Robbar

গাজনের ‘সং’ কি নিছক অশ্লীলতার সংস্কৃতি?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 11, 2026 7:21 pm
  • Updated:April 11, 2026 7:57 pm  

‘ভদ্রলোকি’ সমাজসংস্কারকদের চেষ্টায় এই ‘ছোটলোকি’ সংযাত্রার ওপর বারবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অশ্লীল সঙের অভিযোগে কলকাতায় গাজন-সন্ন্যাসীরা গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কি তাঁরা অশ্লীল? এবং ভদ্রলোকরা সত্যিই শ্লীল?

রাজর্ষি সরকার

চৈত্র মাস– ভগবান শিবের মাস।

‘ধন্য ঋতু বসন্ত সুধন্য চৈত্র মাস।
ধন্য শুক্লপক্ষে জগত উল্লাস…।’

এই চৈত্র মধুমাস, আবার এই চৈত্র সর্বনাশ। বছর শেষ এবং বছর শুরুর ছায়াবৃত্তের চৈত্র‍-কে স্বতন্ত্র করেছে বৈচিত্র এবং বৈপরীত্য। বৈপরীত্য চৈত্র জুড়ে।

‘বসন্তে কি শুধু (কেবল) ফোটা ফুলের মেলা রে।
দেখিসনে কি শুকনো পাতা ঝরাফুলের খেলা রে॥’

এই ঋতু অভিধানের পাতায় আছে ইশ্বর-প্রকৃতি-প্রেম, আর ক্ষণস্থায়ী রাঙা-আলোর চিরস্থায়ী চৈত্র সংস্কৃতি। বৈপরীত্য চৈত্রের মতো, চৈত্রাধিপতি মহাদেব। যিনি দেবাদিদেব, তিনি-ই বিভূতিভূষণ। ভক্তের ভক্তি, আস্তিক বিশ্বাস, নাস্তিক অবিশ্বাস, কবির কাব্য, পাঁচালির গান, অণুভাব থেকে অনুভব– তিনি সর্বত্র। উঁচু-নীচু, সুর-অসুর, মানুষ না-মানুষ– তিনি সবার মনের মানুষ। আরোহণ-অবরোহণের সম্পর্কের বাইরে আমরা ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়রে দেবতা।’ তাই এই চৈত্র ‘বাবা মহাদেবের চরণে সেবা লাগি’। চৈত্র শিরোমণি– গাজন, নীলষষ্ঠী, চড়ক। এই গাজনে আছে– সন্ন্যাসী বা ভক্তা নির্বাচন, ক্ষৌরকর্ম এবং সংযম [নিরিমিস্যি, হবিষ্য (ঘটপাতন), মহা হবিষ্য, উপবাস], উৎসব, নীলের পুজো (নীল ষষ্ঠী) এবং চড়ক।

ভগবান শিবের পাশাপাশি গাজন হয়– ধর্মঠাকুর, দেবী মনসা কিংবা বীর বলাইকে নিয়ে। কিন্তু সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, চৈত্রের শিবের গাজন এবং চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, বৈশাখের ধর্মের গাজনই বেশি প্রচলিত। সময়ের সঙ্গে ধর্মঠাকুর আর ভগবান শিব হয়েছেন একাত্ম। কেউ বলেন, গর্জন থেকে গাজন, কেউ বলেন ‘গাঁয়ের জন’-এর উৎসব থেকে গাজন। সময়ের সঙ্গে বদলেছে এই গাজনের ধ্যান-ধারণা, সাংস্কৃতিক চরিত্র, মানুষের চিন্তাভাবনা, যাপন। কিন্তু অপরিবর্তিত উপাস্য-উপাসক সংস্কৃতি।

উপাস্য দেবাদিদেব শিব মূলত অন্ত্যজ এবং অনার্যদের দেবতা, তাই কৃচ্ছ্বসাধনার চৈত্রতে মহাদেবের ভক্ত সন্ন্যাসী সাধারণত (তথাকথিত) অন্ত্যজরাই। প্রান্তিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বর্ষশেষের এই উৎসব। যা আজকের দিনে, তথাকথিত উচ্চবর্ণের  নাগরিকদের সংস্পর্শে এলেও, চরিত্রে আদতে এটি লোকউৎসব। জানা গিয়েছে, এক সময়ের বাবু শ্রেণি, পুণ্য সঞ্চয় এবং আভিজাত্যের খ্যাতির জন্য দোল-দুর্গোৎসবের সঙ্গে প্রচুর টাকা ব্যয় করত গাজনে। উনিশ শতকের বাবু-কলকাতার চড়ক প্রসঙ্গে কালীপ্রসন্ন সিংহ-র ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ অনুযায়ী– “কলিকাতা শহরের চারদিকেই ঢাকের বাজনা শোনা যাচ্চে, চড়কির পিঠ সর সর কচ্চে, কামারেরা বান, দশলকি, কাঁটা ও বঁটি প্রস্তুত কচ্চে; সর্বাঙ্গে গয়না, পায়ে নূপুর, মাথায় জড়ির টুপি, কোমরে চন্দ্রহার, সিপাহ পেড়ে ঢাকাই শাড়ি মালকোচা করে পড়া, তারকেশ্বরে ছোবান গামচা হাতে বিল্বপত্র বাঁদা সুতা গলায় যত ছুতোর, গয়লা, গন্ধ বেণে ও কাঁসারির আনন্দের সীমা নাই– ‘আমাদের বাবুদের বাড়ি গাজন’।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিবভক্ত প্রান্তিক বাণরাজা বা বাণাসুরের কাহিনি। বাণের অজান্তে, বাণ-কন্যা ঊষার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ-পৌত্র অনিরুদ্ধের গান্ধর্ব বিবাহ নিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং বাণাসুরের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে বাণ নিজের শরীরের শোণিত নিবেদন করে, নাচ-গান করে, দেবাদিদেব মহাদেবকে তুষ্ট করে এবং অভয়লাভ করে বরপ্রাপ্ত হয়। বিশ্বাস, বাণরাজার সেই নৃত্যগীত থেকেই এই গাজন। এই কাহিনির রাঢ়ীয় সংস্করণে আছে। মৃত্যুর আগে অন্ত্যজদের রাজা বাণ শ্রীকৃষ্ণের থেকে এই বর পান যে, যেহেতু ঊষার সন্ততিরা কৃষ্ণের বংশধরদের জনক-জননী হবেন, বছরে একটি দিন তাঁরা সসম্মানে পূজা পাবেন। সেই দিনটি হল গাজন। অর্থাৎ, প্রান্তিক বাণকন্যা ঊষার সম্মানার্থে– গাজন উৎসব।

প্রান্তিক কৌম সমাজভুক্ত মানুষের অর্থাৎ, কৃষক, কারিগর, জেলে, মালো, হাঁড়ি, মুচি, বাউরি এবং বাগদিদের শিবোপাসনার কথা ইতিহাস এবং বর্তমান। হুতোম প্যাঁচার নকশায় কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখছেন– ‘এদিকে দুলে বেয়ারা হাড়ি ও কাওরারা নূপুর পায়ে উত্তরি সুতা গলায় দিয়ে নিজ নিজ বীরব্রতের এবং মহত্বের স্তম্ভস্বরূপ বাণ ও দশলকি হাতে করে প্রত্যেক মদের দোকানে বেশ্যালয়ে ও লোকের উঠানে ঢাকের সংগতে নেচে ব্যাড়াচ্চে।…’ তিনি আরও দেখিয়েছেন, ভগবান শিবের কৃপা লাভের আশায়, কৌম সমাজের ‘গাজুনে বামুন’দের পায়ে লুটিয়েছেন কলকাতার উচ্চবর্ণের বাবুরা। ‘নিজে কাওরা হলেও আজ শিবত্ব পেয়েছে, সুতরাং বাবুকে তারে নমস্কার কত্তে হলো…।’ যেই প্রণাম পেয়ে বাবুর মাথায় আশীর্বাদী ফুল ছোঁয়ালেন তথাকথিত ‘নীচু জাত’-এর মূল সন্ন্যাসী।

প্রাণকৃষ্ণ দত্ত এর লেখায়– ‘গাজনের সন্ন্যাসীদিগের মধ্যে হাড়ি, মুচি, বাগ্দী প্রভৃতি ইতরজাতীয় লোকেরাই বাণ ফুঁড়িত… সে সময় বহু ব্যক্তি তাহাদিগকে প্রণাম করিত।…’ শ্রীমহেন্দ্রনাথ দত্ত ‘কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা’-তে লিখেছেন, ‘…নিম্নশ্রেণীর লোকেরা– হাড়ি বাগদীরাই করিত। উচ্চবর্ণের লোকেরা কখনও চড়কগাছে ঝোলে না বা পিঠে কাঁটা ফোঁড়ে না।’ অতএব, বর্ণাশ্রমের ব্যাকবেঞ্চার মানুষগুলির দীন-মহোৎসবই যে গাজন–এই কথাই বারবার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ-প্রসঙ্গে প্রামাণ্য দলিল, সেই সময়ের সংবাদপত্রের ভাষ্য।

সমাচার দর্পণ (২১ এপ্রিল ১৮২৭/ ৯ বৈশাখ ১২৩৪)– ‘চড়ক পূজার সময় সন্ন্যাসিদের মধ্যে কেহ মত্ত হইয়া পথেতে এমত কদর্য্যরূপে নৃত্যাদি করে যে তাহা দর্শন করিতে ভদ্রলোকেরদের অতিশয় লজ্জা হয় অতএব তাহার নিবারণ করিতে কলিকাতাস্থ মাজিস্ট্রিট সাহেব লোকেরা নিশ্চয় করিয়াছেন এবং গত চড়কপূজার সময় এইরূপ অতিনির্লজ্জ তিন চারি জন সন্ন্যাসিকে পুলিসে ধরিয়া লইয়া গিয়াছেন…।

হরকরা প্রকাশক লিখিয়াছেন যে এরূপ কর্ম হিন্দুদের শাস্ত্রসিদ্ধ নয় তথাপি যদি কর্তব্য হয় তবে যাহার তাহাতে অনুরাগ হয় সে কোন নির্জন স্থানে বনে কিম্বা নিজ ভবনে গিয়া তাহা করুক কিন্তু এরূপ ভদ্রলোকের সন্মুখে না করুক।’ অর্থাৎ, এই বক্তব্যে গাজন সভ্য-অসভ্যের নির্ণায়ক এবং সন্ন্যাসীরা অভদ্র-বিশেষ। তাই শহুরে উচ্চবর্ণের শিক্ষিত [?] বিদেশিদের থেকে নেটিভবাবুদের কাছে অন্তজ্য উদযাপন ছিল অশ্লীল উপদ্রব! ইংরেজ শাসকদের অণুবীক্ষণে এই নেটিভ ভক্তির উদযাপন ছিল– ‘বর্বরোচিত’, ‘ঘৃণ্য’ উপদ্রব ইত্যাদি, ইত্যাদি।

চড়ক প্রসঙ্গে ইংরেজ সাহেব সেসিল বিডন-এর চিঠি, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনকে লেখা– ‘Whether the time has not come when the practice of hook swinging may properly be prohibited by the magistrates under the provisions of the code of Criminal Procedure as a practice dangerous to human life and safety and as an annoyance to all educated and right-thinking persons.’ অতএব, আলাপ-আলোচনায় ব্রিটিশ থেকে নেটিভ একাংশ একমত যে, রুচিবিরোধী এই প্রথা অশিক্ষিত, একান্তই অন্ত্যজ হিন্দুদের। স্যর জন গ্রান্ট এবং বিডন সাহেবের মতো লাটদের চেষ্টায়, ১৮৬৩-’৬৫-এর মধ্যে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ‘অমানবিক’ চড়ক এবং চড়কের বাণ-ফোঁড়া, কাঁটাঝাঁপ দেওয়া ইত্যাদি অনেকাংশে বন্ধ হয়। এই কাজে ইংরেজদের সহায়তায় মাধবচন্দ্র সিকদার, রাজেন্দ্র মল্লিক, হরনাথ মল্লিক, চারুচন্দ্র ঘোষ, হীরালাল শীল এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখ নেটিভবাবুরা ছিলেন উদ্যোগী।

অশ্লীলতার দায়ে বাদ যায়নি চড়কের সং-সংস্কৃতি। অন্ত্যজ শ্রেণির, শ্রমজীবী মানুষের তৈরি, গণমানুষের এই ঐতিহ্যবাহী সং-এর ব্যঙ্গাত্মক শ্লেষ গতদিনের যতকথা। তারকনাথ প্রামাণিক, কৃষ্ণদাস পাল, রূপচাঁদপক্ষী (গৌরহরি দাস), গুরুদাস দাস, নেপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, রসরাজ অমৃতলাল বসু, দাদাঠাকুর, শরৎচন্দ্র পণ্ডিত, সজনীকান্ত দাস, হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষ, কবিশেখর কালিদাস রায় প্রমুখ নামগুলি আজ বিস্মৃতপ্রায়। তৎকালীন ভদ্রলোকি কালচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘চোখে আঙুল দাদা’ এই ‘সং’ কি নিছক অশ্লীলতার সংস্কৃতি? উত্তর দিয়েছেন তাঁরাই–

‘মোদের এ সঙ নয় শুধু কালি মেখে সঙ সাজা,
নয়কো শুধু হালকা হাসি, নয়কো শুধু মজা।
সংসারেতে সাজার ওপর সাজেন যিনি যে যা,
তারি ছবি দেখাই সবে সহজ ভাষায় সোজা।
সমাজনীতি, ধর্মনীতি, শিক্ষানীতি আদি,
বলতে গিয়ে কারো প্রাণে ব্যথা দি যদি।
ক্ষমা করবেন, সবার কাছে এই মোদের মিনতি
সত্যের ভাষণ সত্যের গানই মোদের সঙ-এর নীতি।’

উচ্চবর্ণের শোষণ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, প্রশাসনিক অবিচারের হাতিয়ার ‘সমাজ দর্পণ’ সং-কে অশ্লীল বলে, সংস্কৃতির আছিলায় নিষিদ্ধ করেছিল, কলকাতার তথাকথিত ভদ্রসমাজ। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় যথার্থই সং-কে সমাজের বিবেক বলেছিলেন। যেমন– ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র চুরি নিয়ে সং–

‘বিদ্যার মন্দিরে সিঁদ কেটেছে কোন চোরে
সখীরা নেকী নাকি পড়লো ফাঁকি
কেউ দেখেনি ঘুমের ঘোরে
বিদ্যা সর্ববিদ্যা অধিকারী
দেবের প্রসাদে গুমোর গো ভারী,
বিদ্যা নিত্য পূজে আশুতোষে৷’

কালীঘাট-সংলগ্ন এলাকায় নেশারুদের উপদ্রবের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে–

‘দেবতারা সব নিদ্রাগত
নৈলে মানুষের কি সাহস এত
Garden party চলছে কত
কালীঘাটের পীঠস্থানে৷’

ইংরেজ সরকারকে বিঁধে লেখা হয়েছে–

‘হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার যত বিদেশি তস্কর,
সজাগ হয়েছে দেশবাসী, মজুর চাষী লস্কর,
আমরা হয়েছি এক, কেরানি উকিল মাষ্টার,
আমরা তোমাদের লুটতে দেব না আর।’

কিন্তু ‘ভদ্রলোকি’ সমাজসংস্কারকদের চেষ্টায় এই ‘ছোটলোকি’ সংযাত্রার ওপর বারবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অশ্লীল সঙের অভিযোগে কলকাতায় গাজন-সন্ন্যাসীরা গ্রেফতার হয়েছেন। এই কণ্ঠরোধে সঙের দলের পাল্টা বক্তব্য–

‘শহরে এক নূতন হুজুগ উঠেছে রে ভাই
অশ্লীলতা শব্দ মোরা আগে শুনি নাই।
বৎসরান্তে একটি দিন কাঁসারিরা যত
নেচে কুঁদে বেড়ায় সুখে দেখে লোকে কত।
যদি ইহা এত মন্দ মনে ভেবে থাকো
নিজের মাগকে চাবি দিয়ে বন্ধ করে রাখো।’

পুলিশ এবং সামাজিক মৈত্রমশাইদের উদ্যমে এবং বারবার রাজরোষে সঙের রং হয়েছে বেরং, চড়ক পাক, হয়েছে না-পাক। সেকাল থেকে একাল আধুনিক ভদ্রলোকি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, নীতিপুলিশি প্রমাণ করেছে, অশ্লীল, বর্বরোচিত দেশীয় গাজন আসলে অসভ্যদের। যদিও আইন যে সংস্কৃতিকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না, তার প্রমাণ আজকের বন্ধ বঙ্গ-গাজন। তাই প্রতিরোধে এই অনগ্রসর শ্রেণির এই বিশেষ উৎসবটি লোকায়ত প্রাঙ্গণকে অতিক্রম করে, ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিকতাকে অস্বীকার করে, বাঙালির সাংস্কৃতিক আঙিনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছে।

কারও-র কাছে গাজন সামাজিক কৌলীন্য ভেঙে সমন্বয়ীর বার্তাবাহক উৎসব। কারণ, এই নীচু জাতির উৎসবে উচ্চবর্ণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেওয়া। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি আত্তীকরণ। সমাজবিদদের একাংশের মতে– গাজন, আদিম জনজাতিজাত সংস্কারকে টিকিয়ে রাখার এক রকম কৌশল। তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষরা, অন্ত্যজদের মধ্যে দিয়েই, আদিম জনগোষ্ঠীর বাণফোঁড়া, কাঁটাঝাঁপ ইত্যাদি প্রথাগুলি টিকিয়ে রেখেছে। পরিবর্তে বছরে একদিন দেবতা-জ্ঞানে প্রণাম করে, গাজনের সন্ন্যাস নেওয়া অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষজনকে সম্মান জানায় উচ্চবর্ণের মানুষরা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই গাজনের মূল উৎসবের ধারক নিম্নবর্গরা, কিন্তু মন্দিরের ভিতরের ক্রিয়াকলাপে বর্ণ ‘শ্রেষ্ঠ’ তথাকথিত উচ্চবর্ণরাই। যেমন– নীলপুজোয় অংশ নেওয়া ব্রাহ্মণরা, বর্ণশ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা ব্রাহ্মণ সমাজের অন্তর্গত নন। অতএব বিশ্লেষক, গবেষক, নিন্দুক বা সমালোচকের চশমায় গাজন অন্ত্যজদেরই।

গাজনের অধিকাংশ সন্ন্যাসী থেকে সং, কৃচ্ছ্বসাধনরত ভক্তরা সবাই বর্ণাশ্রমের নীচু বর্গের। যাঁরা জীবন বিপন্ন করে ভক্তির পরীক্ষা দেয়। কিন্তু কষ্ট করে লাভ হওয়া কেষ্টতে যেন অগ্রাধিকার উচ্চবর্ণের। বর্ণাশ্রমের এই বর্ণবৈষম্য দেখেছি ‘হুতুম প্যাঁচার নকশা’য়– সন্ন্যাসীদের হাজারও মাথা ঝাঁকুনিতেও যখন শিবের মাথা থেকে ফুল-বেলপাতা পড়ছিল না, তখন বাবুর শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। আবার অনেক সময় ধনীরা টাকা দিয়ে, সন্ন্যাসীদের চড়ককাঠে চড়কি খাওয়াত– ফ্যানি পার্কসের ভাষায় যা ছিল– ‘প্রক্সি দিয়ে পুণ্যলাভ’।

সেই একই ছবি যেন একুশ শতকের সংবিধান-সিদ্ধ, অস্পৃশ্যতা-নিষিদ্ধ ভারতে। এই বাংলার কিছু জায়গায় শিবমন্দিরে তফসিলি জাতির কিছু মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে, তাদের নিষিদ্ধ পুজোকে সিদ্ধ করতে হয় কোর্টের আদেশে, পুলিশি প্রহরায়। এটা গল্প নয়, সত্যি! অথচ সংস্কৃতিগত দিক থেকে এই উৎসব অন্ত্যজদেরই। আর আইনি-দৃষ্টিতে এই উৎসব সবার। তাছাড়া দেবাদিদেব মহাদেব তো সুর-অসুর সবার উপাস্য। সামাজিকতার আড়ালে অসামাজিকতার এই বিপজ্জনক প্রবণতা যেন গণদেবতার পুজোয় গণতন্ত্রের বলি। নন্দিত পুজোর নিন্দিত অধ্যায়। অথচ যথা ভক্ত তথা তীর্থ, যথা অশ্রু তথা ত্রিবেণী।

প্রশ্ন– উপাস্য শিবের উপাসকদের প্রতি এহেন আচরণ কেন? কেন নীচু জাতের সন্ন্যাসীকে ভগবান গণ্য করলেও, অন্যান্যদের প্রতি এই ব্যবহার। উত্তর ‘দেবত্ব’ এবং ‘আমিত্ব’। যেখানে ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’ গৌণ। পাশাপাশি উল্লেখ্য, গাজনের উপাস্য মহাদেব, পৌরাণিক এবং লোকায়ত দুই-ই। প্রান্তিক ভক্তদের মতো তিনি নিজেও কৃষিজীবী। শিবায়ন কাব্য থেকে শূন্যপুরাণ, তিনি মর্তপৃথিবীর বাসিন্দা। তাঁর কৃষিকথা-প্রসঙ্গ উল্লিখিত বারবার।

‘তুমি চাষ চষিলে কিসের অসম্ভব।
শক্রের সাক্ষাৎ হইলে সদ্য ভূমি লাভ।।
ঘরে আছে বুড়া এঁড়ে ধরে মহাবল।
যমের মহিষ আন বলাইর লাঙ্গল।।
ভীম আছে হাল্যা আর অনির্বাহ কি।’

আসলে, আইনি দাওয়াই মানুষ গিলতে বাধ্য হয়, স্বেচ্ছায় গেলে না। সার্কাসের পশুরা যেমন– প্রশিক্ষিত, শিক্ষিত নয়। ঠিক তেমনই মানুষ আইনি জ্ঞানে প্রশিক্ষিত মাত্র, মননে শিক্ষিত নয়। আজ মানুষের চেতনার রঙে ডানপন্থী সবুজ, আর বামপন্থা রাঙা। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/ অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।’ এই বিষয়টি ধর্ম বনাম ধর্মতন্ত্রের। দেশপ্রেম বনাম দ্বেষপ্রেমের। অথচ ধর্ম মানে যাপন, যেই যাপনের অংশীদার সবাই। আশার কথা এই  ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীতগুলি ব্যতিক্রমী, আশঙ্কা এই ব্যতিক্রমের ভিড় বাড়ছে। তাই সভ্যতা, শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধের উপাচারে নিজেদের আত্মশুদ্ধির জন্য এবং ‘রাজ-রীতি’র অচলায়তনের ভূতদের বিরুদ্ধে লড়াইতে দরকার রক্ষাকর্তা ভগবান ভূতনাথকে। আমাদের দ্বন্দ্ব-বিরোধের মধ্যেই আছেন তিনি। আর সেই ‘সত্যম-শিবম-সুন্দরম’-এর মন্ত্রজপে গণদেবতার শিবের কাছে প্রার্থনা–

‘জাগো জাগো, জাগো ধর্মরাজ।
শ্মাশানের অধীশ্বর, জাগো তুমি আজ।
হেরো তব মহারাজ্যে করিছে উৎপাত।
ক্ষুদ্র শত্রু-জাগো, তারে করো বজ্রাঘাত দেবদেব।
তব নিত্যধর্মে করো জয়ী ক্ষুদ্র ধর্ম হতে।’

ভিতর-বাইরের গণশত্রুদের থেকের রক্ষায় গণদেবতার কাছে প্রার্থনা– ‘ত্রাহি মাং ভবসাগরাৎ।’ ‘ত্রাহি মাং প্রভো।’

…………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন রাজর্ষি সরকার-এর অন্যান্য লেখা

…………………………