

প্রকৃতি মা যেন ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’– ঘরের মায়ের মতো– মুখ বুজে সব সহ্য করে যাবে– ‘টুঁ’ শব্দটি করবে না। তা না হয় হল এক-দু’দিন, এক বছর, দু’বছর পাঁচ কি ১০ বছর, তারপরে একদিন তো ধৈর্যের বাঁধ ভাঙবেই। নেপালে ভেঙেছে সেটাই। অপরূপা জননীর রুদ্ররোষ। ভয়াল রুদ্ররূপে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে হাজার হাজার মানুষ।
বিজ্ঞান, অগ্রগতি, অবৈজ্ঞানিক ভোগবাদ, প্রকৃতি বিজ্ঞানের ন্যূনতম জ্ঞানের অভাব, অনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, জনসংখ্যাবৃদ্ধি, পুণ্যলোভাতুর মানুষের হুজুগ, ব্যাকরণহীন পর্যটন, প্রকৃতিকে সম্ভ্রমের অনীহায় চ্যালেঞ্জ জানানো ও সর্বোপরি রাষ্ট্রপরিচালনার চূড়ান্ত মূর্খামি, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শিক্ষা-দীক্ষার অভাব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনও কর্তব্য না-পালন করা, পরিকল্পনায় ত্রুটি– সব মিলিয়েই নেমে আসে জাতীয় বিপর্যয়। সেটি প্রাকৃতিক হোক বা সামাজিক বা রাজনৈতিক! নেপালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সরাসরি আঁচ প্রতিবেশী রাজ্য হিসাবে আমাদের গায়ে এসে লেগেছে মর্মান্তিকভাবে। আমাদেরও কিছু দোষ এবং দায় থেকে যায় বইকি!
‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।’
লাইন দুটো এক্ষেত্রে খুব কার্যকর মনে হল। কবি সবরকম অসাধ্যসাধন করতে বলেছেন, কিন্তু বারবার কান্ডারিকে হুঁশিয়ার থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। যাত্রীদেরও বলেছেন হুঁশিয়ার থাকতে। কিন্তু আমাদের কাণ্ডারি তো নিজেরাই হুঁশিয়ার নয়, আর আমরা তো এলেবেলে মানুষ– হুঁশিয়ার হতেই শিখিনি! আত্মসংযম শিখিনি। অন্যকে সমীহ করতে শিখিনি। উন্মত্ত, উদ্বেল হয়ে সব হুঁশিয়ারিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে আনন্দ পর্যটনে উদ্বাহু নৃত্য করছি।

মানস সরোবর যেতেই হবে, হবেই! পুণ্য অর্জন না কি কেবল অর্থের প্রাচুর্যে অবিমৃশ্যাকারিতা? না কি অহংকার? না যাতায়াত ব্যবস্থার সহজলভ্যতা? না পর্যটনের বিজ্ঞাপিত হাতছানি?
প্রকৃতি মা যেন ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’– ঘরের মায়ের মতো– মুখ বুজে সব সহ্য করে যাবে– ‘টুঁ’ শব্দটি করবে না। তা না হয় হল এক-দু’দিন, এক বছর, দু’বছর পাঁচ কি ১০ বছর, তারপরে একদিন তো ধৈর্যের বাঁধ ভাঙবেই। নেপালে ভেঙেছে সেটাই। অপরূপা জননীর রুদ্ররোষ। ভয়াল রুদ্ররূপে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে হাজার হাজার মানুষ।
অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের জনসংখ্যার প্রাচীন এক থিয়োরিতে উল্লেখিত, প্রকৃতি আপনা থেকেই বিপর্যয় ঘটিয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। একলপ্তে মুছে দেয় বৃক্ষ, মানুষ, প্রাণী, যন্ত্র-সহ বিস্তীর্ণ নদী–উপত্যকা, পাহাড়ি উপত্যকা। মুহূর্তে বদলে দেয় প্রকৃতির নিজেরই গঠন। এইভাবে কাদামাটি এসে সমভূমি তৈরি করে দেয়। আগামিদিনের ভূগঠন হয়তো ধীরে ধীরে আরও বদলে যাবে। নবীন ভঙ্গিল পর্বত হিমালয় ধসপ্রবণ– ভূগোল সম্বন্ধে ন্যূনতম মাধ্যমিক স্তরের এই জ্ঞানটাও যদি থাকত, তবে পাহাড়ের সঙ্গে এই যথেচ্ছাচার হয়তো মানুষ করার সাহস পেত না। আসলে আমরা কতটুকুই বা মন দিয়ে সিলেবাসের জিনিস পড়ি? আর গত ২০-২৫ বছরে সিলেবাস এসব নেই, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে। যতটুকু আছে তাও অ/ শু (অশুদ্ধ/শুদ্ধ ) টিক চিহ্ন দিয়ে ভূগোলে ৯০ পেয়ে পাশ করছি। এখন তো আবার সিলেবাসের বাইরের পড়াই বেশি পড়া হয়। ভারত তিনদিকে সমুদ্র ঘেরা। অথচ বেসিক লেভেলের সিলেবাসে সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে কোনও পড়াশোনা নেই। দীর্ঘ ৩,০০০ কিমি হিমালয় পর্বতমালা, কোনও পর্বত বিজ্ঞানের উচ্চবাচ্য নেই সিলেবাসে। নেই নদীবিজ্ঞানের বেসিক কোনও জ্ঞান। নদীতে কেবল বাঁধের বেড়ি পরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন ছাড়া আমরা আর কিছুই শিখিনি। শিখেছি সস্তায় উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ। সেজন্যই দিতে হয় চরম মূল্য। দেয় আমজনতা। আর ‘আপেল’ জনতা নিরাপদে থাকে চিরকালই।

ছোটবেলা থেকে নিজের দেশ, প্রতিবেশী দেশের ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে বেসিক ধারণা গড়ে ওঠেনি। তার কু-ফলাফল হইহই করে জুলাই-আগস্ট সেপ্টেম্বরে পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া! পাহাড় আমাদের কাছে শুধুই বেড়াতে যাওয়ার জায়গা? মগ্ন মৈনাকের কাছে কি আমরা কোনও মগ্নতা শিখব না? সংযম শিখব না? শান্ত স্থিতধী হওয়া শিখব না? কীভাবে যে এই ভুলগুলো সামাজিকভাবে গেঁথে বসেছে, তার কুলকিনারা নেই।
বোধি জ্ঞানের দেশ নেপাল। সেখানেও পাহাড়কে, নদীকে সমীহ করে চলার বোধ, জ্ঞান নেই। তাই নদীর তীর ঘেঁষেই অট্টালিকা নির্মাণ, পাহাড়ের কোলে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি সংখ্যায় মানুষের বসবাস। কোটি কোটি বছর ধরে এই ধরনের হিমবাহ ধস নেমে নেমেই তো সমভূমি তৈরি হয়েছে। আবার হিমবাহ তৈরি হয়েছে পর্বতের নিজস্ব নিয়মে। সাধারণভাবেই নদীর তীর থেকে ন্যূনতম দু’কিমি দূরে বসতি করতে হয়। কে মানে কার কথা!
আসলে আমরা নিজেরা জীবনের কোনোও নিয়মশৃঙ্খলা মানি না বলে, জানতেও পারি না যে, প্রকৃতি নিজস্ব শৃঙ্খলা মেনে চলে। আজকের বিপর্যয় মানুষ পাহাড়ের জায়গা দখল করেছে বলেই তো ঘটেছে। কারণ এই দুর্দম হড়পা বান পাহাড়ের রুটিনগঠন প্রণালী।

কালিদাসের বোকামির গল্পটা থেকে আমরা কোনও শিক্ষাই নিতে পারিনি। যে গাছে বসেছি, সেই গাছের ডালই কাটছি! উন্নয়ন বনাম উষ্ণায়ন বিষয়ে শয়ে শয়ে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা করা ছাড়া ন্যূনতম ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটাইনি। আর রাষ্ট্র তো চলে নিজের মর্জিতে। মানুষের কী সমস্যা হবে, আদৌ মানুষের সেটা দরকার কি না, বিকল্প ব্যবস্থা দিয়ে সমাধান মেলে কি না, এসবের কোনও সমীক্ষা নেই! উন্নয়নের গড্ডালিকা প্রবাহে গা-ভাসানো সব দেশেরই লক্ষ্য। সে দেশে আদৌ সেটা করা যাবে কি না, তাই নিয়ে কোনও উচ্চ পর্যায়ের সমীক্ষা নেই। নেপালও এর ব্যতিক্রম নয়– এখন মনে হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে গিয়ে মানব সম্পদ ধ্বংস করে ফেলছি। ৫,০০০ মানুষের এক লহমায় মৃত্যু অর্থনীতি, সমাজ, পরিবার ,অফিস, আদালত, ব্যবসা বাণিজ্য– সবকিছুর ওপর চূড়ান্ত আঘাত।

আমাদের দেশের কথায় যদি আসি, সদ্য ৮০তম স্বাধীনতা দিবস পার করেছি। একটা প্রশ্ন জাগে মনে, পরাধীন ভারতবর্ষে এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা আমরা কি পেতাম? পাইনি। এত প্রাণ বেমক্কা এভাবে যাওয়ার স্বাধীনতা(?) তখন পায়নি। তখন কেবল প্রকৃত অর্থে সাধুসন্ন্যাসীরাই হিমালয়ে যেতেন। সমস্ত অধ্যাত্ম উন্নতির পরেও মানস সরোবর যাওয়ার মতো ধৃষ্টতা তাঁরা দেখাতেন না। কতখানি আত্মিক উন্নতি ঘটাতে পারলে ওই সব ‘ভার্জিন প্লেস’-এ যাওয়ার কথা চিন্তা করা যায়! শুধু তো ভার্জিন প্লেসের শুচিতা নয়, হিমালয়ের যত ওপরে যাওয়া হবে তত ফ্রি এনার্জি জোন অর্থাৎ প্রকৃতির নিজস্ব বিদ্যুৎ তরঙ্গ অনুভব করা যায়। নেহাত পরনিন্দা পরচর্চা করা মানুষ আমরা। এত এনার্জি কনজিউম করার মতো শক্তি তো আমাদের জন্মায়নি। ছোটবেলা থেকে সেই শুদ্ধ জীবনাচরণের ছিটেফোঁটার সন্ধান জানতে পারিনি, শিখতে পারিনি। অথচ আমরা সবাই মানস সরোবর চলে যাচ্ছি। ঋতু বা সময়ের ন্যূনতম জ্ঞান নেই। বারবার এই সব ধৃষ্টতার শাস্তি পাচ্ছি। কেদারনাথের বিপর্যয় থেকে কোনও শিক্ষা নেই, কেরলের বন্যা থেকে শিক্ষা নিইনি, গত বছরের কেরলের ধস থেকে শিক্ষা নিইনি।
একের পর এক ব্রিজ ভেঙেছে উদ্বোধনের দিন বা পরের দিন বা দু’মাস পরে। ৫০-১০০ মানুষ মারা যাচ্ছেন এক মুহূর্তে। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের মেধা নিয়ে কি প্রশ্ন তোলা যাবে না? এখনও কি আমরা আপস করব মেধার সঙ্গে? কোনও দিক দিয়েই কি আমরা সচেতন হব না?
কিছুই যদি আমাদের হুঁশ না জাগায় ,হুঁশিয়ার না হই, তবে তো এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ হবে!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved