


গঙ্গা, পদ্মা, কোপাই। তিন নদী। রবীন্দ্রনাথের আশপাশেই ছিল। তাঁর জীবনচর্যায়, কলমচর্যায় প্রবেশ করেছে এই নদীগুলি। যদিও কোপাই ‘ঘরোয়া’। গঙ্গা-পদ্মার বিস্তার রবীন্দ্রনাথকে টানত ঢের বেশি। বোটে রবীন্দ্রনাথের জলছলাৎ জীবনও তো কেটেছে। এই তিন নদীকে কীভাবে দেখেছেন, ছুঁয়েছেন লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ– রইল রোববার.ইন-এর তৃতীয় জন্মদিনের বিশেষ লেখায়।
‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থর প্রথম কবিতার নাম ‘কোপাই’। এই কবিতাটি একদিক থেকে দেখতে গেলে রবীন্দ্রনাথের এক আত্মজীবনী। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের একটা বিশেষ পর্ব কাটিয়েছেন পদ্মার তীরে। কবিতার মধ্যে পদ্মার সেই বালির চর, বাঁশবন-আমবন, পোড়া ভিটে, কাঁঠাল গাছ, নীলকুঠি– সবই উঠে এসেছে স্কেচের মতো। পদ্মা তীরের সেই বাস লোকজন থেকে দূরে। নিভৃত সেই বাসের মধ্যে প্রধান হয়ে উঠেছে পদ্মার চলন, যে পদ্মা উদাসীন। আশপাশের লোকালয়ের জীবনের চলা তাকে স্পর্শ করেনি। আর যৌবনের শেষে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন তরুবিরল বীরভূমের প্রান্তে। যেখানে তাঁর প্রতিবেশিনী কোপাই নদী। তার চালচলন কৌলীন্যহীন। রোজকার ভাষার রোজকারের জীবনযাপনের সঙ্গে তার ঘরোয়া সম্পর্ক। কোপাই নদীর সহজ চালচলন রবীন্দ্রনাথ সঙ্গী করে নিয়েছিলেন তার প্রথম গদ্য কাব্যের বইয়ের প্রথম কবিতায়।

সকলেই জানেন, রবীন্দ্রনাথের জীবনে পদ্মাপারের শিলাইদহ বাসের দিনগুলির গুরুত্ব কতখানি। শুধু তো পদ্মা নয়, আত্রাই, ইছামতি, নাগর, গরুই– অনেকরকম ছোটখাটো নদীতেও সেই সময় জমিদারের প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথের পদ্মাবোট ঘুরে ঘুরে বেড়াত। রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলী’র চিঠিতে সেই ঘোরা, প্রকৃতি উপভোগের সেই বৃত্তান্ত ধরা আছে। পদ্মার সংহার মূর্তি স্মরণ করে কখনও তিনি পদ্মাকে কালীর সঙ্গে তুলনা করেছেন, কখনও মাঝিদের ভাষা ব্যবহার করে নদীর ‘ধারে’র কথা বলেছেন। এই পর্বের কবিতা বিশেষ করে ‘সোনার তরী’তে নদী আর নৌকার চিত্রকল্পই কেন্দ্রীয় চিত্রকল্প। ‘সোনার তরী’ এবং তারপর ‘চিত্রা’ কাব্যে প্রকৃতিতে ভিতর থেকে অনুভব করা, কল্পনার। বিরাট বিস্তার যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছে তা বোধহয় নদীতে তীরবর্তী এই নির্জন অঞ্চলটিতেই সম্ভব ছিল। মানসসুন্দরীকে নিবিড়ভাবে অনুভব, জীবনদেবতা তত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ– এসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিলাইদহের জীবন ও যাপন। ‘ছিন্নপত্রাবলী’র অনেক চিঠিতে সেই রূপ ও চরিত্র ধরা পড়েছে। শুধু কবি রবীন্দ্রনাথের বিকাশ নয়, কর্মী রবীন্দ্রনাথকে তৈরি করেছে পদ্মাতীরের দিনগুলি।

কিন্তু শুধু কি পদ্মা আর কোপাইয়ের মধ্যে কি রবীন্দ্রজীবনের বুনোট দেখতে পাই আমরা। শিলাইদহ পর্ব যখন চলেছে ততদিনে ‘মানসী’ লেখা হয়ে গিয়েছে। ‘মানসী’ থেকেই তাঁর কাব্যে শিল্পী এসে যোগ দিয়েছিল, এই দাবি করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার ঠিক আগে ‘কড়ি ও কোমল’ থেকে তাঁর কাব্যে ডাঙা জেগে উঠছে শুরু করেছিল, এ কথাও তিনি বিশ্বাস করেছেন। এই ‘কড়ি ও কোমল’-এ এসে শেষ হয়েছে ‘জীবনস্মৃতি’। জীবনস্মৃতিতে তাই পদ্মার কথা নেই। কিন্তু জীবনস্মৃতিতে আছে তার আগের জীবনের কথা। সেখানে যে নদীর কথা আমরা পাই, তা গঙ্গা। ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপে কলকাতা ছেড়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির মানুষেরা। আশ্রয় নিয়েছিলেন পেনেটিতে ছাতুবাবুদের বাগানবাড়িতে। গঙ্গাপাড়ে সেই দিনগুলি রবীন্দ্রনাথের কাছে সোনালি খামে মোড়া চিঠির মতো। একটি একটি করে যেন দিনগুলির রহস্য উদঘাটন হয়েছে। সত্যের খাতিরে বলতেই হয় যে, রবীন্দ্রনাথের বসতবাড়ি গঙ্গা থেকে খুব দূরে নয়, কিন্তু চিৎপুর রোডের সেই ঘিঞ্জি রাস্তা পেরিয়ে গঙ্গার শোভার কথা রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করেননি। ঠাকুরবাড়ির মায়েদের পালকিশুদ্ধ গঙ্গাস্নান করিয়ে আনা বা ঠাকুরবাড়িতে বড় বড় জালায় গঙ্গাজল ধরে রাখা– এইসব কেজো বিবরণ পেয়েছি আমরা। তার মধ্যে বলা বাহুল্য নদীর সৌন্দর্যের কোনও ছিটেফোঁটা নেই। কিন্তু পেনেটিতে যেন তিনি গঙ্গাকে নতুন করে দেখলেন। তারপর নতুন দাদা ও বউঠানের সঙ্গে চন্দননগরে মোরান সাহেবের বাড়িতে থাকাকালীন গঙ্গার ধারে কাটানো দিনগুলোর গুরুত্ব জীবনস্মৃতির পাঠকদের জানা।
পেনেটিতে প্রত্যেকটা দিন যেন অপূর্ব খবর নিয়ে আসত। এই বিস্ময়বোধ পেনেটির দিনগুলিকে অনন্য করেছে। গঙ্গার উপর জোয়ার ভাঁটা, নৌকার গতিবিধি, ‘সূর্যাস্তকালের অজস্র স্বর্ণশোণিতপ্লাবন’, মেঘের ছায়া। সবকিছুর মধ্যেই একটা বিস্ময় বোধ কাজ করেছে। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ পেনেটির এই বাগানে গিয়েছেন, সেই বালকের বিস্ময় আর খুঁজে পাননি। শৈশবের সেই বিস্ময়ের খোঁজে গিয়ে আশাহত রবীন্দ্রনাথের কথা প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ লিখেছেন। পেনেটিবাসের দিনগুলিতে গঙ্গার শোভা তাকে মুগ্ধ করেছে। তবে তাঁর কৌতূহল ছিল বাগানবাড়ির পিছনে যে, গ্রামাঞ্চল আছে তার প্রতিও। অভিভাবকদের অগোচরে গ্রামের মধ্যে চলেও গিয়েছিলেন তিনি। একজন মানুষ খালি গায়ে দাঁতন করছেন দেখে অবাক হয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু অভিভাবকরা লোকালয়ের মধ্যে তার এই ঘোরাঘুরি মেনে নেননি, তাঁকে আবার ঘরেই ফিরতে হয়। সাধারণ মানুষের জীবন দেখার যে কৌতূহল পেনেটি পর্বে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল সেই কৌতূহল মেটেনি। যা মিটল পদ্মার দিনগুলিতে। চলতে থাকা বোট থেকে গ্রামের টুকরো-টুকরো ছবি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তিনি লক্ষ করতে করতে চলেছেন। ‘গল্পগুচ্ছ’-র প্রথম দু’টি খণ্ডে সেই জীবনযাত্রা নানাভাবে ঘুরে ফিরে এসেছে, তা আমরা জানি। কখনও বোট থেকে দেখেছেন একটি দস্যি মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর আয়োজন। এই দেখা মাথায় রেখেই ‘সমাপ্তি’র মতো গল্প লেখা হয়। এভাবেই লোকালয়ের চরিত্ররা রবীন্দ্রনাথের গল্পের চরিত্র। হয়ে ওঠে। মনে পড়বে, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ গল্পে পদ্মার কথা। সেখানে ‘ক্ষুদিত পদ্মা’, যার ‘জল খল্ -খল্ ছল্ -ছল্’ করে ছুটে চলে সে খোকাবাবুকে গ্রাস করেছিল। ধ্বন্যাত্মক শব্দ দিয়ে নদীর তারল্য আর গতি স্পষ্ট করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
‘জীবনস্মৃতি’তে গঙ্গাতীর বলে একটি অধ্যায় আছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথদের সঙ্গে চন্দননগরের গঙ্গার ধারে বসবাসের বৃত্তান্ত। গঙ্গাকে ঘিরে সেখানে যে উচ্ছ্বাস, তার মধ্যে রয়েছে নব যৌবনের বিস্ময়। শৈশবের পেনেটির গঙ্গা আর এর চরিত্র আলাদা। চন্দননগরের দিনগুলো যেন উৎসর্গ করা পূর্ণ বিকশিত পদ্মফুলের মতো বলে রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি’তে তিনি লিখছেন।

আবার সেই গঙ্গা! সেই আলস্যে আনন্দে অনির্বচনীয়, বিষাদে ও ব্যাকুলতায় জড়িত, স্নিগ্ধ শ্যামল নদীতীরের সেই কলধ্বনিকরুণ দিনরাত্রি! এইখানেই আমার স্থান, এইখানেই আমার মাতৃহস্তের অন্নপরিবেশন হইয়া থাকে। আমার পক্ষে বাংলাদেশের এই আকাশভরা আলো, এই দক্ষিণের বাতাস, এই গঙ্গার প্রবাহ, এই রাজকীয় আলস্য, এই আকাশের নীল ও পৃথিবীর সবুজের মাঝখানকার দিগন্ত প্রসারিত উদার অবকাশের মধ্যে সমস্ত শরীরমন ছাড়িয়া দিয়া আত্মসমর্পণ– তৃষ্ণার জল ও ক্ষুধার খাদ্যের মতোই অত্যাবশ্যক ছিল।

রবীন্দ্রনাথের গান জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বেহালা বাগানের ঘাটে নদী, নদীতীরের ছাদের উপর বিশ্রাম্ভালাপ– এসব বিবরণের মধ্যে মোরান সাহেবের বাগানকে বাড়িকে অমর করে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। এখন এই বাড়ি আর নেই। এই বাড়ির একটি ঘরের কথা, ‘সন্ধ্যাসংগীত’–এর কবিতায় আছে
অনন্ত এ আকাশের কোলে
টলমল মেঘের মাঝার
এইখানে বাঁধিয়াছি ঘর
তোর তরে কবিতা আমার ।
চন্দননগরের গঙ্গায় রবীন্দ্রনাথ আবারও আশ্রয় নিয়েছেন, কিন্তু সে অনেক পরে।
জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি শিলাইদহ পতিসর সাজাদপুর এলাকায় বসবাস করেছেন উনিশ শতকের শেষ দশকে। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গান-ছোটগল্প-প্রবন্ধ এবং ‘সাধনা’ পত্রিকার সম্পাদনা– সৃষ্টিশীলতার এই যজ্ঞের পাশাপাশি শুরু হয়েছে গ্রামোন্নয়নের কাজও। আর নির্জন নদীতীর যেন তখন তাঁর প্রধান উদ্দীপনা। শুধু উদ্দীপনা নয়, পদ্মাতীরের নির্জনতা তাঁর ধ্যানের উপলদ্ধিকে ঋদ্ধ করেছে। ‘ছিন্নপত্রাবলী’র ১৪০ নম্বর চিঠিতে লিখছেন,
‘আজ নদীর কলধ্বনির প্রত্যেক তরল লকার আমার সর্বাঙ্গে যেন কোমল আদর বর্ষণ করছে- আমার মনটি আজ অত্যন্ত নির্জন এবং সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, মেঘমুক্ত আলোক-পূর্ণ শস্যহিল্লোলিত জলকল্লোলিত উদার চতুর্দিকের সঙ্গে মুখোমুখি বিশ্রব্ধ প্রীতিসম্মিলনের উপযুক্ত একটি নীরব গোপনতা আমার মধ্যে স্থিরভাবে বিরাজ করছে— আমি জানি আজ সন্ধের সময় যখন কেদারা টেনে বোটের ছাতের উপর একলাটি বসব তখন আমার আকাশে আমার সেই সন্ধ্যাতারাটি ঘরের লোকের মতো দেখা দেবে! আমার এই পদ্মার উপরকার সন্ধ্যাটি আমার অনেক দিনের পরিচিত— আমি শীতের সময় যখন এখানে আসতুম এবং কাছারি থেকে ফিরতে অনেক দেরি হত, আমার বোট ও পারে বালির চরের কাছে বাঁধা থাকত, ছোটো জেলেডিঙি চড়ে নিস্তব্ধ নদীটি পার হতুম, তখন এই সন্ধ্যাটি সুগম্ভীর অথচ সুপ্রসন্ন মুখে আমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকত; আমার জন্যে একটি শান্তি, একটি কল্যাণ, একটি বিশ্রাম সমস্ত আকাশ-ময় প্রস্তুত থাকত; সন্ধ্যাবেলাকার নিস্তরঙ্গ পদ্মার উপরকার নিস্তব্ধতা এবং অন্ধকার ঠিক যেন নিতান্ত আমার অন্তঃপুরের ঘরের মতো বোধ হত। এখানকার প্রকৃতির সঙ্গে সেই আমার একটি মানসিক ঘরকন্নার সম্পর্ক, সেই একটি অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা আছে— যা ঠিক আমি ছাড়া আর কেউ জানে যে কতখানি সত্য তা বললেও কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না।’
‘ছিন্নপত্রাবলী’র এই চিঠিতেই শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন মানুষের দুটো জীবনের কথা। একটা মনুষ্যলোকে একটা ভাবলোকে। তাঁর ভাবলোকের জীবন বৃত্তান্তের অনেকগুলি পৃষ্ঠা এই পদ্মার উপরকার আকাশে তিনি লিখে গিয়েছেন। পদ্মাতীরের নির্জনতা যখন তাঁর চোখে পড়ে তখন তাঁর মনে হয় কবিতায় তিনি কিছুই লিখতে পারেননি। যা অনুভব করেছেন, তা ব্যক্ত করতে পারেননি। কারণ ভাষার ব্যবহার সাধারণের জন্য। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত প্রকৃতি দিয়ে যা অনুভব করেছেন, তা সাধারণের আয়ত্বের মধ্যে পড়ে না। ভাষায় তাঁর পদ্মাতীরের অনুভূতি ধরা পড়ে না তাই। শিলাইদহ পর্ব বা পদ্মাতীরের জীবন সম্পর্কে এরকম প্রগাঢ় অনুভবের কথা অনেক চিঠিতেই ধরা পড়েছে। পদ্মার পাড়ভাঙা রূপ এবং তার নিষ্ঠুরতা– এ-ও যেমন তিনি ধরেছেন তেমনি শরৎকালের পরিপ্রেক্ষিতে পদ্মার শান্ত প্রসন্নতা তাও ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে আছে।
শিলাইদহ অঞ্চল ও তার পাশের নদীগুলি রবীন্দ্রনাথের যত প্রিয়ই হোক না কেন, চিরকাল তা রবীন্দ্রনাথের এলাকা রইল না। ১৯২০ সালে রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় শিলাইদহ চলে গেল সত্যেন্দ্রনাথের ছেলে সুরেন্দ্রনাথের দখলে। সুরেন্দ্রনাথ সেই সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছিলেন ভাগ্যকুলের কুণ্ডুদের। অনেক পরে, রথীন্দ্রনাথ সে সম্পত্তি আবারও কিনে নেওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু কুণ্ডু পরিবার রাজি হননি। ‘কোপাই’ কবিতায় পদ্মা থেকে নিজের জীবন সরে যাওয়ার যে কথা আছে, তা ইন্দিরা দেবীকে লেখা একটি চিঠিতেও আছে। ১৩২৯ সালের চিঠিতে লিখছেন,
‘এবারে শিলাইদহে গিয়ে দেখলুম্ পদ্মা অনেকদূর চলে গিয়েছে– তেমনই দেখতে পাই তোদের জীবনের ক্ষেত্র থেকে আমার জন্মদিনের ধারা দূরে সরে এসেচে। মাঝে মাঝে সে কথা মনে পড়ে। আমাদের পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক এখন ছায়াময় হয়ে এসেচে– তার একটা কারণ ছেলেবেলায় যাদের সঙ্গে আমার জীবনের পারিবারিক গ্রন্থি বাধা হয়েছিল। তারা প্রায় সবাই কোথায় অপসারিত– পরলোকে এবং ইহলোকে; এখন জোড়াসাঁকোর বাড়িটা নদীর সেই বালুময় পথের মত যাতে নদীর স্রোত আর চলে না।’

পদ্মা সরে গিয়েছে, রবীন্দ্রনাথের জীবনও চলেছে ভিন্ন খাতে। কিন্তু পদ্মার জন্য রবীন্দ্রনাথের মন কেমন চলে যায়নি ১৯২৯ সালে ইন্দিরা দেবীকে একটি চিঠিতে লিখছেন যে, ইন্দিরা পদ্মা তীরে গিয়েছেন শুনে কবির লোভ হচ্ছে। লিখছেন ‘পদ্মার আমন্ত্রণ আমার হৃদয়ের মধ্যে নিয়তই প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে’। কোপাই তীরবর্তী শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথের কর্মক্ষেত্র। রবীন্দ্রনাথ এক আদর্শ নিয়ে ভিন্ন ধারার এক বিদ্যালয় এবং গ্রাম পুনর্গঠনের প্রকল্পে হাত দিয়েছিলেন। কোপাই ঘরোয়া নদী। তার সঙ্গে সহজ অনুভূতির যোগ। সে পদ্মার মতো নিরাসক্ত নয়। কিন্তু পদ্মা বা গঙ্গার যে বিস্তার, রবীন্দ্র কল্পনার আধার তার মাহাত্ম্য কোপাইয়ে কোথায়? ঘরোয়া এই নদীটি কি পদ্মার বিকল্প হতে পারে?
রাণী চন্দ লিখেছেন জীবনের শেষ দিকে একবার গ্রীষ্মে রবীন্দ্রনাথ জল জল করে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। কেবলই পদ্মার চরে বোটে থাকার কথা বলেন আর ভাবেন। কিন্তু শিলাইদহতে থাকা আর সম্ভব নয়। শেষে চন্দননগরের কাছে গঙ্গার উপর বোটে থাকা স্থির হল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী হয়ে রইলেন রাণী আর অনিল চন্দ। লোকজনের ভিড় নেই। বাড়ির ঘাটে গঙ্গা ছল ছল করে কবি বেশিটাই থাকেন বোটে।
জলের ধারে এক বাসার কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘পূরবী’র ‘বাসা’ কবিতায়। দেবেন্দ্রনাথও জলের ধারে থাকতে ভালোবাসতেন। বোম্বের বান্দ্রাতে থাকার ব্যবস্থাও হয়েছিল তাঁর জন্য। স্বাস্থ্যের কারণে তা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকতন আশ্রম থেকে কোপাই খুব দূরে নয়। আবার আশ্রমকে ঠিক ‘কোপাই তীরবর্তী’ও বলা যাবে না। ছাত্রছাত্রী-শিক্ষকরা সেখানে ছবি আঁকতে গিয়েছেন, বনভোজন করতে গিয়েছেন– এমন স্মৃতিকথাগুলিতে পাওয়া যায়। কিন্তু সেই কোপাই রবীন্দ্রনাথের ভাবনার সঙ্গে পদ্মা বা গঙ্গার মতো জড়িয়ে যায়নি। নদীর স্রোত আর বিস্তারের জন্য রবীন্দ্রনাথের আকুলতা তাই শেষ পর্যন্তই ছিল।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved