

হিমালয়ের সংকট কেবল বরফ গলার সংকট নয়। এটি জল, খাদ্য, বিদ্যুৎ, পরিবেশ, সীমান্ত, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সংকট। হিমালয়ের বরফ নীরবে গলছিল। কিন্তু ২৬ আগস্টের বিপর্যয় সেই নীরব ভাষাকে বিস্ফোরণের মতো দৃশ্যমান করে দিল। নেপালের ধ্বংসস্তূপের নিচে শুধু ঘরবাড়ি চাপা পড়েনি; চাপা পড়েছে একটি পুরনো ধারণাও– যে পাহাড় স্থায়ী, নদী অনুমানযোগ্য এবং প্রকৃতি রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে। আজকের হিমালয় সেই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করছে।
হিমালয়কে এতদিন বলা হয়েছে এশিয়ার ‘জলভাণ্ডার’। কিন্তু সেই জলভাণ্ডারই এখন ক্রমশ পরিণত হচ্ছে বিপদের আধারে। ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল-চিন সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা নেমে এল, তা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা, পাহাড়ি অবকাঠামো, জলবিদ্যুৎ-নির্ভর উন্নয়ন এবং ভারত-চিন ভূ-রাজনীতির জটিল সম্পর্কের ফলাফল।
নেপালের ভোটেকোশি ও পরে ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও জলের স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদ, রাস্তা, সেতু, সীমান্ত অবকাঠামো এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে বিপর্যস্ত করে। নেপালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘Emergency Operations Centre’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্টের এই বিপর্যয়ে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, চিতওয়ান ও তানাহুন নিয়ে মোট ছয়টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সীমান্তের উত্তরে একটি হিমবাহ-সম্পর্কিত ‘ice-and-rock avalanche’-এর ফলে নদীতে অস্থায়ী জলধারণ বা অবরোধ তৈরি হয়; সেই সঞ্চিত জল হঠাৎ ভেঙে পড়েই বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

এখানেই প্রচলিত ‘GLOF’ বা ‘Glacial Lake Outburst Flood’ ধারণাটিকে একটু বিস্তৃতভাবে দেখতে হবে। ‘GLOF’ সাধারণত হিমবাহ-গঠিত হ্রদের বাঁধ ভেঙে আকস্মিক জলপ্রবাহ নেমে আসাকে বোঝায়। কিন্তু এবারের ঘটনা ছিল আরও জটিল, হিমবাহ ও পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে পড়া, নদীপথে সাময়িক বাধা তৈরি হওয়া এবং সেই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ জল ও ধ্বংসাবশেষের নিচের দিকে ধেয়ে আসা। মার্কিন জিওলজিকাল সার্ভের প্রাথমিক বিশ্লেষণে এই ভূমিঢালের ক্ষয় বা ঢালের স্থিতিশীলতার সঙ্গে একটি হিমবাহের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে এবং ধসের শক্তিকে প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য বলে অনুমান করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিপদটি শুধু ‘একটি হ্রদ ফেটে যাওয়ার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিমালয়ের নতুন বাস্তবতা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বরফ গলছে, পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হচ্ছে, হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদ ও জলাধারের চরিত্র বদলাচ্ছে, আর একটি ছোট ভূ-আকৃতির পরিবর্তন কয়েক মিনিটের মধ্যে সুদীর্ঘ জনপদকে ধ্বংস করে ফেলছে।
এখানে আর একটা বিষয় বুঝে নেওয়া প্রয়োজন, সেটি হল, ঝুলন্ত হিমবাহ কী এবং তা কেন এত বিপজ্জনক?
নেপালের এই বিপর্যয় বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে ‘ঝুলন্ত হিমবাহ’ বা ‘হ্যাংগিং গ্লেসিয়ার’ কী? সাধারণত হিমবাহ পর্বতের অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত ও কম ঢালু উপত্যকার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসে। কিন্তু ঝুলন্ত হিমবাহ থাকে অত্যন্ত খাড়া পাহাড়ের ঢালে বা উঁচু উপত্যকার কিনারায়। তার নিচে অনেক সময় গভীর খাদ বা খাড়া পাথুরে ঢাল থাকে। ফলে হিমবাহের একটি অংশ যেন পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকে।

এই অবস্থান নিজেই তাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। হিমবাহের বরফ যখন উষ্ণতার কারণে ক্ষয় হতে থাকে, তখন তার ভিতরের পুরনো ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বরফের সঙ্গে পাহাড়ের সংযোগ দুর্বল হতে পারে। নিচের অংশ পাতলা হয়ে যেতে পারে। বরফের ফাটল বাড়তে পারে। তার সঙ্গে যুক্ত পাথর ও ধ্বংসাবশেষও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
অবশেষে কোনও একটি অংশ ভেঙে পড়লে তা আর নিছক বরফধস থাকে না। বিপুল গতিতে নামতে থাকা বরফের সঙ্গে পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হয়ে এক বিশাল ধস তৈরি করতে পারে। সেই ধস যদি নদীর মধ্যে গিয়ে পড়ে, নদী মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয় বিপদ শুরু হয় এরপরেই। নদীর জল পিছনে জমতে থাকে। একটি অস্থায়ী প্রাকৃতিক জলাধার তৈরি হয়। কিছু সময় পর সেই বাধা ভেঙে গেলে সঞ্চিত জল একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যায়। তখন সাধারণ বন্যার মতো ধীরে জল বাড়ে না– বরং কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর চরিত্র বদলে যায়। কেন্দ্রীয় হিমালয়ের ঝুলন্ত হিমবাহ নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ২১৯টি ঝুলন্ত হিমবাহ শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, দ্রুত উষ্ণায়নের ফলে এই ধরনের হিমবাহের অস্থিতিশীলতা বাড়ছে এবং বরফ ভেঙে পড়লে তার প্রভাব বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, ঝুলন্ত হিমবাহ কোনও নিছক সুন্দর পাহাড়ি দৃশ্য নয়। এটি একটি সম্ভাব্য উচ্চ-ঝুঁকির ভূ-প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।
এবারে দেখে নেওয়া যাক, ২৬ আগস্ট ঠিক কী ঘটেছিল?
প্রাথমিক উপগ্রহচিত্র ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লেন্দে নদীর উজানে হিমবাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভেঙে পড়ে। সেই বরফ ও পাথরের ধস নদীর পথ আটকে দেয়। অস্থায়ী জলাধার তৈরি হওয়ার পর বাধাটি ভেঙে যায় এবং বিপুল জল ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে ছুটে আসে। প্রথমদিকে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষার বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যে কম্পনটি ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়েছিল, সেটি সম্ভবত ধসের নিজস্ব ভূকম্পীয় শক্তির ফল। অর্থাৎ, কোনও বড় ভূমিকম্পই যে হিমবাহটিকে সরাসরি ভেঙে দিয়েছিল– এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ নেই।

এখানে পরিভাষাগত সতর্কতা জরুরি। ‘GLOF’ বা হিমবাহ-উৎপন্ন হ্রদের আকস্মিক বন্যা বলতে সাধারণত এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যেখানে হিমবাহের গলিত জল জমে তৈরি হওয়া কোনও হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল জল একসঙ্গে বেরিয়ে আসে। হিমালয়ে এই বাঁধ অনেক সময় পাথর, মাটি ও হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি হয়। কিন্তু নেপালের ২৬ আগস্টের ঘটনায় প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মূল চালিকাশক্তি ছিল হিমবাহের অংশবিশেষ ভেঙে পড়া এবং তার ফলে নদীপথে সাময়িক বাধা সৃষ্টি হওয়া। তাই একে সরলভাবে প্রচলিত ‘GLOF’ বলা ঠিক নয়। বরং একে হিমবাহ-সম্পর্কিত আকস্মিক বন্যা বলা বেশি যথাযথ। তবে বিপদের চরিত্র ‘GLOF’-এর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কারণ উভয়ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা হল– উচ্চ পর্বতে বরফ, জল ও ভূপ্রকৃতির ভারসাম্য ভেঙে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জল ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে আসে। এবং এখানেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নটি সামনে আসে।
তবে কি দায়ভার প্রকৃতির একার? প্রকৃতির ভূমিকা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। হিমালয় একটি অস্থির নবীন পর্বতমালা, তাই এই পর্বত যখন তখন ধসে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কখনও বরফ ভাঙবে, নদী কখনও বাঁধা পড়বে, কখনও তার গতিপথ বদলাবে। হিমবাহের ভাঙন পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু সমস্যা হল– প্রকৃতি যে বিপদ তৈরি করে, মানুষ এখন সেই বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলির বরফ হ্রাসের হার ২০০০ সালের পর দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহের মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছোট হিমবাহগুলি।এখানেই মানুষের দায়ের সূত্র। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, শিল্পায়ন, যানবাহনের ধোঁয়া, বনভূমি ধ্বংস, সব মিলিয়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। হিমালয়ের উচ্চভূমিও সেই উষ্ণায়নের বাইরে নয়। তবে একটি সতর্কতা জরুরি। শুধু একটি নির্দিষ্ট হিমবাহ ভেঙে পড়েছে বলেই সেটিকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। কোনও নির্দিষ্ট ধসের ক্ষেত্রে ভূপ্রকৃতি, বরফের গঠন, ঢালের কোণ, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, তুষারের অবস্থা এবং অন্যান্য স্থানীয় কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর প্রবণতাটি অস্বীকার করার উপায়ও নেই– হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে বরফ ও পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা বাড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। অর্থাৎ, এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের ‘তাৎক্ষণিক কারণ’ এবং ‘দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরির কারণ’ এক জিনিস নয়। তাৎক্ষণিক কারণ হতে পারে– হিমবাহের ভাঙন। কিন্তু সেই হিমবাহকে দীর্ঘমেয়াদে আরও উষ্ণ, আরও অস্থিতিশীল পরিবেশে ঠেলে দেওয়ার নেপথ্যে মানুষের ভূমিকা রয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন আসে একটি বিশেষ বিষয়ের, নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান ও পার্শ্ববর্তী দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কথা, যা সরাসরি আমাদের নিয়ে যায় ভূরাজনৈতিক আলোচনার দিকে।
৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেপাল কর্তৃপক্ষের হিসেব অনুযায়ী, বিপর্যয়ে অন্তত ১,২৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪,২০০-র বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রায় ৭,৫০০ বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ২০,০০০ বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সীমান্তের ওপারে চিন-তিব্বতেও অন্তত ২১ জনের মৃত্যুর খবর এবং শত শত নিখোঁজের কথা সামনে এসেছে। প্রায় ৯০০ জনকে এখনও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কিন্তু এই পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে আরও একটি ভয়ংকর বাস্তব। বন্যা যে নদীপথ ধরে নেমেছে, সেটি কেবল নেপালের অভ্যন্তরীণ নদী নয়। ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী শেষপর্যন্ত বৃহত্তর গণ্ডক নদী ব্যবস্থার অংশ হয়ে ভারতের দিকে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ, হিমালয়ের উচ্চভূমিতে যে বিপর্যয় শুরু হয়, তার প্রভাব সীমান্তের অনেক নিচে বসবাসকারী মানুষের জীবন, কৃষি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় পৌঁছে যায়। এখানেই ‘GLOF’ বা হিমমণ্ডল সংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে শুধু নেপালের জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে দেখার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। এটি একটি সীমান্তবর্তী ঝঞ্ঝাট– যার উৎস এক দেশে বা সীমান্তের একপাশে হলেও তার জল, পলি, বন্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি একাধিক দেশে পৌঁছতে পারে। এখানেই আসে ভূ–রাজনৈতিক অবস্থানের কথা।

হিমালয়ের এই পরিবর্তন আকস্মিকভাবে শুরু হয়নি। ২০২৪ সালের থামে উপত্যকার ‘GLOF’-ও দেখিয়েছিল কীভাবে একটি ছোট উচ্চভূমির হিমবাহ-হ্রদ এবং পাহাড়ি ধস একে অপরকে সক্রিয় করে ভয়াবহ জলপ্রপাত তৈরি করতে পারে। ‘ICIMOD’-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট আপার ও লোয়ার Ngole Cho হ্রদের ধারাবাহিক ভাঙনে থামে উপত্যকা বিপর্যস্ত হয়; প্রায় ৪,৫৯,০০০ ঘনমিটার জল মুক্ত হয়েছিল এবং ধ্বংসাবশেষ ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল। আরও সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ওই ঘটনার নেপথ্যে দ্রুত হিমবাহ-গলন, চরম তাপমাত্রা, অতিবৃষ্টি অথবা শৈলধস একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, উচ্চভূমির ছোট হিমবাহ-হ্রদগুলিও দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে ভয়াবহ বন্যার উৎসে পরিণত হতে পারে। এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি হল যে, দেশটি সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করে– ক্ষতির বোঝা কি তাকেই সবচেয়ে বেশি বইতে হবে? নেপাল বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য প্রধান দায়ী দেশগুলির তালিকায় নেই। অথচ তার ভৌগোলিক অবস্থান তাকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম সামনের সারির ভুক্তভোগীতে পরিণত করেছে। অর্থাৎ, কার্বন নির্গমনের উৎস এবং জলবায়ু প্রভাবের অবস্থান একই জায়গায় নয়। এই বৈষম্যই জলবায়ু রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

হিমবাহ গলার গল্প শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইডের গল্প নয়। এখানে রয়েছে ‘ব্ল্যাক কার্বন’ বা ‘soot’, যা বায়ুমণ্ডল ও বরফের ওপর এক গুরুত্বপূর্ণ স্বল্পস্থায়ী জলবায়ুদূষক হিসেবে কাজ করে। হিমালয়ের তুষারের ওপর ব্ল্যাক কার্বন জমলে বরফের সাদা পৃষ্ঠের প্রতিফলন ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সূর্যের তাপ বেশি শোষিত হয় এবং বরফ দ্রুত গলতে পারে। কেন্দ্রীয় হিমালয় নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভারত ও নেপাল মিলিতভাবে ওই অঞ্চলের ব্ল্যাক কার্বনের বড় অংশের উৎস এবং প্রাক্-বর্ষার সময়ে ‘ব্ল্যাক কার্বন ডিপোজিশন’ হিমবাহের ভার হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, ‘ICIMOD’-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নও বলছে, আবাসিক ‘সলিড ফুয়েল বার্নিং’, ইটভাটা এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট উৎস হিমালয় অঞ্চলে ব্ল্যাক কার্বনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই দূষণ শুধু বরফ গলন ত্বরান্বিত করে না; বর্ষার ধরন এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ‘পলিউশন পলিটিক্স’-এর প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের পাহাড়ে জমে থাকা কালো কার্বনের প্রতিটি কণা হয়তো নেপালেই উৎপন্ন হয়নি। তা সীমান্ত পেরিয়ে আসতে পারে। ফলে একটি দেশের বায়ুদূষণ অন্য দেশের হিমবাহ-ঝুঁকির অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে দেয়, বায়ু যদি সীমান্ত না মানে, তবে পরিবেশনীতি কেন সীমান্তে থেমে থাকবে?
নেপালের অর্থনীতিতে জলবিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি নদীগুলির বিপুল জলপ্রবাহ দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাব্য ‘এনার্জি পাওয়ার-হাউস’-এ পরিণত করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিপর্যয় দেখিয়ে দিল, হিমালয়ের নদীর ওপর তৈরি প্রতিটি অবকাঠামোকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা দিয়ে বিচার করলে চলবে না; তার ‘ক্লাইমেট রিস্ক’ও হিসেব করতে হবে। ২৬ আগস্টের বন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে বহু মানুষ আটকে পড়েছেন। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রকল্প ও ‘transmission infrastructure’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নদীর একেবারে তীরবর্তী ‘surface infrastructure’ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। এখানে উন্নয়ন বনাম পরিবেশ, এই পুরনো দ্বন্দ্বটি নতুন রূপ পেয়েছে। প্রশ্ন এখন আর জলবিদ্যুৎ তৈরি করা হবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল, কোথায় তৈরি হবে, কী ধরনের নকশায় তৈরি হবে, কতটা চরম অবস্থা সহ্য করতে পারবে এবং প্রতিকূল স্রোত থেকে ‘real-time warning’ পাওয়া গেলে অনুকূল স্রোতে অবকাঠামো কীভাবে বন্ধ বা খালি করা হবে? কারণ আগামিদিনের হিমালয়ে ৫০ বা ১০০ বছরের পুরনো ‘flood-return period’ ধরে অবকাঠামো নকশা করা, যথেষ্ট নাও হতে পারে।

নেপালের ভূগোল তাকে এক অদ্ভুত কূটনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। উত্তরে চিন, দক্ষিণে ভারত, আর মাঝখানে রয়েছে হিমালয়ের নদী ব্যবস্থা। এই নদীগুলিই একদিকে নেপালের বিদ্যুৎ সম্পদ, অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ। চিন ও ভারতের মধ্যে নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। নেপালের বিপুল জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা দুই প্রতিবেশী শক্তির কাছেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে নেপালের জলবিদ্যুৎ বাণিজ্য ইতিমধ্যে বাস্তব রূপ পেয়েছে; একই সঙ্গে চিনও নেপালের অবকাঠামো ও জ্বালানি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে ২৬ আগস্টের দুর্যোগ শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়– এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। যে নদী নেপালে বিদ্যুৎ তৈরি করে, সেই নদী ভারতের জন্য ‘downstream water system’-এর অংশ। আর যে পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নদীর জন্ম, তার একটি বড় অংশ তিব্বতীয় মালভূমির ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, একটি দেশের ‘upstream environmental change’ অন্য দেশের ‘downstream security’-কে প্রভাবিত করে। এই বাস্তবতায় জল-তথ্য, যেমন হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, lake level, rainfall, snowmelt, river discharge এবং landslide alert, নিজেই একটি কৌশলগত সম্পদ হয়ে উঠছে।
ভারত ও নেপালের সম্পর্ক গভীর এবং বহুমাত্রিক। ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। চুক্তিতে দুই দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারিত হয়। কিন্তু জলসম্পদ নিয়ে সম্পর্ক সবসময় এত মসৃণ ছিল না কখনওই। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি চুক্তির কথা বলা যায়:
কোশি চুক্তি, ১৯৫৪: ১৯৫৪ সালের কোশি চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু সেই চুক্তিতে কোনও বাঁধ নির্মাণের কথা ছিল না, পরে ১৯৬৬ সালে সংশোধিত চুক্তিতে কোশি নদীর ওপর ব্যারেজ ও সংশ্লিষ্ট সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কথা আসে। ভারতের জন্য এর গুরুত্ব ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ ব্যবস্থায় এবং নেপালের জন্য ছিল অবকাঠামো ও জলসম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনা। কিন্তু নেপালে দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক অসন্তোষ শুরু হয়েছিল। অভিযোগের মূল জায়গা ছিল, নেপালের জলসম্পদের ওপর ভারত তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছে কি না এবং নেপালের সার্বভৌম স্বার্থ যথেষ্ট সুরক্ষিত হয়েছে কি না। এই বিতর্ক আজকের হিমবাহ-দুর্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক বুঝতে গেলে এই তথ্য জরুরি।
গণ্ডক চুক্তি, ১৯৫৯: ১৯৫৯ সালের গণ্ডক চুক্তি হয়, এবং পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে সেটিকে আবার সংশোধন করা হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী গণ্ডক নদীর জল সেচ ও অন্যান্য ব্যবহারের জন্য দুই দেশের সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়। এই চুক্তিও দেখায়, নেপালের পাহাড়ি জল ভারতের সমতলের কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে কত গভীরভাবে যুক্ত।
মহাকালী চুক্তি, ১৯৯৬: ১৯৯৬ সালের মহাকালী চুক্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে সারদা ব্যারাজ, টনকপুর ব্যারাজ এবং পঞ্চেশ্বর বহুমুখী প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়। চুক্তিতে মহাকালী নদীকে দুই দেশের সীমান্তবর্তী নদী হিসেবে বিবেচনা করে জলসম্পদের যৌথ ব্যবহারের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পঞ্চেশ্বর প্রকল্পের মতো বিষয় বহু বছর ধরে বাস্তবায়নের জটিলতায় আটকে থেকে যায়।
এতগুলো চুক্তি স্বাক্ষর হলেও কোনও চুক্তিতেই নদীর ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার কথা বলা হয়নি। কোশি, গণ্ডক বা মহাকালী চুক্তির সময় আজকের মতো জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত হিমবাহ ক্ষয়, ঝুলন্ত হিমবাহের অস্থিতিশীলতা কিংবা আকস্মিক হিমবাহ-সম্পর্কিত বন্যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল না। তখন মূল প্রশ্ন ছিল– কত জল পাওয়া যাবে? কোথায় বাঁধ হবে? কত জমিতে সেচ দেওয়া যাবে?কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে? কিন্তু এক প্রশ্ন বদলে যেতে যে সময়ও লাগবে না, এটা কোনও দেশই বুঝতে পারেনি বা বুঝেও এড়িয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছিল। পরবর্তীতে প্রশ্নগুলো বদলে যেতে শুরু করে দ্রুত– হিমবাহ কত দ্রুত গলছে? কোন হিমবাহ বিপজ্জনক? কোন পাহাড় ধস নদীর পথ আটকে দিতে পারে? কত দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছবে? জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কতটা চরম দুর্যোগ সহ্য করতে পারবে? অর্থাৎ বিশ শতকের জলচুক্তি একুশ শতকের জলবায়ু-ঝুঁকির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন এর মুখে।

১৯৫৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত নির্মাণ ক্রমশ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে নেপাল চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত হয়। ২০২৪ সালে দুই দেশ আরও একটি সহযোগিতা কাঠামো স্বাক্ষর করে, যেখানে অবকাঠামো ও সংযোগের বিভিন্ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়। নেপালের সরকারি নথিতে বলা হয়, এই কাঠামো অন্য দেশের সঙ্গে নেপালের সহযোগিতাকে বাধা দেবে না। চিনের সঙ্গে নেপালের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল উত্তরমুখী সড়ক, সীমান্তবন্দর, বাণিজ্য ও সম্ভাব্য রেল সংযোগ। ভারতের দৃষ্টিতে এর একটা কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। কারণ নেপাল ঐতিহাসিকভাবে ভারতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই নেপালে চিনের অবকাঠামোগত উপস্থিতি বাড়লে, দিল্লি বিষয়টিকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে দেখবে না। নেপাল তাই দুই শক্তির মাঝখানে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে– ভারতকে বাদ দেওয়া যায় না, চিনকেও দূরে রাখা যায় না। অর্থাৎ নেপাল দুই শক্তিশালী দেশের মাঝে একপ্রকার ঘেরাটোপের মধ্যে পড়ে রয়েছে।
নেপালের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম বড় সম্পদ তার নদী। জলবিদ্যুৎ নেপালকে শুধু বিদ্যুৎ দিতে পারে না; এটি তাকে ভারতীয় বাজারে বিদ্যুৎ রপ্তানির সুযোগ দেয়। আবার ভারতের জন্য নেপালের জলবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ। চিনও নেপালের শক্তি ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। দুই দেশই নেপালের উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। ফলে জলবিদ্যুৎ আর কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এটি প্রভাব বিস্তারেরও মাধ্যম। কিন্তু ২৬ আগস্টের বিপর্যয় এই উন্নয়ন মডেলকে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। যদি একটি হিমবাহ-সম্পর্কিত ধস একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শত শত মানুষকে আটকে দিতে পারে, তবে ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলির নকশায় হিমবাহ-ঝুঁকি কতটা বিবেচনা করা হয়েছে? যদি পাহাড়ের আচরণ বদলায়, তবে পুরনো ঝুঁকি-মানচিত্র কতটা কার্যকর? এই প্রশ্নগুলো নেপাল মন্ত্রণালয়কে সাহস দিয়েছে রুখে দাঁড়াতে। কারণ এই শিক্ষাকে বা ইঙ্গিতকে কাজে লাগাতে না পারলে, এর থেকেও বড় সর্বনাশ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে আগামিদিনে।
দক্ষিণ এশিয়ার নদী-রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল পর্যাপ্ত এবং সময়মতো তথ্য বিনিময়ের অভাব। অথচ ‘GLOF’-এর মতো ঘটনায় ২০-৩০ মিনিটের আগাম সতর্কতাও জীবন বাঁচাতে পারে। ২০২০ সালে ‘UNDP’ ও ‘ICIMOD’-এর যৌথ সমীক্ষায় নেপাল, ভারত ও তিব্বত অঞ্চলের কোশী, গণ্ডকী এবং কার্নালি অববাহিকায় ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ চিহ্নিত হয়েছিল যার ২৫টি চিনে, ২১টি নেপালে এবং একটি ভারতে। এর মধ্যে ৪২টি কোশী বেসিনে অবস্থিত। অর্থাৎ, বিপদের তালিকা বহুদিন ধরেই জানা ছিল। তবু প্রশ্ন রয়ে যায়, এই তথ্য কি ভারত, নেপাল ও চিনের মধ্যে পর্যাপ্তভাবে এবং real-time ভিত্তিতে ভাগ হচ্ছে? যদি না হয়, তবে হিমালয়ের ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হয়তো বাঁধ নয়, বিশ্বাস ও তথ্যের অবকাঠামো। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সকলেরই প্রশ্ন হওয়া উচিত।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতিক বিপর্যয়কে ‘হিমালয়ের সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ এই ধরনের আকস্মিক ও বিধ্বংসী জলপ্রবাহের অভিজ্ঞতা সাম্প্রতিক স্মৃতিতে বিরল। কিন্তু এই ‘সুনামি’ আসলে শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তিত ভূ-প্রকৃতির প্রতীক। বিশ্ব যখন renewable energy, carbon neutrality এবং green transition-এর কথা বলছে, তখন নেপালও জলবিদ্যুৎকে তার উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু সবুজ শক্তি যদি এমন ভূখণ্ডে তৈরি হয় যেখানে জলবায়ু প্রভাবিত দুর্যোগের (climate-induced disaster) –এর ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে, তবে সেই green transition-এরও climate-risk assessment প্রয়োজন। একইভাবে, ভারত যদি নেপালের জলবিদ্যুৎ আমদানি বাড়ায় এবং চিন যদি সীমান্তবর্তী অবকাঠামো উন্নয়ন করে, তবে দুই দেশকেই বুঝতে হবে, হিমালয়ের নদী কোনও এক দেশের সম্পত্তি নয়। নদীর উৎস, প্রবাহ ও বিপর্যয়ের ঝুঁকি রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না। এর দায় সকলকেই নিতে হবে এবং যাতে বিপর্যয় না ঘটে তার আগাম ব্যবস্থাও নিয়ে হবে।
২৬ আগস্টের বিপর্যয় তাই নেপালের জন্য শুধু পুনর্গঠনের পরীক্ষা নয়; এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি নীতিগত পরীক্ষাও। প্রথমত, নেপাল, ভারত ও চিনের মধ্যে real-time hydrological এবং glacial data-sharing mechanism তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য বিপজ্জনক glacial lakes এবং unstable slopes-এর জন্য যৌথ satellite monitoring প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের environmental impact assessment-এ climate-induced extreme events বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, Black Carbon কমাতে সীমান্ত-অতিক্রমী clean-energy ও clean-cooking programme চালু করতে হবে। পঞ্চমত, দুর্যোগের পরে ত্রাণ দেওয়ার বদলে আগে থেকেই early-warning-to-early-action system তৈরি করতে হবে।
কারণ হিমালয়ের সংকট কেবল বরফ গলার সংকট নয়। এটি জল, খাদ্য, বিদ্যুৎ, পরিবেশ, সীমান্ত, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সংকট। হিমালয়ের বরফ নীরবে গলছিল। নদীগুলি সেই পরিবর্তনের ভাষা বহন করছিল। কিন্তু ২৬ আগস্টের বিপর্যয় সেই নীরব ভাষাকে বিস্ফোরণের মতো দৃশ্যমান করে দিল। নেপালের ধ্বংসস্তূপের নিচে শুধু ঘরবাড়ি চাপা পড়েনি; চাপা পড়েছে একটি পুরনো ধারণাও– যে পাহাড় স্থায়ী, নদী অনুমানযোগ্য এবং প্রকৃতি রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে। আজকের হিমালয় সেই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করছে। যে কার্বন দিল্লি, কাঠমান্ডু, লাহোর বা অন্য কোনও দূরবর্তী শহরের বাতাসে মিশে যায়, তার কিছু অংশ বরফের ওপর ফিরে আসতে পারে। যে হিমবাহ তিব্বতের উচ্চভূমিতে অস্থিতিশীল হয়, তার জল নেপালের জনপদ ভাসিয়ে দিতে পারে। যে নদী নেপালে বিদ্যুৎ তৈরি করে, সেটিই ভারতের সমতলে বন্যার কারণ হতে পারে। আর যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আজ উন্নয়নের প্রতীক, আগামী দিনের extreme event-এ সেটিই হয়ে উঠতে পারে বিপর্যয়ের (vulnerability)-এর কেন্দ্র। তাই ২৬ আগস্টের নেপাল আমাদের সামনে একটি কঠিন কিন্তু জরুরি প্রশ্ন রেখে গেছে– হিমালয়কে আমরা কি শুধু জলবিদ্যুৎ, বাণিজ্য ও সীমান্তের ভূগোল হিসেবে দেখব, নাকি একটি অভিন্ন জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা হিসেবে দেখব?
এই প্রশ্নের উত্তর যত দেরিতে দেওয়া হবে, পরবর্তী ‘Himalayan Tsunami’-র ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ততই দীর্ঘ হবে। হিমালয় আমাদের বারবার সতর্ক করবেনা আগামীতে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved