mosquitos their types behavior and habitat | Robbar
Robbar
  • ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মশা নিয়ে মশকরা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাইজের মশা। ‘এলিফ্যান্ট মসকুইটো’। বৃহত্তম প্রজাতির মশা, কিছু কিছু ১.৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা। একটা বড়, নিরীহ মশা যা মানুষকে কামড়ায় না বা রক্তও খায় না। প্রাপ্তবয়স্করা ফুলের মধু, ফলের রস এবং লতাপাতার রস খেয়ে বেঁচে থাকে। তাদের লার্ভা আবার উপকারী শিকারী, যারা অন্যান্য রোগ-বাহক মশা প্রজাতির লার্ভা খায়। এই কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকার কারণে এরা ‘সুপারহিরো মশা’ উপাধি পেয়েছে। 

শেষ আপডেট: আগস্ট ১৯, ২০২৬, ২১:৩২   
Facebook WhatsApp Messenger

২৮.

মশকরা

একটা সময় গেছে যখন জোকসের বেশ আদরকদর ছিল। আনন্দমেলাতে ছাত্র-শিক্ষক বা বন্ধু-বন্ধুদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর আকারে থাকত ছোটদের জন্য নক-নক কিংবা হাতি জোকস। আমার প্রিয় ছিল হাতি জোকস। হাতিদের নিয়ে নানান রকমের কৌতুক। সেগুলো শুনলে মুহূর্তে চমৎকার একটা ছবি তৈরি হত মনের মধ্যে। বাস্তবে কতটা সত্যি তা জানার দরকার হত না, কল্পনার জগতে অসাধারণ। 

জোকসগুলো প্রশ্নোত্তর আকারেই। যেমন– প্রশ্ন: একটা চেয়ারে যদি হাতি বসে তাহলে কীসের সময় হয়েছে বলে মনে হয়? উত্তর: চেয়ারটা বদলানোর। আর একটা, প্রশ্ন: কাল রাতে তোমাদের ফ্রিজের মধ্যে যে হাতি ঢুকেছিল সেটা তুমি কী করে জানলে? উত্তর: কেন মাখনে হাতির পায়ের ছাপ দেখে! 

zoom

এমন অনেক চমৎকার হাতি জোকস, যেগুলো আজও মনে করলে আনন্দ পাই। আপনাদেরও হয়তো জানা থাকবে সেসব। জীবনে কোনওদিন ভুলব না এমন আরও একটা– প্রশ্ন: হাসপাতালের বেডে একটা আহত হাতি শুয়ে আছে, আর তার পাশের বেডে শুয়ে আছে একটা মশা, কেন? উত্তর: যদি প্রয়োজন হয় রক্তদান করবে বলে।

মিশুকে

মাঝে অনেকদিনের জন্য আমার একটা বন্ধু মশা ছিল। বেশ মিশুকে স্বভাবের। সে বসবাস করত আমার বেডরুমের লাগোয়া টয়লেটে। আর পাঁচজনের মতো আমারও অনেকটা ভাবনাচিন্তা, আইডিয়া খোঁজা ওই টয়লেটে। পোষা মশা বা বন্ধু মশা, যাই বলুন, সে আমার দিনের অনেকটা মূল্যবান সময় নিয়ে নিত। তবে মন্দ লাগত না। 

আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে দিনের বেলায় আধো-অন্ধকারে কিংবা ছায়ায় ওদের বসবাসের সবচেয়ে প্রিয় দুটো জায়গা। একটা হচ্ছে টয়লেট আর একটা রান্নাঘর। সীমিত পরিসরে ঘর সাজানোর জন্য কাজের-অকাজের অনেক জিনিস লুকিয়ে রাখার এই দুটো জায়গাই আমাদের স্টোররুম। রান্নাঘরের অতিথি অবশ্য আরও আছে। পিঁপড়ে আরশোলা মাছি ইত্যাদি। 

zoom

বন্ধু মশার সঙ্গে সময় কাটানোর সময় যা যা ঘটত টয়লেটে, তার মধ্যে প্রধান: আমরা দু’জন দু’জনকে দেখতাম। কখনও কখনও ও আমার কানের কাছে গান গাইতে গাইতে ওখানেই বসে পড়ত বা দূর থেকে হঠাৎ এসে নাকের ডগা ছুঁয়ে দিয়ে চলে যেত দূরে। কখনও কখনও ধীরগতিতে, আবার কখনও বা দ্রুত গতিতে কপালে দু’-তিনবার ঠোক্কর মেরে, দেওয়াল আর কপাল, কপাল আর দেওয়াল করে সে এক অদ্ভুত খেলা খেলত। ও আমার মধ্যে কী দেখত তা তখন জানতাম না, অনেক পরে জেনেছি। আমি ওর মধ্যে যা দেখতাম সেগুলোর মধ্যে ছিল ওর গান, ওড়ার গতি এবং ওড়ার চরিত্র। লুকোচুরি খেলার ধরন, শরীরের চলন এবং উপস্থিত বুদ্ধি, আর ছিল যে কোনও জিনিসপত্রের সঙ্গে মিশে গিয়ে তার পাশে লুকনোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা। সব ছাপিয়ে যে জিনিসটার ওপরে আমার সবচেয়ে বেশি হিংসা, সেটা হচ্ছে ওর দেখার চোখ। দৃষ্টি ক্ষমতা।

মশার চোখ দু’টি হল যৌগিক চোখ, কম্পাউন্ড আইজ। যা শত শত ছোট ছোট লেন্স দিয়ে তৈরি, যা তার দেখার ক্ষমতা ও আমাদের চলাফেরা শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এও জেনেছি, মশা গান গায় না, তবে তাদের ডানার দ্রুত কম্পনের ফলে ‘ভনভন’ যে শব্দ তৈরি হয়, তা আমাদের কানে গানের মতো মনে হয়। হতে পারে অন্য মশার সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ কম্পাঙ্কের শব্দ সৃষ্টি। মশার মস্তিষ্ক খুব ছোট হলেও, তাদের স্নায়ুতন্ত্র খুব দ্রুত কাজ করে।

মশার ওড়ার গতিবেগ খুবই কম। ফ্যানের বাতাসের গতির চেয়েও মশার গতি কম। তাই জোরে ফ্যান চললে মশা কাছাকাছি আসতে পারে না। বেশিরভাগ মশা সাধারণত ২৫ ফুটের নিচে ওড়ে, তবে কিছু প্রজাতি বহুতল ভবনের ২০ তলা পর্যন্ত উপরে উঠে যায় আজকাল। আরও একটা জিনিস লক্ষণীয়, মশা ওড়ার সময় হেলিকপ্টারের মতোই এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারে। যাকে বলে ‘হোভারিং’। মশার ডানার অতি দ্রুত কম্পন, সেকেন্ডে প্রায় ৩০০-৬০০ বার। বিশেষ ওড়ার কৌশল তাদের বাতাসের একই স্থানে স্থির থেকে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটা মশার একটা অত্যন্ত চমৎকার জৈবিক ক্ষমতা, যা তাদের শিকার বা নির্দিষ্ট স্থানে বসার আগে জায়গা পর্যবেক্ষণ করতে সুবিধে হয়।

zoom

রক্তপান

মশারা আসলে রক্তপায়ী প্রাণী নয়। তবে মশারা আমাদের রক্ত নেয়, কারণ শুধুমাত্র স্ত্রী মশারা ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ডিমের পুষ্টির জন্য ওটা সংগ্রহ করে। পুরুষ মশা এবং কিছু স্ত্রী মশা রক্তের দিকে নেই। তারা ফুলের মধু বা লতাপাতার রস খেয়েই দিব্যি আছে। এই রক্ত সংগ্রহের ব্যাপারেও তাদের নানা বায়নাক্কা। যার তার রক্ত চলবে না। পছন্দসই শরীরের গন্ধ, বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করা শরীর, ঠিকমতো তাপমাত্রা থাকা এবং গর্ভবতী নারীর দিকে তার বেশি নজর। যে কোনও রক্তও নয় আবার, সেটা হতে হবে ‘ও’ গ্রুপের। সবচেয়ে ভালো ‘ও পজিটিভ’। মোটা মানুষ, কালো, ফর্সা মানুষের ব্যাপার আছে, আর গাঢ় রঙের পোশাক পরা ব্যক্তিরা বেশি আক্রান্ত হয়। 

রক্ত গ্রহণের ব্যাপারটায় ব্যাপক আয়োজন। রীতিমতো একটা মিনি অপারেশন থিয়েটারই বানিয়ে ফেলে মশারা রক্ত নেওয়ার সময়। ওরা যখন আমাদের কামড়ায় তখন আসলে কী ঘটছে তা আমরা সবটা বুঝতে পারি না। বেশিরভাগ মানুষ মশাকে যতটা ভাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মশা যখন রক্ত নেয়, তখন সে খুব সূক্ষ্ম এবং এমন নমনীয় শুঁড় ব্যবহার করে, যেটা ত্বকের মধ্যে ঢোকার সময় আমরা প্রায় কিছুই বুঝতে পারি না।

zoom

বুঝতে পারি না আরও একটা বিশেষ কারণে। শুরুতে ওদের লালার সঙ্গে মেশানো এক রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া করে, যা সেই জায়গাটিকে সাময়িকভাবে অসাড় করে দেয়। সে কারণে আমরা ব্যথা অনুভব করি না। তাছাড়া ‘ব্লাড থিনার’ হিসেবে আরও এক রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারে রক্ত তরল থাকে, জমাট বাঁধে না। যা ওদের অতি সূক্ষ্ম নলের সাহায্যের রক্ত নেওয়ার কাজ সহজ করে। কাজ শেষ করে উড়ে যাওয়ার পরেই ব্যথা ফিরে আসে; আর যে সমস্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করেছে, সেটা আমাদের শরীর মেনে নিতে না পারলে ওই অংশটা ফুলে যায় আর চুলকায়। যাকে আমরা বলি অ্যালার্জি। 

মশার এই বুদ্ধি এবং দক্ষতা থেকে মানুষও পেয়েছে নতুন নতুন আইডিয়া। বিষয়টি মাথায় রেখেই গবেষকরা ‘মাইক্রোনিডলস’ নামে একটা প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। এটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম সূঁচের মতো, যা ত্বকে ব্যথাহীনভাবে প্রবেশ করতে পারে। কিছু প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মশার অনুকরণে তৈরি রোবটিক সূঁচ তৈরি করেছেন জাপানের কিছু বিজ্ঞানীরা। যেটা মশার শুঁড়ের মতো রক্ত নিতে পারে খুব কম ব্যথা বা কোনও ব্যথা ছাড়াই। আর একটা, মাইক্রোনিডল প্যাচ। এটা ত্বকের উপর লাগিয়ে দিলে রক্ত বা ওষুধ প্রবেশ করানো যায় ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে, ব্যথা ছাড়াই। লেজার ও অ্যাল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তিতে কিছু ক্ষেত্রে রক্ত না নিয়ে শুধু ত্বকের উপর থেকে নির্দিষ্ট তরঙ্গ ব্যবহার করে রক্তের গ্লুকোজ বা অন্যান্য উপাদান পরিমাপ করার গবেষণাও চলছে।

zoom
মশার চোষক নল, শব্দচিত্র

পাহারাদার 

যাচ্ছিলাম ‘বাসেলটন জেটি’ দেখতে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার একটা অবশ্য দ্রষ্টব্য এবং পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে দীর্ঘতম এই কাঠের জেটি। সমুদ্রের মধ্যে ১.৮৪১ কিলোমিটার লম্বা জেটির শেষ প্রান্তে পায়ে হেঁটে যেতে প্রায় আধ ঘণ্টা লাগে, তাই এটার উপর দিয়ে মিনি রেলগাড়ির ব্যবস্থা।

zoom
বাসেলটন জেটি

জেটির কাছাকাছি যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ দেখলাম পথের দু’পাশে বিশাল অঞ্চল জুড়ে জঙ্গল। লম্বা বড় বড় গাছ আর তার নিচে কচুপাতার মতন গাঢ় সবুজ পাতার মধ্যে মাথা তুলে ধবধবে সাদা আরুম লিলির ঠাসা জঙ্গল। লম্বা সবুজ ডাঁটার মাথায় আভিজাত্য নিয়ে ভীষণ সুন্দর পুরু সাদা একটা পাপড়ির মোড়ক এবং তার মধ্যে হলুদ একটি পরাগ ডাঁটি। পাপড়ির ওপর দিকটা পানপাতার মতো ছুঁচলো। ফুলগুলো দেখে প্রচণ্ড রকমের উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। আমার ভীষণ প্রিয় মেক্সিকান শিল্পী দিয়েগো রিভেরার ছবিতে এই লিলি দেখেছি। দু’বাহু জড়িয়ে ওই ফুলগুলোকে নিয়ে বাজারে বিক্রি করছে মহিলা লিলি সেলার। ছবিতে নানাভাবে এঁকেছেন শিল্পী দিয়েগো, যিনি কিনা ফ্রিদা কাহলোর স্বামী।

zoom
শিল্পী দিয়েগো রিভেরার ছবি

ফুল তো নয় একেবারে ঘন সবুজের মধ্যে তারার মতো ফুটে আছে হাজার হাজার দিয়েগো লিলি। গাড়ি থামিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সেই কচু বাগানে, আরুম লিলির ছবি তুলতে। কিন্তু এই লিলির জঙ্গলে প্রবেশ সহজ ছিল না। এই জঙ্গলের যারা বাসিন্দা বা বলা ভালো, পাহারাদার, তারা আমাদের আক্রমণ করল। লক্ষ লক্ষ মশা। বিশাল সাইজ। শক্ত শরীর, যেন বর্মপরা যোদ্ধাদের মতো তাদের চেহারা। ধূসর সবুজ রঙের অসাধারণ সুন্দর মশারা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে আক্রমণ করল আমাদের। মজার ব্যাপার হল, তাদের হাত থেকে পালিয়ে আমরা যখন গাড়িতে এসে উঠলাম, দেখলাম, ক্ষতি হয়নি তেমন। চুলকায়নি, ফুলে ওঠেনি শরীরের কোনও অংশ। 

zoom
আরুম লিলির জঙ্গল

পরে জেনেছিলাম, এরাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাইজের মশা। ‘এলিফ্যান্ট মসকুইটো’। বৃহত্তম প্রজাতির মশা, কিছু কিছু ১.৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা। একটা বড়, নিরীহ মশা যা মানুষকে কামড়ায় না বা রক্তও খায় না। প্রাপ্তবয়স্করা ফুলের মধু, ফলের রস এবং লতাপাতার রস খেয়ে বেঁচে থাকে। তাদের লার্ভা আবার উপকারী শিকারী, যারা অন্যান্য রোগ-বাহক মশা প্রজাতির লার্ভা খায়। এই কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকার কারণে এরা ‘সুপারহিরো মশা’ উপাধি পেয়েছে। 

হাতি-ঘাস

আমার ঘুমের বিষয়ে আগে এক পর্বে বলেছি। বিচিত্র সে ঘুম। একবার একটা বিয়েবাড়িতে গিয়ে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। বিশেষ ঘুম, কারণ সেই বিয়েবাড়িতে এত লোকজন হয়েছিল যে, সবার রাতে শোয়ার ব্যবস্থা করা যায়নি, তাই গল্প করে আধো শুয়ে-বসে রাত কাটানোর পরিকল্পনা। এত মশা ছিল সেখানে যে রাতে কেউই দু’ চোখের পাতা এক করতে পারেনি মুহূর্তের জন্যেও। তারই মধ্যে একটি মানুষ যে সর্বক্ষণের জন্য ঘুমিয়েছিল ওই মশার মধ্যে, সেটি আমি। মশা বোধহয় আমার সেদিন থেকেই বন্ধু। কারণ আমার ঘুমটাকে সে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কামড়ায়নি। মশা যে সবাইকে কামড়ায় না সে খবর সেদিন জানা ছিল না। বন্ধুরা সেটাকে ভালো চোখে নেয়নি। আমাকে বলেছিল, তোর কি গণ্ডারের চামড়া?

zoom
হাতিঘাসের মধ্যে গণ্ডার

গণ্ডার দেখতে গিয়েছিলাম আসামের কাজিরাঙ্গার জঙ্গলে। জঙ্গল ভর্তি এলিফ্যান্ট গ্রাস। সেই বিশাল সাইজের ঘাসের জঙ্গলে হাতি ডুবে যায়। আমরা শীত শীত ভোরে হাতির পিঠে চড়েই গণ্ডার খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। ঘাসের জঙ্গলে গণ্ডার ছাড়াও আরও অনেক কিছুই দেখেছিলাম। অনেক রঙিন পাখি, ছোট ছোট জন্তু-জানোয়ার। এছাড়া দেখেছিলাম বাঘে-চিবনো হরিণের হাড়গোড় কোথাও কোথাও। আর দেখেছিলাম মশা। মশা তাহলে গণ্ডারকেও ছাড়ে না! কৌতুহল, গণ্ডারকে কি মশা কামড়ায় বা গণ্ডারের রক্ত নিতে পারে?

হ্যাঁ, মশা গণ্ডারের রক্ত নিতে পারে। স্ত্রী মশা ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের সন্ধানে গণ্ডার-সহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত শোষণ করে। এমনকী হাতিরও। জলে-জঙ্গলে কাউকে ছাড়ে না মশা। সাপ, ব্যাঙ, মাছ, কুমির। গণ্ডারের মোটা চামড়ার যেসব জায়গায়, যেমন কানের পেছনে, পেটের নিচে যেখানে চামড়া পাতলা থাকে, মশা সাধারণত সেসব জায়গায় কামড়ায়। মশা হাতিরও লেজের গোড়ায়, মুখ, চোখ, কানের মতো পাতলা চামড়ার জায়গা খুঁজে রক্ত শুষে নেয়।

অনিষ্ট

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতে, বিজ্ঞানীরা মশাকে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম বলেছেন। নিশ্চয়ই কারণ আছে। এদের এক শিকার থেকে অন্য শিকারে বিপজ্জনক, রক্তবাহিত ভাইরাস এবং রোগজীবাণু ছড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে। সোজা কথায়, মশার কামড়ে প্রতি বছর ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, পীতজ্বর, জিকা ইত্যাদি রোগে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়।

zoom

মশা জেনে-বুঝে বা পরিকল্পনা করে মানুষের অনিষ্ট করে না। এটি মূলত তাদের বেঁচে থাকার ও ডিম পাড়ার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় অনিচ্ছাকৃত সংক্রমণ। মশা নিজের প্রয়োজনে রক্ত নেয়, আর রোগ ছড়ানো হল তাদের এই প্রক্রিয়ার একটি দুর্ঘটনাবশত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

মশা থেকে আমাদের যতটা অনিষ্ট হয় ততটা আমাদের থেকেও মশার জীবনের ক্ষতি হতে পারে। সে কথাটা আমরা মাথায় রাখি না। যখন আমরা মানুষেরা অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালীন ওষুধপত্র যা ব্যবহার করি, যেসব ড্রাগ শরীরে নিয়ে থাকি তা রক্তে মিশে যায়। তাই মশারা অনেক সময় আমাদের সেই রক্ত নিয়ে নিজেরাই সহ্য করতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের জীবনাবসান ঘটে।

রঙ্গ-তামাশা

একবার কলকাতার শিশির মঞ্চে খুব বড় করে ‘মূকাভিনয় উৎসব’ করা হয়েছিল। সেখানে আমারও অভিনয় ছিল। বিষয়: মশা। পরিবেশনে প্রায় অদৃশ্য এই ক্ষুদ্র প্রাণীটির উপস্থিতি এবং তার চাল-চলন ধরা পড়ছে মূকাভিনেতার অঙ্গ সঞ্চালনায়। অভিনেতার চরিত্র: বংশীবাদক। সে বাঁশের বাঁশি বাজায়। তখনকার দিনে মূকাভিনয়ের মঞ্চে শিল্পী একা থাকত। সেবারে বাড়তি প্রপ ব্যবহার করা হয়েছিল। ফুটদেড়েক লম্বা একটা বাঁশের লাঠি। দূর থেকে সেটাকে বাঁশি বলে মনে হয়। আর ছিল মঞ্চের ঠিক মাঝখানে একটা কাঠের টুল। 

zoom
প্রতীকী ছবি

অভিনয়াংশে বাঁশিবাদক মঞ্চে প্রবেশ করবে হাসি হাসি মুখে এবং শান্ত হয়ে টুলটাতে বসবে। তারপরে একটা হাঁটুর ওপরে অন্য পা টা তুলে বসে দু’ হাতে লাঠিটি ধরে ঠোঁটে ঠেকিয়ে কেষ্ট ঠাকুরের ভঙ্গিতে বাঁশিতে মনোনিবেশ করবে। দু’-একবার শান্ত মনে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে শব্দ পরীক্ষা করে নেওয়ার ভঙ্গি করার পরে হঠাৎ চমকে গেল সে। ডান হাতটা বাঁশি ছেড়ে, তার কড়ে আঙুলটি ডান কানের মধ্যে ঢুকিয়ে দ্রুত নাড়ল শিল্পী বিস্ফারিত চোখে। যেন একটা মশা ভনভনিয়ে ঢুকে পড়েছে কানের ফুটোতে। কানের মধ্যে আঙুলটা কিছুক্ষণ রেখে তারপরে যখন বের করল, তখন দেখল ভেতর থেকে কেউ বেরল না। অর্থাৎ ওখানে মশাটি ঢোকেনি। বাঁশি বাজানোর মেজাজ গেল নষ্ট হয়ে। 

বাঁ-কানে ঢুকল মশা এবার। বেরিয়ে মাথার চারপাশে দু’-তিন পাক ঘুরে নাকের ডগার সামনে উড়তে থাকল। অভিনেতা ওকে এবার হাত জোড় করে টুলের উপরে বসতে বলল। ভাবখানা এমন, তুইও তো গান গাইতে পারিস, দয়া করে শান্ত হয়ে টুলের ওপরে বোস আর এই বাজনা শোন, কাজে আসবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মশার তখন খেলায় পেয়ে বসেছে। সে ডাইনে-বাঁয়ে, আগে-পিছে, দূরে-কাছে, কখনও লুকোচুরি টুলের নীচে, কখনও মাথার ওপরে। নানানভাবে বিরক্ত করতে থাকল অভিনেতাকে। প্রথমে হাততালি দিয়ে বা চড়-চাপড়ে শায়েস্তা করতে চাইল মশাকে। ফল হল না। 

শেষে হাতে তুলে নিল বাঁশি। বাঁশি হয়ে উঠল লাঠি। লাঠিটা নিয়ে সামনে মশার সঙ্গে চলল খানিক ব্যাটিং। পরে সেই বাঁশি হয়ে উঠল অসি। শুরু হল তলোয়ার যুদ্ধ। অভিনেতা দাপিয়ে বেড়াতে থাকল মঞ্চজুড়ে। ক্রোধ মধ্যলয় পেরিয়ে দ্রুতে পৌঁছেছে। বাঁশি ফেলে রেখে খালি হাত এবার। শরীরে তখন তার যুদ্ধের মাতন। আজ তাকে ধরে ছিন্নভিন্ন করে ছড়িয়ে দেবে চারিদিকে। শেষে সত্যিকারের তাকে ধরল হাতের মুঠোর মধ্যে। দু’হাতে চেপে তাকে মারল। তারপরে বৃদ্ধাঙ্গুল এবং তর্জনীর মুদ্রায় সেই ক্ষুদ্র প্রাণীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো নিয়ে ছড়াতে থাকল মঞ্চময়। সশব্দ পদচালনায় কথাকলির স্টেপিং আর শরীরের ছন্দে যেন সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে শিবের প্রলয় নৃত্য, তাণ্ডব। যেন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মশার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তৈরি হচ্ছে সতীপীঠ।

zoom

এতক্ষণে বংশীবাদক মঞ্চ থেকে কুড়িয়ে নিল তার বাঁশিটি। ক্লান্ত দেহে শ্বাসকে শান্ত করতে করতে টুলের ওপরে বসল। তারপর আলতো হাতে বাঁশিটি ঠোঁটের কাছে নিয়ে এল। তাতে ফুঁ দেওয়ার আগে বাঁ-হাতের আঙুল রাখল বাঁশির মুখের কাছের ফুটোতে। ডান হাতের আঙুল যখন নিচের ফুটোগুলোয় রাখছে, তখন লক্ষ করল বাঁশির শেষ প্রান্তে চুপটি করে বসে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে, মশাটি, বংশীবাদকের দিকে।

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ২৭: কাণ্ডজ্ঞানগম্যি

পর্ব ২৬: আয় ঘুম যায় ঘুম

পর্ব ২৫: ধুলোবালির পর বালিধুলো

পর্ব ২৪: তালাচাবির বন্ধুত্ব

পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা

পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন

পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প

পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?

diego rivera diseases Malaria mosquito mosquito net Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar zoology

Share this article on