
বহু মানুষ যখন ভাষা, জাতি, ধর্মের মতো নির্দিষ্ট কোনও পরিচিতি আঁকড়ে ধরে, একটি ভূখণ্ডে নিজেদের অধিকার কায়েম করে, তখনই রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাবনার মূলে ছিল বহুত্বের স্বীকৃতি। নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানকে আপন করার প্রকল্প। দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে-র অনন্ত লেনদেন। আজ এনআরসি কিংবা এসআইআর যেন সেই রাষ্ট্রভাবনার মূলেই আঘাত হানছে। কলমের একটি আঁচড় নতুন করে ছিন্নমূল করছে কত অসংখ্য মানুষকে।
নাগরিকত্ব। এই শব্দটির সংজ্ঞা আমরা প্রায়শই খুঁজি ফেলি রাষ্ট্র ও সংবিধানের রাজনৈতিক আলোচনায়। কখনও তা কাঁটাতারের সঙ্গে যুক্ত হয়, কখনও ভোটাধিকার, আবার কখনও বা জন্মপরিচয়পত্রের সঙ্গে। সাম্প্রতিক অতীতে ভারতে যে-নতুন নথিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়া SIR (Special Intensive Revision) গৃহীত হয়েছে, তা খাতায়-কলমে মূলত ভোটার তালিকার বিশেষ পুনর্বিবেচনা বা হালনাগাদ করার একটি প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্য নাগরিকদের পরিচয়, বসবাস এবং বৈধতার প্রমাণপত্র যাচাই। কিন্তু এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কেবল তথ্য সংগ্রহ ও প্রমাণে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন অস্তিত্বে, বিশেষত নাগরিক হিসেবে তাদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং পরিচয়ের প্রশ্নে।

এসআইআর নিয়ে কলকাতার রাস্তায় কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই শোনা যাবে বিভিন্ন মত। কেউ বলছেন বাংলাদেশিদের নাম বাদ গিয়েছে, কেউ বলছেন মুসলমানদের, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, ‘বাকিরাও কি নিরাপদ?’ এখানেই প্রশ্ন জাগে, নাগরিকত্ব আসলে কী? সহজ বাংলায় বললে, ‘বাসিন্দা’। কিন্তু বাসিন্দা কে? তা কি শুধুই ভূগোলের সীমারেখা নির্ণয় করে? তা কি স্রেফ একটি আইনি সংজ্ঞা? নাকি ইতিহাসের উত্তরাধিকার, যা ফুটে ওঠে প্রতিদিনের সহাবস্থান, স্মৃতি ও সম্পর্কে?
সলমন রুশদি তাঁর ‘Imaginary Homelands’-এ বলেছিলেন– ‘অতীত আসলে একটা দেশ, যেখান থেকে আমরা সবাই একদিন না একদিন চলে আসি।’ এই ভাবনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ‘গৃহ’ হয়তো কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং স্মৃতি, মানুষ এবং অনুভূতির সমষ্টি, যা আমরা নিজের ভিতরে বহন করি।
একইভাবে নাগরিকত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রভাবনার ওতপ্রোত সম্পর্ক। চিন্তক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘imagined community’ (কল্পিত সমাজ) হিসেবে। বহু মানুষ যখন ভাষা, জাতি, ধর্মের মতো নির্দিষ্ট কোনও পরিচিতি আঁকড়ে ধরে, একটি ভূখণ্ডে নিজেদের অধিকার কায়েম করে, তখনই রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাবনার মূলে ছিল বহুত্বের স্বীকৃতি। নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানকে আপন করার প্রকল্প। দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে-র অনন্ত লেনদেন। আজ এনআরসি কিংবা এসআইআর যেন সেই রাষ্ট্রভাবনার মূলেই আঘাত হানছে। কলমের একটি আঁচড় নতুন করে ছিন্নমূল করছে কত অসংখ্য মানুষকে।

কলকাতায় নিজের পাড়া ছাড়া গবেষণার প্রয়োজনে যে-পাড়ায় সবচেয়ে বেশি ঘুরে বেরিয়েছি, তা হল বো ব্যারাক। কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক মহল্লা। সেখানে আমার বন্ধুদের কাছে এসআইআর নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছিলাম। বেশিরভাগই বললেন নথি, কাগজপত্র এবং বৈধতার কথা। অতীত নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের অনাগ্রহ লক্ষ্য করেছি আগে থেকেই। এক বন্ধু বলেছিল, “আমরাই একমাত্র জনজাতি, যাদের নামে ‘ইন্ডিয়ান’ শব্দটি আছে– তবুও আমরা কীভাবে ভারতীয় নই?”
অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা এক সংকর পরিচয়ের ধারক। পিতৃকুলে ইউরোপীয়, মাতৃকুলে ভারতীয়। ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি– সবকিছুতেই তারা এক মধ্যবর্তী অবস্থানে। তারা না-সম্পূর্ণ ভারতীয়, না-সম্পূর্ণ ইউরোপীয়। অথবা হয়তো দুটোই। ফলে তাদের ‘পিতৃভূমি’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপীয় বাণিজ্য ও ঔপনিবেশিক বিস্তারের মাধ্যমেই এই সম্প্রদায়ের উদ্ভব। উপনিবেশবাদ ছিল পুরুষ-প্রধান; বহু ইউরোপীয় পুরুষ ভারতে এসে স্থানীয় নারীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যার ফলেই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের জন্ম। গবেষক কোরালি ইয়ঙ্গর তাঁদের বলেছিলেন, ‘The Neglected Children of the British Raj’।

স্বাধীনতার পর এই সম্প্রদায়কে অনেকেই দেখেছেন ‘ব্রিটিশের অবশিষ্টাংশ’ হিসেবে। ফলে জন্ম নেয় সাংস্কৃতিক বৈরিতা। ‘হাফ-কাস্ট’, ‘আধা-ফিরিঙ্গি’ ইত্যাদি অপমানজনক শব্দ। সেই অপরায়ণের ছায়া ক্রমাগত দীর্ঘতর হয়। গত কয়েক দশকে কলকাতায় অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সংখ্যাও কমেছে, কারণ একের পর এক প্রজন্ম ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ‘খাঁটি’ ভারতীয়দের বৈমাত্রেয় আচরণের শিকার হয়ে।
আমার এক উত্তরদাতা বলছিলেন, ‘এসআইআর আর কী করবে বলো তো? আমরা তো অনেকদিন ধরেই শুনে আসছি যে আমরা পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী নই, কারণ আমরা নাকি বাংলা বলতে পারি না।’ অথচ গবেষণার সময়ে আমি নিজেই বিস্মিত হয়েছি, বো ব্যারাক, বেনিয়াপুকুর বা পিকনিক গার্ডেনের বহু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানই সাবলীল বাংলায় কথা বলেন!
এক্ষেত্রে ভাষার পাশাপাশি ধর্মও এক গুরুত্বপূর্ণ বিভাজনরেখা। এক উত্তরদাতা বলেছিলেন, ‘ভাগ্যিস আমরা খ্রিস্টান। আমার মুসলিম বন্ধুদের অবস্থা আরও খারাপ।’ এখানেই প্রশ্ন জাগে, পরিচয় নির্ধারণে আমরা কেন বারবার ভেঙে ফেলি মানুষকে? কখনও ভূগোল, কখনও ভাষা, কখনও ধর্মের ভিত্তিতে। অথচ আমাদের যৌথ সংস্কৃতিতে তো দেখা যায় মাতা মেরি শাড়ি পরেন, যিশুর গায়ের রং বাঙালিদের মতো বাদামি, গির্জায় জ্বলে ধূপ, স্থানীয় ভাষায় গাওয়া হয়– হাইম, ক্যারোল।

নব্য উদারবাদী বিশ্বব্যবস্থা আমাদের ক্রমশ একমুখী করে তুলছে। ডিজিটাল বাজারে চলতে ফিরতে প্রতিনিয়ত পণ্যের নেশায় মাতাল হতে হতে আমাদের সহানুভূতি কমছে, মনঃসংযোগের ক্ষমতা কমছে, কমছে মানুষের প্রতি মানুষের সহজাত টান। এক উত্তরদাতার কথায়, ‘এই রাজনীতি অন্তর্ভুক্তির নয়, বর্জনের। মানুষকে আলাদা করে রাখাই যেন এর লক্ষ্য।’ আসলে ভূমি কখনও মানুষকে ভোলে না, মানুষকে আলাদা করে মানুষই। ভ্রাম্যমাণ-কর্মপ্রবণ যে জনজাতি, এত বছর ধরে বাংলায় বসবাস করেছে, পরিত্যক্ত ব্যারাক কলোনিতে সংসার সাজিয়েছে, আবাদ গড়েছে, তৈরি হয়েছে সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি– তাদের তো আমরা শুধুমাত্র বড়দিন এলে মনে করি। তাদের পরিচয়কে সীমিত করি হোমমেড কেক বা ওয়াইনের মধ্যে। সহনাগরিক ভাবতে পারিনি। আর তাই আজ সেই মানুষদের কাছেই চাইছি নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র।

অধিক বিস্মিত হলাম, বো ব্যারাকের এক বন্ধুর কাছ থেকে আরেকটি প্রসঙ্গ শুনে। তিনি বলছিলেন, ‘Missionaries of Charity’-এর অনুদান কমিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। একইসঙ্গে উঠে এসেছে– ফ্র্যাঙ্কলিন গ্রাহাম (Franklin Graham)-এর নাম। মিশনারি ভিসার নবীকরণ নিয়েও নানা জটিলতার কথা শোনা যাচ্ছে। এ-রাজ্যেই জন্ম নেওয়া মি. গোমস খুবই দুঃখ করে বলছিলেন, বউবাজারের সেন্ট জোসেফ’স কলেজের শিক্ষক ব্রেন্ডন ম্যাককাথাই-এর কথা। আইরিশ জন্ম পরিচয়ের সেই মানুষটি ভারতে ছিলেন প্রায় ৬২ বছর। নিরলস পরিশ্রম করেছেন আঞ্চলিক ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য, অথচ ভিসা নবীকরণ না-হওয়ার কারণে তাঁকেই আজ ফিরে যেতে হয়েছে আয়ারল্যান্ডে– যে দেশটিকে তিনি জন্মভূমি হিসেবে পেয়েছিলেন, কিন্তু কর্মভূমি হিসেবে ভালোবেসেছিলেন এই ভারতকেই।

এই অসহিষ্ণুতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? বিশ শতকের পৃথিবী ভ্রাম্যমাণতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, রাষ্ট্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় স্বপ্ন দেখিয়েছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন স্রোতের মিলন ও সহাবস্থানের। সেই পৃথিবীতেই এখন প্রাধান্য পাচ্ছে আঞ্চলিকতা। বহু দেশে অভিবাসী-বিরোধী আন্দোলন ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শহরের পথে পথে পাড়ায় পাড়ায় বেআইনি সন্দেহে কেন্দ্রীয় সংস্থার পেয়াদারা আটক করছে মূলত বাদামি রঙের মানুষদের। এই ঘৃণার বসতি গড়ে সহনাগরিককে, বলা ভালো পাশের মানুষটিকে দূরে ঠেলে দিয়ে, এক টুকরো কাগজে তার পরিচয় খুঁজে, আমরা কি এক ভয়ংকর ইতিহাস-বিস্মৃতির দিকে এগচ্ছি না?
…………………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন শুচিস্মিতা দাস-এর অন্যান্য লেখা
…………………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved