Rahul Arunoday honored at East Bengal Gallery। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

লাল-হলুদ গ্যালারিই অরুণোদয়ের ঠিকানা

হাজার হাজার মানুষ হাঁটতে থাকে। দেশভাগ পেরিয়ে। রিফিউজি ক্যাম্প পেরিয়ে। স্যাঁতস্যাঁতে জংলা পেরিয়ে। হ্যারিকেনের নিভু নিভু সন্ধে পেরিয়ে। হাতে থাকে পতাকা। সে পতাকার মানচিত্রে হাত বোলালে বদলে বদলে যায় কেবল। পতাকা আসলে আশ্রয়। গোপন ট্রেঞ্চ পেরিয়ে এসে, যেখানে আশ্রয় নেয় আস্ত দেশভাগ। সে ছেলের বুকে তাই ঠাঁই পেয়ে যায় ক্লাব। আর ক্লাবের বুকে সে।

প্রচ্ছদের ছবি: অমিত মৌলিক

Published by: Robbar Digital

Posted:April 18, 2026 7:32 pm | Updated:April 18, 2026 8:05 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

ছাপোষা কলোনি এক। মরচে ধরা টিউবয়েল। সার দেওয়া বালতি। পকেটে গুলি-মার্বেল আর চেনকাটা হাফপ্যান্ট। দামাল সে ছেলে। লাট্টু ঘোরালে, ভাবে দুনিয়া বদলে যাবে। হাফ-প্যাডেলে ঝুলিয়ে আনে দুধের ক্যান। যে পাড়ায়, কিঞ্চিৎ বড় গাড়ি এলে হাঁ করে তাকায় সকলে, সেখানেই তার শৈশব বাঁধা।

zoom
দেশভাগ: ছিন্নমূল বাঙালির দর্পণ

গলির পাশে, একটা নালার ভিতর যাবতীয় যাপন-টুকরো মজে আছে, যেন কালকের স্মৃতি; ভ্যাটের গাড়ি এসে টেনে নিয়ে যাবে আজ। পাশ দিয়ে, বেদখল জমিতে উঠে যায় ফ্ল্যাট। কলকাতা মসৃণ হয় আরও। আরও ঝকঝকে। সে ছেলে বড় হয়। শৈশব ডিঙিয়ে কৈশোর। ছেলেবেলা লাহোরের নুর-মহল্লা গলির ভিতরে, সাদা-কালো সেলুনে মহম্মদ রফিকে আবিষ্কারের গল্প সে শুনেছিল। দাদার কাছে। দেখেছিল কুলেন্দু সোম।

লালপতাকা হাতে উদ্বাস্তু আন্দোলন। নবারুণের কবিতা। সমরেশ বসু পড়ে ফেলে। পড়ে ফেলে ‘বি টি রোডের ধারে’। গা ঘিন-ঘিন বস্তির পাশে উঠে যাওয়া সেই পলেস্তারা চাপানো বাড়ি, জলছবির মতো ভেসে ওঠে শেষ শ্রাবণে। শ্রেণির লড়াই ভিতরে ভিতরে পুড়িয়ে দেয় বুকটা। সে ক্ষতবক্ষের চারপাশে একটা রংচংয়ে শার্ট আসে আচমকা। যেমনটা পরতেন দেব আনন্দ। রাজেশ খান্না। মিস্টার বচ্চন। উত্তম-সৌমিত্র-প্রসেনজিৎ; সেই জামা পরে সেই ছেলে জলে ঝাঁপায়। উদ্দাম প্রেমে মাতে রুপোলি পর্দায়। সিনেমা হলে পয়সা ওড়ে দেদার। ফ্লেক্স-কাট-আউটে মালা-দুধ।

zoom
‘কালা পাত্থর’ সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন

তার সেই জামার ওপর সেলাই করে এঁটে দেওয়া হয় হাউসফুল বোর্ড। অথচ, টিকিট ব্ল্যাকারের ভয় বুকে নিয়ে সে নিজের দিকে তাকায়। দেখে, রাতারাতি সে সেলিব্রিটি হয়ে গিয়েছে। সেলিব্রিটি! তার সেই রিফিউজি ক্ষতর পাশে তিরতির করে কেঁপে ওঠে আস্ত বিজয়গড়। কেঁপে ওঠে বিজন ভট্টাচার্যের স্টেজ। আর, একটা ক্লাব। একটা জার্সি। ইস্টবেঙ্গল!

zoom
চেনা লাল-হলুদ গ্যালারি

উদ্বাস্তু মুখ। তার ভিটেমাটি। যৌবনে এসে হাতে পাওয়া বাড়ির দলিল। মাথা গোঁজার ঠাঁই। এদেশের বুকে রক্ত দিয়ে কিনে নেওয়া একখণ্ড মাটি। সেই মুহূর্ত থেকে সে পক্ষ নেয়। রঙিন শার্ট ছিঁড়ে দুনিয়াকে দেখায় ক্ষতচিহ্ন। সেলিব্রিটি থেকে হয়ে যায় সমর্থক। লাল-হলুদ গ্যালারি। যেখানে বড় গোল্ড ফ্লেক-কাপস্টান আর লাল সুতোর বিড়ি খোলা হয় একসঙ্গে। মিইয়ে যাওয়া ঘটিগরমের খুচরো হিসেব নেয় মধ্যবিত্তের ক্লাস সচেতনতার। ধোঁয়া ওড়ে। ভেঙেচুড়ে যায় শৌখিন কলকাতা। সে লিখে ফেলে– ‘মসৃণ ত্বকের মতো ফ্ল্যাট কালচারে ব্রণ-র মতো বাওয়ালগুলোই আজও আমার কলোনি।’

zoom
ঋত্বিককুমার ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’র দৃশ্য

নায়ক হয়ে থেকে যাওয়া হয় না তার। প্রকাশ্যে রাজনীতি করে ফেলে। দল নয়। দেশ নয়। ব্যক্তি রাজনীতি। প্রতিরোধই সেখানে ভাষা। হিল্লি-দিল্লি, থাইল্যান্ড-ফুকেট-ইউরোপ ট্রিপের বদলে তার আস্তিন থেকে বেরিয়ে আসে ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ-টিকিট! এখানে আর ক্লাব-সমর্থক না। সমার্থক হয়ে যায় সে আর তার ক্লাব। একাকী আত্মগোপন করে থাকা কলোনিগুলো জেগে ওঠে। সাতের দশক ফিরে ফিরে আসে। আর হাজার হাজার মানুষ হাঁটতে থাকে। দেশভাগ পেরিয়ে। রিফিউজি ক্যাম্প পেরিয়ে। স্যাঁতসেঁতে জংলা পেরিয়ে। হ্যারিকেনের নিভু নিভু সন্ধে পেরিয়ে। হাতে থাকে পতাকা। সে পতাকার মানচিত্রে হাত বোলালে বদলে বদলে যায় কেবল। পতাকা আসলে আশ্রয়। গোপন ট্রেঞ্চ পেরিয়ে এসে, যেখানে আশ্রয় নেয় আস্ত দেশভাগ। সে ছেলের বুকে তাই ঠাঁই পেয়ে যায় ক্লাব। আর ক্লাবের বুকে সে।

একদিন আচমকা দপ করে নিভে যায় কেমন! যেন সন্ধের লোডশেডিং। মাদুর পেতে শুরু হয় অপেক্ষা। দেওয়ালে ছায়াবাজি। সেলিব্রিটিদের কমপ্লেক্সের জেনারটর সে চালাতে দেয়নি এ-পাড়ায়। কোনওদিন। অন্ধকারে অপেক্ষা করতে করতে জুটে যায় মানুষ। একটু একটু করে ভিড় বাড়ে। বাড়তে বাড়তে পেরিয়ে যায় পাড়া। গলি। মোমের বিষাদ আলোয় জ্বলজ্বল করে ওঠে একটা বিশাল গ্যালারি। হাজার হাজার মানুষ। তার অপেক্ষায় টাঙিয়ে দিয়েছে তারই ছবি।

zoom
লাল-হলুদের ‘অরুণোদয়’। ছবি: অমিত মৌলিক

কৃশানুর ড্রিবলিং-এর মতো পড়াশোনাকে কাটিয়ে পালাতে চাইত সে। অথচ তাকে পালাতে দেয়নি কেউ। সে দেখে, কৃশানু-সুরজিৎ-বাইচুং-হাবিব-আকবরের গ্যালারিই তাকে বেঁধে রেখেছে।

সে গ্যালারি তখন আর গ্যালারি না, ছিন্নমূলের মাটি। দেশভাগের ক্ষতে বুলিয়ে দেওয়া মায়ের হাত। বিশ্বজোড়া যৌথ খামার। শ্রেণির শামিয়ানা ছিঁড়ে নেমে আসা বিকেলের রোদ– অরুণোদয়ের মুখ।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন অর্পণ গুপ্তর অন্যান্য লেখা

……………………..

Amitabh Bachchan East Bengal EAst Bengal Tifo Kolkata krishanu dey Nabarun Bhattacharya partition Rahul Arunoday Banerjee Refugee Colony Refugee Issue Samaresh Basu Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Tifo

Share this article on