death of star football player jayden adams | Robbar
Robbar
  • ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬

স্বপ্নের অফসাইড

জেডেন অ্যাডামস। ২৫ বছর। লাজুক চাহনি। প্রচারবিমুখ। মাঠে ও মাঠের বাইরে, স্বভাবে ও পাসিংয়ে– স্থির। দূরদর্শী। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ফুটবল দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। দেশেরই অন্যতম জায়ান্ট ক্লাব, মামেলোডি সানডাউন্সে সই করেছিলেন গত বছর। তারপর দুই মরশুমে দুই গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি। সাউথ আফ্রিকান প্রিমিয়ারশিপ এবং সিএএফ (CAF) চ্যাম্পিয়ান্স লিগ। তবু সে দেখিল কোন ভূত?

Published by: Robbar Digital

Posted:July 16, 2026 8:58 pm | Updated:July 17, 2026 11:37 am  
Facebook WhatsApp Messenger

‘প্রতিদিন প্র্যাকটিসে নামার আগে, মেয়ের মুখটা একবার দেখি। ভিডিও কলে। মায়ের সঙ্গে কথা বলি। বাবার সঙ্গেও। আমি জোর পাই। ট্রেনিং গ্রাউন্ডে যতটুকু সাধ্য, উজাড় করে ফুটবল খেলি তারপর। কারণ জানি, বাকিটা ফুটবল সামলে নেবে…’

অনায়াসে বলেছিলেন জেডেন অ্যাডামস। ২৫ বছর। লাজুক চাহনি। প্রচারবিমুখ। মাঠে ও মাঠের বাইরে, স্বভাবে ও পাসিংয়ে– স্থির। দূরদর্শী। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ফুটবল দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। দেশেরই অন্যতম জায়ান্ট ক্লাব, মামেলোডি সানডাউন্সে সই করেছিলেন গত বছর। তারপর দুই মরশুমে দুই গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি। সাউথ আফ্রিকান প্রিমিয়ারশিপ এবং সিএএফ (CAF) চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। তবু সে দেখিল কোন ভূত?

zoom
জেডেন অ্যাডামস

দক্ষিণ আফ্রিকা নক-আউট পর্বে কোয়ালিফাই করেছিল, ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম! আফ্রিকা আবেগে উচ্ছ্বাসে উদ্যম। মনে পড়ছিল, ২০১০ ফুটবল বিশ্বকাপের কথা। জোহানেসবার্গ স্টেডিয়ামে ওপেনিং ম্যাচ। মেক্সিকোর বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গোল। ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি বলছিলেন: ‘গোল বাফানা বাফানা! গোল ফর সাউথ আফ্রিকা! গোল ফর অল আফ্রিকা!’ জেডেন অ্যাডামস নিশ্চয়ই এ-ধারাভাষ্য শুনেছিলেন। ভেবেছিলেন, সমগ্র আফ্রিকাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। বহন করবেন। আর বলেছিলেন:

‘আমার আল্টিমেট গোল, ইউরোপে ফুটবল খেলব। গায়ে থাকবে লিভারপুলের জার্সি।’

অথচ নক-আউট পর্বে, কানাডার বিপক্ষে ৯০ মিনিট বেঞ্চে বসে রইলেন। ভীষণরকম একা। একজন ফুটবলার যে ভিতরে ভিতরে ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে, টের পাইনি। আসলে বুঝেছি হাজার হাজার আলো। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। দুনিয়া-কাঁপানো স্কিল। সংবাদপত্রে হেডলাইন। অহর্নিশ হাসিমুখ আর খ্যাতির তুঙ্গে! বুঝেছি বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই, একের পর এক নক্ষত্রের জন্ম। নক্ষত্রের মৃত্যু। কিংবা মরে যেতে যেতে মাত্র একবার জ্বলে ওঠার মতো জ্বলে ওঠা!

কিন্তু এ-সবই তো আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু তাবড় তাবড় ফুটবলারের নিয়ে প্রত্যাশা থাকবে না? আমরা কি চাইনি নেইমারের হাতে বিশ্বকাপ ঝলমল করে উঠুক? সেই চাওয়া নিয়ে কোনও সংশয় নেই। কিন্তু ভেবে দেখেছেন নেইমারের ইনজুরির ইতিহাস? কখনও মেটারটার্সাল ইনজুরি। কখনও হাঁটু, কখনও গোড়ালিতে সার্জারি। সেই অসহ্য যন্ত্রণা আর বিষাদের সিকিভাগও আমাদের ছুঁয়ে যায়নি। ব্যথাতুর সেই মনেরও অংশীদার হতে চাইনি আমরা। পাশাপাশি শেষ ষোলোয়, সুইজারল্যান্ড বনাম কলোম্বিয়া ম্যাচ গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। কলোম্বিয়ান মিডফিল্ডার জ্যামিন্টন ক্যাম্পাজ পেনাল্টি মিস করলেন। এইবারের মতো বিদায় নিল কলোম্বিয়া। পার্ট অফ দ্য গেম! কিন্তু দেশে ফিরলেই ক্যাম্পাজকে হত্যা করা হবে– এমন হুমকি উপচে পড়ল সোশাল মিডিয়ায়। এরপর একজন ফুটবলার কতখানি সুস্থ থাকতে পারবেন মানসিকভাবে? অর্থাৎ, মাঠের বাইরেও নিরন্তর এক স্ট্রাগল চলে। যেটা সম্পূর্ণ অদেখা।

zoom
কলোম্বিয়ান মিডফিল্ডার জ্যামিন্টন ক্যাম্পাজ

মেক্সিকোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে, সম্পূর্ণ ৯০ মিনিট খেলেছিলেন জেডেন অ্যাডামস। দক্ষিণ আফ্রিকা সেই ম্যাচ হেরেছিল ১ গোলে। পরবর্তী ম্যাচে, অস্বাভাবিক শান্ত আর অসাড়। একটা পারিবারিক শোক। ঠাকুরমা, মারিয়ান্না মারা গিয়েছেন কিক-অফের আগে। হাফ টাইমে উঠে গেলেন। তৃতীয় ম্যাচে প্রথম একাদশে সুযোগ পেলেন না। ৮০ মিনিটে মাঠে নামলেন। শেষ ম্যাচে, অব্যবহৃত! একজন অ্যাথলিটের মনে, সবটুকু উজাড় করেও রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকার অভিঘাত দুর্দান্ত। ইংল্যান্ডের উঠতি সুপারস্টার জুড বেলিংহ্যাম একটি সাক্ষাৎকারে বলছেন:

‘‘কিছু সময়, ভীষণ ভালনারেবেল হয়ে যাই। নিজের পারফরম্যান্সকেই সন্দেহ করি। এবং আমার প্রয়োজন হয় একজন মানুষ। যে মানুষের সামনে আমার ‘মাচো অ্যাথলিট’ ইমেজ থাকবে না। থাকবে একজন রক্তমাংসের মানুষ। সকলেই বলে, আই ডোন্ট নিড এনিওয়ান। কিন্তু সত্যি কথা হল, আমার প্রয়োজন হয়। জানি, আমার প্রতিটা পাস নিখুঁত হবে না। প্রতিটা ম্যাচে গোল পাব না। জিতবও না হয়তো। এহেন বিষয় মেনে নিলে, তুমি পারফেক্ট!’’

zoom
জুড বেলিংহ্যাম

মনে পড়ছে, উরুগুয়ের ফুটবলার অ্যাবডন পর্তে। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। ক্লাব ডে ন্যাশিওনালের জার্সিতে খেলা শুরু ১২ মার্চ, ১৯১১। তারপর থেকে, ক্লাব-ক্যাপ্টেন। যেমন বল কন্ট্রোল, তেমন রক্ষণভাগে আধিপত্য বিস্তার। ‘ন্যাশিওনাল’ ক্লাবে পর্তে খেললেন ২০৭টি ম্যাচ। ট্রফির সংখ্যা, ১৯। একজন ফুটবলারের রক্ত ঘাম আর মন মিশে গেল ন্যাশিওনালের খ্যাতি ও ভিত্তিতে। ততদিনে উরুগুয়ের জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন পর্তে। কোপা আমেরিকা খেলেছেন।

তারপর এল ১৯১৮। মরশুম শুরুয়াতের আগে ক্লাব কমিটি সিদ্ধান্ত নিল, অ্যাবডন পর্তে প্রথম একাদশে খেলবেন না। রিজার্ভ বেঞ্চে বসবেন। পরিবর্তে খেলবেন আলফ্রেদো জিবেচি। একজন ফুটবলার ভেতরে ভেতরে ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। আমরা টের পাচ্ছি না। চার্লি এফসির বিপক্ষে ৩-১ গোলে জেতার পরে, ন্যাশিওনালের হেড কোয়াটার্সে যাচ্ছেন অ্যাবডন পর্তে। ম্যাচে দুরন্ত পারফরম্যান্স। হেড কোয়াটার্স থেকে যখন বেরিয়ে এলেন, রাত একটা। তারপর ন্যাশিওনালের মাঠে, মাঠের একদম কেন্দ্রে, অ্যাবডন একা। অ্যাবসোলিউট। একটা গুলির শব্দ! মাথার ডানপাশে। বাকিটা ফুটবল সামলে নেয় না কোনওদিনই!

zoom
অ্যাবডন পর্তে

২০২৫। দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাফকন (AFCON) স্কোয়াড থেকে বাদ পড়লেন জেডেন অ্যাডামস। কিন্তু চিৎকার করে বলছেন, ‘আই উইল স্টার্ট এভরি গেম!’ বন্ধুরা বলছে, ‘তুই ইউরোপে চলে যা! এখানে কেন খেলছিস?’ তবু কেপ টাউনের বাড়িতে, প্র্যাকটিস করেছেন জেডেন। নির্জনে। কাউকে বলতে পারছেন না, রিজার্ভ বেঞ্চে বসার যোগ্যতাও সে অর্জন করতে পারেনি। মাথার চুল কামিয়ে ফেললেন। খেলা বদলে গেল। পাসিং দক্ষতা বাড়ল। শাণিত। দূরদর্শী। অভিজ্ঞ। নিজেই নিজেকে বললেন, গ্রুটম্যান। অর্থ হয়, প্রাজ্ঞজন! তারপর ফের চিৎকার, ‘আই উইল স্টার্ট এভরি গেম!’ জেডেন অ্যাডামসের মাথায় ঘনাচ্ছে আরিয়ান্নার মুখ। শৈশবের প্রিয় বন্ধু এবং প্রথম ক্লাব– স্টেলুনবশ এফসির টিমমেট অশউইন অ্যান্ড্রিসের রক্তাক্ত দেহ। রিজার্ভ বেঞ্চের অবসাদ। আশ্চর্য অসহায়তায় ডুবে যেতে যেতে, তারপর পড়ে থাকে নিথর একটা দেহ। কেপ টাউনের সেই বাড়িতে। একা।

বিশ্বকাপের ভরা বাজারে, একজন ফুটবলারের সেই নিঃসঙ্গতা যদি আপনাদের মুহূর্তের জন্যেও অস্বস্তিতে ফেলে, তবে এ-লেখা সার্থক। একটা স্টারডম, একজন মাচো অ্যাথলিট আর অনন্ত প্রচারের চূড়ামণি আর ফোটোগ্রাফারের বাইরে থাকে– একটা আড়াল। জেডেন অ্যাডামস সেই আড়াল থেকে আর ফিরলেন না। তবু জানি, লিভারপুলে খেলতে চেয়েছিলেন। তাই এ-লেখার শেষে, একজন গোঁড়া লিভারপুল ফ্যানের পক্ষ থেকে জানিয়ে গেলাম, ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন, মেট…’।

ফুটবল বাকিটা সামলে নেবে, হয়তো!

Abdón Porte FIFAWorldCup2026 Football Jamilton Campaz Jayden Adams Neymar jr Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on