
উকিল দিতে না পারা কোনও বাবা; যিনি আদালতে ছেলেমেয়ের সঙ্গে যেতে পারছেন না ডিপোর্টেড হয়ে যাবার ভয়ে, কিন্তু জানতে পারছেন না আদালতে কী হচ্ছে তাঁর ছেলেমেয়েদের; আদালতের সমস্ত রেকর্ড যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে, সেখানে বেআইনি অভিবাসীদের সন্তান, যাদের নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য ক্ষমতা নেই, তাদের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যাচ্ছে ইমিগ্রেশন আদালতের বন্ধ দরজার ওপারে– সেটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কী? বেআইনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইসবাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া, এপস্টেইন স্ক্যান্ডালে গলগল করে বেরিয়ে আসা তথাকথিত এলিটদের দুর্গন্ধময় পুঁজরক্ত, কারণ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ-ক্ষতিগ্রস্ত সারা পৃথিবী– এই বছরের প্রথম তিন মাস। আর এই গ্রহণ লাগা পৃথিবীতে আমার কাছাকাছি হারিয়ে যাচ্ছে ছোট কিছু মানুষ। নিঃশব্দে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে আমার রাজ্য ম্যাসাচুসেট্সের পাবলিক রেডিও স্টেশন একটা তদন্তভিত্তিক রিপোর্ট করে– বেআইনী অভিবাসীদের বহিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতে। বিষয়টি হচ্ছে, ম্যাসাচুসেট্সের ফেডারেল ইমিগ্রেশন আদালতগুলোতে প্রতি সপ্তাহে এক অস্বস্তিকর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সেটা হল অভিবাসী শিশুদের, প্রায়ই তাদের বাবা-মা ছাড়া, বিচারকদের সামনে হাজির হতে হচ্ছে নিজেদের বহিষ্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। এদের কেউ কেউ সরাসরি আদালতে যায়। অনেকেই আবার ভিডিওর মাধ্যমে উপস্থিত হয় বিচারপতির সামনে– বাচ্চাগুলো কী বুঝছে, কতটা বুঝছে, বোঝা যায় না– বসে থাকে আইনজীবীদের অফিসে পাথরের মতো নিরাবেগ মুখে। কোন বয়সের বাচ্চারা মুখোমুখি হচ্ছে এই অসম্ভব পরিস্থিতির? এদের মধ্যে আছে দেড় থেকে সাত-আট বছর বয়সী বাচ্চারাও।

অবশ্যই এই পরিস্থিতি শুধু একটা রাজ্যে নয়, চলেছে গোটা আমেরিকার ইমিগ্রেশন আদালতগুলিতে। দেখা যাচ্ছে যে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী বহিষ্কার নীতি কার্যকর করার সময়, আদালতের চলা প্রক্রিয়ার সামনে অভিবাসী প্রাপ্তবয়স্ক যা, শিশুরাও তাই। আর এই শুনানিগুলোর মূল অংশ হচ্ছে বন্ধ দরজার আড়ালে, যেখানে জনসাধারণের জানার প্রায় কোনও উপায় নেই যে শিশুদের আইনি অধিকার ও সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে কি না– অথবা বিচারকরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঠিক কী রায় দিচ্ছেন।
ম্যাসাচুসেট্সে, কিশোরদের মামলাগুলোর শুনানি হয় বস্টন এবং চেমসফোর্ডের ফেডারেল ইমিগ্রেশন কোর্টে। স্থানীয় পাবলিক রেডিও স্টেশনটি বহুবারের চেষ্টায় শিশুদের জন্য গ্রুপ শুনানি পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে। ‘মাস্টার্স’ সেশন নামে পরিচিত এই সেশনগুলো, যেখানে ব্যক্তিগত মামলার তথ্য তেমন প্রকাশ করা হয় না। সাধারণত বিচারক আদালতকক্ষে থাকেন, আর বেশিরভাগ শিশু ভিডিওর মাধ্যমে বেঞ্চের সামনে উপস্থিত হয়। আর যখন শিশুরা সরাসরি আদালতে যায়, তখন সাধারণত বাবা-মা তাদের সঙ্গে থাকেন না, কারণ তারা অভিবাসন এজেন্টদের দ্বারা আটক হওয়ার ভয় পান। সাপ্তাহিক এই সেশনগুলো দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায় এবং বিচারাধীন বাচ্চাগুলির অবস্থার ঝলক সামনে আসে। দেখা যায়, একটি ফাইলিং ক্যাবিনেটের সামনে একা বসে থাকা এক ছোট ছেলে। বিচারকের প্রশ্নের সময় বকবক করা এক খুদে। সাদা দেওয়াল-ঘেরা বড় একটি অফিসে গাদাগাদি করে থাকা একদল শিশু। বস্টনের কোর্টে, ইমিগ্রেশন বিচারক শিশুদের তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান: ‘তোমরা বহিষ্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছো। সরকার অভিযোগ করছে যে তোমরা অনুমতি বা কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছ।’

৩০ বছরের বেশি আমেরিকা বাস আমার, প্রায় এক যুগ কাজ পাবলিক স্কুলে। মা হিসাবে, শিক্ষক হিসাবে এই রিপোর্টের সামনে বসে থাকি হতবাক। কোন ডিস্টোপিয়ায় বসবাস করছি আমরা? আর কত অন্ধকার সামনে? মনে পড়ে যায় প্রায় ১৫-১৬ বছর আগের কথা। ম্যাসাচুসেট্সে আমার এবং আমার সমসাময়িক বন্ধুদের বাচ্চারা তখন অনেকটা ছোট। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং প্রতিবেশী তার আট এবং চার বছরের দুই বাচ্চাকে নিয়ে বরফ-বৃষ্টির এক প্রায়-সন্ধ্যায় ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল, কারণ তার ছোট বাচ্চাটি ছিল অসুস্থ। চার বছরের বাচ্চাটি খুব ক্লান্ত, তার কার-সিটে গভীর ঘুমে। আমার বন্ধু কয়েকটি খুব প্রয়োজনীয় জিনিস আনার জন্য ওষুধের দোকান, যেখানে অন্যান্য জিনিসও পাওয়া যায়, তার সামনে একটি আলোকিত জায়গায় গাড়ি পার্ক করে বড় মেয়েটিকে বলে সে দশ মিনিটের মধ্যে ওষুধ নিয়ে ফিরে আসবে। গাড়ি চালু করা থাকল, মেয়ে যেন গাড়ি ভেতর থেকে লক করে দেয় এবং মা ছাড়া অন্য কাউকে দরজা না খোলে, কোনও কারণেই। বাইরে এত ঠান্ডা আর বৃষ্টি যে অসুস্থ, ঘুমন্ত বাচ্চাটিকে সে বাইরে বের করতে চায়নি। দোকানে দশ মিনিটের জায়গায় ২০-২৫ মিনিট লাগে। বাইরে এসে সে দেখে তার ভ্যানকে ঘিরে দু’টি পুলিশের গাড়ি এবং ভ্যানের দরজার সামনে দু’জন পুলিশ। উৎকণ্ঠায় প্রাণ বেরিয়ে এসেছে তার, কাছে পৌঁছে সে জানলা দিয়ে বড় মেয়েকে দেখতে পায় কোলে মুখ গুঁজে রয়েছে, পুলিশদের দেখেও দরজা খোলেনি, ছেলে তখনও ঘুমন্ত। মা বুঝতে পারে পুলিশ তার পার্ক করা গাড়িতে একা বাচ্চাদের দেখতে পেয়েছে। তারপর শুরু হয় পুলিশের জেরা। মা অসম্ভব নার্ভাস হয়ে প্রায় কান্নায় ভেঙে পড়ে তার অবস্থা বলে। সে স্বীকার করে যে, সে জানত সে এইভাবে তার ছোট দু’টি বাচ্চাকে গাড়িতে রেখে যেতে পারে না। এটা বেআইনি। কিন্তু অবহেলা করে সে কাজটি করেনি। পরিস্থিতি বদলাতে সময় লাগে। পুলিশ কিছুক্ষণ বাদে খানিকটা প্রশমিত হয়ে তাকে বলে যে, যেহেতু সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, সঙ্গে এটাও বুঝতে পেরেছে যে অনেক বেশি বিপদের দিকে সে বাচ্চাদের ঠেলে দিতে পারত, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, কিন্তু তারা সোশাল সার্ভিসকে এই বিষয়ে রিপোর্ট করবে এবং তার প্রতিনিধিরা আমার বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করবে। সেই সন্ধেতে আমার বন্ধু প্রায় এক ট্রমা নিয়ে বাড়ি ফিরল। দু’ সপ্তাহের মাথা থেকে তার বাড়িতে বেশ কিছু মাস ধরে ডিপার্টমেন্ট অফ সোশাল সার্ভিসের প্রতিনিধিদের যাতায়াত রইল, একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে একটা ইভ্যালুয়েশন করা পর্যন্ত। ঘটনাটা আমাদের কাছে আতঙ্কের হলেও আমরা জানতাম ঘটনাটা স্বাভাবিক। পুলিশ এবং সোশাল সার্ভিসের প্রতিক্রিয়া এরকমই হবে। কারণ উন্নত দেশ হিসাবে শিশুদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অনেকখানি। যদিও ব্যক্তি স্বাধীনতার দেশ আমেরিকা। কাজেই সন্তান কীভাবে মানুষ করবেন তাতে অভিভাবকদের ব্যক্তি স্বাধীনতাও আছে অনেক। বাচ্চা ভ্যাকসিন নেবে কিংবা নেবে না– তার সিদ্ধান্ত যেমন অভিভাবকরা নিতে পারেন; তেমনই বাকি বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্য, পাবলিক স্কুলে ভ্যাকসিন রিপোর্ট ছাড়া ভর্তি না-করার সিদ্ধান্ত কিন্তু সরকারের। সন্তান বাড়িতে জন্ম নেবে না হাসপাতালে, সিদ্ধান্ত মা-বাবার। কিন্তু সুরক্ষিত ‘কার সিট’ ছাড়া বাচ্চাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া বেআইনি। আমেরিকায় শিশুদের রক্ষা করার জন্য আইন আছে।

১৯৭৪ সালে তৈরি হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের চাইল্ড অ্যাবিউস প্রিভেনশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট– যা রাজ্যগুলোকে তাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ ও নির্দেশনা দেয়। নির্যাতনের সংজ্ঞা তৈরি করা, প্রতিরোধ করা, অবহেলা প্রতিরোধ করা, তদন্ত করা, এই সমস্ত কিছুর নির্দেশিকা এই অ্যাক্ট। তবে এটি নির্দেশিকা। এটিকে নিজের রাজ্যে প্রয়োগ করা, পরিবারদের সহায়তা করা, শিক্ষা, সচেতনতা বাড়ানো, যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া– এই সমস্ত কিছুর দায়িত্ব রাজ্যগুলোর ওপর। আমি ম্যাসাচুসেট্সের বাসিন্দা, কাজ করি পাবলিক স্কুল সিস্টেমে। তাই জানি, আমার রাজ্যে আমার সংস্পর্শে আসা ছাত্রছাত্রীদের ওপর কোনও শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতন হচ্ছে, বা তারা অবহেলার মধ্যে আছে– এরকম মনে হলে সেটা রিপোর্ট করা আমার জন্য বাধ্যতামূলক। শিক্ষক, কাউন্সিলর, থেরাপিস্ট কোনও বাচ্চার শরীরে কোনও আঘাত বা পোড়ার চিহ্ন দেখতে পেলে, তাদের পড়াশোনা খেলাধুলোয় আগ্রহ কমে যাচ্ছে দেখলে, গুটিয়ে যাচ্ছে দেখলে, আতঙ্কে থাকলে, স্কুলে আসা কমে গেলে, জামাকাপড়, চেহারায় অপরিচ্ছন্নতা দেখলে– এরকম বহু বহু কারণে সোশাল সার্ভিসকে রিপোর্ট করতে পারে। বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের জন্য আছে ‘ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক এডুকেশন প্ল্যান’ যা একজন বিশেষ ক্ষমতার শিক্ষার্থীকে স্কুলে একাডেমিক বা অন্য বিষয়ে উন্নতি করার জন্য তার চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা হবে, এবং তারা তাদের পথে কতটা উন্নতি করছে তার নিয়মিত মূল্যায়ন হবে। এই এডুকেশন প্ল্যানটি একটি আইনি নথি। এটি স্কুল অনুসরণ না করলে অভিভাবকরা স্কুলের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারেন। আর কিছু রাজ্যে এখন এসেছে– ইংরেজি যাদের মাতৃভাষা নয়, তাদের জন্য সুরক্ষা। আমার রাজ্য ম্যাসাচুসেট্সে আইন অনুযায়ী পাবলিক স্কুলগুলোকে ইংরেজি শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রোগ্রামের মাধ্যমে, বিশেষভাবে ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিক্ষকরা, ইংরেজি শেখানোর সাথে অন্যান্য যে বিষয় পড়ানো হচ্ছে তাতে যাতে দক্ষতা আসে, তার জন্য তার ভাষাতে সহায়তা দিয়ে একাডেমিক সাফল্য পেতে সাহায্য করছেন।

শুধু কি পড়শোনা? কোভিড ১৯-এর সময় থেকে আমার রাজ্যে পাবলিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা স্কুল থেকে বিনামূল্যে ব্রেকফাস্ট এবং লাঞ্চ পায়। শারীরিক বা মানসিক অথবা পারিবারিক কারণে স্কুলে বেশিদিন অনুপস্থিত থাকলে প্রাণপণ চেষ্টা করা হয় যাতে শিক্ষার্থীরা ফিরে আসে স্কুলে। জীবনের সমে ফিরে আসে। কোনও ধরনের সমস্যাতেই তাদের ছোট অথবা একটু বড় হয়ে যাওয়া হাতগুলো ছেড়ে দেওয়া হয় না। তাই আজ যখন শুনি উকিল দিতে না পারা কোনও বাবা; যিনি আদালতে ছেলেমেয়ের সঙ্গে যেতে পারছেন না ডিপোর্টেড হয়ে যাবার ভয়ে, কিন্তু জানতে পারছেন না আদালতে কী হচ্ছে তাঁর ছেলেমেয়েদের; আদালতের সমস্ত রেকর্ড যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য খোলা থাকে, সেখানে বেআইনি অভিবাসীদের সন্তান, যাদের নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য ক্ষমতা নেই, তাদের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যাচ্ছে ইমিগ্রেশন আদালতের বন্ধ দরজার ওপারে– সেটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া কী? বেআইনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইসবাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া, এপস্টেইন স্ক্যান্ডালে গলগল করে বেরিয়ে আসা তথাকথিত এলিটদের দুর্গন্ধময় পুঁজরক্ত, কারণ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ-ক্ষতিগ্রস্ত সারা পৃথিবী– এই বছরের প্রথম তিন মাস। আর এই গ্রহণ লাগা পৃথিবীতে আমার কাছাকাছি হারিয়ে যাচ্ছে ছোট কিছু মানুষ। নিঃশব্দে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved