


এ সকালটা বড় অদ্ভুত। আমরা আচমকা বুঝতে পারছি, অনেকটা ছুটে এসেছি আমরা। তোমার পিছু পিছু। নিশ্চিন্দিপুর পেরিয়ে যাবার আগে ভুবনডাঙার মাঠ দেখা যায় একবার। আমাদের পিছনে পড়ে আছে অনেক খড়কুটো। এককালে ছিল না কিছু। এসব আগলে আমরা এখন একা বাঁচতে পারব! সময় যে এবার সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে তা বুঝতে পেরে আমরা বোকা বনে যাই। বোকার মতো দু’-হাতে ঠেলি সময়ের পাথর। সে সরে না আর। চেপে বসে বুকে। আমরা জানি, তা-ও মানি না– আমরা একথা বিশ্বাসই করতে পারি না, তুমি সব কিছু ড্রিবল করে ফেললেও সময়টাকে ড্রিবল করে, টাইমমেশিনে বসিয়ে দিতে পারো না একটা প্রজন্মকে।
রুডি ভলার-লোথার ম্যাথাউস-আন্দ্রে ব্রেহেম-ক্লিন্সম্যানের সামনে মারাদোনার কান্না। জেঠুদের বলতে শুনেছি– মারাদোনার বিশ্বজয়ের মতো মারাদোনার কান্নাও কাল্ট– কারণ ‘ইট ওয়াজ দ্য এন্ড অফ আ জার্নি’। ’৮৬ ফুরলেও ’৯০ ছিল। মারাদোনা ছিল। জার্মানির সামনে আর্জেন্টিনার গুঁড়িয়ে যাওয়ার মাঝে একটা মারাদোনা অন্তত ছিল। তারপর একা, নিঃসঙ্গ আর্জেন্টিনা– গাউচিতো গিলের মতো চরিত্রেরা আগলে রাখে আর্জেন্টিনাকে। সে একা হয়ে যায় না। মারাদোনাও তেমনই। রোজারিও সান্টা ফের চে গুয়েভারার মতো বেপরোয়া লাতিন আমেরিকান। কিন্তু ফুরতে হয়– সব্বাইকে। হবেই। প্রকৃতির নিয়ম। তারপর ২৮টা বছর কিস্যু নেই!

বাতিস্তুতা-জানেত্তি-ক্রেসপো-স্যাভিওলা-আইমার-রিকেলমেদের একটা প্রজন্ম শুধু সাফার, সাফার আর সাফার করে গেল। আর্জেন্টিনার ফুটবল দর্শনে একটা কথা আছে, জয় আসে কষ্টের মধ্যে দিয়েই। তাই সেই কলকাতা-ক্যালিফোর্নিয়া-নেপলস্-সহ তামাম মারাদোনা দুনিয়া কেবল কষ্ট পেয়েছে।
ব্রাহ্মণবেড়িয়ার সেই ছেঁড়া গেঞ্জির ওপর পেন দিয়ে লেখা ‘মেছি ১০’, সেই নীল-সাদা প্লাস্টিকে জার্সি বানিয়ে মেসি হতে চাওয়া আফগান শিশু মুর্তাজা, এই নিখাদ ভালোবাসা পেয়ে আসা নরম-আদুরে মেসিকে একটা হিংস্র সিংহের মতো লড়তে হল ২০২২-এ। নইলে হত না। সময়ের দাবি। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস এমনই থমকে থমকে এগয়। মেসির সামনে সেই থমকানোই নিয়তি– আশা রাখি পেয়ে যাব বাকি দু’-আনার সেই দুরন্ত আশাকে দু’-আনা দিতে হত মেসিকেই। আমাদের কাছেই নেসেসিটি হয়ে গেল– আর মেসির কাছে তো…

আর্জেন্টিনা অধ্যায়ে লিওনেল স্কালোনিকেই দরকার ছিল মেসির। এই শেষাংশে। পেলেন। লেখাও হল ইতিহাস। গতবার ফাইনালের পর মেসি খেলা ছেড়ে দিতে পারতেন। খাদহীন মূর্তির মতো থেকে যেত তাঁর বিগ্রহ। তবু, তিনি ফিরলেন। অগ্নিপরীক্ষা একটা নেশার মতো, ছাড়া যায় না। যে জিমন্যাস্ট ট্রাপিজে একবার ঝুলেছে, সে সার্কাসে হাততালির তোয়াক্কা না করে কেবল নিজের নেশায় খেলা দেখিয়ে যায়। সালভাদোর আপারিসিও– মেসির প্রথম কোচ; সাক্ষাৎকারে বলেন, মেসি পায়ে বল পেলে নেশার মতো ড্রিবল করত। বল জালে চলে গেলেও যে নেশা না ফুরলে আসর ছাড়তে নেই– এমনকী এ নেশার কাছে যে শ্রেষ্ঠত্বের বটবৃক্ষের গায়ে এক-আধটা কুড়ুলের কোপকেও উপেক্ষা করা চলে– এ শিক্ষা তো তোমারই দেওয়া। লিও। তবে কেবলই কি নেশা? ২০২২ সালের পর আর্জেন্টিনার এই প্রজন্মের তোমাকে দরকার ছিল। স্কালোনির আপেক্ষিকতাবাদের ভাবনায় তোমাকে সে বানিয়েছিল ধ্রুবতারা। মনে আছে সেমিফাইনালের পর কুটি রোমেরোর সেই কথা–
“লিও, তুমি কথা দাও, আমরা জিতলে, তুমি আমাদের এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে যাবে না, আরও ক’টা বছর থাকবে…”।

তোমাকে যে থাকতে হতই। আর উপায় ছিল না। জয়-পরাজয়ের বাইরে– একটা ফুটবল-দর্শনের তোমাকে দরকার ছিল। তুমি কথা রেখেছ। মায়ামিতে গিয়ে সেই ভয়ানক ট্রেনিং– নিজেকে একটু একটু করে ফিট রাখা আর শেষ পর্যন্ত জীবনের সেরা বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স!
এই আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের শেষ পর্যন্ত তোমাকে দরকার ছিল। নইলে দিক্ভ্রান্ত হয়ে পড়ত দলটা। তোমার দরকার কি তবে ফুরল? আর্জেন্টাইন ফুটবল এবার বাঁক নেবে, ইতিহাসের অন্য খাতে বইবে– সে সময়ের নিয়ম মেনে।

কিন্তু তুমি কেবল ফুটবল তো দাওনি। ফুটবলোত্তর কিছু অর্জন আমরা ভাগ করে নিয়েছি এতকাল। এতগুলো বছর। পারানার জলের বুকে যে ছলাৎ ছল, এই হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আমাদের বুকেও সেই স্পন্দন– একই। এই জুড়ে যাওয়া নীল-সাদা বৃত্তখানাই আমাদের যৌথ নির্মাণ। আমাদের মজা-মশকরার ভিতর ঘৃণা ঢুকে গিয়েছে বহুকাল। অজান্তেই। মারাদোনা-যুগের চায়ের দোকানে পা-টানাটানির ভিতর যে স্নেহ-উষ্ণতা, সে পাট চুকিয়েছি আমরা। তোমার জয় কিংবা পরাজয় দুই-ই এখন পারস্পরিক ঘৃণাভাষণের চাতাল। আমাদের ভিতরের এ-বিষে আমরা জ্বলছি রোজ। তোমার খেলা সে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ উসকে দেয় কেবল।
এ দোষ কারও একার নয়। তোমার জয়ে যারা বিষ ছড়ায়, তোমার পরাজয়ে তাদের দিকেই ধেয়ে আসে ঘৃণার স্রোত। সময়ের এই বদল, এই যে মারাদোনা থেকে মেসি অবধি একটা যাত্রাপথ– এখানে ব্যর্থতা তো কিছু কম নেই। আবার, এ-ও ঠিক, একটা ছ’-বছরের কালখণ্ড তুমি এমনভাবে খোদাই করেছ, ইতিহাসে, যা আগলে রাখতে পারবে আগামী অনেকগুলো বছর এই আলবিসেলেস্তেরা। আর্জেন্টিনা থেকে ‘হারজেন্টিনা’ হয়ে যাওয়া মৃত মহাদেশে ফের রোদ্দুর আসে। কোপা-ফিনালিসমা-বিশ্বকাপ-কোপা-বিশ্বকাপ ফাইনাল অবধি অপরাজিত এ দৌড় দেখে প্রতিপক্ষ ভাবে– ‘হারছে না, কিছুতেই হারছে না কেন?’– ইতিহাস তো আমাদের আগলে রাখে।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে মারাদোনা যা দিয়েছিলেন তা আগলেই ইনকা সভ্যতার দেশ পেরিয়েছে তিনটে দশক। প্রজন্মের চুলে পাক ধরে ফুরিয়ে যাবার আগে তুমি এলে। এই সাফল্যকে আগলেও তারা বেঁচে নেবে একটা যুগ, আজ যে ‘বেপরোয়া বিচ্ছু’ কেবল তোমায় দেখে এই দলটাকে ভালোবেসে ফেলল, একটা প্রজন্মের নরম মাটির ওপর যে পাকাপাকি ছাপ পড়ল– সে ছাপ আগলে তারা বাঁচবে– যতদিন না নতুন কোনও সূর্য ওঠে নীল-সাদা আকাশে।
আর আমরা? যারা দরকচা প্রজন্ম– যারা তোমার কেরিয়ার সায়াহ্নের সর্বোত্তম সাফল্যের বহু আগে থেকে তোমার ব্যথার ভাগ বুকপকেটে জমিয়েছি? যারা তোমার কান্নাকে সাবলীলভাবে মেনে নিয়ে এক-একটা রাতে অনেকটা করে বড় হয়ে গিয়েছি– তারা? খেলোয়াড়ের অবসর হয়। সমর্থকের হয় না। ভালোবাসারও হয় না।

এ সকালটা বড় অদ্ভুত। আমরা আচমকা বুঝতে পারছি, অনেকটা ছুটে এসেছি আমরা। তোমার পিছু পিছু। নিশ্চিন্দিপুর পেরিয়ে যাবার আগে ভুবনডাঙার মাঠ দেখা যায় একবার। আমাদের পিছনে পড়ে আছে অনেক খড়কুটো। এককালে ছিল না কিছু। এসব আগলে আমরা এখন একা বাঁচতে পারব! সময় যে এবার সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে তা বুঝতে পেরে আমরা বোকা বনে যাই। বোকার মতো দু’-হাতে ঠেলি সময়ের পাথর। সে সরে না আর। চেপে বসে বুকে। আমরা জানি, তা-ও মানি না– আমরা একথা বিশ্বাসই করতে পারি না, তুমি সব কিছু ড্রিবল করে ফেললেও সময়টাকে ড্রিবল করে, টাইমমেশিনে বসিয়ে দিতে পারো না একটা প্রজন্মকে। এ পাহাড় ডিঙিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলে, অস্ফুটে সে প্রশ্নখানা করেই ফেলি–
‘ধনঞ্জয়দা, তুমি যে বড় চলে যাচ্ছ!’
তুমি হেসে বলছ–
‘আমার কাজ যে ফুরিয়েছে।’
‘তুমি কি আর আসবে না?’
তোমার হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া অবয়ব শেষবার বলে ওঠে–
‘আমার আসার আর দরকারই হবে না…’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved