Robbar

ছাব্বিশের বইমেলা বাণীপ্রধান!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 26, 2026 3:01 pm
  • Updated:January 26, 2026 3:59 pm  

‘ইউ নো, আই ওনলি লাইক দিস ফিল্ম অফ হিজ– নায়ক। উত্তমকুমার লিটারালি আউটপার্ফমড্ হিমসেল্ফ, তাই না?’, নব্যযুবা একজনের উড়ো মন্তব্য কানে আসে। মতান্তর থাকতেই পারে, তবে ২০২৬-এর বইমেলা বাণীপ্রধান। আদ্যিকালের সাইনবোর্ডের ধাঁচে হাতে লেখা (অথবা ছাপানো) অভিনব সব সংলাপ মেলার চারিদিকে! ‘বই কিনলেই নাকি খিদে পায়’– তেমনই এক ব্যানারের দাবি। নিমেষে পুরনো একখানি মন্তব্য ভুস করে ভেসে ওঠে মনে– ‘সবাই যায় বইমেলায়, বই না কিনে দেদার খায়।’ লোক থইথই মেলায় তারাপদ রায়ের লেখার সেই বিখ্যাত পাগলের কথা মনে পড়ে যায়– যে বইমেলার বাইরে দাঁড়িয়ে মেলা থেকে বেরনো প্রতিটি লোককে জিজ্ঞেস করত, ‘এত বই কে কিনবে? এত বই কে পড়বে?’

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

সেই কোন কাল থেকে শুনছি– মাসের শেষ ভায়া, লোকের ট্যাঁকে পয়সা নেই! কিন্তু রোববারের বিকেলে লোক-থইথই মেলার মাঠে সে তত্ত্ব বিলকুল খারিজ হয়ে গেল! ব্যাদে আছে– এক প্রবাদ যাবে, অন্য স্লোগান হবে। ললাট-পোড়া বাঙালির মলাট-খোলা মেলায় এবার শতবর্ষীদের প্রবল ডিমান্ড। বলতে গেলে তাঁরাই সুপারস্টার।এমনকী যেসব তারকারা ইতিমধ্যেই শতবর্ষ অতিক্রান্ত, তাঁরাও ‘শতবর্ষ পেরিয়ে’ ট্যাগ ঝুলিয়ে দিব্য বাজারে রয়েছেন। যেমন ৩৯২ নম্বর স্টলে অভিযান পাবলিশার্সের গায়ে দু’হাত তুলে সমবেতদের ভাবা প্র্যাকটিস করতে বলছেন ঋত্বিক ঘটক, থুড়ি তাঁর লার্জার দ্যান লাইফ কাট-আউট! তেমনই গেট নম্বর ১ পেরলেই গোটা চত্বর উত্তমকুমারের দখলে। একখানা মণ্ডপজুড়ে আয়োজন করা হয়েছে উত্তম প্রদর্শনী ও বাংলা সিনেমার ইতিবৃত্ত। অরিজিনাল লবিকার্ড, পোশাক এবং পোস্টার, বই, বুকলেটে মিলেমিশে একাকার।

‘ইউ নো, আই ওনলি লাইক দিস ফিল্ম অফ হিস– নায়ক। উত্তমকুমার লিটারালি আউটপার্ফমড্ হিমসেল্ফ, তাই না?’ নব্যযুবা একজনের উড়ো মন্তব্য কানে আসে। মণ্ডপের বাইরে রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা, বক্স ক্যামেরায় ছবি তোলা, প্রোজেক্টর-এ চালানো ছোট্ট ছবি দেখা বা প্রিয় চিত্রতারকার (পড়ুন উত্তম-সৌমিত্র) কাট-আউটের সঙ্গে ছবি তোলার সুবর্ণ সুযোগ নামমাত্র মূল্যে! আর্ট অলিন্দ থেকে প্রকাশিত ‘দ্য গোল্ডেন বুক অফ উত্তমকুমার’ সত্যিই প্রশংসনীয় একটি প্রোডাকশন, নানা অদেখা স্থিরচিত্রে ভরপুর বইটি। তেমনই লিটল ম্যাগাজিন ‘কিঞ্জল’-এর ‘ব্যঙ্গদর্শনে উত্তমকুমার’ সংখ্যাটি বৈচিত্রের দাবিদার। আর? আর আছেন শক্তিপ্রসাদ রায়চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি। তিনিও ১০০ ছুঁলেন। অধিকাংশ লোকই তাঁকে চেনেন ময়ূখ চৌধুরী নামে।

শিল্পীর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজগুলিকে দু’মলাটের মধ্যে এনে বুক-ফার্ম থেকে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত ‘কমিক্স ও গ্রাফিক্স’ এর পঞ্চম তথা শেষ সংখ্যা। ছোটদের প্যাভিলিয়ন বেশ কয়েক বছর পর চোখ টেনেছে অঙ্গসজ্জায়। তাদেরও থিম ‘ময়ূখ চৌধুরী ১০০’! অলংকরণ এবং অসংখ্য গ্রন্থপ্রচ্ছদে সাজানো স্টল নতুন প্রজন্মের খুদে পাঠকদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে এই দিক্পাল শিল্পীর। এও এক দুরন্ত আশা!

কোনও এক ওষুধের দোকান এককালে এক অভিনব নোটিশ ঝুলিয়েছিল– ’এইখানে সব হেভি হেভি ডাক্তারবাবুরা বসেন।’ মতান্তর থাকতেই পারে, তবে ২০২৬-এর বইমেলা বাণীপ্রধান। আদ্যিকালের সাইনবোর্ডের ধাঁচে হাতে লেখা (অথবা ছাপানো) অভিনব সব সংলাপ মেলার চারিদিকে! ‘বই কিনলেই নাকি খিদে পায়’– তেমনই এক ব্যানারের দাবি।

চিন্তার কথা। বইয়ের দর যে হারে বাড়ছে, তার সমান্তরালে এমন কোরিলেশনের হদিশ পাওয়া সহজ নয়কো। নিমেষে পুরনো একখানি মন্তব্য ভুস করে ভেসে ওঠে মনে– ‘সবাই যায় বইমেলায়, বই না কিনে দেদার খায়।’ মেলার মাঠের বেনফিস-এর চপ হোক বা মোহনের ঘুগনি, অথবা দীঘার হরেকরকম মাছের ভাজাভুজি– কোলেস্টেরল কোলে উঠে বসে থাক মেলার ক’দিন! ঠেসে নাও এ দু’দিন ‘বই’ তো নয়। রোববারের সন্ধেয় খাদ্যের সন্ধানে উপচে পড়া ভিড়, বাঙালির সেই হেউঢেউকেই সংগ্রামী স্যালুট জানাল।

দে’জ পাবলিশিং-এর স্টলে নামলিপি নিয়ে ইতিমধ্যেই কড়চায় লেখা হয়েছে, তাই ও পথে না হেঁটে পাশের এক গলিতে ঢুকতেই ভারতী বুক স্টল-এর দেওয়াল লিখন আর ‘ছাত্রসংগ্রাম’-এর স্লোগানে চোখ আটকাল– ‘বসন্ত কান পেতে ক্লাসরুমে গান শোনে/ শেকড়ে নোঙর গেঁথে বদলের দিন গোনে’। বাস্তবিকই একাধিক গান কানে ভেসে এল গিল্ড অফিসের এধার ওধার থেকে। পশ্চিমবঙ্গ মণ্ডপের বাউল গান মিশে গেল এসবিআই অডিটোরিয়ামে চলা অনুপম রায়ের লাইভ পারফরম্যান্সের সঙ্গে। কোলকাতা লিটারেচার ফেস্টিভ্যালের শেষদিন উপলক্ষে এই আনন্দ আয়োজন।

বই-মেলা-ধুলো পার্বণের মাঠে চক্কর দিতে দিতে প্রবল ভিড় দেখলেই থমকে দাঁড়ানো বহুকালের অভ্যেস। হাজার হোক, হুজুগে বাঙালি তো। মাঝেমধ্যে মিলেও যায় রকমারি রসদ! রোববারের সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএ) স্টলে ঠাসাঠাসি ভিড় দেখেই মনে হল, উঁকিঝুঁকি অবশ্যকর্তব্য। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই! স্টলে হাজির বাঙালির অতি প্রিয় ‘সবুজ তোতা’! হোসে র‍্যামিরেজ ব্যারেটো! প্রায় একযুগের বেশি সময় খেলা থেকে অবসর নিলেও মোহনবাগানের পোস্টার-বয় আজও যে কতখানি জনপ্রিয় তার হাতেগরম হদিশ মিলল।

পথ চলতি উপকরণের অভাব নেই। একটি প্রথমসারির দৈনিকের স্টলে জনগণ ভিড় করে শুনছে দুই ব্যক্তির আলাপচারিতা–

–“উপহার জিনিসটা আমার এত প্রিয় কেন জান? ওই ‘উপ’ শব্দটার জন্য।”
–‘তাই?’
–“হ্যাঁ। ‘উপ’ মানে প্রিয়। সেজন্যই উপহার, উপনিষদ, উপপত্নী সবই মনোরম। উপপত্নী অর্থে প্রিয়তম পত্নী!”

সাংবাদিক অনির্বাণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে প্রবীণ লেখক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এহেন কথোপকথন সাগ্রহে আটকে রেখেছে উৎসাহী জনতাকে।

আনন্দ পাবলিশার্সের স্টলের সামনে তখন ঘনাচ্ছে পেল্লায় এক লাইন। ধৈর্যের ফিক্সড ডিপোজিট কায়েম রাখায় বাঙালির সমকক্ষ আছে কি কেউ এ ভবে?

শিল্পী: সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়

মেলার চারদিকেই শব্দের বাগান, স্বপ্নের দৃশ্য। চোখ কচলে, গায়ে চিমটি কেটে নিজেকে আশ্বস্ত করার প্রয়োজন নেই। যাহা ঘটিল, তাহাই সত্য। স্টলে স্টলে দলে দলে লোক যে ভেসে যায়। লালমাটির স্টলের সামনে পকেটভর্তি নুড়িপাথর নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ৯ নম্বর গেটের কাছেই আস্ত একখানি লালরঙা ‘পদিপিসীর বর্মিবাক্স’ সগৌরবে বিরাজমান। ছোটদের এবং ‘বড়দের মতো দেখতে’– ছোটদের নিজস্ব ‘পেরিস্তান’ তো এখানেই! বিশ্বভারতী-র এ বছরের স্টল অবিকল রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামলী’ বাড়ির আদলে, তেমনই মাতৃশক্তি-র মণ্ডপ প্রতিবছরের মতো দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের অনুকৃতি। পরিমিতিবোধ আর নান্দনিকতার মিলমিশে ‘উদ্বোধন’ এবং ‘প্রতিক্ষণ’ তাঁদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। যদিও শেষোক্ত স্টলে ছবি তোলার ব্যাপারে কড়াকড়ি খানিক মাত্রাছাড়া।

যে কথা না বললেই নয়, এ বছর মেলার মাঠে কমিক্স সত্যিই ধুন্ধুমার বাধিয়ে দিয়েছে। ‘শক্তি কমিক্স’-এর সামনেই স্বয়ং অরণ্যদেব দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাচ্ছেন পাঠকদের। ‘অমর চিত্রকথা’ তাদের সুবিশাল স্টলের সবটাই সাজিয়েছে কমিক্স চরিত্রদের নিয়ে। অসংখ্য বাংলা কমিক্সের বই প্রকাশিতও হয়েছে মেলায়, যার মধ্যে কাফি খাঁ, সন্দীপ রায়, ময়ূখ চৌধুরী, অরিজিৎ দত্ত চৌধুরীর কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইংরেজি বইয়ের স্টলগুলি গতবছর থেকে ঢাকা দেওয়া হলের বাইরে চলে আসায়, বাহার বেড়েছে তাদের অঙ্গসজ্জায়। পেঙ্গুইন ৮০ বছর উদযাপন করেছে অগুনতি মলাটের কোলাজে স্টল সাজিয়ে। অন্যদিকে, প্যান ম্যাকমিলান ‘প্যালেস অফ ইলিউশনস’ বইয়ের প্রচ্ছদের সুবিশাল ব্লো-আপ পোস্টারের সামনে ছবি তোলার কন্টেস্ট আয়োজন করে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে।

একটি জনপ্রিয় সংবাদপত্রের স্টল প্রতিবছরই আলোকচিত্রের প্রদর্শনী করেন। এ বছরও করেছেন। তবে অন্য বছরের তুলনায় তা নিষ্প্রভ। ছবি নির্বাচনের পাশাপাশি টাইপফেসের ব্যবহারে যেন সামঞ্জস্যের অভাব রয়েছে খানিক। ‘আজকাল’ মিনিবই সিরিজ আবারও এনেছে বাজারে। আবারও সেই শতবর্ষীদের নিয়ে। অভিনেতা সন্তোষ দত্তকে নিয়ে একটি চমৎকার বই রয়েছে এই সংকলনে। পুরনো বইয়ের স্টলে প্রবল ভিড়। ধাক্কাধাক্কির চোটে তারাপদ রায়ের সেই বিখ্যাত পাগলের কথা মনে পড়ে গেল– যে বইমেলার বাইরে দাঁড়িয়ে মেলা থেকে বেরনো প্রতিটি লোককে জিজ্ঞেস করত, ‘এত বই কে কিনবে? এত বই কে পড়বে?’

মেলার মাঠে সেই পাগলকে খুঁজে না পেলেও, দেখা মিলল এক প্রবীণ বিক্রেতার। পিঠে বোর্ড ঝুলিয়ে তিনি অক্লান্তভাবে ‘ভুলোবুদ্ধি মিচকেবুদ্ধি’-র গুণগান করে যাচ্ছিলেন। ভিড়ে ভেসে বেরনোর মুখে চোখ পড়ে গেটের এককোণে। শীতের রাতে জলের পাউচ-ভরা ড্রাম ঘেঁষে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক সোনালি মানুষ। খালি গা, পরণে ধুতি, হাতে একখানি কাঠের ফ্রেমে লেখা– ধর্ম যার যার, বড়মা সবার। কোমরে আটকানো পরিচয়পত্রে একঝলক দেখা গেল, নাম– গোপাল মণ্ডল। ‘রেললাইনে বডি দেব, মাথা দেব না’– দূর থেকে মাইকে ভেসে আসা গান, রাত ৯টায় মনের মধ্যে আলগোছে একচিলতে অস্বস্তি রেখে মিলিয়ে গেল।

… বইমেলার কড়চা

১: ইতনা বেঙ্গলি বুকস!

২: মালিককে গিয়ে বল, ‘ব‌ইমেলা’ এসেছে!

৩. বই পোড়ানোর চেয়ে গুরুতর অপরাধ বই না পড়া