ncert censored the historical dancing girl of Mohenjo-Daro | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

প্রচ্ছদ কাহিনি

আজ থেকে ১৩৬ বছর আগে, উনিশ শতকের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ নগ্নতার মধ্যে সৌন্দর্য দেখেছিলেন– বিন্দুমাত্র অস্বস্তি তাঁর হয়নি, সম্ভ্রমহানির কোনও প্রসঙ্গও তিনি উত্থাপন করেননি। আর আজ তাঁর মৃত্যুর সাড়ে আট দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও, পৃথিবী যখন আরও একটু এগিয়ে গিয়েছে, তখন আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা যদি সম্ভ্রম ও শালীনতার প্রশ্ন তুলে মহেঞ্জোদারোর নৃত্যরতা বালিকার নগ্নতার সৌন্দর্যের হানি ঘটাতে চান– তাহলে আমরা কিঞ্চিৎ বিস্মিত হই বইকি!

Published by: Robbar Digital

Posted:June 16, 2026 5:48 pm | Updated:June 16, 2026 7:40 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে– ১৯২৬ সালে, সিন্ধু সভ্যতার পীঠস্থান মহেঞ্জোদারো থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল ‘নৃত্যরতা বালিকা’ বা ‘dancing girl’-এর একটি মূর্তি। মূর্তিটি অপরূপ এবং গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে বোঝার চেষ্টা করা যাক, মূর্তিটি কেন অপরূপ। মাত্র সাড়ে দশ সেন্টিমিটার উচ্চতার এই নিকষ কালো মূর্তিটি একটি নগ্ন বালিকার– তার পরনে কোনও পোশাক নেই, কিন্তু ব্রোঞ্জের তৈরি এই মূর্তির গলায় দেখা যায় একখানি নেকলেস, এবং তার দুই হাতে চুড়ির বাহার। শুধু তাই নয়, বালিকাটির দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটিও ভারি মনোহর– সে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন এক শিথিল, ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে; তার একটি হাত কোমরে, আরেকটি ঊরুতে। নতুন দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে রক্ষিত এই মূর্তি যাঁরা দেখেছেন বা দেখবেন– তাঁরা যে এটি থেকে চোখ ফেরাতে পারেননি, বা পারবেন না– তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এরপর আমরা জানতে চাইতে পারি– মূর্তিটি ইতিহাসের উপাদান হিসেবে কেন গুরুত্বপূর্ণ? মূলত তিনটি কারণে– প্রথমত, এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, আজ থেকে প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে তামা ও টিন থেকে প্রস্তুত সংকর ধাতু ব্রোঞ্জের প্রচলন ছিল; দ্বিতীয়ত, বুঝতে পারি, সেকালেও ব্রোঞ্জ থেকে মোম সহকারে মূর্তি তৈরির জটিল পদ্ধতি সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের জানা ছিল; এবং তৃতীয়ত, নৃত্যরতা বালিকার দেহের গঠন, তার পরনের অলংকার এবং সর্বোপরি তার দেহের ভঙ্গিমা– এ সবই নিশ্চিতভাবে আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, মূলত কৃষিভিত্তিক সেই সমাজে নারীর স্থান কত মর্যাদাসম্পন্ন ছিল, সৌন্দর্যের প্রতি সেই সমাজের মানুষের কতখানি অনুরাগ ছিল, তা প্রকাশের বাসনা কতটা তীব্র ছিল এবং অবকাশ যাপনের মূল্য সে সমাজে কতখানি গুরুত্ব পেত।

zoom
মহেঞ্জোদারোর ‘নৃত্যরতা বালিকা’ বা ‘dancing girl’

অতি সম্প্রতি এই মূর্তি নিয়ে আমাদের দেশের বিদ্বৎসমাজে, বিশেষত ইতিহাসবিদদের একাংশের মধ্যে, আলোচনা ও বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। এই বিতর্কের কারণ আর কিছু নয়– সম্প্রতি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং’ (এনসিইআরটি) কর্তৃক প্রকাশিত বিদ্যালয়-পাঠ্য একটি পাঠ্যপুস্তকে এই নৃত্যরতা বালিকার ছবিটি কিছুটা অন্যভাবে ছাপা হয়েছে। এখানে দেখা যাচ্ছে– বালিকাটি সম্পূর্ণ নগ্ন নয়, তার দেহের ঊর্ধ্বাংশ ছায়া দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। যদিও এই পরিবর্তনের কারণ কী– কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার স্পষ্ট কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। অনেকেই মনে করছেন যে, তথাকথিত ‘শালীনতা’ রক্ষা করতেই এই পরিবর্তন করা হয়েছে– যেহেতু কেউ কেউ মনে করতে পারেন সম্পূর্ণ নগ্ন মূর্তি অল্পবয়সি ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে উপযুক্ত নয়। এই ‘শালীনতা’র প্রশ্নেই বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, ‘শালীনতা’র দোহাই দিয়ে ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক পরিচিত মূর্তিটির– যা বিশ্বে ভারতীয় শিল্পের মর্যাদার প্রতীক, তার সৌন্দর্যহানি ঘটানো হয়েছে এবং ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। অনেকেই স্মরণ করতে পারবেন, ইংল্যান্ডে ভিক্টোরীয় যুগে শালীনতার প্রশ্নটি এতটাই হাস্যকর রকমের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, নৈতিকতা রক্ষার নামে টেবিলের পায়াগুলোও কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হত। সেই ভিক্টোরীয় নীতিবোধ বা শালীনতার প্রশ্ন কি এই একুশ শতকের ভারতেও ফিরে এল– এই হল ঐতিহাসিক ও ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসু মানুষদের জিজ্ঞাসা। শুধু তাই নয়, এভাবে ইতিহাস বিকৃত করলে ছাত্রছাত্রীদের কাছে সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া যায় কি না, কিংবা এর ফলে প্রাচীন ভারতের ঔদার্য এবং শৈল্পিক বোধ সম্বন্ধে সঠিক বার্তা পড়ুয়াদের কাছে পাঠানো যায় কি না– এই প্রশ্নও অনেকে তুলতে শুরু করেছেন। বিশেষত মনে রাখতে হয়, এর আগে এনসিইআরটি-র কোনও পাঠ্যপুস্তকেই এভাবে মহেঞ্জোদারোর এই মূর্তিটির ‘শালীনতা’ রক্ষার চেষ্টা করা হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস-বিকৃতির প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সন্দেহ নেই, আমাদের দেশ ‘শালীনতা’ রক্ষায়, এবং সমাজ নিয়ন্ত্রণ করতে, বরাবরই তৎপর। আজ বলে নয়– অনেকদিন ধরেই, বলা যায় স্বাধীনতার পর থেকেই। সে কারণেই আমাদের দেশে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও– সিনেমার ওপর সেন্সরশিপ বসে। এমনকী একটু বয়স্করা এ-ও স্মরণ করতে পারেন– কিছু প্রখ্যাত লেখকের সাহিত্যসৃষ্টিও বিভিন্ন সময়ে আইনের জাঁতাকলের সম্মুখীন হয়েছিল। প্রশ্ন হল– এই শালীনতা বা সম্ভ্রমের বিষয়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত বিদ্যালয়-পড়ুয়াদের কাছে? সত্যিই কি নৃত্যরতা বালিকাটির যথার্থ ও অবিকৃত ছবি তাদের পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হলে তা তাদের পক্ষে ক্ষতিকর হবে?

zoom
এনসিইআরটি-র পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হওয়া ‘বিকৃত’ ছবি

এ-প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠতম শিল্পী, কবি ও শিক্ষাবিদের শরণাপন্ন হতে পারি। বলা বাহুল্য, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বারের জন্য ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন– তখন তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা বা বেলার (যাকে তিনি ‘বেলি’ বলে ডাকতেন) বয়স মাত্র চার বছর। সে-সময়ে তিনি ফরাসি ছবির এক প্রদর্শনীতে গিয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন সুন্দরীর এক ছবি দেখেছিলেন। তখন তিনি যা লিখেছিলেন, এই প্রসঙ্গে তা হুবহু উদ্ধৃত করা জরুরি। তিনি লিখেছিলেন:

‘সেদিন French Exhibition-এ একজন বিখ্যাত artist-রচিত একটি উলঙ্গ সুন্দরীর ছবি দেখলুম। কী আশ্চর্য সুন্দর! দেখে কিছুতেই তৃপ্তি হয় না। সুন্দর শরীরের চেয়ে সৌন্দর্য পৃথিবীতে কিছু নেই… সেই উলঙ্গ ছবি দেখে যার তিলমাত্র লজ্জা বোধ হয় আমি তাকে সহস্র ধিক্‌কার দিই। আমি তো সুতীব্র সৌন্দর্য-আনন্দে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলুম, আর ইচ্ছে করছিল আমার সকলকে নিয়ে দাঁড়িয়ে এই ছবি উপভোগ করি। বেলি যদি বড়ো হত তাকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে আমি এ ছবি দেখতে পারতুম। এরকম উলঙ্গতা কী সুন্দর… এই উলঙ্গ চিত্রে রমণীর সেই হৃদয়ের কোমলতা এবং আত্মার শুভ্র জ্যোতি ব্যক্ত করছে, মানব-অন্তঃকরণের চিরপ্রচ্ছন্ন রহস্য কতকটা প্রকাশ করে দিচ্ছে।’

রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য নিঃসংকোচ, এবং নির্দ্বিধায় তিনি সেই বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। নগ্নতার মধ্যে তিনি কোনও অসুন্দরের সন্ধান পাননি, লজ্জাও বোধ করেননি– বরং উলটে যিনি বা যাঁরা এ নগ্নতা দেখে লজ্জা বোধ করবেন, তাঁকে বা তাঁদেরকে তিনি ‘ধিক্‌কার’ জানাতে প্রস্তুত। সকলকে নিয়ে তিনি এই ‘উলঙ্গ সুন্দরীর ছবি’ উপভোগ করতে চান তো বটেই, এমনকী তাঁর কন্যা বেলা যদি বড় হত, তাহলেও তার সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এ ছবি দেখতে তাঁর তিলমাত্র অস্বস্তি হত না– এসব কথা তিনি পরিষ্কারভাবেই লিখেছেন।

zoom
ভারতীয় ইতিহাসের উপাদানে নগ্নতা, রঘু রাইয়ের তোলা আলোকচিত্র

রবীন্দ্রনাথের এ-লেখা আজ থেকে ১৩৬ বছর আগের। উনিশ শতকের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে তিনি নগ্নতার মধ্যে সৌন্দর্য দেখেছিলেন– বিন্দুমাত্র অস্বস্তি তাঁর হয়নি, সম্ভ্রমহানির কোনও প্রসঙ্গও তিনি উত্থাপন করেননি। আর আজ তাঁর মৃত্যুর সাড়ে আট দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও, পৃথিবী যখন আরও একটু এগিয়ে গিয়েছে, তখন আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিরা যদি সম্ভ্রম ও শালীনতার প্রশ্ন তুলে মহেঞ্জোদারোর নৃত্যরতা বালিকার নগ্নতার সৌন্দর্যের হানি ঘটাতে চান– তাহলে আমরা কিঞ্চিৎ বিস্মিত হই বইকি!

প্রশ্নটা অবশ্য শুধুই তথাকথিত ‘শালীনতা’র নয়– তার চেয়েও আরও কিছু বেশি। প্রশ্নটা ইতিহাস ও ইতিহাসবোধেরও বটে। ইতিহাস, সকলেই একমত হবেন, শুধু নীরস তথ্যের সমাবেশ নয়। অতীতকে প্রামাণ্য তথ্যে রূপান্তরিত করে তার মাধ্যমে বর্তমানকে বোঝা এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করা– ইতিহাসের এই অতি প্রয়োজনীয় ভূমিকা ভুললে চলবে না। একটু ভাবলেই আমরা বুঝতে পারব, ইতিহাসের এই ভূমিকার মধ্যে তথ্যের সঠিক উপস্থাপনার গুরুত্ব সর্বাধিক– কারণ, তা না হলে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়, এবং তার ফলে বর্তমানকে বোঝা যেমন ব্যাহত হয়, ঠিক তেমনই ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরির কাজেও ব্যাঘাত ঘটে। ইতিহাস বিকৃতি তাই শুধুই তথ্যের বিকৃতি নয়, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের পক্ষেও বিপজ্জনক। এর ফলে শুধু যে তরুণ প্রজন্ম সত্য থেকে বঞ্চিত হয় তাই নয়, সমাজে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের জন্ম হয়, আর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের পথে তা অন্তরায় হয়ে ওঠে। আমাদের দেশ বারবার এই অন্তরায়ের সম্মুখীন হয়েছে। ক্ষমতার অলিন্দে যখন যে গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তখন সেই গোষ্ঠী তাদের রুচি, বিশ্বাস, আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে ইতিহাস ‘নির্মাণ’ করতে চেয়েছে। জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে এই তথাকথিত ‘নির্মাণ’-এর কর্মসূচি যেন আমাদের দেশের ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ-প্রসঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যের ইতিহাসের পাঠ্যক্রম থেকে মুঘল যুগকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চয়ই অনেকের মনে পড়বে। মুশকিল হল, ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করা ব্যক্তিবর্গ যদি নিজেদের ইচ্ছেমতো ইতিহাস গ্রহণ বা বর্জন করেন, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ স্থপতিরা– যারা আজকের পড়ুয়া– সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এর সুদূরপ্রসারী ফল ফলতে পারে জাতির ভবিষ্যৎ জীবনে ও কর্মকাণ্ডে।

zoom
ভারতীয় ইতিহাসের উপাদানে নগ্নতা, রঘু রাইয়ের তোলা আলোকচিত্র

সবশেষে ফিরে আসা যাক আবার সেই নৃত্যরতা বালিকার কাছে। যাঁরা এ-মূর্তির ছবি বিকৃতভাবে উপস্থাপিত করতে চান, তাঁরা কি জানেন বা বুঝতে পারেন যে এর মধ্যে দিয়ে তাঁরা সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক শিল্পকলা, নাগরিক জীবন ও নান্দনিক বোধের স্বরূপ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার পথে বাধা সৃষ্টি করছেন? তাঁরা কি জানেন যে ‘শালীনতা’ বজায় রাখতে গিয়ে তাঁরা ইতিহাসের প্রতি অবিচার করছেন?

এ-প্রশ্নের উত্তর আজকের ভারতে অনেকেই খুঁজছেন।

dancing girl data discripancy historical monuments History Indian history indus valley civilization Mohenjo-Daro Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on