
এই যে ‘আমি আগে জেনেছি’ কিংবা, ‘আমিই বললাম’ বা ‘আমি ভিতরের মানুষ’– এই সব সাইকোলজি মিলিয়ে শোক নয়, এখানে লক্ষ্য ইনফরমেশন দিয়ে নিজের আধিপত্য। কারও মৃত্যুসংবাদ ছড়ানো মানে আমাদের সমাজে সাধারণত হঠাৎ করে তিনটে জিনিস তৈরি হয়। প্রথমত, মৃত্যু তথ্যের মূল্য বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, শ্রোতা এবং বাকি সবাই অস্থির হয়ে পড়ে, আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। কে কতটা ‘ঘনিষ্ঠ’ ছিল, সে নিয়ে আত্মপ্রদর্শন শুরু হয় এই পরিস্থিতিতে। এই ‘খবর’টা হয়ে ওঠে একটা অস্ত্র কিংবা পাড়ার মাসিমাতুতো পুঁজি।
আমার মা-র মৃত্যুর পরমুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে যায় ফোনে সব্বাইকে মৃত্যুবার্তা জানানো। বরফ-শীতল আইসিউ থেকেই আমার স্ত্রীকে, দাদাভাই, দিদি, কোম্পানির পার্টনারকে পরপর জানাতে থাকি। এসবের মাঝে অফিশিয়াল প্রসিডিওর শুরু হয়।
আমার আর কাউকে খবর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এবার আমার মাধ্যমে মৃত্যুসংবাদ বিষয়ক অবস্থান এটুকুই ছিল। ঠিক এক বছর আগে আমার বাবার মৃত্যু হয়, রাত ৩টের সময়। জাস্ট মৃত্যুর পর, পাশের ঘরে শুয়ে থাকা অসুস্থ মাকে সন্তর্পণে এড়িয়ে, তারও পাশের ঘরে শুয়ে থাকা স্ত্রীকে ফিসফিস করে জানাই– বাবা আর নেই।তারপর সেই মধ্যরাতে ফোন করি বন্ধু, আর চেনাবৃত্তের মানুষদের। বাকিদের ফিসফিসিয়ে ফোনে জানায় স্ত্রী।
তারপর মা। এরপর থেকে, যে কোনও মৃত্যুসংবাদ আমার কাছে ব্যক্তিগত ট্রমার মতোই।
ব্যক্তিগত পরিসর থেকে তত্ত্বকথায় আসি। মৃত্যুসংবাদ ছড়ানো নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা মত, নানা প্যাটার্ন। ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’-এর যুগে, বাংলাদেশের যে কোনও অঞ্চলের মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলে হঠাৎ কোনও বাড়ির সামনে কালো কাপড়, উল্টো মাটির হাঁড়ি, বা কোনও বিশেষ চিহ্ন দেখতে পেলে, সেই আমলে, অর্থাৎ, সোয়াশো বছর আগের বাঙালিপাড়ায় এই চিহ্ন চোখে পড়লে বুঝে নিতে হত, নির্ঘাত এ বাড়িতে সম্প্রতি কারও মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও কারও মৃত্যু হলে ঢাক-ঢোল বা ঘণ্টা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে বাজানো হত। আর সেই শব্দ শুনেই লোক বুঝত মৃত্যু! এভাবেই বাংলায় মৃত্যুসংবাদ ছড়ানো হত।

এবার পৃথিবীর তিনটি বিখ্যাত মৃত্যুসংবাদ দিয়ে শুরু করা যাক।
১. মিশরীয় সুন্দরী ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করার পর তার মৃত্যুসংবাদ বার্তাবাহকের মাধ্যমে রোমান শিবিরে অক্টাভিয়ান পর্যন্ত পৌঁছয়। এই খবরে ভূমধ্যসাগরীয় গোটা রাজনীতির যুগটাই বদলে যায়। অর্থাৎ, রেবেলিয়ান বার্তা।
২. ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরে যিশুর মৃত্যুর খবর (যদিও তা নিয়ে অনেক তর্ক রয়েছে! কাশ্মীরের গপ্পটা বাদ দিয়ে!) শিষ্যদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটাই পরে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধর্মীয়-সুনামির জন্ম দেয়।
৩. বর্তমান শাসক দলের ‘গডফাদার’ নাথুরাম গডসের দ্বারা গান্ধীজির হত্যার পর খবর প্রথমে ছড়ায় লোকের মুখে মুখে। মানুষ পাগলের মতো সবাইকে বলতে থাকে এই মৃত্যুসংবাদ। অঞ্চলে, গ্রামে, শহরে, চরম দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে যায় এই মৃত্যুবার্তা। তারপর রেডিও ‘দূত’ হয়ে ওঠে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পুরো দেশ স্তব্ধ।

এই পর্যন্ত এসে এক সম্পূর্ণ অন্য পর্যায়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিই। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, মৃত্যুসংবাদ নিয়ে কানাকানি করা, আলোচনা বসানো, দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে সব্বাইকে বলে বেড়ানো ‘কে কী বলল’– সবাইকে উৎসাহের চোটে মৃত্যুসংবাদ বলে বেড়ানো– এই ব্যাপারটা কিন্তু আমতা আমতা করে বলতে গেলে মনস্তত্ববিদের ভাষায় ‘পারভার্শন’ বা ‘বিকৃতি’র মতোই! কিন্তু এঁকে এককথায় সোজাসুজি ‘পারভার্ট’ ট্যাগ করে দাগিয়ে দেওয়াও হয়তো ঠিক নয়। এর নেপথ্যে কয়েকটা আলাদা আলাদা মানসিক অবস্থা দায়ী। কিছু ক্ষেত্রে খুব অদ্ভুত, সাধারণ, নিষ্ঠুর, কিছু আবার ভয় বা অ্যাড্রিনালিন উত্তেজনা থেকেই জন্মায় এই ‘মৃত্যুসংবাদ’ ছড়ানোর অদ্ভুত উল্লাস।
‘মৃত্যুসংবাদ’-এর দামামা বাজানোর পিছনে সাধারণ মানুষের একরকম চরম ‘থ্রিল’ বা উত্তেজনা কাজ করে। মৃত্যু অর্থাৎ, ‘নিষিদ্ধ খবর’– এই মর্মে মস্তিষ্কে এক স্যাডিস্ট পারসেপশন কাজ করতে থাকে অবিরত।
‘পারভার্শন’-এর কাছাকাছি কয়েকটা মনস্তত্বঘটিত টার্ম আছে। যেমন , ‘Morbid curiosity’ বা মৃত্যুকেন্দ্রিক কৌতূহল। ট্রেন লাইনে কাটা পড়া মৃতদেহ দেখতে ভিড় জমে ওঠে। টিভিতে বীভৎস দুর্ঘটনা মৃত্যু বারবার দেখি। হাসপাতাল চত্বরে শিশুর মাথা ছিঁড়ে নিয়ে মুখে করে ঘুরে বেড়ায় কুকুরের দল, আমরা তা দেখার জন্য ভিড় করি কিংবা মোবাইলে বারবার দেখি রিল। মোবাইলে অমোঘ রিল জীবনে আসা বীভৎসতার ভিউ সবথেকে বেশি হয়, মিলিয়ন ছাপিয়ে যায় কৌতূহলের মৃতদেহ।

এছাড়া আছে ‘Schadenfreude’ বা অন্যের ক্ষতিতে আনন্দ। এটা জাস্ট নিম্নগামী মানুষশাবকের চিরন্তন স্বভাবজাত সেলিব্রেশন। এই প্যাটার্নের মানুষ বরাবর জন্মায়।
কিংবা ‘Grief gossip’ বা ‘grief consumption’ বা শোককে গসিপে ব্যবহার। এর মাধ্যম আজকের যুগে মূলত সোশ্যাল মিডিয়া… । শোক নিয়ে পোস্ট, তাতে বারবার জিজ্ঞেস করা, ‘কী হয়েছিল, কী হয়েছিল?’ পোস্ট , রিপোস্ট আর অমোঘ বাণী দিয়ে কাজ সারা– ‘RIP’! এই ‘রিপ’ ‘রিপ’ করে ‘রেস্ট ইন পিস’ আর হয় না। কারণ আমরা সাধারণত দেহ পুড়িয়ে ফেলি, কিছু ক্ষেত্রে মাটির তলে। মৃত্যু পরবর্তী ডিসেকশনেও আমরা অত্যন্তই পটু।
আর এত সবের পর আসে ‘Sadism’ বা ‘low level social sadism’ বা শোককে অস্ত্র বানানো। শোকের সময়ে অকারণ আচার-উপাচার বাগিয়ে নিজেকে আলট্রা বাস্তববাদী দেখানো। আসলে মৃত্যু একটা ‘taboo’ ঘটনা। মৃত্যু পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আলোচিত সত্য এবং মিস্ট্রিও বটে। তাই মানুষ অনেক সময় মৃত্যুর খবরকে নেয় চরম ‘সেনসেশন’ হিসাবে, যেন একটা আপাতদৃষ্টিতে দুঃখ অথচ আর এক দিকে চরমতম থ্রিলিং সংবাদ। আজকাল বাংলার বুকে সাহিত্য থেকে সিনেমা– সবেতেই চরম ‘সেনসেশনাল’ থ্রিলারের রমরমা বাজার। এই বাংলাতে গত ১০ বছরে ভার্চুয়ালি যত খুন হয়েছে, তা বাস্তব জীবনে হলে মহামারী লেগে যেত বোধহয়!
এই সমস্ত ক্ষেত্রেই সেই অমোঘ মৃত্যু সাধারণের কাছে হয়ে যায় ‘কন্টেন্ট’। যা সাহিত্যিক থেকে ওটিটি থেকে সিনেমায় ‘সেলিং লাইক হট কচুরিজ’। সমসাময়িক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার চরমতম আলোচিত টপিক। এবং ‘মৃত্যু সংবাদদাতা’র জনিত বিষয় নিয়ে বলতে বসলে এটাই আসল বিকৃতি। আর এই শোককেই কনটেন্ট বানিয়ে মৃত মানুষকে নিয়ে ‘ডিটেইল’ জোগাড় করে সোশাল মিডিয়ায় চমৎকার ‘রিচ’ পাওয়া যায়।
‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।’ আমাদের রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে কিন্তু দেখেছেন বন্ধু হিসেবে। জীবন-মৃত্যু একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যে মা শিশুকে এক স্তন থেকে অন্য স্তনে তুলে নেন, মৃত্যুকেও ঠিক তেমনই এক কোল থেকে অন্য কোলে যাওয়ার রূপান্তর মাত্র। অমিতাভ ঘোষের ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা’-য় এক আশ্চর্য খাতার উল্লেখ পাওয়া যায় , যাতে রবীন্দ্রনাথ মুহুরি থেকে শুরু করে কাদম্বরী দেবী পর্যন্ত সব্বাইকে প্ল্যানচেটে ডেকে আনতেন।

মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন, মৃত্যুচর্চা এবং মৃত্যু সংবাদচর্চা একপ্রকার ক্ষমতার নেশা। মৃত্যুসংবাদ বেচে, বেঁচে থাকার এক সস্তা শর্টকাট পদ্ধতি একদল বাঙালি রপ্ত করে নিয়েছে। ‘মৃত্যু মৃত্যু’ খেলা, খুন, থ্রিলার আর গোয়েন্দাবাজি নিয়েই বাঙালির সিনে-মিডিয়ার সংসার। আর অপর দিকে, ‘আমার কাছে খবর আছে’, ‘আমার কাছে খবর আছে’– বলতে বলতে এই প্যাটার্নে অনেকেই মৃত্যুসংবাদ আগে জেনে এবং জাঁকজমক সহকারে ফোনে বা পাড়ার মোড়ে বলে অকারণ এক আজব গুরুত্ব পেতে চায়। এটা একটা সামাজিক ক্ষমতা দেখানোর বিচিত্র স্যাডিস্ট বহিঃপ্রকাশ।
এই যে ‘আমি আগে জেনেছি’ কিংবা, ‘আমিই বললাম’ বা ‘আমি ভিতরের মানুষ’– এই সব সাইকোলজি মিলিয়ে শোক নয়, এখানে লক্ষ্য ইনফরমেশন দিয়ে নিজের আধিপত্য। কারও মৃত্যুসংবাদ ছড়ানো মানে আমাদের সমাজে সাধারণত হঠাৎ করে তিনটে জিনিস তৈরি হয়। প্রথমত, মৃত্যু তথ্যের মূল্য বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, শ্রোতা এবং বাকি সবাই অস্থির হয়ে পড়ে, আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। কে কতটা ‘ঘনিষ্ঠ’ ছিল, সে নিয়ে আত্মপ্রদর্শন শুরু হয় এই পরিস্থিতিতে। এই ‘খবর’টা হয়ে ওঠে একটা অস্ত্র কিংবা পাড়ার মাসিমাতুতো পুঁজি।
এবার যাঁরা প্রথমে শুনে ফেলেছেন, মৃত্যুর খবর শুনেই প্রথম প্রশ্ন– ‘কীভাবে মরল?’ ফলোড বাই– ‘কখন?’, ‘কে কে আছে এখন ওখানে?’ তারপর শুরু হবে একে ফোন, তাকে হোয়াটসঅ্যাপ আর এই ‘আমিই প্রথম বললাম’– এই সেলফ প্রশংসার পসরা। আর এক অমোঘবাণী– ‘আমি তো প্রথম থেকেই সব জানতাম।’ ঈর্ষা, বিদ্বেষ, মরবিড কিউরিওসিটি কখনও মৃত্যুর খবর ছড়ানোর ভেতরে থাকে গুপ্ত রাগ, চাপা হিংসা। ক্ষেত্রবিশেষে ‘দেখলি, শেষ!’ টাইপ আনন্দও চলতে থেকে মনের ভিতর।

একটা প্রশ্ন বারবার চলে আসে। এটা সত্যিই পারভার্শন সাইকোপ্যাথি টাইপ? কেউ ভেঙে পড়ছে দেখে আনন্দ পাওয়ার ব্যাপার। এটা শুধু কানাকানি নয়, এটা ‘sadistic pleasure’, বিকৃত প্রবণতা। এই ধরনের মানুষদের স্বভাব এরা মূলত খবরে বাঁচে, সম্পর্কে নয় এবং নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে অন্যর বিপদ ব্যবহার করে কথার ভিতর দিয়ে বলে, ‘আমিই কেন্দ্র’ এবং ‘আমি অমুক করিয়াছি’, ‘তমুক সালে তমুক করিয়াছি’। কিংবা ‘অমুকের ছোটভাই আমার শালার কলিগ’! এদের একটা গোপন আনন্দ থাকে, সেটা অবিশ্যি বাঁচার আনন্দ না আধিপত্যের আনন্দ। আসলে, আসল জীবনে অনেকেই আছেন যারা কারও কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। তাই এ হেন সংকটে ‘খবরদাতা’ হয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গাটি দখল করে।
মৃত্যুসংবাদ মানুষের মনকে নরম করে। সেই নরম সময়ে খবর বললে মানুষ তাকে সম্মান দেয়, এটাই তাদের এক প্যাটার্নের নেশা। আর ওপর দিকে নিজের ভিতরকার মৃত্যুভয় সামলানোর কৌশলের ফলে, ‘আমি দূর থেকে দেখি’। মানুষ মৃত্যু নিয়ে ভয় পায়। কিছু মানুষ ফোবিয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সেই ভয় এড়াতে তারা শোকের ভেতরে না গিয়ে খবর ছড়ায়, যেন দর্শক হয়ে চেষ্টা করে নিরাপদে থাকার।

একটা দু’-লাইনের গপ্পো দিয়ে শেষ করি। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০-এর কাছাকাছি গ্রিক, ফরাসি যুদ্ধের সময়। বিখ্যাত ম্যারাথনের যুদ্ধ। গ্রিকের দল যুদ্ধে জিতে যায়। যুদ্ধ শেষে এক বার্তাবাহক দৌড়ে দৌড়ে এসে গ্রিস সাম্রাজ্যে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে– ‘আমরা জিতেছি, আমরা জিতেছি, আমরা জিতেছি!’ ব্যস, তারপরই সে নাকি ক্লান্তিতে ওখানেই মারা যায়! যাকে এককথায় বলে, পতন ও মৃত্যু! সুতরাং, এই জাতীয় স্বভাব, আলোচনা এবং মৃত্যুবিলাস ‘পল্লবিত কুসুমসম’ বিকশিত না করে জাস্ট চেপে যাওয়াই শ্রেয়! কী দরকার…। ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
……………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন অভ্রদীপ ঘটক-এর অন্যান্য লেখা
……………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved