


আজকের দুনিয়া ‘সিম্পল লিভিং, হাই থিঙ্কিং’ থেকে সরে ‘লিভ কিং সাইজ’ হওয়ায় পশ্চিমের পাশাপাশি ভারতেও অস্তিত্বের জোর দর কষাকষি চলছে। নিজেদের বাজারদর যাচিয়ে দেখতে মৃত্যুর অভিনয় করেও লোক জড়ো করতে আজকাল দ্বিধা নেই মানুষের! জীবনানন্দ ডাহা মিথ্যে। যুগের লক্ষণ বলছে– অর্থ, কীর্তি, সচ্ছলতাই সব!
১৯৯৫ সাল। আপনার বা আমার পাড়ার একজন প্রয়াত হয়েছেন। শ্মশানযাত্রায় তিন ম্যাটাডোর ‘কান্না’। পরিবার-আত্মীয়-প্রতিবেশী মিলিয়ে আসলে তিনটে ম্যাটাডোরেও কুলোচ্ছে না। অবশ্য অতিবৃদ্ধ ও ছোটরা বাদ, মেয়েরা অধিকাংশই যাবে না। তথাপি শ্মশানযাত্রী মেরেকেটে ৫০। কাট টু ২০২৫। আপনার বা আমার পাড়ায় কে যেন মারা গিয়েছে! শববাহী গাড়ির সঙ্গে একটি চারচাকা। শ্মশানযাত্রী খুব বেশি হলে জনাদশেক।

দুই দশকে বদলে যাওয়া পৃথিবী। প্রযুক্তির শাসন। জীবনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়া একাকিত্ব। সবার সঙ্গে থেকেও একা! জীবনানন্দ মিথ্যে। যুগের লক্ষণ বলছে– অর্থ, কীর্তি, সচ্ছলতাই সব। ‘বিপন্ন বিস্ময়’ হল অনেক পেয়েও না পাওয়ার বেদনা কিছুতেই পিছু ছাড়ে না! কিশোর কুমার লুপে গাইছেন– ‘যা পেয়েছি আমি তা চাই না/ যা চেয়েছি কেন তা পাই না?’ উত্তর মেলে না। বরং প্রশ্ন ওঠে, বেঁচে থাকতে যে স্বীকৃতি মেলেনি, মরার পর তা মিলবে? বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি আজব কাণ্ড করেছেন বিহারের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী মোহনলাল। মৃত্যুর পরে মানুষ তাঁকে কতটা সম্মান করবে– বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যে কে কতটা শোকাহত হবেন, তা পরখ করতে ভুয়ো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করেন ৭৪ বছরের বৃদ্ধ। মোহনলালের পরিবার প্রথা মেনে আচার-অনুষ্ঠান এমনভাবে পালন করেন, যাতে মনে হয় তিনি সত্যিই প্রয়াত হয়েছেন। এই বিষয়ে মোহনলাল নিজে বলেছেন, ‘জানতে চেয়েছিলাম মানুষ আমাকে কতটা সম্মান দেয় ও স্নেহ করে।’

মোহনলালের এই ঘটনা যতটা মজার, তার চেয়ে বেশি ভয় জাগানো। আসলে একাকিত্বের যুগ স্বীকৃতি খুঁজছে, এমনকী মৃত্যুর বিনিময়েও। অবাক কাণ্ড হল হাতে হাতে মুঠোফোন, সারাক্ষণ সোশাল মিডিয়ায়, তবু সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাটছে না ডিজিটাল দুনিয়ার। লাইক-কমেন্ট-শেয়ারের ফাঁকে অনন্ত নির্জন মধ্যরাত। ঘুম না-আসা ঘড়ির বিষাদ-টিকটিক। নিজের বেঁচে থাকাটাকে ঠিক দেখাই যাচ্ছে না মাইরি! অনেকেই সাধ্য ডিঙিয়ে ব্র্যান্ডেড জামা পরে, দামি গাড়ি কিনে স্বীকৃতির পিছনে ধাওয়া করছেন। কেউ কেউ আবার ঝুঁকিবহুল রিল বানিয়ে অন্যের চোখ দিয়ে নিজের অস্তিত্ব যাচাই করতে চাইছেন। পাহাড়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে রিল, ট্রেন থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝুলতে ঝুলতে, ২৫০ কিমি গতিতে গাড়ি চালিয়ে…। যাঁরা এমনতর ঝুঁকি নিতে পারছেন না, তাঁরা যৌনগন্ধী ভিডিও বানিয়ে রুচির বলি দিচ্ছেন মিথ্যে স্বীকৃতির হাড়িকাঠে। সোশাল মিডিয়া সর্বক্ষণ প্রশ্ন করছে– তুমি কে? ‘রাইজিং ক্রিয়েটার’ না ব্লু ট্যাগ পাওয়া সেলিব্রেটি? ফেলো কড়ি, মাখো তেল। বিজ্ঞাপন বলছে– ‘বিগ ড্রিম’। প্রিন্ট থেকে ডিজিটাল সবখানে ‘কমপ্লিট ম্যান’-এর হন্যে খোঁজ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে ‘ফাস্ট ফরোয়ার্ড’, ‘মুভ অন’-এর এই পৃথিবীতে নতুন রোগের নাম ‘FOMO’ বা ‘Fear of missing out’। সর্বক্ষণ আলোকবর্তিকায় ভেসে থাকতেই হবে। মঞ্চ থেকে পতনের ভয়। তার ওপর ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি এমনকী আত্মহননের টান। সবথেকে বেশি করে মধ্যবয়সীরা এই রোগে ভুগছেন। যত আয় বাড়ছে, তত বন্ধু কমছে। আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার সময় নেই। আজ থেকে দেড়-দুই দশক আগেও অফিস থেকে ফিরে মানুষ চায়ের দোকানে, রকে বসে আড্ডা দিত। এখন অফিস থেকে ফেরার পথেও ফোনে ব্যস্ত, বাড়ি ফিরেও হাতে ফোন। কাজ না থাকলেও রিলস দেখছে, ভ্লগ দেখছে। মোদ্দা কথা, রক্তমাংসের সঙ্গী নেই জীবনে, কেবল আমি ও একটি ফোন। জন্ম হচ্ছে নতুন শব্দবন্ধের– ‘ডিজিটাল লোনলিনেস’। ফেসবুকে জমকালো পোস্ট দিয়েও দুঃখ। কিছুতেই লাইক-কমেন্ট-শেয়ার বাড়ছে না। এবং বিপুল বেদনা। ঠিক যেন ফ্র্যাঙ্কেস্টাইনের গল্প। স্বীকৃতির ওষুধে একাকিত্বের ঘা সাড়াতে গিয়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা শরীরে– ‘তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে’।

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো বলেছিলেন, স্বীকৃতির খিদে হল প্রতিটি মানুষের একটি গভীর মানসিক এবং সামাজিক চাহিদা। নিজের কাজ, অস্তিত্ব এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি পেলে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানুষকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। একথা যেমন সত্যি, তেমনই মানব সভ্যতা ‘সাধনা’ নামের একটি শব্দেরও আবিষ্কারক। যে কাজের দায়ে সিদ্ধার্থ একাচারী বুদ্ধ হন। এখানেই স্পষ্ট হয় ‘একা’ ও ‘একাকিত্ব’ শব্দ দু’টির স্বর্গ-নরক পার্থক্য। অস্তিত্ববাদী ফরাসি দার্শনিক জঁ পল সার্ত্রে যখন বলেন, ‘দ্য আদার ইজ হেল’। তখন তা একক সাধনার কথাই বলে, নারকীয় একাকিত্বের কথা বলে না। অতএব, স্বীকৃতির ইঁদুর-দৌড় যে দুঃস্বপ্ন ডেকে আনছে– প্রশ্ন ওঠে, কোন খাল সাঁতরে এল সেই কুমির?

পুঁজিপতিদের আগ্রাসনে ভোগবাদকে মোক্ষ করে তুলছে বিজ্ঞাপনী পৃথিবী। বাঁচার দাম না দিয়ে, দামি বেঁচে থাকার হাইরাইজ ফন্দি আটছে সমাজ। ‘সিম্পল লিভিং, হাই থিঙ্কিং’ থেকে সরে ‘লিভ কিং সাইজ’ দর্শনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে পশ্চিম তো বটেই, এমনকী এই বাউল-ফকিরের দেশও। ফলে রোটি-কাপড়া-মকান-এর সহজিয়া বাঁচা হয়ে উঠেছে অলীক। ‘আধুনিকতর জন্ম’ কবিতায় সাতের দশকের অন্যতম কবি রণজিৎ দাশ যেমনটা বলেছেন– ‘ষোড়শ শতক অব্দি তুমি ছিলে ব্যোম ভোলা, আপনার জন/ যার ভিন্ন রাগ, দুঃখ, শুদ্ধ ভাব, শুদ্ধতর ভুল/ সমাজে স্বীকৃত ছিল– তুমি ছিলে আত্মার বাউল/ উনিশ শতকে এসে সেই তুমি হয়ে উঠলে মনোরোগী, বিপজ্জনক…।’ ফলে শতাব্দী ডিঙিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মৃত্যু ফিরে এলেও কমছে কান্নার ম্যাটাডোর।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved