Robbar

প্রশ্নে নো এন্ট্রি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 11, 2026 4:30 pm
  • Updated:July 11, 2026 4:50 pm  

দিল্লির একটি নামকরা সংস্থায় এক বান্দার চাকরি প্রায় পাকা। শেষবেশ সন্দেশ চলছে। এমন সময় যা হয়, গড়িয়াহাটার বিস্তর দরাদরি, কত নেবে আর কত দিতে পারব– এই গোছের দড়ি টানাটানি। এক্ষেত্রে কী হয়েছে, তা অবশ্য জানি না। তবে খবর বলছে– প্রার্থী একজোড়া প্রশ্নের ঢেলা ছুড়ে মারে কর্তৃপক্ষকে। প্রশ্ন করার যা ফল হয়, এখানেও সেটাই হল। চাকরি বাতিল!

প্রচ্ছদ: দীপঙ্কর ভৌমিক

সম্বিত বসু

রাস্তায় রাস্তায় ঘূর্ণিপাক খাচ্ছেন এক ভদ্রলোক। একে-তাকে পাকড়াচ্ছেন। পাকড়ে করছেনটা কী? নাছোড়বান্দা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলছেন এক্কেরে! বলি, ন্যায় কী? সত্যিটা কী বস্তু বলুন তো! আজ্ঞে, সাহস কাকে বলে? হেন বিবিধ প্রশ্ন। বিচিত্র বিষয়! শুধু জনবহুল রাস্তায় না, কখনও-সখনও সভাতেও, শরীরচর্চা কেন্দ্রে। কেউ উত্তর দিচ্ছেন বা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ বিকট বিরক্ত হচ্ছেন– আ মোলো যা, এসব আবার কেন! খাচ্ছি-দাচ্ছি-ফুল ফোটাচ্ছি– তার মধ্যে এসব তাত্ত্বিক কামড়! এই কাণ্ডটা করতে করতেই ভদ্রলোক রাষ্ট্রের চোখে ‘অপরাধী’ হিসেবে বিবেচিত হলেন। কারণ এই প্রশ্নের মন এথেন্সের স্বীকৃত দেবদেবীর ধারণাকে অস্বীকার করছিল। এবং অভিযোগ ছিল, তরুণদের তিনি বিপথগামী হতে সাহায্য করছেন। তবে একথা স্পষ্ট– তাঁর অমার্জনীয় অপরাধ– প্রশ্ন করা। এবং এমনই ঘোরতর অপরাধ, যে, তাঁকে শাস্তিস্বরূপ খাওয়ানো হল ‘হেমলক’ নামের বিষাক্ত উদ্ভিদের রস। কিন্তু আদপে, তাঁর মৃত্যুতে মিলিয়ে গেল না অনর্গল প্রশ্নের ধারাটি। একে একে আসবেন তাঁর প্রশ্নবাচক উত্তরাধিকারীরা। সেই প্রশ্ন-তোলা ভদ্রলোক– সক্রেটিস। আড়াই হাজার বছর আগে, এথেন্সের রাস্তায় রাস্তায় যিনি প্রশ্ন বুনছিলেন। তাঁর শিষ্যরা– প্লেটো, অ্যারিস্টটলরা সেই প্রশ্নের পথ ধরেই দর্শনের রংমশাল জ্বালাবেন। দর্শনের ইতিহাসকে একরকমভাবে প্রশ্নেরই ইতিহাস হিসেবে পড়া সম্ভব নয় কি?

সক্রেটিস তাঁর অন্তিম পর্যায়েও ছিলেন পারিষদ বেষ্টিত, শিল্পী: জাক লুই ডেভিড

এই ‘প্রশ্ন’ ব্যাপারটাকে তালুতে রেখে, কঠোপনিষদের দিকে যদি এ লেখার মুখ ফেরাই, পাব যম আর নচিকেতাকে। কে নচিকেতা? এক প্রশ্নাতুর বালক। ‘কঠোপনিষদ’ মূলত যম আর নচিকেতার সংলাপ হলেও, প্রশ্ন শুরু হয়েছিল খানিক আগে। নচিকেতার বাবা যখন যজ্ঞে এক অকেজো গরু দান করেছিলেন স্বর্গলাভের আশায়, নচিকেতা দিব্যি বুঝতে পারে, এ দান ‘আদর্শ’ হতে পারে না। এতে ঘেঁচু হবে, স্বর্গলাভ তো হবেই না! নচিকেতা তখন বাবাকে প্রশ্ন করে বসে, ‘আমাকে কার কাছে দান করবেন?’ নচিকেতা এই রকমই ডাহা সৎ, ঝকঝকে, দিলদরিয়া। বাবা প্রথমে জবাবই দিচ্ছিলেন না, শেষে প্রশ্ন ঝেলতে না-পেরে বলে বসেন: ‘মৃত্যুর কাছে।’ এরপরই হরবখত চলতে থাকে যম ও নচিকেতার সংলাপ। যমের আস্তানায় পৌঁছে নচিকেতা জাঁদরেল প্রশ্ন ছুড়ে বসে– যা অনাদিকালের এক বিপুল জিজ্ঞাস্য– ‘মৃত্যুর পর কি জীবনের কোনও অবশেষ থাকে, না থাকে না?’ যম বেচারা ঘাবড়েই গিয়েছিলেন। একে তো বালকের এ বয়সে পরলোকপ্রাপ্তির কথা নয়। বেশ কিছু বছরের আয়ু সেভিংসে ছিল। সে ব্যাটা বিফোর টাইম এসে এখন এরকম বাঘা বাঘা চাচাছোঁলা প্রশ্ন করছে– যার উত্তর তাঁর কাছে কেন দেবতাদের কাছেও ঠিকমতো নেই! যম বালকটিকে নানা প্রকারে শান্ত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু নচিকেতাও অদম্য, প্রশ্ন করে চলে। নিরন্তর। প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন, কথার পিঠে কথা। অথচ যম, নচিকেতা কিংবা এই মৃত্যু-তত্ত্ব– কোনওটাই কিন্তু কঠোপনিষদের সদর দরজা নয়। কঠোপনিষদ আসলে হাজারদুয়ারি তার প্রশ্নে, প্রশ্ন করার ক্ষমতায়। প্রশ্নের উদ্ভাবনে, অন্তরের অন্বেষণে। আনুমানিক আড়াই-তিন হাজার বছর আগে কঠোপনিষদ রচিত হচ্ছে যখন, মনে রাখতে হবে সুদূর এথেন্সেও, ওই আড়াই হাজার বছর আগেই, সক্রেটিস প্রশ্নের ঝুলি নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। দুই আলাদা স্থানাঙ্কে, পরিসরে, প্রশ্নচর্চা চলছে। সক্রেটিসের প্রশ্ন যুক্তির, নচিকেতার প্রশ্ন আত্মানুসন্ধানের– অনেকটা আধ্যাত্মিকতার দিকে বাঁক নেওয়া। কিন্তু দু’জনের হৃদয়ে টোকা মারলেই, সারসার প্রশ্নচিহ্ন ঝরে পড়বে।

যম ও নচিকেতা, শিল্পী: নন্দলাল বসু

খবরটা একটু চমকে দেওয়ার মতো বটে। তবে, যা দিনকাল পড়েছে, তেমন না-চমকালেও চলে। দিল্লির একটি নামকরা সংস্থায় এক বান্দার চাকরি প্রায় পাকা। শেষবেশ সন্দেশ চলছে। এমন সময় যা হয়, গড়িয়াহাটার বিস্তর দরাদরি, কত নেবে আর কত দিতে পারব– এই গোছের দড়ি টানাটানি। এইচআর পুরনো স্যালারি স্লিপ দেখতে চাইবে, হাজারখানেক সার্টিফিকেট দেখে না-মঞ্জুর করে দেবে দর। ‘এবারটা খানিক অ্যাডজাস্ট করে নিন, অ্যাপ্রেইজাল এল বলে!’– এই সমস্ত মগজ ধোলাইয়ে সাধারণত টাটকা কর্মী নরমসরম হয়ে পড়ে ও আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে কী হয়েছে, তা অবশ্য জানি না। তবে খবর বলছে, বেতন নিয়ে দরাদরি হয়েছিল– প্রার্থীও তাতে রাজি। কিন্তু কী মহা নচ্ছার কাণ্ড, চাকরি পেয়েছে কি পায়নি– সে একজোড়া প্রশ্নের ঢেলা ছুড়ে মারে কর্তৃপক্ষকে। এক, অফার লেটার কবে পাওয়া যাবে। আর দুই, কাজের সময় ক’টা থেকে ক’টা!

প্রশ্ন করার যা ফল হয়, এখানেও সেটাই হল। চাকরি বাতিল! তুমি মশাই কাজ করতে এসেছ। তোমাকে মাসমাহিনা দেওয়া হবে। ডিলও ফাইনাল। এই ব্রাহ্ম মুহূর্তে কেউ এরকম বেহায়া প্রশ্ন করে? তাও কর্পোরেটে? অফার লেটার কী এমন মহার্ঘ বস্তু! আলমারির অন্ধকারে ন্যাপথলিনের নেশা করা ছাড়া, কী করবে ওই অফার লেটার, অ্যাঁ? আর সময়? সময় আবার কী? আগে তো কর্মসংস্কৃতি, মানে, ইয়ে, ‘ওয়ার্ক কালচার’ বোঝো? জম্পেশ নুলিয়া হতে হবে আসলে, যেনতেন প্রকারেণ অফিস ডুবলেই, সাঁতরে বগলদাবা করে তুলে দিতে হবে। এইটাই তো কাজমাত্র। এটিএম– অল টাইম মারদাঙ্গা! এসবে কি আর টাইম-ফাইম বলা চলে?

উত্তরের প্রতি হায়ার অথরিটির এমন বেবাক নিড়বিড়ানিই প্রমাণ করে, তারা চান কর্মীর ওষ্ঠে কোষ্ঠকাঠিন্য থাক। ঠোঁটখানা যত কম নড়বে-চড়বে, ততই এ গোছের চোটপ্রবণতা কমবে! আর এই উচ্চস্তরের অস্পষ্টতাই অফিস-সংস্কৃতির আদপ টিপছাপ। বিমূর্ত শিল্পের মতো ব্যাপার। দেখছ দেখো, অত মানে-টানে করতে যেও না, ওসব তোমার মগজে ঢুকবে না। কোম্পানি যদিও হামেশাই জীবনবৃত্তান্তে নাক গলাবে, স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ আঘাতের বাদামি চামড়া খুঁটে দেখবে– কিন্তু যদি কাজের সময় কতটুকু– জানতে চাওয়া হয়, তখনই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে! সভ্যতার ইতিহাস বারবারই অ্যায়সা উলটপুরাণ দেখেছে। প্রশ্নকর্তাকে পইপই করে সন্দেহ আর নির্বাককে তেড়ে সম্মান। একালে ব্যাপারটা পরিষ্কার যে, প্রশ্ন আর জ্ঞানচর্চার মূল বারুদ নয়। ‘আমার মাথা নত করে দাও’ কর্পোরেটের জাতীয় সংগীত, না-হলে হিড়হিড় করে টানতে টানতে দখিন দুয়ার দেখিয়ে দেবে।

কর্পোরেট কালচারের নব্য পরিবারবাদ

বহু কর্পোরেট অফিস সংস্কৃতিরই আপ্তবাক্য: ‘আমরা পরিবার’। তা সত্ত্বেও এইচআর-কে তো মেসোমশাই বা মাসি বলে ডাকতে পারা যায় না। বসকে ‘দোস্তো’ বলে কাঁধে হাত দিয়ে অফিস-বেড়ানো যায় না। তাছাড়া সর্বসমক্ষে স্কেল হাতে পিঠের ভুলভুলাইয়া অঞ্চলে রগড়ে নেওয়াও তো যায় না। আবার ওদিকে, মানে খাস পরিবারে, ধরুন, বাড়ির ওয়াশিং মেশিনের নাটবল্টু খুলে সারিয়ে ফেলেছেন বীর বিক্রমে, আপনিই বিপত্তারিণী– দুপুরে আশা করছেন পুরস্কারস্বরূপ মাটনের পাতলা ঝোলের বদলে খানিক কষা হবে– কিন্তু উল্টে কড়কড়ে খসখসে নগদ তালুতে এসে বসল। এমনটা তো আদৌ হয় না। ১০২ ডিগ্রি জ্বরে জলপট্টি দেয় পরিবার, কর্পোরেট চায় লগ ইন করুক। পরিবারে বিবিধ কাজের ফিকির থাকে। ভালোবাসার পূর্বমেঘ-উত্তরমেঘ থাকে। শান্তি-অশান্তির ডাবল ইঞ্জিন থাকে। স্নেহ-যৌনতা-বিরক্তির বহুবিধ অনুভূতির সাড়ে বত্রিশ ভাজায় তৈরি হয় পরিবারের বোধ।

প্রতিপ্রশ্ন মানেই কি প্রতিপক্ষ? পোস্টার: সত্যজিৎ রায়

কর্পোরেট আসলে ‘পরিবার’ হতেও চায় না, চায় শুধু এই শব্দের আবেগটা খাবলে ধরতে। না-হলে চাকরির শুরুতেই কেন দুটো স্বাভাবিক ও জরুরি প্রশ্নকে দুরমুশ করে দেবে? তৎক্ষণাৎ শাস্তি দেবে চাকরি বাতিল করে? কর্পোরেট মনে মনে বিড়বিড়াচ্ছে– এক কর্মীকে প্রত্যাখান করে সে মহা ক্ষমতাবান। খানিক আত্মপ্রত্যয়ও সংগ্রহ করছে সে, নিশ্চিত।

কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা: প্রশ্ন, যে কোনও ক্ষমতার চোয়ালে জব্বর ঘুসি মারে, আর তারই প্রত্যাঘাতে ঘটে চলে যাবতীয় হ-য-ব-র-ল। হয়তো আগুন, চাকা বা বিদ্যুৎ নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার– সে প্রশ্ন করতে পেরেছিল। সেই পারা, কর্পোরেটের চাকরি বাতিলে ক্ষয়ে যাবে না কোনওদিন।

একটি মামুলি জিজ্ঞাসা: প্রশ্নের নিরিখে কর্পোরেটকে মাঝে মাঝে রাষ্ট্রের মতো দেখায়? না কি রাষ্ট্রকেই কর্পোরেট?