Through SIR: A Short Story from Bengal। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুধাময়ীর পরিচয়পত্র

রোববার.ইন-এ এবার মাঝে মাঝেই গল্পের আসর। তবে, শুধুই রবিবার করে। কেমন লাগছে সেইসব গল্প আপনাদের? জানাতে পারেন [email protected]এই মেল আইডিতে। গল্প পাঠাতেও পারেন আমাদের। গল্পের শব্দসীমা ২০০০। পাঠাতে হবে ইউনিকোড, ওয়ার্ড ফাইলে। সঙ্গে পরিচয় ও ফোন নাম্বার দিতে ভুলবেন না। 

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১৭:৩১   
Facebook WhatsApp Messenger

সুধাময়ীর নামে সমন এসেছে। পুলিশি সমন নয়, সুধাময়ী যে সুধাময়ীই এবং সে যে একজন ভারতীয় ভোটার, তা প্রমাণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের সমন। অশীতিপর সুধাময়ী রুক্ষ্ম বলিরেখাময় চেহারা নিয়ে তার বস্তির ঘরে পুরনো বড় কালো ট্রাঙ্ক খুলে নিজের কাগজপত্র খোঁজে। সুধাময়ী শিক্ষিত। ম্যাট্রিক পাস না-করলেও সে স্কুলে পড়েছিল। ইংরেজি শিখেছিল তাদের ডাকসাইটে প্রধানশিক্ষিকা কমলা সেনের কাছে। সে স্কুল অবশ্য এখন আর নেই। সরকারি স্কুলের বন্ধের বাজারে কবেই তাতে তালা পড়েছে। অতএব স্কুলে গিয়ে কাগজ সন্ধানের সম্ভাবনাও কিছু আর অবশিষ্ট নেই। সুধাময়ী ট্রাঙ্ক হাতড়ায়। তার ৭০ বছরের স্মৃতির মণিমঞ্জুষা রয়েছে এই ট্রাঙ্কে। তার জন্ম কত সালে জানে না সুধাময়ী। তবে আন্দাজ ১০-১২ বছর বয়সে বাবা-মা ভাই-বোনের সঙ্গে এদেশে এসে দমদমের উদ্বাস্তু কলোনিতে বাস করতে শুরু করে। ছোট বোনটা কলেরায় মরেছিল। তার একটা ছিটের ফ্রক এখনও রাখা আছে ট্রাঙ্কে। ভাইটা বদসঙ্গে পড়ে বখে গিয়েছিল। গুলতিটা নিয়ে এসেছিল ভাই। সেটাও সুধাময়ীর ট্রাঙ্কেই আছে। ভাই-বোন জীবনসংগ্রামে হেরে গেলেও হার মানেনি সুধাময়ী। সারাদিন অসুস্থ, রুগন মায়ের সেবা, ঘরের কাজের পাশাপাশি সে ভর্তি হয়েছিল কলোনির মেয়েদের স্কুলেও। মা সারদা বালিকা বিদ্যালয়। খড়ের চালে মাটির বাড়ি। দেওয়ালে ছাত্রীদের দেওয়া আলপনা। পরে পাকা বাড়ি হয়ে নামও বদলে গিয়েছিল স্কুলের। 

’৫৫ সালে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল সুধাময়ী। স্কুলের খাতায় তার নাম উঠেছিল। সুধাময়ী দাস। ম্যাট্রিক পরীক্ষার অ্যাডমিট খুঁজে পায়নি সুধাময়ী। তার ট্রাঙ্কে মায়ের ছেঁড়া শাড়ি, বাবার পুরনো পাঞ্জাবির নিচে, জোড়াতালি দেওয়া কাঁথাকানি সরিয়ে পুরনো খবরের কাগজ আর দরকারি-অদরকারি চিঠি-কাগজপত্রের মাঝে। তবু সে হাল ছাড়েনি। আবার সব নামায়, খোঁজে। হাল আসলে সে কোনও দিনই ছাড়েনি। তবু জীবন তাকে বারেবারেই পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। আসলে জীবনকে সে তো নির্মাণ করতে পারেনি কোনও দিন। জীবন নিজেই তাকে বারেবারে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চিতের দিকে, অনিশ্চয়তার দিকে। সে শুধু তার সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করেছে। এক অনিশ্চয়তা ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছে গিয়েছে আর এক অনিশ্চিতের মুখে। এ বিষয়ে আপাত নির্বিকার সুধাময়ী শুধু নিজের মতো করে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার আর বেঁচে থাকার পথ খোঁজে অথবা পথ কেটে বের করে। আজও সে আসলে সেই পথই খুঁজছিল। এই বিপদ থেকে উদ্ধারের।

ম্যাট্রিক পাস না-করতে পেরে হালতু পলিটেকনিকে হাতের কাজ শিখতে ভর্তি হয়েছিল সে। পাসও করেছিল পরীক্ষায়। কিন্তু চাকরি পায়নি। কারণ জীবন রূপকথা নয়। অন্তত সুধাময়ীর জন্য তো নয়ই। কলোনিরই ছেলে বাপ-মা মরা সুবোধের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। সুবোধ ছিল কলোনির ছেলেদের স্কুলের মাস্টার। হয়তো একটা রূপকথার জন্ম হলেও হতে পারত। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যেই সুবোধ মরে গেল টিবিতে। তারপরে একে একে মরে গেল রুগন মা আর বিষণ্ণ বাবা। ভাইটা কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে! হারাধনের শেষ ছেলেটির মতো সুধাময়ী কিন্তু মরল না। সুধাময়ী মরতে কিংবা হারতে জানত না বলেই হয়তো বেঁচে গেল আধপেটা খেয়ে না-খেয়ে। কলোনির লোকেদের চিঠি লিখে দেওয়া, ছেঁড়া জামাকাপড় সেলাই করা, এমনকী, কলোনির বাইরে বেরিয়ে পাকাবাড়িতে রান্নার কাজ নেওয়া। এভাবেই সুধাময়ী বেঁচে রইল।

সুধাময়ীর চোখের সামনেই কলোনিও ধীরে ধীরে বদলে গেল। বাম সরকারের আমলে মাটির বাড়ি ভেঙে সব পাকা ঘর উঠল, আবার সরকার বদলে গেলে সেই পাকা ঘর ভেঙে বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি। এই আপাত উন্নয়নে সুধাময়ীরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কবে যেন কলোনি ছেড়ে তার ঠিকানা হয়েছে পাশে গড়ে ওঠা বস্তিতে। ইতিমধ্যে তার যৌবন অস্তমিত হয়েছে। চশমার কাচ পুরু হয়েছে। শরীর ক্রমশ শুকিয়ে দড়ি পাকিয়ে উঠেছে। চুলগুলো শনের নুড়ির মতো। ইদানীং তেমন কাজও করতে পারে না সে। বয়সের ভারে শরীর ঝুঁকে পড়েছে। চোখেও প্রায় দেখতে পায় না। চেয়েচিন্তে দিন চলে। তবু কী আশ্চর্যের মতো বেঁচে আছে, বেঁচে থাকে সে!

লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে পলিটেকনিকে গিয়েছিল সে। কিন্তু এতকাল আগের কাগজ সেখানেও পাওয়া যায়নি। বা সুধাময়ীর কাগজ খুঁজতেই হয়তো আগ্রহ দেখায়নি কেউ। তাই আবার ট্রাঙ্কের কাছেই ফিরে এসেছে সুধাময়ী। প্রত্যেকটা কাগজ আলোর দিকে তুলে ছানিপড়া চোখে বোঝার চেষ্টা করে। তারপর আরেকটা কাগজ দেখে, তারপর আরেকটা। সুধাময়ী কিছুতেই খুঁজে পায় না তার আমিত্বের প্রমাণ। 

শেষ পর্যন্ত একটা প্রায় আবছা হয়ে আসা জেরক্স খুঁজে পায় সে। তার পলিটেকনিক পাসের সার্টিফিকেটের ফোটোকপি। সেটা হাতে নিয়ে প্রায় যুদ্ধজয়ের ভঙ্গিতে ট্রাঙ্ক বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। তার এই যুদ্ধজয়ে কোনও আনন্দ নেই, আছে শুধু বেঁচে থাকার একটা আপাত নিশ্চিন্ততা। এই কাগজ নিয়ে কাল সে যাবে বিএলও-র কাছে। দেখাবে যে সে সুধাময়ী দাস এবং সে ভারতীয় নাগরিক। 

বিএলও সুধাময়ীর দিকে খানিক তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকান। তারপর নুয়ে পড়া শরীরটার দিকে ফর্মটা এগিয়ে দিয়ে বলেন, সব ঠিক আছে। নিন, এবার টিপছাপ দিন। মুহূর্তে সোজা হয়ে যায় সুধাময়ী। তার চোখদুটো জ্বলে ওঠে। তারপর বিএলও-র দিকে তাকিয়ে দৃঢ়ভাবে বলে, টিপছাপই যদি দেব, তবে লেখাপড়া শিখেছি কেন? বিএলও নড়েচড়ে বসেন। তারপর কথা না-বলে পেনটা এগিয়ে দেন সুধাময়ীর দিকে। কলমটা হাতে নিয়ে সে মুক্তাক্ষরে ইংরেজিতে লেখে, সুধাময়ী দাস। 

তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে বিএলও-র অফিস থেকে। সে জানে না এরপরে ঠিক কী হবে। 

শুধু সামনের দিকে হাঁটতে থাকে সুধাময়ী। তার অনন্ত জীবনীশক্তি নিয়ে।

অলংকরণ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

BengalStories GroundReality HumanStories LiteraryFiction Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar ShortStory WestBengal

Share this article on