


১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি প্রায় ২০ কোটি ভোটারকে কোনও রাজনৈতিক শক্তিই উপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই প্রজন্মই আগামিদিনের ভারতীয় সমাজ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করবে। আরএসএস সম্ভবত সেই দীর্ঘ ভবিষ্যতের কথাই ভাবছে। ১৯৫২ সালে যে সংগঠন একটি শিশুর হাতে বই তুলে দিয়ে তার ভারত-ভাবনা গড়ে তোলার দীর্ঘযাত্রা শুরু করেছিল, ২০২৬-এ এসে সেই সংগঠনকে সেই শিশুর উত্তরসূরির সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে স্মার্টফোনের পর্দার ওপারে। বদলেছে মাধ্যম, বদলেছে ভাষা, বদলেছে প্রজন্ম; বদলায়নি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মন জয় করার গুরুত্ব।
জেনারেশন জেড, আমরা সংক্ষেপে এই প্রজন্মকে ‘জেন জি’ বলে থাকি। এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা ছোট থেকেই ডিজিটাল দুনিয়ার কাঁধে হাত রেখে বড় হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী প্রজন্ম ‘জেন জেড’।
বিগত কিছু বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা বিশ্ব-রাজনীতির ইতিহাসে প্রবল ভাবে দাগ কেটেছে। নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব রাজনীতির মসনদ। সেই প্রজন্মের তরুণদের সঙ্গে কথা বললেন মোহন ভাগবত! রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস)-এর বর্তমান প্রধান মোহন মধুকর ভাগবত।

ভারতীয় রাজনীতির নিলয় এবং অলিন্দে যে রক্ত প্রবাহিত হয়, সেই রক্তে লোহিতকণিকার মতো ফিনকি দিয়ে উঠে আসে মোহন ভাগবতের নাম। সরাসরি রাজনীতির আঙিনায় না-থেকেও তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে আলোচ্য হয়ে থেকেছেন বারবার। সেই মোহন ভাগবত নিট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনায় অংশ নিলেন। শুনলেন তাদের হালহকিকত। ভোটের হিসেব না কি এটাই আরএসএসের প্রাচীন পন্থা? সমীক্ষা অনুসারে, ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের কথা ভেবে মাঠে নেমেছে আরএসএস। বিপুল সংখ্যক জেন জির মনের কথা শুনতে গুটি সাজাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংস্থা!
স্বাধীনতার ঠিক পরে দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু স্রোত, দারিদ্র এবং দেশের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার ব্যস্ততার মধ্যেই আর একটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। আগামী প্রজন্মকে কীভাবে তৈরি করা হবে? আগামী প্রজন্মের কাছে কীভাবে রাজনীতিকে আরও সহজ করা যেতে পারে? আগামী প্রজন্মকে কীভাবে আরও রাজনীতির অভিমুখে আনা যেতে পারে! সেই সময় আরএসএস বেছে নিয়েছিল শিক্ষার প্রাঙ্গণ।
১৯৫২ সালে উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরে মাত্র পাঁচ টাকা মাসিক ভাড়ার একটি বাড়িতে শুরু হল ছোট্ট স্কুল ‘সরস্বতী শিশু মন্দির’। কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তি ভারতীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যেই এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে সেটি ছিল আর পাঁচটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতোই। কিন্তু এই ছোট্ট পরিসরের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় পাশ করার উপায় নয়, একটি শিশুর চরিত্র, সংস্কার, দেশ ও সমাজ সম্পর্কে তার ধারণা তৈরিরও মাধ্যম। সেই ভাবনা থেকেই গোরক্ষপুরের স্কুলটির আদলে উত্তরপ্রদেশের নানা প্রান্তে একের পর এক শিশু মন্দির তৈরি হতে থাকে। ১৯৫৮ সালে এই বিস্তারকে সংগঠিত করার জন্য গড়ে ওঠে রাজ্যস্তরের ‘শিশু শিক্ষা প্রবন্ধ সমিতি’ এবং পরে বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে এই শিক্ষাপ্রয়াস । ১৯৭৭ সালে তার জন্য তৈরি হয় সর্বভারতীয় সংগঠন ‘বিদ্যা ভারতী’। অর্থাৎ, ১৯৫২-এর সেই ছোট্ট স্কুলটিকে শুধুমাত্র একটি বিদ্যালয়ের সূচনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আসলে সেটি ছিল একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক-শিক্ষাগত প্রকল্পের সূচনা যেখানে রাজনীতির মঞ্চে ওঠার অনেক আগেই শ্রেণিকক্ষকে ভাবা হয়েছিল একটি প্রজন্মের মন ও মূল্যবোধ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে। অর্থাৎ আজকে যখন নিট আন্দোলনে দেশ উত্তাল, সেই সময়ে আরএসএসে প্রধানের সঙ্গে জেন জি এবং জেন আলফাদের সাক্ষাৎ বিরল ঘটনা, এমনটা নয়। আরএসএস চিরকাল শিক্ষাক্ষেত্রকেই তাঁদের হাতিয়ার বানিয়ে এসেছে এবং এই ধারা তারা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

কিন্তু ১৯৫২-এর ভারত আর ২০২৬-এর ভারত এক নয়। বদলে গিয়েছে শ্রেণিকক্ষ, বদলে গিয়েছে শিক্ষার ভাষা, বদলে গিয়েছে তথ্য পাওয়ার পথ, সবচেয়ে বড় কথা বদলে গিয়েছে তরুণদের মনোজগৎ। যে প্রজন্মের হাতে একসময় ছিল পাঠ্যবই, তার পরের প্রজন্মের হাতে এসেছে টেলিভিশন। জেন জি-এর হাতে এসেছে স্মার্টফোন। ১৯৯৭ থেকে ২০১২-র মধ্যে জন্মানো এই প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই ইন্টারনেট, সোশাল মিডিয়া, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, শর্ট ভিডিও এবং অবিরাম তথ্যপ্রবাহের মধ্যে বড় হয়েছে। তাদের কাছে কোনও নেতা, কোনও রাজনৈতিক দল কিংবা কোনও সংগঠনকে গ্রহণ করার প্রক্রিয়াটিও আগের মতো একমুখী নয়। বক্তৃতা শুনে চুপ করে থাকার বদলে তারা প্রশ্ন করে, পাল্টা প্রশ্ন করে, তথ্য খোঁজে, মতের বিরোধিতা করে এবং প্রয়োজনে সেই বিরোধিতাকে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনগুলিও দেখিয়েছে, এই প্রজন্ম কেবল রাজনৈতিক বার্তার শ্রোতা হয়ে থাকতে রাজি নয়; তারা নিজেরাই রাজনৈতিক কথোপকথনের অংশীদার হতে চায়। আর এখানেই আরএসএসের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ।
যে সংগঠন একসময় শিশুর মনোজগতে পৌঁছতে শ্রেণিকক্ষকে বেছে নিয়েছিল, সেই সংগঠনকে এখন পৌঁছতে হচ্ছে এমন এক প্রজন্মের কাছে, যাদের ভরসা সমাজমাধ্যম। তাই মোহন ভাগবতের সঙ্গে জেন জি এবং জেন আলফার সরাসরি কথোপকথনকে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ কিংবা আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি বলে দেখলে হয়তো পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। এর মধ্যে হয়তো রয়েছে আরও অনেক দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন।

সেই প্রশ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম– জেন জি কি আদৌ সংসদীয় রাজনীতির অংশ হতে ইচ্ছুক? শাসক দলের বিরোধিতা করা সোজা। শাসক দলের ভুলভ্রান্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা, আন্দোলন সংগঠিত করা, বিচার চাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলোর মধ্যে যে সদিচ্ছা আছে, তেমনই জেন জি কি ইচ্ছুক সংসদীয় রাজনীতিতে আসার? ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের হিসাবে দেশে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯.৭৪ কোটি। ২০ মে ২০২৪-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটারের ২২.৭৮ % এই বয়সগোষ্ঠীর। ‘রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম’-এর ২০২৫ সালের ‘India Digital News Report’ বলছে, ভারতীয় ৫৫ শতাংশ মানুষ ইউটিউবের মাধ্যমে খবর দেখেন, ৪৬ শতাংশ হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে এবং ৩৭ শতাংশ ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন খবরের জন্য।
একই প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক তথ্যের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষণ আরও বলছে, ১৮-২৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম এখন সংবাদ পাওয়ার প্রধান পথ সমাজমাধ্যম। ভারতীয় রাজনীতির প্রায় সব পক্ষই এখন বুঝতে পারছে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা বদলেছে। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলিও দেখিয়েছে, শিক্ষা, চাকরি, পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ দ্রুত সংগঠিত হতে পারে এবং ডিজিটাল মাধ্যম সেই ক্ষোভকে অনেক বড় রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে যেতে পারে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-এর জেন জি-এর নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমাজমাধ্যম-কেন্দ্রিক তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর প্রচেষ্টাও জোরদার হয়েছে।

তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়। জেন জি কি রাজনীতি-বিমুখ? না কি তারা কেবল পুরনো ধরনের দলীয় রাজনীতির প্রতি অনাস্থাশীল? ২০২৪-এর নির্বাচনের আগে ১৮-২৯ বছর বয়সিদের এত বড় ভোটার উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়, এই প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলা যাবে না। আবার তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বড় অংশ যে এখন ডিজিটাল ও ইস্যুভিত্তিক, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে যে তরুণ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে, সে কি আগামিকাল কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকা হাতে নিয়ে নির্বাচনী ময়দানে নামবে? যে তরুণ সরকারের কাছে চাকরি, শিক্ষা বা স্বচ্ছতার দাবি করছে, সে কি নিজেই ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হতে চাইবে?
২০২৪ সালে ‘Lokniti-CSDS’-এর প্রথমবারের ভোটারদের নিয়ে করা সমীক্ষায় দেখা যায়, ৩৬.১ শতাংশ তরুণ ভারতীয় রাজনীতি নিয়ে খুব আগ্রহী এবং ৪২.৬ শতাংশ কিছুটা আগ্রহী। অর্থাৎ, প্রায় ৭৯ শতাংশ তরুণেরই রাজনীতি নিয়ে কমবেশি আগ্রহ রয়েছে। ভোটের ক্ষেত্রেও অনাগ্রহের ছবি নেই। প্রায় ৬৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফারাক রয়েছে। রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী হওয়া আর নিজে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করতে চাওয়া এক কথা নয়। তরুণরা ভোট দিতে চায়, সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চায়, আন্দোলনে অংশ নেয়; কিন্তু তাদের কতজন রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে নির্বাচনে লড়তে চায়, সে-বিষয়ে এখনও রয়ে গিয়েছে ধোঁয়াশা।

১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি প্রায় ২০ কোটি ভোটারকে কোনও রাজনৈতিক শক্তিই উপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই প্রজন্মই আগামিদিনের ভারতীয় সমাজ, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করবে। আরএসএস সম্ভবত সেই দীর্ঘ ভবিষ্যতের কথাই ভাবছে। ১৯৫২ সালে যে সংগঠন একটি শিশুর হাতে বই তুলে দিয়ে তার ভারত-ভাবনা গড়ে তোলার দীর্ঘযাত্রা শুরু করেছিল, ২০২৬-এ এসে সেই সংগঠনকে সেই শিশুর উত্তরসূরির সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে স্মার্টফোনের পর্দার ওপারে। বদলেছে মাধ্যম, বদলেছে ভাষা, বদলেছে প্রজন্ম; বদলায়নি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মন জয় করার গুরুত্ব।
তবে এখানেই জেন জি-রও একটি বড় পরীক্ষা। তারা কি শুধু প্রশ্ন করবে, না কি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ক্ষমতার কাঠামোর ভিতরেও প্রবেশ করবে? তারা কি শুধু সরকারের ভুল ধরিয়ে দেবে, না কি নিজেরাই একদিন সেই সরকার চালানোর দায়িত্ব নেবে? আগামিদিনের ভারতীয় রাজনীতির আসল লড়াই হয়তো এখানেই।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন আদিত্য ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved