ট পাই না।
সমীর: না না, শুধু অ্যাঙ্গেলের কথা তো হচ্ছে না।
দেবাশীষ: না ওই যে, আমি বাড়তি অনেক কিছু দেব…
সমীর: যে প্রপস, যে ডিটেইলগুলো থাকে সেখানে…
দেবাশীষ: হ্যাঁ।

সমীর: বেড়াল-কুকুর নিশ্চিত দুলেন্দ্র ভৌমিকের লেখায় সবসময় থাকে না।
দেবাশীষ: হ্যাঁ, সবসময় থাকত না।
সমীর: অথচ সেটা তো তোমার ছবিতে থাকত। সুন্দর লাগে দেখতে। সুতরাং, অনেক এলিমেন্ট জোগাড় করে তবেই তো জিনিসটা সর্বাঙ্গসুন্দর হয়।
দেবাশীষ: না, আমি একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝেছিলাম যে, গল্প লোকে পড়ুক না পড়ুক ছবিটা দেখবে। ইলাস্ট্রেশন পাঠক দেখবেই। এখন এই যে নিয়মিত খবরের কাগজে ছবি আঁকি, অনেক সময় আমাকে সবাই এসে বলেছে, ‘তোমার ছবিটা অসাধারণ হয়েছে’ এবং খুঁটিয়ে দেখেছে। আমি তখন জিজ্ঞেস করি, ‘লেখাটা পড়েছ?’ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জবাব আসে, ‘না, লেখাটা পড়িনি।’ অর্থাৎ লেখা অবধি পাঠকরা যায়ই না। (সমবেত হাসি)।

দেবাশীষ: আমি একটা জিনিস বুঝে গিয়েছি যে, ছবি হয়তো পুরো গল্পটা বলতে পারবে না, কিন্তু পাঠককে একটা মজা দেবে এবং হয়তো পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে। সুতরাং, ইলাস্ট্রেটরের একটা বিরাট দায়িত্ব আছে ছবিটাকে অ্যাট্রাকটিভ করার নেপথ্যে। এখন মুখোমুখি দুটো মুখ এঁকে আমি ছেড়ে দিলাম, পেছনে একটা ইয়েলো রং মাখিয়ে, সে ধরনের ইলাস্ট্রেটর আমি নই। আমি ওটা পারিনি কোনওদিন। আমার চিন্তাটা জুড়ে থাকে ডিটেইলস। মনে হয় অনেক কিছু দেব। এই যে সমীরদা মাঝেমধ্যেই করে যে একটা চরিত্রের গেঞ্জির ওপরে খুব সুন্দর করে কিছু একটা লিখে দিল। কিংবা পাইপের ওপর। এগুলো জরুরি। সুধীরদা, আপনার একটা ইলাস্ট্রেশন ছিল ‘অজযাত্রা’, নবনীতা দেবসেনের। একটা পুরনো আলমারি এঁকেছিলেন। আলমারির ওপরে ছাগলটা উঠে গিয়েছে।
সমীর: অ্যাকচুয়ালি সেগুলোই তো অলংকরণের আসল মজা…

দেবাশীষ: আমি আসলে টেক্সটের মধ্যে সেগুলোই খুঁজি। এই যে আপনি বললেন না, বেড়াল-কুকুর কি গল্পে থাকে? থাকে! ওই বিটুইন দ্য লাইনস। মনে করুন একটা বাড়ির দাওয়া। সেটা কোনও গল্পের হয়তো একটা লাইনে বেরিয়ে গেল। আমি ওই দাওয়াটাকেই হাইলাইট করলাম।
সমীর: না না শোনো, তুমি তো উল্টোদিকে যাচ্ছ! আমি তো সেটাই বলতে চেয়েছিলাম যে, গল্পে যেটা থাকে না, সেটা যদি ইলাস্ট্রেটর নিজের পছন্দমতো এবং গল্পের সঙ্গে যায় সেভাবে যদি নিজের ইনপুট দেয়, সেটাতেই ছবিটা…
দেবাশীষ: আমি ওইভাবেই নিয়ে গিয়ে তৈরি করেছি।

সমীর: অলংকরণ অর্থাৎ অর্নামেন্টেশন! অলংকরণ বলতে তো এগুলোকেই বোঝায়!
দেবাশীষ: নাহ্, তা ঠিক নয়। শিবরাম কিংবা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প করতে গেলে এটা হত না। কারণ ওগুলোতে এমনিতেই প্রচুর এলিমেন্ট আছে। কিন্তু দুলুদার গল্পের মধ্যে নেই, হয়তো বা অন্য কারওর লেখার মধ্যেও নেই। তখন কী করব? ভেবেচিন্তে গড়ে নিতে হয়।
সুধীর: যেমন সঞ্জীবের গল্প। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। ওর গল্পে কিন্তু তুমি প্রচুর জিনিস পাবে। যেগুলো পাওয়া যায়…

প্রণবেশ: আদতে ব্যাপারটা সাজানো কিন্তু খুবই কঠিন।
সমীর: যাই হোক, তখন যদি মূলানুগভাবে চিত্রায়িত করতে হয়, তখন তোমাকে গিয়ে বুঝতে হবে এ চরিত্র কী ধরনের অ্যাক্টিভিটির সঙ্গে জড়িত, কী ধরনের প্রফেশন অ্যাডাপ্ট করে। সেটার বেসিসে তার কী চেহারা হবে…
দেবাশীষ: অনেক চ্যালেঞ্জিং কিন্তু! অনেক চ্যালেঞ্জিং! যে, ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, না ডাক্তারি পড়ে… মার্কসবাদী না ক্যাপিটালিস্ট…

সমীর: না, ব্যাপারটা হচ্ছে কী জানো তো… দেখা গেল যে বই বেরনোর পর খোদ লেখকই হয়তো ফট করে বলে দিল যে আমি যেমনটা ভেবেছিলাম ছবিতে সেটা হলই না।
দেবাশীষ: না, ধরুন তা করেনি। করবে না। কিন্তু ইলাস্ট্রেটরের পরিধিটা তো সত্যিই বিশাল– যেন অ্যাজ আ ফিল্ম ডিরেক্টর, সে গল্প অনুযায়ী একটা সেট তৈরি করছে, কস্টিউম ডিজাইন করছে।
সমীর: লোকেশন ঠিক করছে, কাস্টিং করছে…
দেবাশীষ: এটা কিন্তু খুব মজার!

সমীর: এই যে কালীকিংকর ঘোষ দস্তিদার, শৈল চক্রবর্তী থেকে শুরু করে তারপর আরও অনেকের ছবি দেখেছি যাঁরা আমাদের ছবি আঁকার সময় ইনস্পিরেশন হন.. আরও পরে সত্যজিতের সংস্পর্শে যখন এলাম, তখন আমার নিশ্চিতভাবে মনে হল এতদিনে আসল জিনিসটি পেয়ে গিয়েছি! আর আমার অন্য কাউকে দরকার নেই! সবার পরিপূরক হচ্ছে এই একটি লোক! যার উপর নির্ভর করা যায়, যার ভেতরের জিনিস নিজে নেওয়া যায়। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করতে করতে দেখলাম যে, আমার ভেতরের একটা সত্তা তৈরি হয়ে গিয়েছে। যে সত্তাটা প্রত্যেকটা ছবি করার সময় আমার মধ্যে কাজ করে। যেন নিজের পছন্দ অনুযায়ীই সে কাজটা করছে। সেটা আমার পক্ষে একটা বিরাট এক্সপিরিয়েন্স!

সুধীর: সেটা তুমি ওর কাছাকাছি এসেছিলে বলে…
সমীর: শুধুই সংস্পর্শে এসেছি বলে নয়। পারস্পরিক গুণগ্রাহী বলে আরও। আমার সঙ্গে ওঁর আলাপ হওয়ার আগেই উনি আমার কাজ দেখেছেন এবং সে কাজ সম্বন্ধে ওঁর একটা মতামত তৈরি হয়ে গিয়েছে। যখন প্রথম ‘পথের পাঁচালী’র সময় আমি ডি.জে. কিমারে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, তখন উনি এমন ভাব দেখালেন যে, আমি যেন ওঁর কতদিনের চেনা! আমি একদম মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এত বড় একটা লোক আমার ছবি দেখে! শুধু দেখেই না, আমার কাজটাকে সে মান্যতা দেয়! আমি স্তম্ভিত! তারপরে আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে সম্যকভাবে বুঝলাম যে, এঁর চিন্তাধারার যে মান, তাকে যদি ঠিকমতো কাজে লাগানো যায়, তাহলে ‘মনের সুখ’ কী জিনিস সেটা আমি বুঝতে পারব!
সুধীর: আমি যেমন একদিন ফোন করে সত্যজিৎবাবুর বাড়ি গিয়েছিলাম।
দেবাশীষ: এটা কোন সময়ের ব্যাপার?

সুধীর: এটা ধরো ছয়ের দশকের একদম শুরুর দিকেই হবে, ১৯৬৫-ও হতে পারে… সঠিক মনে নেই। তখন উনি ছবি-টবি করে যথেষ্ট বিখ্যাত। উনি যখন কিমারে কাজ করতেন তখন একবার দেখেছিলাম ওঁকে। ওঁদের অফিসে আরেকটি ছেলের সঙ্গেই আমি গিয়েছিলাম কোনও দরকারে। তখনও ওঁর সঙ্গে আলাপ-টালাপ হয়নি। যাই হোক, পরে যখন আমি ফোন করে গিয়েছি, তখন আমি আমার নিজস্ব একটা কাজেই গিয়েছিলাম… অন্য একটা কাজে। তো যখনই আমি ফোন করেছি, আমি বললাম যে আমার নাম এই… তখন উনি বলছেন– ‘ওহ! সুধীর মৈত্র। হ্যাঁ হ্যাঁ! চলে আসুন। আপনি তো আনন্দবাজারে কাজ করেন?’ আমি বললাম– ‘না না, আমি আনন্দবাজারের কাজ করি না, আমি চাকরি করি স্টেটসম্যানে।’
সমীর: ও, তখন তুমি তখন স্টেটসম্যানে ছিলে না!
সুধীর: হ্যাঁ। তা সত্যজিৎ আমার কথা শুনেটুনে বললেন, ‘স্টেটসম্যানে? ওহ! আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি কখন আসবেন?’ এরপর ডিরেকশন দিয়ে উনি কোথায় থাকেন ইত্যাদি বলেটলে দিলেন। সমীরের কথার রেশ ধরেই বলি– যাওয়ার পরে একবারও আমার মনে হল না যে, উনি আমার অপরিচিত– আমার কোন কাজ, কোথায় দেখেছেন… এই যেমন এখন তোমরা আলোচনা করছ, উনিও কিন্তু এইভাবেই, এতটা গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতেন।
দেবাশীষ: বাহ্! মানে একদম কাজ ধরে ধরে আলোচনা করতেন?
সুধীর: হ্যাঁ, মানে কয়েকটা কাজ ওঁর ভালো লেগেছে, কোনটা মনে ধরেছে, কেন ভালো বলছেন… এই এটার এই ছিল, ফর্ম কেমন ছিল, সমীরের কাজ কীরকম, আমার কাজ কীরকম, আরেকটা ছেলে কাজ করত ধ্রুব রায় বলে…

দেবাশীষ: হ্যাঁ, মূলত ‘অমৃত’ কাগজেই ছবি আঁকতেন…
সুধীর: তারপরে সিনিয়রদের মধ্যে শৈল চক্রবর্তী, কালীকিংকর ঘোষ এঁদের কাজের কথাও উঠল… কিন্তু ওই ঘরানার কাজ সম্বন্ধে ওঁর মনে বোধহয় একটু রিজারভেশন ছিল। দেখলাম উনি একটা সময় চুপ করে গেলেন। এটা হতেই পারে… জানি না, কিংবা উনি হয়তো এড়িয়ে গেলেন…
(আড্ডায় চা-পানের বিরতি)
দেবাশীষ: লেখকদের সঙ্গে ইলাস্ট্রেটরদের জুটিকে কি সত্যিই আমরা রাজযোটক বলতে পারি?
সুধীর: রাজযোটক তো স্থায়িত্বের নিরিখে তৈরি হয়ে যেত… যেমন শৈল চক্রবর্তীর সঙ্গে শিবরাম চক্রবর্তী কিংবা যতীন সেন এবং পরশুরাম… এই নামগুলোই আমার বেশি করে মনে হয়…
সমীর: আমার ধারণা শৈল চক্রবর্তী এবং শিবরাম চক্রবর্তীর যে জুটি ছিল, সেটাই সত্যিকারের রাজযোটক। যতীন সেন এবং পরশুরামের যুগলবন্দি কিন্তু ততটা আবেদন রাখে না…
প্রণবেশ: কারণ পরশুরামের লেখা পড়লে ছবি দেখারই দরকার হয় না…

দেবাশীষ: যতীন সেন কিন্তু ২০০% বিদেশি ঘরানার কাজ করতেন। অথচ পরশুরামের লেখা এত বেশিমাত্রায় বাঙালি, সেখানে যতীন সেনের কাজ কিন্তু ভীষণভাবেই বিদেশি ঘেঁষা। খানিক চোখে লাগত। তখনকার বিদেশি বিজ্ঞাপন বা পাঞ্চের কার্টুন দেখলে কিন্তু ওরকম ড্রয়িং দেখতে পাওয়া যেত।
প্রণবেশ: পরশুরামের গল্পের কাজ তো সমীরদা নিজেই করেছেন…
দেবাশীষ: হ্যাঁ, বটেই তো! সমীরদা, একটা ছবি ভীষণ মনে পড়ছে, তাজমহলে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, তারপরে ছবি-লেখা মিলেমিশে গিয়েছে হেডপিসে… আচ্ছা ওই চিন্তাগুলো, মানে কীভাবে আপনি ডেভলপ করতেন? হেডপিসের সঙ্গে ওই টাইপ দিয়ে ওই কবিতাটা দেওয়া… এটা কি কোনও কাজ থেকে ইনস্পায়ার্ড হয়ে করা? আপনি তো অন্যরকমও আঁকতে পারতেন।

সমীর: আমি তো তখন বিজ্ঞাপনের আপিসে কাজ করি, ফলে ওই প্রভাবটা আঁকায় এসে থাকবে। বিজ্ঞাপনে ডিজাইনিং ব্যাপারটা থাকে তো! সেই ডিজাইনিং সেন্সের খানিকটা ইলাস্ট্রেশনেও চলে এসেছিল আর কী! গ্রাফিত্তি ব্যাপারটা দেখতে ভারি ইন্টারেস্টিং! ইলাস্ট্রেশন মানেই যে দুটো-তিনটে ক্যারেক্টার বসে গল্প করছে বা ইয়ে করছে তা নয়। তার ভেতরেও বাড়তি কিছু দেওয়ার থাকে…
প্রণবেশ: এক্স্যাক্টলি!
সমীর: সেই জিনিসটাই চলে এসেছে আর কী! আমার নিজের অজান্তেই এসে গিয়েছে। আমি তখন ভাবলাম গ্রাফিক এলিমেন্ট কিছু জুড়ব। আমার খুব ভালো লাগত। এবং পরবর্তী সময়ে আমি বহুবারই এরকম করার চেষ্টা করেছি।

দেবাশীষ: মানে ওটা নিছক একটা গ্রাফিক্যাল এলিমেন্ট।
সমীর: হ্যাঁ, সেভাবে দেখলে ওদের কার্যকরী কোনও ভূমিকাই নেই। ওই যে লেখাগুলো বলছিলে…
দেবাশীষ: না, কিন্তু কবিতাটা আছে। কবিতাটা কিন্তু লেখাতে ছিল না। তাজমহলের মাঝে কবিতাটা, এ কথা জানিতে তুমি…। এই যে বিখ্যাত… এইটাকে আপনি অ্যাডাপ্ট করে ছবিতে নিয়ে এলেন এটাই তো ভীষণ মানে সেরিব্রাল জায়গা। শুধুমাত্র তুলির টান নয়।
সমীর: যেমন বিমল করের গল্পের জন্য একবার ছবি করেছিলাম, বিমলবাবুর যে মূল ম্যানুস্ক্রিপ্ট বা পাণ্ডুলিপি সেটার ওপরেই! ওর লেখাটাই হচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ড। ডিজাইন ছাড়া ছবির মধ্যে তো ওই ম্যানুস্ক্রিপ্টটার আর কোনও ভূমিকা নেই! ওটা জাস্ট একটা গ্রাফিক্যাল ব্যাপার।

প্রণবেশ: আপনি কালার ব্যবহার করছেন যখন… আমি দেখেছি সেটা অনেকাংশেই কন্ট্যুর নির্ভর। মানে ওটা যদি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট রেখে, আমি কালারগুলো অফ করে দিই, আমার মনে হয় ছবিতে বা ছবির আবেদনে কোনও অসুবিধা হবে না।
সমীর: না, তা হবে না।
প্রণবেশ: অথচ সুধীরদার ছবিতে যদি কালার অফ করে দিই, ছবির অনেক কিছু কিন্তু হারিয়ে যাবে। অথচ আপনার ছবিতে যদি আমি কালারগুলো তুলে নিই, সেটা হবে না। সত্যজিৎ রায়ের ছবির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সমীর: না, সেটার কারণ হচ্ছে সুধীরের কালার দেওয়াতে অনেক রকম টোনের ব্যাপার আছে। যাকে বলে টোনাল ডাইমেনশন। আমার ছবিতে সেটা থাকে না।
প্রণবেশ: হ্যাঁ, আপনার সবই কন্ট্যুর বা ফিগার নির্ভর। সত্যজিতের ঘরানায়…

সমীর: হ্যাঁ, আমার ট্রিটমেন্ট… ওইটা একটু গ্রাফিক্যাল। যেমন ‘পঞ্চপ্রিয়া পাঞ্চালী’-তে সত্যজিৎ কী অনবদ্য ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন!
প্রণবেশ: হ্যাঁ, পেপার কাটিং।
সমীর: পেপার কাটিং মানেই সেখানে গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের ব্যাপারটা চলে এসেছে। ছোট লাইনেও তো অনায়াসে করতে পারতেন, অথচ তা কিন্তু উনি করলেন না। তার বদলে বেশ সুন্দর দেখতে একটা পেপার কাটিং দিয়ে কালো কালো ফিগার বানিয়ে ছবি একেবারে জমিয়ে দিলেন। এটাই সত্যজিৎ রায়!
(মধ্যাহ্নভোজের দরুণ আড্ডায় সাময়িক ছেদ)
দেবাশীষ: সুধীরদা, ইলাস্ট্রেশন নিয়ে খুব সিরিয়াসলি একটা কিছু ভাবা যায় না? এগজিবিশন করার কথা?
সুধীর: এটা নিয়ে আর আমি কীই বা বলি?
দেবাশীষ: আপনি নিজের মতো করেই বলুন না! প্রণবেশদাকে বলুন!
সুধীর: তুমি তো এইটা নিয়ে কথা তুলেছিলে, ইলাস্ট্রেটরদের নিয়ে তোমার কী যেন একটা বক্তব্য ছিল?

দেবাশীষ: আমার বক্তব্য ছিল যে ইলাস্ট্রেটররা তাদের ন্যায্য সম্মানটা পাচ্ছে কি পাচ্ছে না… আপনার কী মনে হয়?
সুধীর: আহা, সমীর তো একবার বলেই দিয়েছে।
দেবাশীষ: কী?
সুধীর: ওই যে ইলাস্ট্রেটর আর পেইন্টারদের… এই যে তফাতটা।
সমীর: ওটা তো সবারই জানা কথা। পেইন্টাররাও ইলাস্ট্রেটরদের পোঁছে না। অধিকাংশ পেইন্টারের মতে ইলাস্ট্রেটররা ন্যারেটর ছাড়া আর কিচ্ছু না। যথেষ্ট খাটো করেই দেখে।
সুধীর: ওরা নিজেরা কী? ওরাই একমাত্র ক্রিয়েটিভ? কী ক্রিয়েট করে?
সমীর: যাই হোক, পেইন্টাররা অরিজিনাল কাজ করছে।
সুধীর: তাই না কি?
সমীর: হ্যাঁ, অরিজিনাল কাজ করছে। আর আমরা কোনও একটা লেখার ওপর ভিত্তি করে সেটাকে ন্যারেট করছি ইন আর্ট ফর্ম।
সুধীর: ওরা ন্যারেটর হোক না! মাইকেল অ্যাঞ্জেলো কী ছিল? রুবেন্স কী ছিল? রাফায়েল কী ছিল? এইসব বললে তো অন্য কথা এসে যাবে…

দেবাশীষ: রাফায়েল তো পুরো ইলাস্ট্রেটর!
সুধীর: ওই তো বললাম, এই কথা বললে তো সবাই ন্যারেটর আর ইলাস্ট্রেটর!
দেবাশীষ: না, এতে কি আমাদের কোনও দায়িত্ব থেকে যায়? বরং একটা এক্সিবিশন হোক না। পুরোপুরি ইলাস্ট্রেশন নিয়ে একটা প্রদর্শনী। অরিজিনাল আর্টওয়ার্কের দরকার নেই, হয়তো কিছু পাওয়া যাবে…
প্রণবেশ: অরিজিনাল দরকার কী? অরিজিনাল নিয়ে তো ওখানে কোনও ব্যাপার না!
দেবাশীষ: দেখো, শেষমেশ রিপ্রোডাকশনে কী হল ওইটা নিয়ে আমাদের কথা। ছাপা অথবা রিপ্রোডাকশনের কথা এবং পাতায় কীভাবে ছবিটা বসছে, সেসব নিয়ে পেইন্টাররা কখনও ভাবে না, আমরা ভাবি… এক্ষেত্রে একটা ইম্পর্ট্যান্ট বিষয় এই যে, আমাদের যে ফান্ডিং দরকার হবে, তা নিয়ে আমরা একটা চিন্তাভাবনা কি শুরু করতে পারি?
সুধীর: ফান্ডিং বলতে কী বলছ?
দেবাশীষ: খরচাপাতি তো আছে… যদি স্পনসর ইত্যাদি কোনও গ্যালারি… মানে আমাদের তো জনসংযোগের অভাব নেই। আমরা যদি একটু খোঁজখবর করি, যেটা আমাদের নিজস্ব স্ট্রেংথ আর কী, তাহলে কেন পারব না?

প্রণবেশ: দেখো, সেটা কতখানি সাকসেসফুল হবে জানি না। একজন পেইন্টারের জন্য যেটা করা হয়, একজন ইলাস্ট্রেটরের জন্য সেটা করা হবে কি না, লোকে করতে রাজি হবে কি না… সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে।
দেবাশীষ: না, যদি আমরা চেষ্টাটুকু করি?
প্রণবেশ: চেষ্টা কীভাবে হবে? ইলাস্ট্রেটরদের ক’জন চেনে? ক’জন জানে?
দেবাশীষ: আমি তো ব্যাপারটা করতে বলছিই ইলাস্ট্রেশনটাকে প্রোমোট করার জন্য। প্রোমোট করাই লক্ষ্য, বিক্রির কথা বলছি না আমি।
প্রণবেশ: আমি যদি বাড়িতে একটা পেইন্টিং রাখতে পারি, তাহলে একটা ভালো ইলাস্ট্রেশন আমি কেন বাঁধিয়ে রাখতে পারব না?
সুধীর: এ তো তোমার জোর করে বলা…
প্রণবেশ: না না, জোর করে কেন? জাপানে ক্যালিগ্রাফি বাঁধিয়ে রাখা হয়। অথচ আমাদের এখানে ক্যালিগ্রাফি নিয়ে এখন কেউ আর তেমন ভাবছেই না। ক্যালিগ্রাফিটা আমাদের এখন পুরো বন্ধই হয়ে গিয়েছে। আর এর জন্য দায়ী পূর্ণেন্দুদা (পূর্ণেন্দু পত্রী)।

দেবাশীষ: প্রণবেশদা, আমরা কিন্তু এখন অনেক ধরনের এগজিবিশন হতে দেখছি। অলংকরণ নিয়ে একটা হবে না? শুধুমাত্র পেইন্টিং নয় তো, অনেক ধরণের এগজিবিশন হয় এখন। লোকে ভিড় করে দেখতে যায়।
প্রণবেশ: হ্যাঁ, তা যায়।
দেবাশীষ: এবং ইলাস্ট্রেটরদের একটা বিরাট মার্কেট আছে কিন্তু।
প্রণবেশ: কোনও লেখককে কিংবা পেইন্টারকে আমি কিন্তু এমন প্রদর্শনীতে যেতে দেখিনি। আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে, সত্যজিতের বুক কভার নিয়ে যখন এক্সিবিশন করছি, ওইখানে নন্দন চত্বরে অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ কেউ প্রদর্শনীতে এসে ভিড় করছে না…


দেবাশীষ: সুধীরদা, তাহলে এটা নিয়ে কি আর কোনওদিন কিছু করতে পারব না বলে মনে হয়?
সুধীর: দল চাই। দল না হলে কী করে হবে?
সমীর: আই কান্ট এগ্রি মোর। দেবাশীষ, তুমি দেখবে যেখানে যত প্রফেশনাল আছে, সবাই দলে আছে। প্রত্যেকের অ্যাসোসিয়েশন আছে, প্রতিটা প্রফেশনালের অ্যাসোসিয়েশন আছে।
সুধীর: দল না করলে হবে কী করে? তোমার কথা তুলে ধরবে কে?
সমীর: ও ছাড়া আর কিচ্ছু নেই।
দেবাশীষ: সেজন্যই আমি বলছি যে একটা গ্রুপ হিসেবেই তো আমরা এগজিবিশনটা করতে পারি। একটা কোনও অ্যাক্টিভিটি সামনে রাখলে, একটা গোল থাকলে কাজটা করা যায় বোধহয়, না? আমাদের দলটার প্রথম কাজ না হয় সেটাই হোক!
———————————————–
অনুলিখন: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
নামাঙ্কন: দেবাশীষ দেব
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: পাপড়ি দেব, দেবাশীষ দেব, শরণ্য চট্টোপাধ্যায়
ছবি সৌজন্য: সন্দীপ রায়, দেবাশীষ দেব, সুধীর মৈত্রের ফেসবুক পেজ, চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved