


বর্ষাকালের অল্প অল্প জলে বোয়ালমাছ যখন খেলা করে তার দৃশ্য হয়ে ওঠে অপরূপ। মেয়েরা মুগ্ধ হন– ‘ও কি বইল মাছে খেইল করে, ঝরুয়ালি পানির মাঝে/ ও কি কমর হ্যাঁকা কমর ব্যাঁকা, থেইকরে থেইকরে নাচে’ (গোয়ালপাড়া)। পুঁটিমাছ আমরা অনেকেই দেখলেও, তার সৌন্দর্যের দিকে খেয়ালই করিনি! গ্রামের মেয়েরা বলছেন– ‘ছুটু দহে ছুটু মাছ আর বড় দহে বড় মাছ/ আর কালিদহে রে দিদি কাজলপরা পুঁঠি মাছ’ (পুরুলিয়া)। পুঁটিমাছের কাজলপরা নয়নের সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতা বাংলার মেয়েদেরই আছে। ইলিশমাছের প্রতি তাঁদের পক্ষপাতের কথা তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেন– ‘ছাওয়াল কান্দাইন্যা মাছ, অতিথ ভুজনের মাছ, রান্ধনি পাগল মাছ, ইলিশা রে’ (ঢাকা)।
বাঙালি মেয়ের সঙ্গে মাছের সম্পর্ক বেশ পুরনো। বাংলাভাষা যখন তৈরি হওয়ার পথে সেই সময়কার লেখা, ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ গ্রন্থে দেখা যায়, বাংলার গৃহস্থ ঘরের এক সুখচিত্র। কলাপাতায় গরম ভাতের সঙ্গে ঘি আর ‘মৈলি মচ্ছা’ অর্থাৎ মৌরলা মাছ দিচ্ছেন ‘কান্তা’ অর্থাৎ স্ত্রী, আর খাচ্ছেন পুণ্যবান স্বামী; এখানে মাছের সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্ক ঘরোয়া অন্তরঙ্গ শ্রমের। আবার ষোড়শ শতকের কবি দ্বিজমাধব তাঁর চণ্ডীমঙ্গলে, ‘ভাঁড়ু দত্তের বেসাতি’র বর্ণনা দিয়ে লিখছেন, ‘মাছোনি বসিছে মৎস্যের পসার লইয়া কোলে’– এখানে মাছের সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্ক খানিকটা পেশা বা বৃত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অন্য সকল বিক্রেতাকে ঠকাতে পারলেও মাছোনি বা ডোমনির কাছে তিনি পর্যুদস্ত হন। জনসমাজে জেলেনিদের প্রতাপের কাছে ভাঁড়ু দত্তের মতো প্রভাবশালী শঠেরও জারিজুরি খাটে না। এই দুই ক্ষেত্রেই মাছের সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্ক নানাভাবে নানা স্তরে, আজও রয়েছে। আর তার সাক্ষ্য ধরা আছে মেয়েদের নিজস্ব গানে।

মাছ বিক্রি
সেই ষোড়শ শতাব্দীর মতোই আজও আমরা দেখি– ‘চৈত বৈশাখে ঘন ঝারি, উজাইল নাগিল মাছ, হাতে নিল কুলা ডেলি মাথায় নিল মাছ, যায় যায় ডুমুনি আমার গৌরীপুরের হাট। ঐ হাটখোলার মহাজনে পাড়িয়া দেয় রে খাট, না বইসং তোর খাটে পাটে, না করোং তোর আও’ (গোয়ালপাড়া)। অর্থাৎ সেই ডোমনি বা জেলেনিরা আজও যথেষ্ট প্রতিপত্তিশালী; তিনি মাছ নিয়ে আজও হাটে গেলে, বাজারের মহাজন তাঁকে বসার অনুরোধ করলে, তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে এগিয়ে চলেন কথা না বাড়িয়ে। আমরা প্রত্যেক বাজারেই কিন্তু এই মেছুনি বা ডোমনিদের দেখা পাই আজও। শুধু হাট বা বাজার নয়, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরেও মেয়েরা মাছ বিক্রি করেন– ‘এ পাড়ার বৌ ঝি তোরা, মাছ নিবি নাকি লো … মাছ তো ধারে দিব না, বাড়িতে আছে ছেলার বাবা দেবে গঞ্জনা’ (দক্ষিণ ২৪ পরগনা)। দেখা যাচ্ছে, বিবাহিতা মহিলারাও– পর্দার তোয়াক্কা না করেই পাড়ায় পাড়ায় মাছ বিক্রি করে রোজগার করেন আজও।
মাছ ধরা
শুধু বিক্রিবাটাই নয়, মাছ ধরার কাজও মেয়েরা করেন কখনও কখনও– ‘নিছিলা নদীর ইছিলা মাছ/ হ্যাঙ্গা দিয়া সে মারে’। জলপাইগুড়ির চাউলহাটের গান। আরেকটু দূরে বানে-ভাসা পাড়ায় শুনছি– ‘পয়া সে মাছ কোনা, পয়া সে মাছ কোনা/ মুই সে মারিবার জানু/ সরু জাল দিয়া ধীরে ধীরে মারু রে’। কোথাও আবার বিল ছেঁচা হচ্ছে শুনতে পেলে মেয়েরা সেখানেও হাজির হন– ‘ছ্যাচা বিলে মাছ মা মারিলাম রে/ হেলেঞ্চার শাগে মইজ্যা যায়’ (মালদহ)। কখনও কখনও বৃষ্টির জলে শস্যক্ষেতের মধ্যেও মাছের চলাচল দেখা যায়। মেয়েরা সে সুযোগ ছাড়েন না– ‘আখের ভুঁইয়ে সরুয়া বালি/ গামছা পাতে কতই মাছ ধরি’ (মুর্শিদাবাদ)। কখনও কখনও বৃষ্টিতে জমা জলে কাছাকাছি পুকুর থেকে ভেসে চলে আসে নানা মাছ– ‘রিমিঝিমি হইল জল পুঁঠি মাঝে চলাচল মাছগাকে ওল মিশাই রাঁধলি/ ও জোড়া ঝুমুর গাহলি’ (ঝাড়গ্রাম)। অপ্রত্যাশিতভাবে মাছ পাওয়ার আনন্দে কণ্ঠে বেজে ওঠে সুর। জমা জল যখন প্রায় হাঁটু ছোঁয়, তখন মনে হয় যেন বন্যা এসেছে আর সেই জলে ভেসে আসে আরও নানা মাছ– ‘বান এল অলি গলি ফুলফুলা ফুল/ এক ছোবে সাত শোল ফুলফুলা ফুল’ (মুর্শিদাবাদ)।

কাটা-বাছা-ধোওয়া
মাছ ধরার পরে আসে তার কোটা, বাছা আর ধোয়ার পালা আর তা নিয়েও গান বাঁধেন মেয়েরা– ‘বাহির কর লোহার হাঁসুই, মাছ কাটি ঘ্যাঁচঘোঁচ’– এমন গান শোনা যায়। পয়া মাছের মতো ছোট পিছল মাছ কাটার জন্য না কি ছোট কাটারিও ব্যবহার করা হয়– ‘সরু নাখিরি দিয়া ধীরে ধীরে কাটু রে’ (জলপাইগুড়ি)। টেংরা বা মাগুরমাছ কাটা বেশ ঝামেলা, মেয়েরা তাই বলেন– ‘মাগুর মাছের এলেং আর পেলেং, ট্যাংয়েনা মাছের ওই দাড়ি (গোয়ালপাড়া)। আর ইলিশ মাছের মতো প্রিয় মাছ কাটতে বসলে, মনে আসে অন্য ভাবনা একাধিক অঞ্চলে– ‘ইলিশ মাছগা কাটে লো বউ পেটির দিকে চায়, আহা রে ইলিশার পেটি কার পাতে যায়’ (নোয়াখালি)। বাড়ির মেয়েরা মাছ কাটবেন, ধুয়ে রান্না করবেন, পরিবেশন করবেন, কিন্তু শেষে তাঁদের নিজেদের কপালে কোনও পছন্দের টুকরো জুটবে কি না, তার কোনও নিশ্চয়তা কিন্তু থাকে না। কিন্তু সেই মাছ কতটা সুস্বাদু হবে, তার আন্দাজ তাঁরা পান আগেই– ‘ইলিশ মাছগা ধুইত নিল মেঘনা নদীর কূলে, মেঘনা নদী ভাসি গেল ইলিশার তেলে’ (নোয়াখালি)। তবে নানান ভাবনা ভাবতে ভাবতে কাজ করতে গেলে অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে, বিশেষত ধারওয়ালা বঁটিতে মাছ কাটতে কাটতে অনেক সময় আঙুলও কাটে– ‘রাঙ্গা বউ মাছ কোটে লো বটিতে ফেলিয়া/ মাছ কাটিতে গেল বউয়ার আঙ্গুল কাটিয়া’ (ফরিদপুর)।
মুগ্ধতা
কোটা-ধোয়ার পর, মাছ রান্নার কথা; কিন্তু তার আগে আসি মাছ নিয়ে মুগ্ধতার কিছু গানের কথায়; বর্ষাকালের অল্প অল্প জলে বোয়ালমাছ যখন খেলা করে তার দৃশ্য হয়ে ওঠে অপরূপ। মেয়েরা মুগ্ধ হন– ‘ও কি বইল মাছে খেইল করে, ঝরুয়ালি পানির মাঝে/ ও কি কমর হ্যাঁকা কমর ব্যাঁকা, থেইকরে থেইকরে নাচে’ (গোয়ালপাড়া)। পুঁটিমাছ আমরা অনেকেই দেখলেও, তার সৌন্দর্যের দিকে খেয়ালই করিনি! গ্রামের মেয়েরা বলছেন– ‘ছুটু দহে ছুটু মাছ আর বড় দহে বড় মাছ/ আর কালিদহে রে দিদি কাজলপরা পুঁঠি মাছ’ (পুরুলিয়া)। পুঁটিমাছের কাজলপরা নয়নের সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতা বাংলার মেয়েদেরই আছে। ইলিশমাছের প্রতি তাঁদের পক্ষপাতের কথা তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেন– ‘ছাওয়াল কান্দাইন্যা মাছ, অতিথ ভুজনের মাছ, রান্ধনি পাগল মাছ, ইলিশা রে’ (ঢাকা)।

রান্না আর পরিবেশন
মাছ রান্নার যে কত তারিকা! ভালশরী নামে মেয়েটি ভালো রান্না করে বলে সুখ্যাতি আছে; সে রাঁধছে–
‘ভাজিল চুচুরা মৎস্য, চিতলের কোল–
শোউলের শুকুতা রান্ধে, মাগুরের ঝোল।
তৈলতে ভাজিয়া উঠাই কই মাছের জালি,
চ্যাং মাছু পুড়িয়া শ্যাষে জামুরি দিয়া স্যানে’ (জলপাইগুড়ি)
জামুরি বা লেবু দিয়েই শুধু নয়, তেঁতুল দিয়ে মাছ রান্নাও বাংলার নানা জায়গায় জনপ্রিয়– ‘বামুনদের দুয়ারে তেঁতুল গাছ। ও বামুনরা তাই দেখে, লিতুই খুঁজে বড় মাছ’ (বাঁকুড়া)। বৃষ্টির জলে যে পুঁটিমাছ ধরা হয়েছিল, সেই মাছগুলো, ‘ওল মিশাই রাধোলি/ ও জোড়া ঝুমুর গাহলি’। ওল দিয়ে মাছ রান্নায় যে এত আনন্দ আছে, তা বাংলার মেয়েরা ছাড়া আর কে জানে! অভিজ্ঞা নির্দেশ দেন–
‘চুনো মাছের চচ্চড়ি,
তাতে দিও ফুলের বড়ি।
ভোলা মাছের ভোম্বলা
তাতে দিও কাঁচকলা।
টেংরা মাছের তিনশিরে,
তাতে দিও বেগুন চিরে’ (২৪ পরগনা)

সম্বল যাই থাক না কেন, তা নিয়েই খুশি থাকেন বা খুশি থাকার চেষ্টা করেন বাংলার মেয়েরা। একদিন যদি দু’ রকমের মাছ পাওয়া যায়, আনন্দের প্লাবন আসে; মাগুরমাছটা বড়, তাই তাকে টুকরো করে কাটা হয়। আর কৈ মাছটা ছোট, তাই সেটা গোটা-গোটাই রান্না করে সবার পাতে পরিবেশন করে আনন্দে নেচে ওঠেন মেয়েরা–
‘মাগুর মাছের ঠুমা রে ঠুমি,
আদা বা চাকা চাকি
কৈ মাছের গোটা রে গুটি,
মরিচ আর হলদি
হাত বাড়েয়া পারস কর,
নয়ন ভরিয়া দেখি।
নাচ কর রে সুরূপা সুন্দরী,
হাতে বা দিয়া তালি’ (গোয়ালপাড়া)
মাছ খাওয়াকে ঘিরে এই আনন্দের পরিবেশ গোটা বাড়িকে ছন্দোময় করে তোলে।

মৎস্য আর বৈধব্য
ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজকর্তাদের এই আনন্দটুকুও বোধহয় সহ্য হয় না। তাই তাঁরা বিধবা মেয়েদের মাছ খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। বাল্যবিবাহের বলি যে শিশুটি বুঝলই না বিবাহের অন্তর্গত সৌন্দর্যের কথা, যাকে জোর করে কোনও এক বয়স্ক মানুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল বংশের কৌলীন্য রক্ষার জন্য, সে যখন শিশু-বয়সেই বিধবা হয়, তখনই তার ওপরে নেমে আসে এই মর্মান্তিক বিধান। তার মাছ খাওয়া বন্ধ হয়; একাদশীতে চলতে থাকে নির্জলা উপবাস। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, বাংলার জনসমাজে এই প্রভাব খুব বেশি বিস্তৃত নয়; তাই বৃহত্তর অংশে বিধবার দ্বিতীয় বিবাহ যুগ যুগ ধরেই প্রচলিত ছিল বা আছে। উত্তরবঙ্গে তাকে বলে ‘কাইন’ আর দক্ষিণবঙ্গে তাকে বলে ‘সাঙা’। তাই বিধবা মেয়েদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞাকে সমাজের বৃহত্তর অংশে মান্যতা দেওয়ার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। আবার অনেক সময় কোনও কোনও সমাজে এর প্রভাব কিছুটা হলেও পড়ে; সেখানেও কোনও বৃদ্ধ বা অসুস্থ স্বামীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হলে মেয়েটির মন খুঁজে নেয় অন্য কোনও পুরুষের বন্ধুত্বকে। সে বন্ধুত্ব নিয়ে সমাজের খুব বেশি মাথাব্যথাও থাকে না। তাই মেয়েটি অনায়াসেই বলতে পারে– ‘বিয়ার সোয়ামি মইলে মাছ ভাত খাওং/ মুই বন্ধু মরিলে হব আড়ি (বিধবা)’। মন্ত্র-পড়া মনের বন্ধনহীন স্বামী নয়, বন্ধুকেই সে তার স্বামী বলে মানে; আর তার বিহনেই সে একমাত্র মাছ খাওয়া ছাড়তে পারে– এমন স্পর্ধিত উচ্চারণও বাংলার মেয়েরাই করতে পারেন। মেয়েদের মৎস্যপুরাণ তাই অন্দর-বাহিরের নানা জানলা খুলে দেয়।
[আগ্রহী পাঠক আলোচিত গানগুলি শুনতে পারেন এই ইউটিউব লিংক থেকে।]
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved