Robbar

মা হওয়া কি মুখের কথা!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 5, 2026 4:43 pm
  • Updated:June 5, 2026 4:43 pm  

বিখ্যাত বলিউড অভিনেত্রী কিয়ারা আদবাণী বলেছেন, গর্ভাবস্থার সময় তাকে দেবীর সঙ্গে তুলনা করা হলেও সন্তান হওয়ার পরেই তাকে মোটা বলতে কেউ পিছপা হয়নি। ‘প্রেগনেন্সি গ্লো’ বলে একটি কথা এখন বহুল প্রচলিত; ‘প্রেগনেন্সি শুট’ থেকে ‘বেবি শাওয়ার’, ট্র্যাডিশন আর ভোগবাদ– একে অপরের সঙ্গে মিলে গিয়ে নানা আচার অনুষ্ঠানের জন্ম দেয়। অভিনেত্রীর ‘বেবি বাম্প’ উন্মোচিত হয় লাখ টাকার পোশাকে, সেই দেখে সাধারণ মানুষ বাহবা দেন, কিন্তু সেই অভিনেত্রীই যখন মা হওয়ার পর সাক্ষাৎকারে নিজের অবসাদের কথা বলেন, তখন সেটা অমূলক, অর্বাচীন।

সম্প্রীতি চক্রবর্তী

মেগান উইলার একটি ফুটফুটে মেয়ের জন্ম দিয়েছে। শরীরে কিছু সাধারণ অসুবিধা রয়েছে বটে, কিন্তু এখন তার সবথেকে বড় চিন্তা সামনেই ডক্টরাল সাবমিশন। থিসিস, হাসপাতাল আর মেয়েকে নিয়ে খুব গতানুগতিক জীবন কাটলেও একদিন হঠাৎ সে শুনতে পায় এক বিকট আওয়াজ! ওপরের ঘরে হয়ে চলা এক অনবরত শব্দ শুনে মেগান দেখে বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক মার্গারেট ওয়াইজ ব্রাউন বসে আছেন সেখানে। তাঁর লেখা ছোটবেলায় পড়েছে মেগান, হয়তো নিজের মেয়েকেও দেবে সেই ধ্রুপদী বই, কিন্তু লেখক স্বয়ং তার ‘upstairs house’ এ। এ-ও কি সম্ভব! মার্গারেট ব্রাউন যে মারা গিয়েছেন ৬০ বছর আগে!

এরপর থেকেই মেগানের পরিবর্তিত জীবনে তার কথা বলার সঙ্গী হয়ে ওঠেন মার্গারেট। সদ্য মা হওয়ার গল্প, কত আফসোস, না-বলা কথা: সবেতেই মার্গারেটের সঙ্গে মত বিনিময়ে তুষ্ট হয় সে। মেগান ভুলে যায় কোনটা তার বাস্তব, আর কোনটা ভ্রম। রিয়াল আর আনরিয়াল মিলেমিশে, সদ্য মা হওয়া মেগান শিকার হয় সাইকোসিসের।

কথা হচ্ছে, জুলিয়া ফাইন রচিত উপন্যাস ‘The Upstairs House’ নিয়ে। শিকাগো রিভিও বুকস’ পুরস্কার-জয়ী এই বই ‘পোস্টপার্টাম হনটিং’-কে কেন্দ্র করে লেখা। সাইকোলজিক্যাল হরর, যা মাতৃত্বের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দেয় ভয়, উদ্বেগ বা নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়গুলি। প্রসব পরবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের দেশে স্বতন্ত্র বইয়ের খোঁজ প্রায় মেলে না, বললেই চলে। মাতৃত্ব বলতে বনফুলের ‘দুধের দাম’ বা মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশি’র মা মনে পড়ে। ‘মাদার ইন্ডিয়া’ থেকে ‘মাসুম’, সবেতেই সন্তানকে নিয়ে দোটানা, তাকে বড় করার অদম্য লড়াই। কিন্তু সন্তান ছাড়াও যে মায়ের আলাদা অস্তিত্ব হয়; তার শরীর, মন বা আবেগ নিয়ে ফিকশন, ফিল্ম কিংবা স্মৃতিচারণা খুবই বিরল। বিশ্বসাহিত্যের দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাই– ‘গুড মমস হ্যাভ স্কেয়ারি থটস’-এর মতো বই। প্রথম বিশ্বের দেশে এমন লেখাপত্র ক্রমশ সামনে আসলেও ভারতে এই বিষয় এখনও অধরা। এখানে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর গৃহস্থ বউ যেন ব্যবহৃত ‘পিদিম’-এর মতো। প্রদীপ জ্বালানোর ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেলে বা সলতে ফুরিয়ে গেলে আমরা যেমন তা ফেলে দিই, মাতৃত্বের জঠরও যেন সেইরকম।

নার্গিস অভিনীত ‘মাদার ইন্ডিয়া’র দৃশ্য

আমাদের দেশে গর্ভবতী মায়েদের পরিচর্যায় তৈরি হয়েছে হরেকরকম গার্হস্থ্য রেওয়াজ। কিন্তু সেই সুরক্ষা বলয় ক্রমশই শিথিল হয়ে যায় সন্তান একবার ভূমিষ্ট হয়ে গেলে। গ্রামীণ, অতি সাধারণ বাড়ির মহিলাদের কথায় পরে আসছি, কিন্তু যারা অত্যন্ত ধনী? যে-মহিলারা অতি সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে আসে, তারাও কি অনুভব করে না গর্ভবতী আর প্রসূতি হওয়ার পার্থক্য?

এই প্রসঙ্গে একটি সাম্প্রতিক শিরোনাম খুব জনপ্রিয় হয়েছে। ‘দেবী থেকে মোটি’: এমন হেডলাইন বেশ কিছুদিন ধরে সর্বভারতীয় নিউজ চ্যানেলে ঘোরাফেরা করছে। বিখ্যাত বলিউড অভিনেত্রী কিয়ারা আদবাণী বলেছেন, গর্ভাবস্থার সময় তাকে দেবীর সঙ্গে তুলনা করা হলেও সন্তান হওয়ার পরেই তাকে মোটা বলতে কেউ পিছপা হয়নি। ‘প্রেগনেন্সি গ্লো’ বলে একটি কথা এখন বহুল প্রচলিত; ‘প্রেগনেন্সি শুট’ থেকে ‘বেবি শাওয়ার’, ট্র্যাডিশন আর ভোগবাদ– একে অপরের সঙ্গে মিলে গিয়ে নানা আচার অনুষ্ঠানের জন্ম দেয়। অভিনেত্রীর ‘বেবি বাম্প’ উন্মোচিত হয় লাখ টাকার পোশাকে, সেই দেখে সাধারণ মানুষ বাহবা দেন, কিন্তু সেই অভিনেত্রীই যখন মা হওয়ার পর সাক্ষাৎকারে নিজের অবসাদের কথা বলেন, তখন সেটা অমূলক, অর্বাচীন। সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসে যিনি সর্বোচ্চ পদে বসে আছেন, তাকেও মা হওয়ার পরে ‘ঘ্যানঘ্যান করো না’ শুনতে হয়। কলের পুতুলের মতো বাচ্চা জন্ম দিয়ে সে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে, কোনও যন্ত্রের অন-অফ সুইচের মতো। এমন সামাজিক প্রত্যাশা থেকে কোটি টাকা আয় করা কিয়ারাও যখন বাদ যান না, তখন দেশের সাধারণ মহিলাদের কী অবস্থা, সেদিকে তাকাতে ইচ্ছে করে।

কিয়ারা আদবাণী

অত্যন্ত সাধারণ মেয়েদের মা হওয়ার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে উত্তরাখণ্ডের আলমোড়া জেলার কথা বলা যাক। ‘চো’ শব্দটি সেখানে ঘরে ঘরে প্রচলিত। এর আক্ষরিক অর্থ অস্পৃশ্যতা হলেও, নির্দিষ্ট করে বললে এর মানে দাঁড়ায় সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে প্রসূতির বিচ্ছিন্ন অধিবাস। পোস্টপার্টাম বা প্রসবোত্তর সময়কে একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে না-ভেবে ‘চো’ কে একটি বাহ্যিক অসুখ বলে ভাবা হয় সেখানে। যেন কোনও সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ হয়েছে প্রসূতির, তাই সকলের আড়ালে থাকা জরুরি। হাইজিন বা সুস্বাস্থ্যের কথা বলে অনেকে এই সঙ্গরোধকে (quarantine) ন্যায্যতা দিলেও সাম্প্রতিক গবেষণা কিন্ত প্রসূতির মানসিক অবস্থা বা তার অবসাদকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই ধরনের ‘রিচুয়াল পলিউশন’ বা শুদ্ধ-অশুদ্ধের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মাতৃত্বকে মহিমান্বিত করার প্রবল চেষ্টা এবং তারই সঙ্গে সন্তান একবার ভূমিষ্ঠ হয়ে গেলে প্রসূতি পরিচর্যার চূড়ান্ত অবহেলা। আলমোড়া জেলার মাতেনা গ্রামে দাইমায়েরা সাধারণত সন্তানপ্রসবে সাহায্য করে থাকেন। হাসপাতাল অনেকটাই দূরে, অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেও দু’-ঘণ্টা সময় লেগে যায়, তাই দাইমায়েরাই ভরসা। আঁতুরঘরে শিশু জন্মানোর পর তাকে পরিষ্কার করে সযত্নে রক্ষা করা তাদের কর্তব্য হলেও, বাচ্চার মাকে নিয়ে একরকম খুঁতখুতানি থেকে যায়।

লিঙ্গের ইতিহাস নিয়ে গবেষণারত স্কলাররা বলেন যে, পৃথিবীর নানা দেশে ঋতুস্রাব (menstruation), গর্ভস্রাব কিংবা ‘placenta’, যে কোনও শারীরিক নির্গমনকে (তরল) কেন্দ্র করে পিওরিটি-পলিউশনের ধারণা আছে। ভারতের মতো দেশে তো রয়েছেই। উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান বা উত্তরপ্রদেশের নানা জায়গায় অমরা বা প্লাসেন্টাকে এতটাই দূষিত ভাবা হয় যে, দাইমারাও তা স্পর্শ করতে চান না। ফলত, প্রসববেদীতেই ক্লান্ত মা, নিজেই পরিষ্কার করেন তার প্লাসেন্টা অথবা পরিবারের কোনও বয়োজেষ্ঠ্যা। আধুনিক হাসপাতালের পরিষেবা থেকে দূরে থাকা মায়েরা এভাবেই দিনযাপন করেন।

অনেক জায়গায় শিশুর নামকরণ করা হয়ে গেলে তাকে শুদ্ধ হিসেবে পরিবারে স্থান দেওয়া হলেও মা থেকে যান কোয়ারেন্টিনে। এই বিচ্ছিন্ন থাকার সময় পোস্টপার্টাম হ্যামারেজ হয়ে মৃত্যু ভারতের মতো দেশে অতি সাধারণ ঘটনা। সরকারি পোর্টাল (হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) বলছে ভারতে প্রসূতি মৃত্যুর সব থেকে বড় কারণ এই অবস্টেট্রিক হ্যামারেজ, এছাড়া প্রসব পরবর্তী ইনফেকশন এবং হাইপারটেনশিভ ডিসঅর্ডার। নিম্নবিত্ত সমাজে অপুষ্টিজনিত সমস্যা বা চিকিৎসার সুযোগ না-পাওয়ার বিষয় যেমন আছে, তেমনই প্রাচীন ধাত্রীবিদ্যার কলাকৌশল যে এই মৃত্যুহার আরও বাড়িয়ে দেয়, তা বোঝা কঠিন নয়। একটি শিশু জন্মানোর পর তাকে ঘিরে বিবিধ নিয়মকানুন তৈরি হয়েছে ভারতীয় গার্হস্থ্য সমাজে, কিন্তু মায়ের শারীরিক অবস্থার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সেবাশুশ্রূষা বা মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা এই দেশে দুর্লভ। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মহিলাদের বয়ান থেকে জানা যায় যে, বাড়ি যাওয়ার পর তারা নিজেদের পরিচর্যা কীভাবে করবে, সেই বিষয় কোন পরামর্শ দেওয়া হয় না। এই অবহেলাকে শুধুমাত্র শ্রেণি বা বিত্তের প্রশ্ন হিসেবে দেখে লাভ নেই। এমন অবজ্ঞা এই দেশের প্রথাগত লিঙ্গজনিত ধ্যান-ধারণাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে।

কিয়ারা আদবাণী গর্ভবতীদের দেবীত্বে উন্নীত করার যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তার ব্যাখ্যা এ দেশের পুঁথি, লোকাচার বা দর্শনে ছড়িয়ে রয়েছে। বেদ এর গৃহসূত্র অনুযায়ী, ১৬টি সংস্কার মানুষকে বিশুদ্ধ করে তোলে। প্রথমেই রয়েছে গর্ভদান, অর্থাৎ, কোনও মহিলা ঋতুমতী হলে সে স্বামীর সঙ্গে সহবাসে অনুমতি পায়। দ্বিতীয় হল পুংসবন, যেখানে স্বামী-স্ত্রী পুত্রের প্রার্থনা করেন। তৃতীয়, সীমান্তোন্নয়ন‌; এটি খুব উল্লেখযোগ্য, কারণ শাস্ত্র মতে, এই সময় হবু মাকে তার পছন্দের খাবার খাওয়ানো ছাড়াও তার চুল বেঁধে দেওয়া, তাকে মনোরঞ্জন করা, এমন বিষয় গুরুত্ব পায়। স্বামী তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীয়ের চুল পরিপাটি করে বেঁধে দেবে, কিন্তু এই পরিচর্যা স্বামী কর্তৃক প্রাপ্ত হবে তখনই, যখন সে বংশের উত্তরসূরি দিতে চলেছে। পতিব্রতা নারীচরিত তো কতই শোনা যায়, কিন্তু স্ত্রীয়ের সেবা করা স্বামীর আখ্যান পাওয়া যায় কেবল এই বিরল সময়ে।

এই তিনটি সংস্কারের পর যে ১৩টি সংস্কার, সেখানে কিন্তু মায়ের কথা আর প্রায় নেই বললেই চলে। সবটাই আবর্তিত এবার পুত্রকে কেন্দ্র করে। যেমন চার নম্বরে জাতকর্ম (পিতা ঘি, মধু খাইয়ে আর্শীবাদ করছে সন্তানকে), পাঁচ নম্বরে নামকরণ, ছয়ে অন্নপ্রাশন, সাতে চুড়োকর্ণ (প্রথম চুল কাটা), তারপর শিক্ষার শুরু, উপনয়ন ইত্যাদি। অর্থাৎ, যতক্ষণ সেই মেয়ে গর্ভিণী ততক্ষণ তার সাধ, মনোরঞ্জন, কেশশয্যা চলে, কিন্তু প্রসবের পরে সংস্কারগুলি থেকে সে প্রায় উহ্য। পুরাণে হিরণ্য গর্ভিণীর উল্লেখ রয়েছে (যাকে দেবী ভৈরবীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়), এর আক্ষরিক অর্থ ‘golden womb’। গর্ভ যেন মেয়ের কাছে সোনার মতোই দামি, সেটির কাজ ফুরলে তার গল্পও ফুরিয়ে যায়।

একটি মেয়ের পরিচয় নিহিত কেবলই তার গর্ভে, সেটি ব্যতীত আর কোনও হিতাহিতের প্রশ্ন নেই। এই ভাবনার ছায়া ১৮৯১ সালের বাংলায় ‘Age of Consent Bill’ ডিবেটকে উসকে দিয়েছিল। তনিকা সরকারের বই ‘হিন্দু ওয়াইফ, হিন্দু নেশন’-এ এই তর্কের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। ১৮৯১ সালে মেয়েদের বিবাহের বয়স ১০ থেকে ১২ করার প্রস্তাব উঠলে চারিদিকে ত্রাহি ত্রাহি রব পড়ে যায়। কলকাতার বুকে ফুলমণি দাসী নামে ১১ বছরের একটি মেয়ে তার স্বামী দ্বারা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হলে সহবাস সম্মতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিবাহের মধ্যে ধর্ষণের প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? গৌরীদানে প্রাপ্ত মেয়ে ঋতুমতী হলে তার গর্ভদান অনুষ্ঠান হবে এবং শীঘ্রই সে সহবাসে অনুমতি পাবে। এর মধ্যে হিংসা, ধর্ষণ বা সম্মতির প্রশ্ন কোথা থেকে আসছে, তা নিয়ে ভাবনায় পড়েছিলেন একদল বাঙালি। তাদের মতামত ছিল যে, ঋতুস্রাব হওয়ার পরে আর একদিনও অপেক্ষা করার দরকার নেই বিবাহের আয়োজনে। ইংরেজদের আইন অনুযায়ী, ১০ থেকে ১২ বছরে বিবাহের বয়স বাড়ানো হলে, মেয়েরা, যারা ৯-১০ বছরে ঋতুমতী হয়, তাদের কী গতি হবে? তনিকা সরকার লিখছেন:

‘They argued that a higher age of consent would violate the garbhadan ritual, the first of the 10 fundamental life cycle rights… If the rule is violated, her womb is polluted, her future sons will not be able to offer pure ritual offerings to ancestral spirits, and the sin of foeticide will be visited upon her father and her husband; in short, it would be death for the community.’

এই যদি হয় আধুনিক বাংলায় তর্কের নজির, তাহলে প্রসূতির মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা হয়তো যোজন দূরের বিষয়। এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে, ১৮৯১ থেকে ২০২৬-এ এসে এই চিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে গড়ে ২২% মহিলা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে (পিপিডি) ভোগে। পুণে, বিহার, আহমেদাবাদের মতো রাজ্য সবচেয়ে এগিয়ে এই তালিকায়। পিপিডি নিয়ে এত কম সচেতনতা যে, কিছু মেট্রোপলিটন শহর ছাড়া এই মানসিক অবস্থার কথা কোথাও নথিভুক্তই হয় না। এমনিতেই ভারতের মতো দেশে মানসিক স্বাস্থ্যকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। ডিপ্রেশনকে বড়লোকের অসুখ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, ‘মাথার ব্যামো’ হলে সে সমাজ বিচ্ছিন্না। এমতাবস্থায় প্রসব পরবর্তী মানসিক সমস্যা স্টিগমা বা বিষম কলঙ্ক নিয়ে আসে। আমাদের সংস্কৃতি বা লোকাচারে মাতৃত্ব এতটাই গ্লোরিফাইড বা প্রশংসার যে, সেই ‘পরম লক্ষ্যবস্তু’-কে একটি মেয়ে জয় করার পর আর কীভাবে অবসাদ আসতে পারে, সেই নিয়ে তর্ক চলে। কিয়ারা আদবাণী হয়তো অপমান শুনেছেন সমাজমাধ্যমে ট্রোলের দৌলতে। সুতন্বী থেকে স্থূলকায় হয়ে যাওয়া, যাকে আমরা ‘বডি সেমিং’ বলি, সেই ধারায়। কিন্তু ভারতের বেশিরভাগ মেয়েদের হয়তো শারীরিক গঠন ছাড়াও আরও অনেকরকম প্রসবোত্তর সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সন্তানসম্ভবা হলে তাকে শুদ্ধ মানা, সন্তান না হলে ‘বন্ধ্যা’, ‘বাজা’, ‘অপয়া’ বলা, এই সবই একই মুদ্রার দুই দিক। প্রজনন বা ফার্টিলিটির দেবী ষষ্ঠী থেকে হরীতি; উত্তর ও পূর্ব ভারতে ষষ্ঠীপুজো বিখ্যাত আর থেরাবাদা বৌদ্ধধর্মে হরীতিকে দেখা যায় মাতৃরূপে। কিন্তু এই সব ব্রতপালন বা নিয়মনীতিতে সন্তানের মঙ্গল কামনায় অসংখ্য শ্লোক লেখা হলেও মায়ের সুস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা, তার হিতাহিতের কথা কোনো পাঁচালী বা ব্রতপালনের মুখ্য উদ্দেশ্য কি না, সে-বিষয়ে সংশয় আছে।

আসলে পিপিডি নিয়ে ইউরোপ বা আমেরিকায় জনসচেতনতা ছড়ানো যতটা সহজ, ভারতে তা নয়। ২০২৩ সালে ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা থেকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে কেরলের দিব্যার কথা লেখা হচ্ছে। ২৬ বছরের মেয়েটি তার সদ্যজাত শিশুকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল। এই ঘটনার পর তাকে ৪২ দিন পুলিশি হেফাজতে রাখার পর মেন্টাল হেলথ এসাইলামে পাঠানো হয়। গার্ডিয়ান পত্রিকার এই মূল্যবান আর্টিকেল জানান দিচ্ছে যে, ভারতে ৫ জন মায়ের মধ্যে ১ জন পিপিডির শিকার হন। কিন্তু সাহায্য পাওয়ার রাস্তা অত্যন্ত কঠিন। যে পরিমাণ মানুষ অবসাদগ্রস্থ হন, সেই পরিমাণ মনোবিদ নেই। পাঁচ-ছ’টি বড় শহর ছাড়া পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাব সর্বত্র। তার ওপর আসে অবসাদ নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক, নিন্দা ও অপবাদ। ভারতীয় যৌথ পরিবারে যে ধরনের পুরুষতান্ত্রিকতার উদযাপন চলে, যেখানে সদ্য মা হওয়া মেয়েটি যে নিজের অবসাদের কথা বিনা দ্বিধায় বলতে পারবে, সেই সংবেদনশীলতা উচ্চবিত্ত পরিবারেও থাকে না।

পিপিডি যেন গোপন রোগের মতো, গাইনকলজি নিয়ে আজও যেমন নানা ধরনের ট্যাবু, তেমনই এই অবসাদ নিয়ে। কথায় বলে ‘মা হওয়া কি মুখের কথা’। এই প্রবাদ মনে করায় যে, মাতৃত্ব হল ত্যাগ, সহনশীলতা আর বেদনার নামান্তর। যিনি মা, তিনি তো সহ্য করবেনই, তাই অসুখের কথা মুখ ফুটে বলা বারণ।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন সম্প্রীতি চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা

………………………