


রোববার.ইন-এ এবার মাঝে মাঝেই গল্পের আসর। তবে, শুধুই রবিবার করে। কেমন লাগছে সেইসব গল্প আপনাদের? জানাতে পারেন [email protected]এই মেল আইডিতে। গল্প পাঠাতেও পারেন আমাদের। গল্পের শব্দসীমা ২০০০। পাঠাতে হবে ইউনিকোড, ওয়ার্ড ফাইলে। সঙ্গে পরিচয় ও ফোন নাম্বার দিতে ভুলবেন না।
“আজ সকালে প্রমিত গেছে ওদের প্রতিবেশী পরমেশবাবুর বাড়িতে। এমনি এমনি। মাঝেমাঝেই প্রমিত ওঁদের বাড়িতে যায়, কারণে অকারণে। পরমেশবাবুর সঙ্গে গল্প করে। ওঁদের গ্রামের খবর নেয়। পাড়ার খবর নেয়। আজ মঙ্গলবার। প্রমিত ওঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখে পরমেশবাবু তখন খাবার টেবিলে বসে লিচু কাটছেন। দূর থেকে দেখে কী ভালো যে লাগছিল প্রমিতের। লাল টুকটুকে লিচু একটা একটা করে হাতে নিয়ে পরমেশবাবু প্রথমেই আলতো করে খোসা ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। তারপর ধারালো একটা ছুরি দিয়ে লিচু ফালা ফালা করে একটি পাত্রে রাখছেন। রসালো লিচু। রস যেন উপচে গড়িয়ে পড়ছে। পরমেশবাবু এত নিখুঁতভাবে কাজটি করছেন যে, সত্যিই তারিফ করতে হয়। খোসা পড়ে থাকছে পাশেই। পাত্রে সাদা শাঁসের লিচুর ফালা। আর বাদামি বিচিগুলো তখন বড় অবহেলায় মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। প্রমিত ভাবে, কাঁঠালের বিচি হলে কি এরকম মেঝেতে গড়াগড়ি খেত? মোটেও না। তার ভাজাটাও তো খেতে খুবই সুস্বাদু। প্রমিত শোনে, পরমেশবাবুদের বাড়িতে আজ দুপুরে কেউই ভাত খাবেন না। আজ জয় মঙ্গলবারের ফলার। জৈষ্ঠ্য মাসের সব মঙ্গলবারেই এ বাড়ির এই রীতি বহুদিনের। দই কলা আর আম দিয়ে চিঁড়ের ফলার। প্রমিতকে কাছে ডেকে পরমেশবাবু বলে ওঠেন– প্রমিত, বোসো, বোসো। ভালো দিনেই এসেছ। আর এসেই পড়েছ যখন, আজ দুপুরে আমাদের সঙ্গে বসে ফলার খেয়ে, তবে যেও কিন্তু।
এ পাড়ায় প্রমিতের একমাত্র পরিচিতি, সে একজন পরোপোকারী সুদর্শন টগবগে যুবক। পরমেশবাবুর সঙ্গে ওর একটু ঠাট্টা-ইয়ার্কিরও সম্পর্ক আছে। প্রমিত কিন্তু জানেই না, জয় মঙ্গলবার কী, কেন! ওদের বাড়িতে তো এসব কেউ মানেই না। জানেও না। যেমন পরমেশবাবুও জানেন না প্রমিত কী করে! প্রমিতের রোজগার কী! পাড়ার ছেলে, যে কোনও কাজে একবার কেউ বললেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সময়ে অসময়ে বাইক-সহ পাওয়া যায় তাকে। হোক না তার বেশভূষা একটু অন্যরকম। চকরা বকরা। লালচে চুল। কানে দুল ঝুলছে। ডান হাতে বালা। গলায় মোটা সোনার চেন। ব্যবহারে সে কিন্ত অতীব ভদ্র। বড়দের সমীহ করে, সম্মান দেয়। কথায় কথায় ঢক ঢক করে গুরুজনদের প্রণামও করে। পরমেশবাবুর নিখুঁতভাবে লিচু কাটা দেখে প্রমিত বলে ওঠে,
–আপনি কত কী জানেন মাইরি?
–এ আর এমন কী! তুমিও তো অনেক কিছুই জানো। কম্পিউটার জানো। ল্যাপটপে কাজ করতে পারো। আমি তো পারি না।
–পরমেশবাবু, আপনি আর কী কী পারেন, বলবেন একটু?
–আমি অনেক কিছুই পারি। সবজি কাটতে পারি, ঘর মুছতে পারি। এমনকী রুটি বেলা, পোস্ত বাটা, মোচা কাটা সব পারি। কেবল তোমরা ওই যাকে ‘আই টি’ বলো, সেটা একেবারেই না। তুমি তো শুনি আবার না কি কবিতা-টবিতা লেখো।
–ছাড়ুন ছাড়ুন। লেখার কথা বাদ দিন। লেখা কি আদৌ একটা কাজ হল না কি মশাই? ওসব আপনারা বলেন।
ঠিক এ সময়ে এই গল্পের তৃতীয় প্রধান চরিত্রের প্রবেশ পরমেশবাবুর বাড়ির ভিতর, একেবারে হঠাৎই। তার নাম বিয়াস। সম্পর্কে পরমেশবাবুর এক নাতনি, ভাগ্নীর একমাত্র মেয়ে। দুধে-আলতা গায়ের রং। চোখে সানগ্লাস। ছিপছিপে, বা বলা ভালো, জিরো ক্যালরির দেহে হাল্কা গোলাপি টপ, পরনে ডার্ক ব্লু ফেডেড নরম জিনস। উচ্চতা ঠিক রাখতে পায়ে উপযুক্ত হাই-হিল জুতো। নিখুঁতভাবে ছাঁটা সোনালি চুলে সাদা ওড়না অর্ধেক জড়ানো। শর্ট গোলাপি টপ ছাপিয়ে তার উন্মুক্ত যৌবন যেন সর্বদাই কাউকে না কাউকে ডাকে। ছোট্ট একটা লাল ট্রলি গড়িয়ে তার এই হঠাৎ প্রবেশে গোটা বাড়িটা নিশ্চুপ আর যেন ঝলমল করে উঠল। পরমেশবাবু এক লহমা আড় চোখে তাকিয়ে দেখে– প্রমিত, বিয়াসের মুখ থেকে চোখ আর ফেরায় না বললেই চলে। কালো চশমা, ডান হাতে চোখ থেকে খুলে বিয়াস বলে ওঠে, ‘হাই দাদাই!’
প্রমিতের দিকে তাকায় না সে।
পরমেশবাবু রসে টইটম্বুর কাটা লিচুগুলো থালায় ঢাকা দিয়ে রেখে প্রমিতের দিকে তাকিয়ে বলে:
–তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। আমাদের নাতনি। কুইন অব বীরভূম। এবার এ শহরে ওর আরও বড় পরীক্ষা হবে। আর অ্যাড এজেন্সিগুলো তো ওর পিছনে লেগে আছে। আজ এই ইনডোর শুটিং তো কাল ওই আউটডোর, চলছেই। আমাদের বাড়িতে ও এখন কিছুদিন থাকবে। অনেকগুলো ব্র্যান্ডের শুটিং আছে পরপর। তারপর ওই যে বললাম, ওর বড় পরীক্ষার লড়াই। ক’দিন পরেই।
প্রমিত আবার ভালো করে বিয়াসের দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। বিয়াসের হাবেভাবে কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়াই নেই। তাকায় না পর্যন্ত ওর দিকে। বরং তার সম্পর্কে দাদাই এত কথা কেন ছেলেটাকে বলছে– সে ভেবে পায় না! সে সহসা কাউকে কিছুই না বলে ভেতরের ঘরে চলে যায়। ‘দিদা… দিদা…’ ডাকতে ডাকতে।
প্রমিত পরমেশবাবুর বাড়ির মঙ্গলবারের ফলারের জন্য আর অপেক্ষা করে না। হতচকিতে বলে:
–আজ থাক পরমেশবাবু। আর একদিন খাব। বেলা হয়ে গেছে। আজ চলি। কেমন?
সবটা যেন কেমন গুলিয়ে গেল। না হলে প্রমিতের ফলার খাওয়ার ইচ্ছেটা তো ছিলই। প্রমিত চোয়াল শক্ত করে। চলে যেতে উদ্যত হয়। পরমেশবাবু কিছুটা বাধা দিতে গিয়েও দেয় না। প্রমিত কি কিছুটা অপমানিত হল? বিয়াস ওর দিকে একটু তাকালও না বলে? পরমেশবাবু কিছুটা যেন অস্বস্তিতে।”
একটা গল্পের এইটুকু একটানা ল্যাপটপের স্ক্রিনে লিখে নিখিলেশ থেমে গেল। শুধু থেমে গেল বললে কিছুই বলা হয় না। নিখিলেশ লিখতে বসেছে গল্প। কয়েকদিন আগেই একটি পত্রিকার ডিজিটাল ভার্সনের জন্য একটা গল্প চেয়ে তরুণ সম্পাদক পৃথ্বীপতি সেনগুপ্ত সাত সকালে ফোন করল। একথা সেকথার পর বলল:
–নিখিলেশদা একটা গল্প দেবেন? আমাদের ডিজিটাল ভার্সনের জন্য? সাতদিনের মধ্যে দিতে হবে। শব্দসীমা ১৫০০ । আর একটা কথা আছে, গল্পটায় যদি কোনও একজন লেখকের একটু কিছুর ছোঁয়া থাকে, ভালো হয়। ব্যস, এইটুকুই বলার ছিল। তাহলে, পাচ্ছি তো দাদা?
একটানা পৃথ্বীপতি বলে গেল, নিখিলেশকে কিছু বলতে না দিয়ে। নিখিলেশ জানে ১৫০০ শব্দে গল্প লেখাটা বেশ চাপের। কিছুতেই পারা যায় না। তবু সম্পাদকের অনুরোধ বলে কথা। চেষ্টা করে একবার দেখা যাক। এই ভেবে দুপুরেই নিখিলেশ লিখতে বসে যায়। আর তরতর করে লেখা এগতে থাকে। কিন্তু হল কী, ওই ওপরের অংশটুকু লেখার পর ওই ‘অস্বস্তিতে’ এসে হঠাৎ থেমে গেল নিখিলেশ। এমন থেমে গেল যে, আর এগনো গেল না। একেবারে ‘নট নড়নচড়ন’ যাকে বলে আর কী। একদিন, দুদিন, তিনদিন চলে গেল। চুপ করে ল্যাপটপের সামনে বসেই থাকল নিখিলেশ। কেবল ভাবল, এবার কোনদিকে যে যাবে লেখাটা? বা যেতে পারে। বা কোনদিকে নিয়ে যাওয়া যায়।
নিখিলেশ সাধারণত খুব একটা কিছু ভেবে যে লিখতে বসে, তা কিন্তু নয়। লিখতে শুরু করে সে সামনে দেখতে পাওয়া কোনও একটা দৃশ্য, কারওর বলা কোনও কথা, বহুদিন আগে শোনা কোনও গলার স্বর, ডায়লগ এইসব দিয়ে। আর পুরোনো স্মৃতি– নিখিলেশকে খুব টানে। সে মনে করে, স্মৃতিই যেন তার কাছে সব। এত বছরের জীবনে কত যে স্মৃতি– সুখের দুঃখের। মুখে বলে বা লিখে যেন তা শেষ হয় না। হুবহু সব মনে পড়ে নিখিলেশের। আর তা থেকে গল্প আসে। গল্প আসতেই থাকে। এত যে স্মৃতি, তার মাথায় থাকে, মাঝেমাঝে মনে হয়, এত স্মৃতির স্টোররুমটা কোথায়? কে জানে? সে তো আর চোখে দেখা যায় না।
এত গল্প লিখেছে, সংখ্যাটা তা প্রায় ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। এমনটা তো কখনও হয়নি। কী যে হল এবার? গল্পটা লিখতে গিয়ে কোনওভাবেই সে আর এগতে পারে না। এ যেন সেই দরজা বন্ধ করে ছিটকিনিটা উপরের দিকে উঠিয়ে কেউ একজন কেবল ভেবেই চলেছে, ছিটকিনিটার গোলাকার গোড়াটা এবার কোনদিকে সে ঘুরিয়ে রাখবে। বাঁ, না কি ডান? নিখিলেশেরও অবস্থা কতকটা ওরকমই দাঁড়ায়।
চুপ করে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বাংলা সাহিত্যে পড়া তার প্রিয় গল্পগুলো মাঝেমাঝে উঁকি মারতে থাকে। আর একবার কি সে সব পড়ে দেখবে না কি? পড়লে যদি আবার একটু এগনো যায়। শেষ পর্যন্ত, সে কি না লিখতে পারছে না! কী যে এক অস্বস্তি! ভাবা যায় না। তবে আর নয়। ঠিক করল, আর কিছুতেই সে গল্প লিখবে না। প্রমিস! ঘাট হয়েছে। শুধু এবারের মতো কোনওভাবে যদি উতরে যাওয়া যায়! নিখিলেশ এইসব ভাবতে থাকে। গল্পের সম্ভাব্য পরিণতিগুলো এক নজরে একবার পরপর আনার চেষ্টা করে সে। কত দিক যে ভাবে! তারপরেও ভাবে আরও কত দিক যে রয়ে গেল। কতটুকুই বা সে ভাবতে পারল। পয়েন্টগুলো ল্যাপটপে লিখে রাখার চেষ্টা করল এক-দুই করে। এসব করতে করতে যদি আবার শুরু করা যায়। কেবলই ভাবে, কী কী হতে পারে এই গল্পের পরিণতি! দেখা যাক না!

১
প্রথম দর্শনেই প্রমিত বিয়াসের প্রেমে পড়ে যায়। তাড়াহুড়ো কিছুতেই নয়। পরদিন থেকে ধীর পায়ে এগনোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়াসের কিন্তু একটুও আগ্রহ নেই। তবু রাগ-অনুরাগের পর একটা নিটোল প্রেমের গল্প শেষ পর্যন্ত তো হতেই পারে।
২
ছেড়ে দেওয়ার পাবলিক তো নয় প্রমিত। আবার পরদিনই সে পরমেশবাবুর সঙ্গে দেখা করার নামে ঘ্যানঘ্যান করে বিয়াসের সঙ্গে ভাব জমাতে চায়। ব্যাপারটা সহজ করে নিয়ে তার এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে। হয় না। কিছুতেই হয় না। বিয়াস তো বেঁকে বসে আছে। তবু একটা ব্যর্থ প্রেমের গল্প ফাঁদাই যায়।
৩
বিয়াসের প্রথম দর্শনে সেই যে বিকর্ষণটা হল, তা কিন্তু থেকেই গেল। কিছুতেই প্রমিতের ঘনিষ্ঠ সে আর হয়ে ওঠে না। হতে চায়ও না। সে তার পার্সোনালিটি দেখাতে চায়। দূরত্ব বজায় রাখে। গাম্ভীর্য রাখে। ছেলেটা কেমন যেন। কিম্ভূতকিমাকার।
৪
ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প বলে, ন্যাগিং করেও বিয়াস যখন কিছুতেই প্রমিতের নাগালে আসে না, গল্পে শেষ পর্যন্ত একটি ধর্ষণও দেখানো যায়। এমনকী ধর্ষণ শেষে বিয়াসের ডায়রিতে ওয়ান লাইনার একটা কমেন্ট (‘সব পুরুষরাই শেষ পর্যন্ত আসলে এক একজন ধর্ষক’) লেখা দেখিয়ে মোটা দাগের একটা ভ্যাদভেদে গল্পও লেখা যায়।
এইভাবে পয়েন্টগুলো এক-দুই করে লিখতে লিখতে হঠাৎ তার মাথায় একটা ক্লিক করল। নিখিলেশের হঠাৎ একটা গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। আরে আরে, নামটা কী যেন ছিল, ‘সোনালী দিন’? পুরোটা কিন্তু এখন আর ঠিক মনে পড়ে না। তবে লেখকের নাম কিন্তু এক ঝটকায় মনে পড়ে যায়। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। এক রোববার দুপুরে নিখিলেশ গল্পটা পড়েছিল দৈনিকের পাতায়। প্রখর রৌদ্র দুপুরের দাবদাহে জনমানবহীন এই শহরে ট্রাম চলেছে ঢিসিয়ে ঢিসিয়ে। নিস্তব্ধ দুপুরে ঝনঝন করে একটি ট্রাম স্টপেজে এসে দাঁড়াতেই, এক অসামান্য সুন্দরী যুবতী বাতাসে ওড়া তার মাথার সিল্কি চুল সরিয়ে, শাড়ির কুঁচি তুলে ধরে ট্রামে উঠল। কী আত্মবিশ্বাস তার চলাফেরায়, চোখেমুখে। ট্রামটা মুহূর্তের মধ্যে যেন ঝলমল করে ওঠে। ওই স্টপেজে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক প্রৌঢ়। তিনিও উঠলেন ট্রামে। যুবতী কয়েক স্টপ পরে নেমে গেল। দেখাদেখি প্রৌঢ়ও নেমে গেলেন। প্রৌঢ় সুন্দরী যুবতীকে যেন গোপনে মন ভরে দেখছেন। দেখে যাচ্ছেন। সেই প্রখর রৌদ্রে আস্ত একটা দুপুর কেটে যেতে যেতে প্রৌঢ় যুবতীকে অনুসরণ করে চলেছেন অনেকটা দূরত্ব পর্যন্ত। তারপর একটা সময় যুবতী কোথাও পৌঁছে অন্তরালে চলে যায়। খুঁজে পাওয়া যায় না আর। প্রৌঢ় ফিরে আসেন। প্রবল মধ্যাহ্নে একজন যুবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে অন্য এক অসমবয়সীর এই অনুসরণ, শুধু এই নিয়েই সম্ভবত গল্পটা ছিল। সবটা মনেও পড়ছে না। কিছুটা তার ভুল হতে পারে। কিছুটা তার কল্পনা। কিন্তু লেখকের কী মুনশিয়ানা! জাস্ট, ভাবতে পারে না এখন নিখিলেশ। তখনও পারেনি, আজও পারল না।
নিখিলেশ গল্পটা পড়ে তখন এতটাই মুগ্ধ হয়ে যায় যে, একবার খোঁজ-খবর করে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর সঙ্গে দেখা করতে চলে যায় তাঁর পিকনিক গার্ডেন্সের ছোট্ট ফ্ল্যাটে। বাগমারির বস্তি ছেড়ে তিনি তখন চলে এসেছেন এই ফ্ল্যাটে। কথায় কথায় নিখিলেশ তোলে গল্পটির প্রসঙ্গ। নিখিলেশ জিজ্ঞেসও করে বসে:
–আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না। একটা কথা যদি জিজ্ঞেস করি। আপনাকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখায় এরকম পড়েছি, আপনি না কি রাস্তায় একসময় সুন্দরী মেয়েদের দেখতে পেলে অনেকক্ষণ অনুসরণ করতেন? কথাটা কি ঠিক?
শুনে একেবারে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। প্রসঙ্গটি সটান উড়িয়ে দিয়ে তিনি কেবলই হা হা করে হেসে প্রসঙ্গ পালটান। বলেন:
–তাই না কি? সুনীল পারেও সব…। ছাড়ুন ছাড়ুন ওসব।
উত্তর শুনে নিখিলেশ সেদিন চুপ করে যায়। আর আজ অনেকদিন পর অসমাপ্ত গল্পটা শেষ করতে গিয়ে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা সে যেন হঠাৎ দেখতে পায়। ওই গল্পের ছায়ায় যদি তার এই গল্প এগয়। অসুবিধা কী! যাকে কেউ ঠিক কপি-পেস্টও বলতে পারবে না। টোকাটুকি যাকে বলে, মোটেও তা হবে না। তাছাড়া, কবে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী কোথায় কী লিখেছেন, কেউ এতদিন পরে আর তা মনে রেখেছে না কি?
এখন এ শহরে ট্রাম না থাকলেও, প্রবল মধ্যাহ্ন তো ভীষণভাবে রয়েইছে। দুপুরের রোদে সুন্দরী বিয়াসের নানা শুটিং বা বিউটি কমপিটিশনে যাওয়ার পথে পথে তার ভাড়া করা ক্যাবের পিছু পিছু প্রমিত আস্ত একটা ষাঁড়ের মতো তার সাইলেন্সরহীন বাইকটা নিয়ে কিছুদিন নানা পরিস্থিতিতে অনুসরণ করতে থাকুক না। শুধুই অনুসরণ। যা গল্পের একটা মোচড় হয়ে যেতে পারে। জমিয়ে লিখতে পারলে, আর কিছুই লাগবে না। গল্প জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। শেষও হবে। ব্যস। আর তো চিন্তা নাই রে!
আহ্, ক’দিন পর আজ নিখিলেশকে খুব ফুরফুরে লাগছে। ল্যাপটপ খুলে সে স্ক্রিনে চোখ রাখে। তার গল্প শেষ হল বলে!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved