


সুদূর অতীতে যখন আক্রমণকারীরা দখল করেছে, ধ্বংস করেছে শহরের পর শহর, ভূখণ্ডর পর ভূখণ্ড, তখন শুধু কি ধ্বংস হয়েছে লাইব্রেরি? না। এখনও হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইজরায়েল, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল, সব বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য আর্কাইভ, জাদুঘর, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং অন্তত ১৩টি লাইব্রেরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
লাইব্রেরি শুরু হয়েছিল কবে? কোন সময়কালে এসে মানুষের মনে হয়েছিল তাদের সঞ্চিত জ্ঞানের উৎসকে এক জায়গায় সংগ্রহ করে রাখতে হবে?
অবশ্যই তা তো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না, সে কাজ ছিল শাসকের। প্রথম লাইব্রেরি আবিষ্কার হয় মেসোপটেমিয়ায়। নিনেভেহ নগরীর ধ্বংসাবশেষে (বর্তমান উত্তর ইরাক), যা একসময় ছিল শক্তিশালী অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী– সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ৬৬৯ থেকে আনুমানিক ৬৩১ সাল পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেছিলেন সম্রাট আশুরবানিপাল। ‘সম্রাট আশুরবানিপালের লাইব্রেরি’ নামে পরিচিত এই সংগ্রহে ছিল ৩০ হাজারেরও বেশি মাটির ফলক ও ভগ্নাবশেষ, যেগুলোর ওপর খোদাই করা ছিল কিউনিফর্ম লিপি– মেসোপটেমিয়া (প্রাচীন ইরাক)-এ ব্যবহৃত এক ধরণের প্রাচীন লিখনপদ্ধতি।

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬১২ সালে নিনেভেহ ভয়াবহ আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, কাগজের বই যেখানে আগুনে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সেখানে এই কাদামাটির ফলকগুলো আগুনে আরও শক্ত হয়ে পুড়ে টিকে যায়। ফলে এগুলো আজ হাজার হাজার বছরের মেসোপটেমীয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
এর পরে বলা যায়, ‘লাইব্রেরি অফ আলেকজান্দ্রিয়া’র নাম। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া নগরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। তবে তাঁর উত্তরসূরি ও মিশরের শাসক টলেমি ২৮৩ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে ‘মিউজিয়াম’ বা রাজকীয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। বিশাল এই গ্রন্থাগারে বক্তৃতার স্থান, উদ্যান, চিড়িয়াখানা এবং ৯ জন মিউজের জন্য আলাদা উপাসনালয় ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, একসময় এই গ্রন্থাগারে আসিরিয়া, গ্রিস, পারস্য, মিশর, ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের পাঁচ লক্ষেরও বেশি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। শতাধিক পণ্ডিত সেখানে স্থায়ীভাবে বাস করে গবেষণা, অনুবাদ ও নকল তৈরির কাজ করতেন। বই সংগ্রহের প্রতি টলেমি ও অন্যান্য শাসকের প্রবল আগ্রহ নিয়ে অসংখ্য চমকপ্রদ কাহিনি প্রচলিত ছিল। বলা হয়, বইয়ের সন্ধানে তাঁরা নাকি নানারকম অসাধারণ পদ্ধতির আশ্রয় নিতেন। এর মধ্যে একটি ছিল– আলেকজান্দ্রিয়ার বন্দরে প্রবেশ করা প্রতিটি জাহাজ তল্লাশি করা। যদি কোনও জাহাজে বই পাওয়া যেত, তবে সেটি লাইব্রেরিতে নিয়ে যাওয়া হত। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হত বইটি মালিককে ফেরত দেওয়া হবে, নাকি সেটি লাইব্রেরিতে রেখে তার পরিবর্তে সঙ্গে সঙ্গেই একটি অনুলিপি তৈরি করে মালিককে দেওয়া হবে এবং মালিককে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও প্রদান করা হতো। জ্ঞানের তীর্থস্থানের মতো এই লাইব্রেরিও কিন্তু স্থায়ী হয়নি, যুদ্ধ, দাঙ্গা, ধর্মীয় সংঘর্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অবহেলার কারণে ধীরে ধীরে এর পতন ঘটে।ইতিহাস বলে, কখনও জুলিয়াস সিজার শত্রুদের মোকাবিলায় বন্দরের জাহাজে আগুন লাগানোর নির্দেশ দেন। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে শহরের একাংশে, যেখানে প্রধান গ্রন্থাগারটি ছিল বলে ধারণা করা হয়। কখনও আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রিস্টান প্যাট্রিয়ার্ক, থিওফিলাস অফ আলেকজান্দ্রিয়ার শাসনকালে সেরাপিস মন্দিরকে গির্জায় রূপান্তর করা হয় এবং সেখানে থাকা বহু পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করা হয়।

সুদূর অতীতে যখন আক্রমণকারীরা দখল করেছে, ধ্বংস করেছে শহরের পর শহর, ভূখণ্ডর পর ভূখণ্ড, তখন শুধু কি ধ্বংস হয়েছে লাইব্রেরি? না। এখনও হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইজরায়েল, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল, সব বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য আর্কাইভ, জাদুঘর, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং অন্তত ১৩টি লাইব্রেরি ধ্বংস করে দিয়েছে বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতর জানিয়েছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বহু বছর পরে ইতিহাসবিদরা নয়… ভেঙে যাওয়া শহরের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে যখন শুধু নিজের প্রাণটুকুই আছে, বাকি সব জিনিস হারিয়ে গিয়েছে, তখন এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় পালাতে পালাতে দুই যুবক, যুদ্ধবিরতির ধার করা সময়ের মাঝখানে, ধুলো-পাথরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে উদ্ধার করছেন বই, তাঁদের সভ্যতার ইতিহাস, তাঁদের জীবনের ধারাবিবরণী। ওমর হামাদ এবং তাঁর বন্ধু ইব্রাহিম মাসরি।

ওমর হামাদ ছিলেন সবসময়ই একজন নিবেদিত পাঠক। ছোটবেলায় যখন তিনি প্রথম জানতে পারেন যে, ইজরায়েল ফিলিস্তিনি স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে, তখন থেকে তিনি গোপনে নিজের হাতখরচ জমিয়ে রাখতেন, যাতে মাসের শেষে কয়েকটি বই কিনতে পারেন। তিনি বলেন এটি ছিল তার ‘বিদ্রোহের প্রথম বীজ’। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর তাঁর কাছে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ আসে, তখন বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা বইগুলো– যতটুকু বহন করা সম্ভব– সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু বারবার স্থানত্যাগ, তাই তাঁর সেই সংগ্রহ ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে।
তারপর পালাতে পালাতে এক সময়ে ঠাঁই হয় এক হাসপাতালে, আর সেটিও হামলার শিকার হলে তিনি তাঁর বইগুলো সেখানেই ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। বইগুলোর সঙ্গে তিনি রেখে যান একটি চিরকুট:
‘যে-ই এই বইগুলো খুঁজে পাবেন, দয়া করে এগুলোর যত্ন নেবেন।’
অলৌকিকভাবে কীভাবে যেন এই আর্তি কিছু মানুষের কাছে পৌঁছয়, রক্ষা পেয়ে যায় বইগুলো এবং সেগুলোই হয়ে ওঠে ফিনিক্স লাইব্রেরির ভিত্তি। ফিনিক্স লাইব্রেরি। যুদ্ধের আগুনে আগ্রাসনের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েও বেঁচে ওঠার গল্প। বইয়ের। মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির। গাজায়, গণহত্যার পর, ওমর ও ইব্রাহিম বুঝেছিলেন যে, বইয়ের মাধ্যমে যে স্বপ্ন সুরক্ষিত তা কখনও হার মানে না– জ্ঞান এমন এক শক্তি, যা ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি শহরকে আবারও ফিরিয়ে আনতে পারে।

ইব্রাহিম মাসরির জন্য, যিনি আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় পড়াশোনা করেছিলেন এবং পরে শিক্ষক, ফ্রিল্যান্স অনুবাদক ও লেখক হিসেবে কাজ করেছেন, ফিনিক্স লাইব্রেরি যেন নিজের ঘরে ফিরে আসারই আরেক নাম। ইব্রাহিমের গল্প শুরু হয় প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে– সেই দিনে, যেদিন ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে শ্বাস নিতে থাকা একটি বুকশেলফ তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, আশা সবকিছুর মধ্য দিয়েও বেঁচে থাকতে পারে… তাঁরা আশা রাখেন, শুধু বইয়ের একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা হিসেবেই নয়, এই লাইব্রেরি ফিলিস্তিনি লেখক ও কবিদের জন্য, পাশাপাশি যুদ্ধ ও চলমান গণহত্যার কারণে যাদের শিক্ষা থমকে গিয়েছে– সেই শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে। তবে প্রতিকূলতা সীমাহীন। গাজায় বই সহজলভ্য নয়। কাগজের সীমাবদ্ধতা, মুদ্রণের সংকট, এবং শিক্ষা উপকরণের ওপর কঠোর বাধার কারণে, একটি শক্তিশালী ও বৈচিত্রময় বইয়ের সংগ্রহ গড়ে তোলা এখন তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে পৃথিবীর বহু মানুষ হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অর্থ দিয়ে, বই দিয়ে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে দান করা নতুন বই এবং গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে সংগ্রহ করা এক হাজার বই নিয়ে এই লাইব্রেরি প্রতিদিন আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল থেকে লাইব্রেরিটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত।

‘সবকিছুর মধ্যেও আমি কখনও এই বিশ্বাস হারাইনি যে আমরা আবারও উঠে দাঁড়াব। আমি আমার গল্প এবং আমার চারপাশের মানুষের গল্প লিখেছি, এই আশায় যে পৃথিবী একদিন আমাদের ছিনিয়ে নেওয়া মাতৃভূমির সত্যকে দেখবে– যে সত্যকে দখলদার শক্তি দশকের পর দশক ধরে নীরব করে দিতে চেয়েছে’– তহবিল সংগ্রহের লিখিত বিবৃতিতে এভাবেই বলেন মাসরি। তিনি বলেন যে, তিনি বিশ্বাস করতেন এবং এখনও করেন যে, প্রতিটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরের ভেতর একটি নতুন লাইব্রেরির বীজ লুকিয়ে থাকে এবং শব্দ নিজেই এক ধরনের প্রতিরোধ। ফিনিক্স লাইব্রেরি যেন আগুনের ভেতর দিয়ে বহন করে আনা বইয়ের গল্প, আর বোমার নিচেও রক্ষা করে রাখা স্বপ্নের গল্প। ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলাই স্বাধীনতার এক প্রতীক হয়ে ওঠে। ফিনিক্স লাইব্রেরি হয়ে উঠেছে সেই প্রতীক।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved