Robbar

নিবিড় সংশোধন ভুলিয়ে দিচ্ছে– মানুষ মানুষের জন্য

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 3, 2026 5:55 pm
  • Updated:April 3, 2026 6:03 pm  

আমরা আসলে এত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছি, আজকাল আর এই খবরগুলো আমাদের বিবেক স্পর্শ না। তাই আব্দুল হালিমরা বা খইরুল শেখরা হারিয়ে গেলেও আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা কোভিডের সময়েও যেমন শুধু নিজেদের নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি, আজও তেমনই শুধু নিজেদের নাম আছে কি না, তাই নিয়ে চিন্তিত। তথাকথিত ভদ্রবিত্তের এই স্বেচ্ছাবৃত্ত উন্নাসিকতা আমাদের আরও বিচ্ছিন্ন করছে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের থেকে আর তার লাভ নিচ্ছে বিভেদকামী বাংলা বিরোধীশক্তিরা। অথচ আমাদেরও তো বলা উচিত, ‘মোদের কোনও দেশ নাই, মোদের কোনও বাসা নাই’।

সুমন সেনগুপ্ত

কেমন আছে খইরুল শেখ? মনে পড়ছে তাঁর কথা?

আমাদের সহনাগরিক। তাঁকে নিয়ে আগে এখানেই লিখেছিলাম, ‘একটা বানান ভুল, কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবনও’। প্রকাশিত হয়েছিল ১ নভেম্বর, ২০২৫ সালে। তখন ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। মানুষজন নিজের তাগিদে ২০০২ সালের তালিকা খুঁজে বের করছেন। এর মধ্যে শোনা গেল খইরুল শেখের কথা। তখন তাঁর বয়স ৬০ পেরিয়েছে। খুব বেশি পড়াশুনা করেছেন, এমন নয়। শরীর কিন্তু শক্তপোক্ত ছিল। গায়ে গতরে খেটে রোজগার করতেন। কখনও ভ্যান চালানো, কখনও জনমজুরের কাজ এইভাবে তিনি সংসার চালাতেন। একদিন খবর পাওয়া গেল– কীটনাশকের বোতল থেকে গলায় ঢেলেছিলেন বিষ! তারপর হাসপাতালে বেশ কয়েকদিন থাকার পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।

তখন তাঁর আশঙ্কা ছিল, তাঁর নামের বানান ২০০২ সালে যা ছিল, তার সঙ্গে ২০২৫ সালের তালিকার নামের ফারাক আছে, সেই কারণে তাঁর নাম বাদ পড়বে না তো? যদি বাদ যায়, তাহলে তো তাঁকে বাংলাদেশে চলে যেতে হবে, অথচ তিনি তো এই দেশেই জন্মেছেন। এই দেশেই তিনি ঘাম ঝরিয়েছেন, শ্রম দিয়েছেন। তাহলে কেন অন্য লোকের ভুলে তাঁকে এই দেশ থেকে চলে যেতে হবে? এই আশঙ্কাতেই সেদিন তিনি কীটনাশক খেয়েছিলেন।

সেদিন তিনি যে-কারণে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন, তাঁর সেই আশঙ্কাই কিন্তু আজ সত্যি হয়েছে। আজও তিনি ‘বিবেচনাধীন’। এখনও বিচার-বিভাগের লোকজন তাঁর বিষয়টি দেখে উঠতে পারেনি। তাঁর নাম যে অতিরিক্ত তালিকায় থাকবে, খুব যে আশা আছে, তা নয়। কারণ, খইরুলের আশপাশের বহু মানুষের পরিণতি দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তার জন্য কি খইরুলকে দোষ দেওয়া যায়?

গতবার ১২ দিন হাসপাতালে থেকে ফিরে এলেও, এখন উনি জানেন যে, তাঁর মাথার ওপর এই ঘন কালো মেঘ সহজে কাটবে না। এখনও তিনি মনে করেন, আবার বিষ খেলে হয়তো তাঁর সমস্যার একবারে সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তা যদি না হয়, আবার যদি বেঁচে ফেরেন, তাহলে কী হবে?

শুধু খইরুল শেখ নন, আরও অসংখ্য মানুষ সারা বাংলা-জুড়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের নামই বাদ গিয়েছে বিচারকদের কলমের খোঁচায়। কী করবেন তাঁরা জানেন না। অথচ নির্বাচন কমিশন বা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে কোনও সুরাহা পাওয়ার আশাও এখন আর করা যাচ্ছে না। যে সর্বোচ্চ আদালতের দায়িত্ব ছিল এই প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক স্বীকৃতি আছে কি নেই– সেই রায় দেওয়ার, তা না করে ওই রায়কে স্থগিত রেখে সর্বোচ্চ আদালত এই প্রক্রিয়াকে কীভাবে দ্রুত বাংলায় নামানো যায়, সেইদিকে লক্ষ্য রেখে তারা কাজ করে গিয়েছে।

দিনহাটার খইরুলের স্ত্রী আছে, একটি মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তান আছে। স্ত্রী আমিনার নাম তালিকায় উঠেছে। কিন্তু তাঁর নাম উঠবে কি না, তিনি জানেন না। এরপর কি শুধুই অন্ধকার? আর ভাবতে পারছেন না খইরুল। অথচ নির্বাচন কমিশন, যাঁদের কাজ ছিল সমস্ত মানুষকে নিশ্চয়তা দেওয়ার, তারা তোতাকাহিনির মতো, নিজেদের তৈরি করা নিয়ম থেকে এতটুকু সরতে নারাজ। না, তা অবশ্য নয়, তারা সরেছেন, নিজেদের কথা থেকেই সরেছেন। প্রথমে তারা বলেছিলেন– ২০০২ সালের তালিকায় যাদের নাম আছে, তাদের কোনও চিন্তার কারণ নেই, তাঁরা শুধু ওই নির্দিষ্ট ফর্মটি পূরণ করলেই কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু খসড়া তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে যখন দেখা যায় যে, কেন্দ্রের শাসকদলের পছন্দমতো হয়নি, তখন তারা তাদের নিয়মে বদল আনে। আনা হয় লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-র মতো এক আজব নিয়ম, যার ফলে বিচারাধীন হয়ে যান খইরুল শেখের মতো মানুষজন।

তারপরে আসরে নামে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। যাদের কাছে মানুষ একটা সময়ে পৌঁছত একটু বাঁচার ও সুবিচারের আশায়, সেই আদালত খইরুলদের মতো মানুষদের সহায় না হয়ে, কী করে আরও দ্রুত এই ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ শেষ করা যায়, তাই নিয়ে তৎপর। যদিও তারা প্রথমে আশ্বাস দেয় যে, কোনও ভোটারের নাম বাদ যাবে না, বানান ভুলের জন্য কাউকে শুনানির নামে হেনস্থা করা হবে না, তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন সেই কাজটিই করে। কেউ তাদের কাজের ভুল দেখালে, কীভাবে তা নিচুতলার বিএলও কিংবা ইআরও কিংবা এইআরও-দের দিকে ঠেলে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা করে গিয়েছেন তারা।

তার মধ্যে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে বিএলও থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষদের মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। কেউ চাপ সহ্য করতে না পেরে, কেউ ভয়ে, আতঙ্কে আত্মহত্যা করেন। সেই মৃত্যু নিয়েও রাজনীতি হয়। এই এসআইআর-কে যেহেতু রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সমর্থন করছেন, তারা বলতে থাকে এগুলো সবই সাধারণ মৃত্যু, এসআইআর-এর কারণে মৃত্যু বলে অপপ্রচার হচ্ছে। এখনও অবধি প্রায় ২০০ জন মারা গিয়েছে। আসলে মৃত মানুষ তো কথা বলে না, তাই জানাও যায় না কারণ, কিন্তু মারা যাওয়ার চেষ্টা করে যাঁরা বেঁচে ফিরে আসেন, তাঁরা বলতে পারেন, কেন তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। খইরুল, সেইরকম একজন মানুষ। কিন্তু পরেরবার কী হবে, যদি তিনি আবারও একইভাবে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তখন যদি তিনি মারা যান, তখন সরকার বা রাষ্ট্র মানবে তো তাঁর মৃত্যুর জন্য এসআইআর এবং নাগরিকত্ব হারানোর ভয় দায়ী?

খইরুল শেখ তো তাও কথা বলতে পারেন, কিন্তু বসিরহাটের আব্দুল হালিমের কী হবে?

তিনি তো কথা বলতে পারেন না। তাঁকে শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়। তিনি তাঁর কাগজপত্র নিয়ে পৌছনোর পরে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকেরা তাঁর সাংকেতিক ভাষা বুঝতে না পেরে, তাঁকেও বিচারাধীনের তালিকায় রেখেছেন!

আমরা আসলে এত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছি, আজকাল আর এই খবরগুলো আমাদের বিবেক স্পর্শ না। তাই আব্দুল হালিমরা বা খইরুল শেখরা হারিয়ে গেলেও আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা কোভিডের সময়েও যেমন শুধু নিজেদের নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি, আজও তেমনই শুধু নিজেদের নাম আছে কি না, তাই নিয়ে চিন্তিত। তথাকথিত ভদ্রবিত্তের এই স্বেচ্ছাবৃত্ত উন্নাসিকতা আমাদের আরও বিচ্ছিন্ন করছে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের থেকে আর তার লাভ নিচ্ছে বিভেদকামী বাংলা বিরোধীশক্তিরা। অথচ আমাদেরও তো বলা উচিত, ‘মোদের কোনও দেশ নাই, মোদের কোনও বাসা নাই’। আমাদেরও তো খইরুল আমিনাদের পাশে দাঁড়িয়ে, আব্দুল হালিমের সাংকেতিক ভাষাকে নির্বাচন কমিশনের কানে তোলার দায়িত্ব ছিল, আমরা কি তা করলাম?

আমরা তো বলতে পারলাম না, আমরা তো আশ্বাস দিতে পারলাম না খইরুল শেখকে। সোচ্চারে নির্বাচন কমিশনকে বলতে পারলাম না, এই এসআইআর মানুষ মারা প্রক্রিয়া, এই এসআইআর বাতিল করো। পারলাম না বলেই, মান্যতা পেয়ে গেল একটা অসাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এ-প্রসঙ্গে মনে পড়ছে তারাপদ রায়ের লেখা সেই কবিতা–

‘অনেক চেষ্টা, দৌড়োদৌড়ি করে
জীবনে যা সম্ভব হয়নি
মৃত্যুর পরে ভোটার তালিকায়
নাম উঠল সত্যপ্রকাশের।
শুধু তাই নয়,
মৃত্যুর পরে জীবনে এই প্রথমবার
সত্যপ্রকাশ ভোটও দিলেন’

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

…………………….