Robbar

রাজনৈতিক মঞ্চে রবীন্দ্র-ব্যবহার

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 18, 2026 2:47 pm
  • Updated:March 18, 2026 5:43 pm  
Relevance of Tagore songs in this political reality by Purnendu Bikash Sarkar

বর্তমানে কলকাতা তথা সারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন ক্রমেই উত্তপ্ত, মেরুকৃত এবং স্নায়ুচাপপূর্ণ, তখনও রবীন্দ্রনাথের গান সমান প্রাসঙ্গিক। সম্প্রতি কলকাতায় নানা সমাবেশ, প্রতিবাদ-মিছিল, আগুন ধরানো রাজনৈতিক তরজা, হামলা-পালটা হামলা, রক্তস্রোত আর মৃত্যু যে বীভৎসতা দেখা গিয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয়েছে যে শহরের রাজনীতি এখন শুধু ভাষণের মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই, তা জনজীবনের ভেতরেও প্রবলভাবে ঢুকে পড়েছে।

পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার

রবীন্দ্রনাথের গান শুধু বাণী আর সুরের মাধুর্য নিয়েই ধরা দেয় না; স্পর্শ করে আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, নৈতিক বোধ এবং জীবনের গভীর উপলব্ধিকে। তাঁর গানে প্রেমের স্নিগ্ধতার পাশাপাশি প্রকাশ পেয়েছে গভীর আত্মনিবেদনের সুর। সেখানে রয়েছে মানুষের অন্তর্জীবনকে জাগিয়ে তোলার এক অমোঘ শক্তি। জীবনের নানা মুহূর্তে আমরা তাঁর গানে শুনতে পাই আমাদেরই মনের প্রতিধ্বনি। সুখে, দুঃখে, লড়াইয়ে, প্রার্থনায়– সব অবস্থাতেই রবীন্দ্রসংগীত যেন আমাদের হৃদয়ের ভাষা হয়ে ওঠে। তাঁর গান শুধু শোনার নয়, ভাবার বিষয়। শুধু শিল্পসৃষ্টি নয়, জীবনকে জানার ও গড়ার এক মূল্যবান শিক্ষা। তাঁর গান আমাদের অন্তরকে প্রসারিত করে, গভীরতর করে, নির্মল করে তোলে। তাই প্রতিটি বাঙালির মানসলোকে রবীন্দ্রসংগীত আজও এক অনির্বাণ আলোকধারা। কিন্তু সেই গানই কখনও কখনও হয়ে উঠেছে অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, ধিক্কার জানিয়েছে সমকালীন রাজনীতি আর ক্ষমতার দম্ভকে। শাসকের নিষ্ঠুর আদেশে অসহায় মানুষের বেদনায় রবীন্দ্রনাথের নির্ভীক কলম বারবার গর্জে উঠেছে গানের ভাষায়, ভাঙন ধরিয়েছে তাদের মিথ্যা অহমিকার প্রাচীরে।

যৌবনে রবীন্দ্রনাথ

লাহোর জেলে রাজনৈতিক বন্দিদের প্রতি শাসকের অত্যাচার আর অসাম্যের প্রতিবাদে দীর্ঘ অনশনের শহিদ বিপ্লবী যতীন দাসের মৃত্যুর অভিঘাতে লেখা ‘সর্ব খর্ব তারে দহে তব ক্রোধদাহ’ তৎকালীন সমাজে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। নারী অধিকার আন্দোলনকারী ভারতীয় স্বায়ত্তশাসনের সমর্থক অ্যানি বেসান্তের গ্রেফতারে ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথের জ্বালাময়ী ভাষণ ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ আর ‘দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরী’ গানে ব্রিটিশের প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল তাতে কারাবাসের সম্ভাবনা থাকলেও নির্ভীক কবি কোনও আপসের পথে পা বাড়াননি। 

১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ আইনের প্রতিবাদে সারা দেশ যখন উত্তাল, তখন রবীন্দ্রনাথের লেখা স্বদেশি গানগুলি মানুষের মনে বিপুল উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল। স্বাস্থ্য উদ্ধারের বাসনায় কবি তখন গিরিডিতে। কলকাতার আন্দোলনের উত্তাপ গিরিডির নিস্তরঙ্গ জীবনে যে তুফান তুলেছিল, রবীন্দ্রনাথও ‘অন্যতম চারণকবির ভূমিকা’ নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন সেই উন্মাদনায়। রাখীবন্ধন উৎসব, বিদেশি ভোগ্যপণ্য বর্জন, স্বদেশি শিল্পের প্রসার, জাতীয় ধনভাণ্ডার স্থাপন, হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য প্রচেষ্টা, সভা-মিছিল-বক্তৃতা-লেখালেখি ছাড়াও তরুণ সমাজের মুখে মুখে গাওয়া গিরিডিতে রচিত রবীন্দ্রনাথের স্বদেশি গানগুলির আবেদন ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার ঘরে ঘরে। শ্রী প্রশান্ত পালের কথায়, ‘গান গেয়ে তিনি একটি জনসম্প্রদায়কে একটি জাতিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন।’

বর্তমানে কলকাতা তথা সারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন ক্রমেই উত্তপ্ত, মেরুকৃত এবং স্নায়ুচাপপূর্ণ, তখনও রবীন্দ্রনাথের গান সমান প্রাসঙ্গিক। সম্প্রতি কলকাতায় নানা সমাবেশ, প্রতিবাদ-মিছিল, আগুন ধরানো রাজনৈতিক তরজা, হামলা-পালটা হামলা, রক্তস্রোত আর মৃত্যু যে বীভৎসতা দেখা গিয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয়েছে যে শহরের রাজনীতি এখন শুধু ভাষণের মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই, তা জনজীবনের ভেতরেও প্রবলভাবে ঢুকে পড়েছে। একইসঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন, মূল্যবৃদ্ধি ও এলপিজি-সংকটকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং নারীবিদ্বেষী মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক ইত্যাদি মিলিয়ে কলকাতার রাজনীতি আজ উদ্বেগ, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার এক জটিল আবহ তৈরি করেছে।

জালিয়ানওয়ালাবাগের বিরুদ্ধে চেমসফোর্ডকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের গান নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ, তিনি কোনও দলীয় রাজনীতির কবি নন; তিনি মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীন বিবেক, ভয়ের বিরুদ্ধে সাহস এবং বিভেদের বিরুদ্ধে মানবিকতার কণ্ঠস্বর। তাই আজকের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রসংগীত কেবল সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ নয়, এ এক নৈতিক আলোকবর্তিকা, যা রাজনৈতিক দলাদলির ঊর্ধ্বে আমাদের মনুষ্যত্ব জাগ্রত করে। শেখায় প্রতিপক্ষকে ঘৃণা নয়, নিজের ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করো।

‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ গানটিকে নিছক ব্যক্তিসাহসের গান বলে ভাবলে ভুল হবে। আজ যখন রাজনৈতিক আনুগত্য অনেকসময় নৈতিক বোধকে আচ্ছন্ন করে দেয়, তখন ‘একলা চলো’ হয়ে ওঠে বিবেকের আহ্বান। সহিংসতা, বিদ্বেষ, কুৎসা আর অসত্যকে সমর্থন না করার সাহসই এখানে মুখ্য। গিরিশ পার্কের সংঘর্ষ দেখিয়ে দিয়েছে, জনসমর্থনের প্রদর্শন অনেক সময় খুব দ্রুত রাজপথের হিংসায় নেমে আসতে পারে। এই গান আমাদের বিবেকের জাগরণ, শান্তির আহ্বান। মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ভয়মুক্ত চেতনার জয়। গণতন্ত্রে নাগরিক যদি ভীত থাকে, তবে নির্বাচনের বাহ্যিক আয়োজন থাকলেও তার আত্মা শুকিয়ে যায়।

রাজনৈতিক উত্তেজনায় সাধারণ মানুষের মন ভয়, দ্বিধা আর আশঙ্কায় ম্লান হয়ে থাকে। ভয়– মত প্রকাশের, ভয়– প্রতিবাদের, ভয়– ভোটাধিকার হারানোর, ভয়– বিরুদ্ধমতের মানুষকে এড়িয়ে চলার। রবীন্দ্রনাথের ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়’ গানটিতে ব্যক্ত হয়েছে মানুষের অধিকার, মর্যাদা আর ভয়মুক্ত চেতনার জয়। নাগরিক যদি দলীয় পেশিশক্তির কাছে পদানত থাকে, স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে নির্বাচনের আয়োজন শুধু আড়ম্বরেই পরিণত হয়, গণতন্ত্র সেখানে নিষ্ফল অপমানে মুখ লোকায়।

রবীন্দ্রনাথের ছবিতে ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা (মুসোলিনী)

বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিকায় ‘বাংলা’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। তাই ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গানটি ফিরে এসেছে নতুন অর্থ নিয়ে, নতুন ব্যঞ্জনায়। আজ পরিচয়, অঞ্চল, ভাষা, ভোটব্যাঙ্ক– সব কিছু মিলিয়ে ‘বাংলা’কে যখন নানাভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাংলাকে ভালোবাসা মানে বাংলার মানুষকে ভালোবাসা। যে মানুষ শ্রম দেয়, কষ্ট পায়, ভোট দেয়, জীবনের নিরাপত্তা চায়– বাংলা তারও। বাংলা কোনও স্লোগান নয়; বাংলা এক সহাবস্থানের নৈতিক প্রতিশ্রুতি। 

‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল’ বসন্তের এই গান রাজনৈতিক পাঠেও আশ্চর্য তাৎপর্যময়। আজকের সমাজে মানুষ ক্রমশ নিজ নিজ মতাদর্শের ঘরে বন্দি হয়ে পড়ছে। সামাজিক মাধ্যম, পাড়ার আলোচনা, এমনকী পারিবারিক সম্পর্কও অনেক সময় দলীয় রঙের ছোঁয়ায় রঙিন হয়ে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে ‘দ্বার খোল’ মানে কেবল ঘরের বাইরে আসা নয়; সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ, গুজব আর দলান্ধতার দরজা খুলে দেওয়া। 

‘এখনো গেল না আঁধার, এখনো রহিল বাধা’ বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার এক গভীর আত্মসমালোচনামূলক দর্শন। আজকের রাজনীতিতে প্রায় সব পক্ষই নিজেদের স্বার্থহীন, জনদরদি এবং সততার দাবি জানিয়ে অন্য দলের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জানেন, সমাজের অন্ধকার এত সহজে কাটে না। সহিংস ভাষা, নারীবিদ্বেষী মন্তব্য, প্রতিশোধস্পৃহা, প্রশাসনিক বিভ্রান্তি– এসবই সেই আঁধারের রূপ। তিনি মনে করিয়ে দেন, সভ্যতার কাজ হল আলো বাড়ানো, ঘৃণা বাড়ানো নয়।

মুখোমুখি, শিল্পী: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের গান শুধু আমাদের শ্রবণকেই তৃপ্ত করে না, জাগ্রত করে আমাদের বিবেককেও। যেখানে অন্যায় আছে, সেখানে তাঁর গান প্রতিবাদের ভাষা; যেখানে ভয় আছে, সেখানে সাহসের মন্ত্র; যেখানে বিভেদ আছে, সেখানে মৈত্রীর আহ্বান; আর যেখানে অন্ধকার আছে, সেখানে আলোর অনিবার্য প্রত্যয়। অতীতের স্বদেশি আন্দোলন থেকে আজকের উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা– সব ক্ষেত্রেই তাঁর গান আমাদের শিখিয়ে দেয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, মানুষকে ভালোবাসা এবং বিবেককে জাগ্রত রাখাই প্রকৃত সাহস। তাই রবীন্দ্রসংগীত আজ শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, আমাদের সামাজিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের এক অনির্বাণ শক্তি। যতদিন অন্যায়, ভয়, বিদ্বেষ ও অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে মানুষের অন্তরে প্রতিরোধ জাগবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথের গানও আমাদের পথ দেখাবে– আলোকের, সাহসের এবং মনুষ্যত্বের পথে।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার-এর অন্যান্য লেখা

……………………….