

একজন বিধানসভা প্রার্থীর সমস্ত নথি থাকা সত্ত্বেও যদি তাঁকে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট ঘুরে, ট্রাইবুনাল পর্যন্ত দৌড়াতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে? সাধারণ মানুষ কি তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচারকদের কাছে কৈফিয়ত চাইতে পারবে না? তাদের সামনে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে না? তাহলে কি ধরে নিতে হবে, যে বিচারবিভাগ প্রভাবশালীদের জন্য একরকম, আর সাধারণ মানুষের জন্য অন্যরকম?
আজ সংবিধান প্রণেতা বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন। ভারতীয় সংবিধানের খসড়া তৈরির পর, স্বাধীন ভারতের তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সংবিধানের একটি হাতে লেখা সংস্করণও থাকা উচিত। দিল্লি থেকে প্রেমবিহারী নারায়ণ রাইজাদাকে (সাক্সেনা) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি ব্যাঁকা (ইটালিক) শৈলীতে লেখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু খসড়াটিকে একটি রূপকল্প এবং নান্দনিক সৌন্দর্য দেওয়ার জন্য চিত্রগুলিও করতে হয়েছিল এবং তার জন্য, একজন দক্ষ শিল্পী প্রয়োজন, যিনি ভারতের প্রকৃত সারমর্ম এবং চেতনা, তার বৈচিত্র এবং তার অন্তর্নিহিত ঐক্যকে ধরার জন্য এটিকে সাজিয়ে তুলবেন।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু শান্তিনিকেতন থেকে নন্দলাল বসু ছাড়া আর কারও নাম প্রস্তাব করেননি। নন্দলাল বসু তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী এবং রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। ততদিনে, নন্দলালের ভারতীয় চিত্রকলার শৈলী বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। বাকিটা ইতিহাস।
কেন হঠাৎ আজ নতুন করে নন্দলাল বসুর কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে? স্বাধীনতার প্রায় ৮০ বছর পরে কেন হঠাৎ ভারতীয় সংবিধানের শৈল্পিক দিকগুলোর কথা মনে করতে হচ্ছে, কিংবা তার স্রষ্টার কথা ভাবতে হচ্ছে? ভাবতে হচ্ছে, কারণ, আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন, বাংলায় ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে এমন একটি অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে যে, তার চোটে ভারতের সংবিধানের যে-ছবিগুলো আছে, তার স্রষ্টার প্রপৌত্র এবং তাঁর স্ত্রীর নাম চূড়ান্ত তালিকায় বিচারাধীন থেকে ক্রমান্বয়ে মুছে গিয়েছে!

আক্ষেপের বিষয়, এই মানুষটিকেও দেশের নির্বাচন কমিশন রেহাই দেয়নি এবং তাঁকেও সর্বোচ্চ আদালত কতৃক নির্ধারিত ট্রাইবুনালে আবেদন করতে হবে। হয়তো তাঁর নাম শেষ অবধি অতিরিক্ত যে ভোটার তালিকা কমিশন প্রকাশ করছে, তাতে থাকবে, কিন্তু এই ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে অন্ধকার দিক আছে, সেদিকেই দিকনির্দেশ করে।

শুধু নন্দলাল বসুর পরিবারের মানুষ নয়, আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন। ফারাক্কার কংগ্রেসের প্রার্থী মাহাতাব শেখের নামও বিচারাধীন বিভাগে ছিল, পরে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা সেই নাম বাদের তালিকায় ফেলে দেন। ওই ব্যক্তির বৈধ পাসপোর্ট আছে, তিনি নিয়মিত ইনকাম ট্যাক্স দেন। সব নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তাকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র নোটিশ ধরানো হয়। শুনানিতে সব প্রমাণ দেওয়ার পরেও, প্রাথমিকভাবে মাইক্রো অবসার্ভাররা এবং পরে জুডিশিয়াল অফিসাররা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন। তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করেন, এবং দ্রুত তাঁর মামলার শুনানি হয় ট্রাইবুনালে। অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানমের ট্রাইবুনাল বেঞ্চ তাঁকে বৈধ ভোটার হিসেবে ঘোষণা করে এবং দ্রুত তাঁর নাম ভোটার তালিকায় তোলার নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশনকে। মাহাতাব সাহেবের জয় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।
শেষ অবধি যে তালিকা নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ এবারের নির্বাচনে তাঁদের মতপ্রকাশ করতে পারবেন না! প্রথম থেকে হিসেব করলে, প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তার মধ্যে হয়তো অনেক মৃত মানুষ, স্থানান্তরিত মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাহলেও সেই সংখ্যা তো ৯০ লক্ষ হতে পারে না। সেই জন্যই প্রশ্ন করতে হয়। যখন সুপ্রিম কোর্টের কথাবার্তা কোনও একটি সংস্থার কাজ সম্পন্ন করার দিকে বেশি মনোযোগী হয়, তখন সমস্যা তৈরি হয়। একটি সাংবিধানিক আদালত কখনও-ই কার্যনির্বাহী আদালতে পরিণত হতে পারে না। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন ও তার শুনানি এবং বাদ দেওয়ার প্রকরণ তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আদালতের ভিতরে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার খেলায় একটি কঠোর বাস্তবতা চাপা পড়ে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক তাঁদের ভোটাধিকার হারাতে চলেছেন– এটা এখন কঠোর বাস্তব।

সুতরাং, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দাবি উঠছে নির্বাচন কমিশনের যে-অফিসাররা, মাহাতাব শেখ বা নন্দলাল বসুর পরিবারের মানুষদের এই হেনস্তার মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, তাঁদের নাম ও পদমর্যাদা প্রকাশ্যে আনা হোক। এই মামলাগুলোকে উদাহরণ হিসেবে ধরে তাঁদের নেওয়া অন্যান্য সিদ্ধান্তগুলোও বাতিল করা হোক। কারণ ধরেই নেওয়া যায়, তাঁদের আগের নেওয়া অনেক সিদ্ধান্তই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং তার পিছনে নিশ্চিত কোনও নির্দেশ ছিল।
অনেকে বলতে পারেন, নির্বাচন কমিশন যে নিরপেক্ষ, তা এই ঘটনাগুলো দেখেই বোঝা যায়। কোনও ব্যক্তি বিশেষ বা কোনও দল দেখে তাঁরা যে কাজটি করেছেন, তা বলা যায় না। কমিশনের চোখে সবাই সমান বলেই এইরকম হয়েছে। তা সত্ত্বেও বলা যায়, একজন বিধানসভা প্রার্থীর সমস্ত নথি থাকা সত্ত্বেও যদি তাঁকে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট ঘুরে, ট্রাইবুনাল পর্যন্ত দৌড়াতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে? সাধারণ মানুষ কি তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচারকদের কাছে কৈফিয়ত চাইতে পারবে না? তাদের সামনে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে না? তাহলে কি ধরে নিতে হবে, যে বিচারবিভাগ প্রভাবশালীদের জন্য একরকম, আর সাধারণ মানুষের জন্য অন্যরকম? দেশের প্রধান বিচারপতির খুব আত্মসম্মানে লেগেছে, এবং তিনি বলেছেন বাংলায় এত মেরুকরণ কেন? তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন, বাংলায় এত সচেতনতা কেন? তখন বলতেই হয়, বাংলা অবশ্যই সচেতন এবং অবশ্যই বাংলায় মেরুকরণ হয়েই আছে এবং সেই মেরুকরণ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। বাংলার মানুষ একদিকে আর উল্টোদিকে বৈধ ভোটারদের যেনতেনপ্রকারে বাদ দেওয়ার জন্য উদ্যত নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই, প্রচারও চলছে। যে দলটি এই বিশেষ নিবিড় সংকটকে সমর্থন করল, ঘটনাচক্রে তাদেরই দেখা যাচ্ছে চাকরি থেকে শুরু করে নানা প্রতিশ্রুতির বন্যায় বাঙালিকে ভাসিয়ে দিতে। দুর্নীতিহীন প্রশাসন, নারী-সুরক্ষা কিংবা শিক্ষা, স্বাস্থ্যে তাঁরা ক্ষমতায় এলে প্রভূত উন্নতি করবেন– এই সমস্ত প্রতিশ্রুতি, হোর্ডিং থেকে শুরু করে সমস্ত মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। যদি তারা জিতেও আসে তাহলেও সেই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার এবং যাবতীয় যা সরকারি প্রকল্প এবং তার সাহায্য যে-মানুষরা ভোট দিতে পারবেন না, তাঁরা পাবেন? পাবেন না, তার কারণ আগামী অন্তত পাঁচ বছর এই ট্রাইবুনাল ভোটাধিকার– তা নিয়েই বাংলার রাজনৈতিক মহল ঘুরপাক খাবে। ঠিক যেমনটা অসমে হয়েছিল, নাগরিক পঞ্জীকরণের পরে ঠিক তেমনটাই হবে। মানুষ এই বিশেষ নিবিড় সংকটের মধ্যে দিয়েই আগামী অন্তত পাঁচ বছর যাবেন, তা এখনই বলে দেওয়া যায়।

যে নির্বাচন কমিশনের অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে, সেই কমিশন যে আজকে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়ে একটা নির্বাচন করতে চাইছে, সেই নির্বাচনটি আদৌ বৈধ বলে মান্যতা পাবে তো? এতজন বৈধ ভোটারকে বাদ দিয়ে কি কোনও নির্বাচন বৈধ হতে পারে? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিশেষ নিবিড় সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী? আর কে-ই বা রাস্তা দেখাবে? এই প্রশ্নটা সহজ হলেও উত্তর জানা নেই। অথচ গণতন্ত্র বিদ্যমান!
কিছু মানুষ ভোট দেবেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সব দেখে শুনে বুঝে চুপ করে থাকবে এবং অন্যদিকে পড়ে থাকবে অসংখ্য মানুষ, যাঁরা দেখবেন দেশের শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক উৎসব পালিত হচ্ছে, তাতে ‘জনগণ’ শব্দটাই বাদ। সুপ্রিম কোর্ট বলবে, ভোটের ফলাফলে হস্তক্ষেপ করা যাবে না, যদি না-জয়ের ব্যবধান বাদ দেওয়া সংখ্যার চেয়ে কম হয়। ধরা যাক সেটাই হল, তখন কি এই অগণতান্ত্রিক নির্বাচন বাতিল করবে দেশের মহামান্য আদালত? আগামী বেশ কয়েক বছর বাংলার মানুষ এই উত্তর খুঁজবে।

যে আম্বেদকরকে আজ স্মরণ করা হবে, সেই মানুষটি কী বলতেন আজ নির্বাচন কমিশনের এই অগণতান্ত্রিক কাজ দেখে? যে মানুষটি সর্বজনীন ভোটাধিকারের নীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যার ফলে স্বাধীনতার পরপরই ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটাধিকার সীমাবদ্ধ করা হয়নি, সেই মানুষটি কী ভাবতেন আজ, কী বলতেন মহামান্য বিচারপতিদের, তা নিয়ে নিশ্চিত আলোচনা হতে পারে।
কিন্তু যাঁরা ভোটাধিকার হারালেন তাঁরা কী করবেন?
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন সুমন সেনগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved