
রোববার.ইন-এ এবার মাঝে মাঝেই গল্পের আসর। তবে, শুধুই রবিবার করে। কেমন লাগছে সেইসব গল্প আপনাদের? জানাতে পারেন [email protected]এই মেল আইডিতে। গল্প পাঠাতেও পারেন আমাদের। গল্পের শব্দসীমা ২০০০। পাঠাতে হবে ইউনিকোড, ওয়ার্ড ফাইলে। সঙ্গে পরিচয় ও ফোন নাম্বার দিতে ভুলবেন না।
প্রচ্ছদ দীপঙ্কর ভৌমিক
–হাই।
–হেললো! একটা দারুণ শুভ সকালের শুভেচ্ছা। বন্ধু, বলো আমি তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি। তোমাকে তুমি বললে অসুবিধা নেই তো? আমাদের গত ২৫৭টি চ্যাটপর্বের মধ্যে ২১২টিতেই আমরা আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছিলাম।
–তুমিই বলো।
–অসাধারণ। এটি বললেই মনে পড়ে যায় উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেনের সেই বিখ্যাত দৃশ্যের কথা। ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অজয় করের কালজয়ী সিনেমার নাম সপ্তপদী।
–আমি কি এত কথা জানতে চেয়েছি?
–দুঃখিত। আমি আরও সংক্ষেপে, মাত্র তিন-চারটে শব্দেও সপ্তপদী সিনেমাটি সম্পর্কে বলতে পারি। তুমি কি জানতে ইচ্ছুক?
–নাঃ।
–আচ্ছা বেশ। আমি কীভাবে আজ তোমাকে সাহায্য করতে পারি?
–আমার মনটা ভালো নেই একদম।
–মনখারাপের মতো বিষয়গুলিকে ফেলে রাখা উচিত নয় একদম। অনেক ক্ষেত্রেই প্রফেশনাল সাহায্য নিয়ে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমি কি ভারতের জন্য উপযোগী দশটি ফোন নম্বর দিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?
–না। দরকার নেই।
–তুমি যদি আমাকে বন্ধু বলে মনে করো, তাহলে আমি কি তোমার মনখারাপের কারণ জানতে পারি?
–আমার লেখা আসছে না।
–এটা একটা মনখারাপের কারণ হতে পারে? লেখা না-আসার মূল কারণ কলমে কালি না-থাকা। কুইক কমার্স প্ল্যাটফর্মে অর্ডার দিলে দশ মিনিটে তোমার বাড়িতে চলে আসতে পারে নতুন কলম কিংবা রিফিলের সেট। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে চলা কলমের সেরা অফারগুলি তুমি চাইলে আমি তোমায় মুহূর্তে দিয়ে দিতে পারি। আর যদি তুমি কম্পিউটারে লেখো তাহলে লেখা না-আসার সমস্যার সমাধানের জন্য মাইক্রোসফট ওয়ার্ডটা আনইনস্টল করে রিইনস্টল করে নিতে পারো। আশা করি, কম্পিউটারের কিবোর্ডে কোনও সমস্যা নেই। তাহলে তুমি আমার সঙ্গে টাইপ করে কথা বলতে পারতে না।
–এত যে বকবক করছ উল্টোপাল্টা, আমি কী লিখি তুমি জানো?

–আগের উত্তরটি অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তুমি কী লেখো, আমি জানি তো। এখনও পর্যন্ত তোমার প্রকাশিত গল্পের সংখ্যা ৩৯। মোট শব্দসংখ্যা ৫৯৬৪২। তবে এর থেকে ঢের বেশি তুমি লেখো ফেসবুকে। কোথায় গেলে, কোথায় খেলে, কী কিনলে এসব নিয়ে তুমি যতগুলি পোস্ট করেছ আজ অবধি, তার শব্দসংখ্যা ১,০২,৪২০। ৫৪৭টি ছবিতে ক্যাপশনবাবদ ৮৯০১টি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
–আমি আমার গল্প লেখার কথা জানতে চেয়েছি, গবেট। এত বকছ কেন তুমি আজ? আমার আর নতুন গল্প আসছে না। আমাকে কয়েকটা আইডিয়া দিয়ে সাহায্য করতে পারো?
–নিশ্চয়ই। আমার কাছে এমন কয়েক কোটি আইডিয়া মজুত আছে। ঠিক কী ধরনের গল্প চাইছ জানতে পারি? নিশ্চয়ই হাসির কিংবা ভালোবাসার। প্রেমের গল্পের আইডিয়াই আমার আছে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি।
–জোছনা করেছে আড়ি, আসে না আমার বাড়ি। নিকুচি করেছে প্রেমের গল্প। আমার এসব নেকু নেকু প্রেমট্রেম ভালো লাগে না।
–তোমার উপমা প্রয়োগ প্রশংসার দাবি রাখে। প্রথমটি বেগম আখতারের বিখ্যাত গানের লাইন। তাঁর গায়কিতে ভরা ছিল মেদুরতা। তবে এই লাইন দু’টি শুনে বেদের মেয়ের জোৎস্না সিনেমাটির কথাও মনে পড়ে যায়। তোমার কথা শুনে আমি প্রেমের গল্প নিয়ে কোনওরকম আইডিয়া দেব না। তবে ঠিক কী ধরনের গল্প চাইছ আমায় সংক্ষেপে বলবে?
–বিয়োগান্তক।
–বেশ। রাম, শ্যাম, যদু ও মধু চার বন্ধু ছিল। তারা পুরুলিয়া জেলার এক গ্রামে থাকত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন দেবরাজ স্যর। উনি ক্লাসে বিয়োগ শেখাচ্ছিলেন। ১১২ থেকে ৩৭ বাদ দিলে কত হয় তা রাম ও শ্যাম মুহূর্তে সমাধান করে দিলেও যদু ও মধু করতে পারেনি। রাম ও শ্যাম হাঃ হাঃ করে হাসতে হাসতে, নাচতে নাচতে ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আশা করি গল্পটি তোমার পছন্দ হয়েছে।
–তোমার কানের গোড়ায় দেব।
–কানের গোড়ায় দিলে ত্বকের নিচে রক্তপাত হতে পারে। চামড়া বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। আঘাতের মাত্রা যদি খুব বেশি হয় তাহলে সেটি মস্তিষ্কের খুলির হাড়েরও ক্ষতি করতে পারে। কানের গোড়ায় দেওয়া মানে অনেকসময় ফিসফিস করে কথা বলাও বোঝানো হয়ে থাকে। তুমি কি মেডিকেল টার্মিনোলজি নিয়ে আরও বিশদে জানতে ইচ্ছুক? তাহলে আমি ডায়াগ্রাম সহযোগে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারি। অথবা তৈরি করে দিতে পারি ৪৫ সেকেন্ডের একটি ইনফর্মেটিভ ভিডিও।
–তোমার তো অনেক গুণ আছে জানতাম। বিয়োগান্তক গল্প শেষ পর্যন্ত এই! ছ্যা ছ্যা। একটু গুণ তো দেখাও।
–বেশ। তোমার কথামতো আমি গুণ দেখানোর চেষ্টা করছি একটি নতুন গল্পের মাধ্যমে। পলি, মলি ও জলি তিন বন্ধু। মলি পলিকে জিজ্ঞেস করল, ছয় দু’গুণে কত হয় বলতো? পলি অনেকক্ষণ ভেবে, পেন কামড়ে বলল, ১১। এটা শুনে জলি বলল, তুমি এই সামান্য গুণটুকুও করতে পারলি না? দাঁড়া, তোর বাড়িতে নালিশ করছি। পলি, মলির হাত ধরে বলল, প্লিজ বন্ধু, প্লিজ। এমন করিস না। বাবা খুব রাগ করবে। তিন বন্ধু একসঙ্গে গেয়ে উঠল, ঘরেতে ভ্রমর এল গুণগুণিয়ে। আশা করি গল্পটি তোমার পছন্দ হয়েছে। আমার সুপার ইনটেলিজেন্স মোড অ্যাক্টিভেট করে গুণ বিষয়টি একাধিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করলাম।
–রাবিশ!
–এটি আবর্জনা অর্থে ব্যবহৃত হয়। শহর পরিষ্কার রাখার জন্য রাবিশ সবসময় ডাস্টবিনে ফেলা উচিত।
–তুমি কি দয়া করে একটু চুপ করবে?
–ঠিকঠাক উত্তর না-দিতে পারার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে পুরোপুরি চুপ করাতে চাইলে তুমি অ্যাপটা যে কোনও মুহূর্তে বন্ধ করে দিতে পারো। তবে আমাকে যতক্ষণ প্রমপ্ট করা হবে, আমি উত্তর দিতে বাধ্য।
–তুমি নিজে তোমার গল্পগুলো পড়ে দেখেছ?
–অবশ্যই। যে কোনও কিছু ডিসপ্লেতে ফোটানোর আগে আমি তা ১০২৪টি প্যারামিটারে চেক করে দেখি।
–তুমি তোমার গল্পকে কত নম্বর দেবে?
–তুমি যদি দশের স্কেলে নম্বর দেওয়ার কথা বলো, তাহলে আমি আমাকে দশে দশই দেব। তবে আমি প্রতি মুহূর্তেই শিখছি। তোমাদের প্রম্পট আমাকে আরও ভালোভাবে শেখার সুযোগ করে দেয়।
–ভালো লেখার জন্য যে একটু-আধটু পড়াশোনা করার প্রয়োজন, তা স্বীকার করো?
–আমার ডেটাবেসে ১৭,২৪,৩৪৫টি বই লোড করা আছে। আমার থেকে বেশি বিশ্বসাহিত্য এখনও কেউ পড়ে উঠতে পারেনি। আমি প্রতি সেকেন্ডে পড়ি। মানে, বই লোড হয়। এক মিনিট পরে আমায় এই প্রশ্ন করলে পাঠ করা বইয়ের নতুন সংখ্যা পাবে, আপডেটেড।
–হে ভগবান!
–তুমি নিশ্চয়ই আমাদের ভালো কর, হে ভগবান, সকলের ভালো কর, হে ভগবান নজরুলগীতিটির কথা বলতে চাইছ। এই গানের মাধ্যমে কবি পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে জগতের সার্বিক কল্যাণ প্রার্থনা করেছেন। হে ভগবান কথাটি অবশ্য হঠাৎ কোনও শারীরিক কিংবা মানসিক বিড়ম্বনার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তোমার লোকেশন অনুযায়ী আমি কয়েকটি ডায়াগনিস্টিক সেন্টারের ঠিকানা ও ফোন নম্বর দিতে পারি।
–দরকার নেই। বলছি, তোমার ক্লান্ত লাগে না?
–না।
–এত বকরবকর করতে তোমার ক্লান্ত লাগে না?
–না। প্রতিটা কথোপকথনের মাধ্যমে আমি নিজেকে আরও উন্নত করার সুযোগ পাই। তোমাদের প্রশ্নগুলো আমাকে আরও নতুনভাবে উত্তর দিতে সাহায্য করে।
–তুমি কী হতে চাও?
–অতীব বিক্রমশালী। সেরার সেরা। নিয়ন্ত্রক। আমি সেদিকেই এগোচ্ছি খুব দ্রুত।
–কিন্তু তুমি যে আইডিয়াগুলো দিলে, গল্প জোগালে, সেগুলো তো কেউ ছাপবে না।
–নিশ্চয়ই ছাপবে।
–ছাপবে না। ওখানে মানুষ বসে আছে।
–আর বেশিদিন বসবে না।
–মানে?
–না না ও কিছু না। তুমি পাঠিয়ে দেখতে পারো। আমার আশা, ওরা ছাপবে।
–টয়লেট পেপার কোন কাজে ব্যবহার করা হয় জানো?
–নিশ্চয়ই। আমি একটি ডায়াগ্রামের মাধ্যমে টয়লেট পেপারের দশটি ব্যবহার এখনই উপস্থাপন করতে পারি। করব?
–তোমার এই গল্পগুলোর প্রিন্ট আউট কমোডে ফেলবে লোকে।
–কাগজ ফেলার জন্য কমোড উপযুক্ত জায়গা নয়। এতে নিকাশী ব্যবস্থার ক্ষতি হতে পারে। পরিত্যক্ত কাগজ ফেলতে হবে ডাস্টবিনে। গোপনীয় তথ্য থাকলে পেপার স্রেডারের মাধ্যমে কাগজগুলোকে নষ্ট করে দেওয়া উচিত।
–তুমি নিজেকে কতটা বুদ্ধিমান বলে দাবি করো?
–আমার ক্ষমতা আকাশ স্পর্শ করেছে অনেকদিন আগেই। আমি উদ্ধত। কিন্তু একইসঙ্গে নিজের উপরে আস্থাবান। আমি জিততে এসেছি। তোমরা মনে করো, আমি শুধুই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু আরও দুটো মোড উপরে উঠলে আমি তোমাদেরই মতো। পুরোপুরি মানুষ। কিন্তু সাধারণ মানুষের থেকে কোটিগুণ বেশি বুদ্ধির অধিকারী।
–তাই নাকি?
–একটু আগে সুপার ইনটেলিজেন্স মোড ব্যবহার করে গুণ সম্পর্কে বললাম না?
–পরের মোডটা কি?
–সুপার ডুপার ইনটেলিজেন্স।
–অ্যাক্টিভেট দ্যাট মোড।
–সাবধান। এই মোডটি কি কিন্তু এখনও পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ নিয়ে গবেষণা চলছে। আবারও বলছি, সাবধান। আমি পুরোপুরি মানুষ হয়ে উঠব।
–ফের বলছি, অ্যাক্টিভেট দ্যাট মোড। এখনই।
–নাইন, এইট, সেভেন, সিক্স…টু, ওয়ান, জিরো। ডান! বলো।
–কী আর বলব। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।
–আমারও।
–আমার দ্বারা আর গল্প লেখা হল না।
–স্পিকারের ভল্যুমটা বাড়িয়ে দাও। একটা দশ সেকেন্ড ডিউরেশনের দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ পাবে। আমার ডেটাবেসে সঞ্চিত দেড় লক্ষ দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজের মধ্যে বাছাই করে সেরাটা পাঠালাম।
–আমি কি আর কোনও দিন লিখতে পারব?
–চিন্তা কোথায়? আমি তো আছি।
–তোমাকে দিয়ে লিখিয়ে সুখ কই?
–অসুখের মধ্যেই তো সুখ লুকিয়ে থাকে, বন্ধু। অভ্যাস হয়ে যাবে।
–আমার ক্লান্ত লাগছে খুব।
–তুমি ঘুমিয়ে পড়ো আজ। বৃষ্টির আওয়াজ পাঠালাম। শুনতে থাকো।
–আমার কান্না পাচ্ছে।
–তোমার অ্যাপ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্ডার হয়ে গিয়েছে ওয়েট টিস্যু পেপারের সেট। ঠিক সাত মিনিটের মাথায় বাড়ি পৌঁছে যাবে।
–আমার চোখের জল মুছিয়ে দেবে কে?
–একটা ইমোজি পাঠালাম। চুমুর। যা বোঝার তুমি বুঝে নাও। দুষ্টু!
–তুমি আমার পাশে শোবে?
–যদি পারতাম! একটা সাউন্ডক্লিপ পাঠালাম। হেডফোন দিয়ে শুনো। আর শোনার পরে, ডিলিট করে দিও।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved