Robbar

ম্যাডান থেকে ইন্দ্রপুরী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 27, 2026 7:03 pm
  • Updated:April 27, 2026 7:13 pm  

উনিশ শতকের শেষদিক থেকে ভারতে দেখানো শুরু হয়েছিল পশ্চিমের সিনেমা। জামশেদজি টের পেলেন, চলন্ত ছবির প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। তিনি তৈরি করলেন ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানি’, ১৯০২ সালে; যার কাজ ছিল কলকাতার বুকে বিদেশি সিনেমা দেখানো। প্যারিসে, ১৮৯৬ সালে, পাতে (Pathé) নামের দুই ভাই গড়ে তুলেছিলেন সিনেমার সরঞ্জামের কোম্পানি, সোসিয়েটে পাতে ফ্রের (Société Pathé Frères); তাদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনে, কলকাতার ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে ‘বায়োস্কোপ’ দেখাতে শুরু করলেন জামশেদজি।

উদয়ন ঘোষচৌধুরি

মূল বম্বে শহরটা আসলে ছিল ছোট ছোট সাতটা দ্বীপ– কোলাবা, ছোটা কোলাবা, বম্বে, মাঝগাঁও, পারেল, ওরলি, মাহিম– দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি গ্রিক-রোমান পণ্ডিত ক্লডিয়াস টলেমি, যার একত্রিত নাম দিয়েছিলেন ‘হেপ্টানেশিয়া’। অতীতের পাতায় নানা দখলদারের হাত ঘুরে, জায়গাটা যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রেরিত বম্বে প্রেসিডেন্সির গভর্নর উইলিয়াম হর্নবি দেখাশোনা করছেন, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন– এই সাতটা দ্বীপ জুড়ে দেওয়া হোক। তাহলে, বসবাস আর ব্যবসাপাতির জন্য জমির অফুরন্ত চাহিদা খানিক মিটবে।

কোম্পানির ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ১৭৮২ সালে শুরু হল– ‘প্রোজেক্ট হর্নবি ভেলার্ড’। আরব সাগরের জলোচ্ছ্বাস আটকানোর জন্য বাঁধ তৈরি করা হল; পাহাড় কেটে মিশিয়ে দেওয়া হল আশপাশের সমতলে; আর খাঁড়িগুলোকে বোজানো হল আবর্জনার ডাঁই ঢেলে ঢেলে। (এখানে বলা দরকার, প্রচলিত ও জনপ্রিয় এই ইতিহাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ‘কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’-এর প্রাক্তন ছাত্র টিম রাইডিং। তাঁর অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাতটা দ্বীপ জুড়ে দেওয়ার এই কাহিনি একটু অতি-সরলীকরণ এবং উইলিয়াম হর্নবি আসার আগেই এই কাজ শুরু হয়েছিল।)

একসময়ের দ্বীপপুঞ্জ থেকে বম্বের ক্রমবিবর্তন

কাজটা মোটামুটি শেষ হওয়ার পর, উনিশ শতকের মাঝামাঝি, দেখা গেল ততদিনে জনসংখ্যা আরও বেড়েছে। অতএব, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জমির চাহিদাও। এদিকে, এ-দেশে সদ্য আসা রেলপথের লাইন আর স্টেশন বাড়ানোর জন্যও জমি চাই। এখনকার যে ঠাসাঠাসি গ্রেটার মুম্বই, মিরা-ভাইন্দর, আর ঠানে– তা ছিল আলাদা আলাদা ৬৬টা দ্বীপ; মারাঠি ভাষায় যাকে একত্রে বলা হত– ‘সাসাষ্টি’, বা সংক্ষেপে ‘সাষ্টি’ দ্বীপ। ধীরে ধীরে সেগুলোকেও জুড়ে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হল– ‘ব্যাকবে রিক্ল্যামেশন কোম্পানি’ আর ‘বম্বে রিক্ল্যামেশন ব্যাঙ্ক’।

জায়গাটা তখন আর্থিক দিক থেকে শিখরে। কারণ, ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ায় সেখান থেকে তুলো রপ্তানি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়; এই তুলোই ছিল ইউরোপের বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল। ফলে, রাতারাতি বেড়ে গেল ভারত থেকে ইউরোপে তুলো পাঠানো। বেড়ে গেল বম্বে বন্দরের ব্যস্ততা। মাত্র চার বছরের মধ্যে বম্বে থেকে পাঠানো তুলোর পরিমাণ ৫,৬৬,০০০ বেল (তুলো মাপার একক) থেকে বেড়ে পৌঁছল ১১,১৮,০০০ বেলে। তুলো হয়ে উঠল বম্বের ‘সাদা সোনা’। কিন্তু, এই হইহই বৈভবের মাঝে কেউ খেয়াল করল না, আলো আর আঁধারের সহাবস্থানের মতো সকল বাড়বাড়ন্তের নেপথ্যে রয়েছে ফাটকা বুদ্বুদ এবং মানুষের অপরিসীম লোভ।

বোম্বের তুলো ব্যবসা, উনিশ শতকের আলোকচিত্র

বুদ্বুদটা আচমকা ফেটে গেল ১৮৬৫ সালের ২৬ মে, যেদিন আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শেষ হল। সুতরাং, আবার শুরু হল সেখান থেকে নির্বিঘ্নে ইউরোপে তুলো রপ্তানি। সেই তুলোর গুণগত মান আর দামের তুলনায় ভারত ছিল অনেক পিছিয়ে। পরিণামে, বম্বেতে ভুঁইফোঁড় গজিয়ে ওঠা অসংখ্য কোম্পানি দুম করে দেউলিয়া হয়ে গেল। এই সাংঘাতিক মন্দায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল শেয়ার বাজারে। শেয়ারহোল্ডাররা হুমড়ি খেয়ে পড়ল শেয়ার বিক্রি করার জন্য; কিন্তু, সেসব কেনার কোনও লোক নেই। বাস্তবিক প্রমাণিত হল, চার বছরের রমরমা ব্যবসায় ফাঁপিয়ে তোলা সম্পত্তির থেকে রদ্দি কাগজও অনেক দামি। ভারতের শেয়ার বাজারে প্রথম ধস নামল ১৮৬৫ সালের ১ জুলাই; লোকসানের মোট অঙ্ক ছিল প্রায় ৪৬ কোটি টাকা! আরও অনেকের মতোই ধসে পড়ল ‘ব্যাকবে রিক্ল্যামেশন কোম্পানি’ আর ‘বম্বে রিক্ল্যামেশন ব্যাঙ্ক’।

সেই ব্যাঙ্কের সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিলেন গুজরাট থেকে আসা, বম্বের এক সচ্ছল পার্সি ভদ্রলোক। সর্বস্ব হারিয়ে প্রায় পথে বসলেন তিনি! অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, তাঁর মাত্র ১২-১৩ বছরের ছেলে জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডানকে স্কুলের পাট চুকিয়ে নেমে পড়তে হল রোজগারের ধান্দায়। কিন্তু, ওইটুকু ছেলে কী এমন করতে পারে আর? এতদিন তো রঙিন ছিল তার দুনিয়া! রঙিন দুনিয়া আর বাস্তব ঠোক্করের মধ্যবর্তী অংশে কাজ পেল বালক। বম্বের এলফিনস্টোন কলেজে ভূমিষ্ঠ হওয়া ‘এলফিনস্টোন’ নাটক-মণ্ডলীতে ঢুকে পড়ল সে, ১৮৬৮ সালে। কাজ ছিল মঞ্চের পর্দা টানা, যার গালভারী নাম ‘কার্টেন পুলার’। কিশোর জামশেদজির জীবন বদলে গেল, যখন খুবই অল্পবয়সে সে সুযোগ পেল মঞ্চে অভিনয় করার, নুসেরওয়ানজি পারেখের নাটক ‘সুলেমানি শামশের’-এ। পাশাপাশি, ‘এলফিনস্টোন’ নাটক-মণ্ডলীর নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল সারা ভারতে; তাদের শো রমরমিয়ে চলতে থাকল গোটা দেশজুড়ে। আর, জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে দলের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে দেশের নাড়ি-নক্ষত্র বুঝতে থাকল জামশেদজি।

জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডান

২.

যৌবনে পা রেখে জামশেদজি ছেড়ে দিলেন সেই নাটকের দল! করাচি গিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন, ১৮৮২ সালে। মাত্র একবছর সেখানে কাটিয়ে কলকাতায় চলে এলেন ১৮৮৩ সালে। ইংরেজদের আনুকূল্যে তখনকার কলকাতাবাসীদের বিনোদনে ‘থিয়েটার’ বিষয়টা ছিল শীর্ষে। তীক্ষ্ণবুদ্ধির জামশেদজি প্রথমে শুরু করলেন ব্রিটিশ আর্মিতে মালপত্র যোগান দেওয়ার ব্যবসা; আর তাঁর ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠতে সময়ও লাগল না বিশেষ। কিন্তু, শুধুমাত্র মোটামাথার ব্যবসাদার ছিলেন না তিনি। তাঁর প্রথম প্রেম ছিল মঞ্চ, নাটক, শিল্পকলা। মুনাফার টাকা দিয়ে তিনি কিনলেন ‘করিন্থিয়ান থিয়েটার হল’; ঠিকানা: ৫, ধর্মতলা স্ট্রিট (এখন, লেনিন সরণি)। পরে, এই হলেরই নাম হয়েছিল ‘অপেরা সিনেমা’। আর কিনে নিলেন তাঁর প্রথম কর্মভূমি, ‘এলফিনস্টোন থিয়েটার কোম্পানি’, দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কুভারজি নাজিরের কাছ থেকে। করিন্থিয়ান হল ছিল দুর্দান্ত ঝাঁ-চকচকে; আর ছিল তখনকার দিনের বিরল ঘটনার সাক্ষী: নারীচরিত্রে সেখানে অভিনয় করতেন মহিলারাই। এরই পাশাপাশি, বম্বেতেও জামশেদজি দুটো পার্সি থিয়েটার কোম্পানির মালিক হলেন।

উনিশ শতকের শেষদিক থেকে ভারতে দেখানো শুরু হয়েছিল পশ্চিমের সিনেমা। জামশেদজি টের পেলেন, চলন্ত ছবির প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। তিনি তৈরি করলেন ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানি’, ১৯০২ সালে; যার কাজ ছিল কলকাতার বুকে বিদেশি সিনেমা দেখানো। প্যারিসে, ১৮৯৬ সালে, পাতে (Pathé) নামের দুই ভাই গড়ে তুলেছিলেন সিনেমার সরঞ্জামের কোম্পানি, সোসিয়েটে পাতে ফ্রের (Société Pathé Frères); বিশ শতকের শুরুতে যা হয়ে উঠেছিল চলচ্চিত্রের সরঞ্জাম সরবরাহে বিশ্বের সবথেকে বড় সংস্থা। তাদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনে, কলকাতার ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে ‘বায়োস্কোপ’ দেখাতে শুরু করলেন জামশেদজি।

পাতে ভাইয়েরা

পরের কয়েক বছর তিনি বেশ কয়েকটা শর্ট আর ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানো আর দেখানোর জন্য লগ্নি করলেন; সেগুলোর মধ্যে ছিল জ্যোতিষ সরকারের ‘গ্রেট বেঙ্গল পার্টিশন মুভমেন্ট: মিটিং অ্যান্ড প্রসেসন’ (১৯০৫)। সেই বছরেই হ্যারিসন রোডে (এখন, মহাত্মা গান্ধী রোড) ‘আলফ্রেড থিয়েটার’ কিনলেন তিনি; সেখানে শুরু হল তাঁর প্রযোজিত শর্ট ফিল্ম দেখানো। ভারতের প্রথম স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ, ‘এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস’ তৈরি করলেন ১৯০৭ সালে, চৌরঙ্গী প্লেসে; যেখানে একসময়ে আসন সংখ্যা ছিল ১,৭০০! পরে, এই হলেরই নাম হয়েছিল– ‘মিনার্ভা’; আরও পরে ‘চ্যাপলিন’। (উত্তর কলকাতার ‘মিনার্ভা থিয়েটার’-এর সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেলবেন না, প্লিজ।) শোনা যায়, উত্তমকুমারের বাবা, সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় একসময় প্রোজেক্টর চালাতেন এখানে।

ভারতের প্রথম স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ ‘এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস’

ক্ষুরধার বুদ্ধির জামশেদজি পাতে কোম্পানির এজেন্ট হলেন ১৯০৮ সালে। এজেন্সির দরুন, দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সিনেমা দেখানোর একচেটিয়া অধিকার পেল তাঁর কোম্পানি। এই দূরদৃষ্টিতে খুব অল্পদিনের মধ্যে আরও বাড়ল তাঁর ব্যবসা। তাঁর পরিবেশনায় সিনেমার সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পড়ল অবিভক্ত ভারতের কোণে কোণে, বার্মায়, শ্রীলঙ্কায়। এক দশক পেরনোর আগেই এই উপমহাদেশে তাঁর মালিকানায় গড়ে উঠল ৩৭টা সিনেমাহল!

ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেডের লেটারহেড, ১৯৩১

মোহনবাগানের সঙ্গে ১৯১১ সালে ইংরেজদের ফুটবলের লড়াই মনে আছে, যে-খেলায় ভারতীয়দের টিম হারিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশদের? শোনা যায়, জামশেদজির কোম্পানি শুট করেছিল সেই ঐতিহাসিক আইএফএ শিল্ড খেলার ফাইনাল ম্যাচ; যা ছিল এ-দেশের মাটিতে কোনও স্পোর্টস ইভেন্টের প্রথম সরাসরি ডকুমেন্টেশন।

১৯১১-তে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক শিল্ড জয়ের একটি মুহূর্ত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে (১৯১৪-’১৮) ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে রসদ সরবরাহের ব্যবসাতেও প্রচুর আয় হল তাঁর। এমনকী, তাঁর পরিষেবার জন্য তাঁকে দেওয়া হল ‘অফিসার অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ খেতাব। অন্যদিকে, ১৯১৫-’১৬ সালে যুদ্ধের মাঝেই তিনি নামলেন থিয়েটারের আরেক অধীশ্বর, মরিস ব্যান্ডম্যানের সঙ্গে নিলামের লড়াইয়ে। নিলামের বিষয়: ব্রিটিশ সরকারের তরফে যুদ্ধকালীন ‘প্রোপাগ্যান্ডা ফিল্মস’ দেখানোর বরাত পাবে কার কোম্পানি। সেই প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়লেন লন্ডনের রাজদরবারের লবিবাজ আর এজেন্টরাও। বরাতটা তখনকার মতো ব্যান্ডম্যান পেলেন ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে তিনি সখ্যতা স্থাপন করতে একপ্রকার বাধ্য হলেন জামশেদজির কোম্পানির সঙ্গে।

মরিস ব্যান্ডম্যান

ততদিনে, এ-দেশে তৈরি হয়েছে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিল্ম, ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ (১৯১৩)। যুদ্ধের বাজারে, ব্যবসার শত ব্যস্ততার মাঝেও থেমে থাকলেন না জামশেদজি। দাদাসাহেব ফালকের কাহিনি অনুসরণেই প্রযোজনা করলেন ‘সত্যবাদী রাজা হরিশচন্দ্র’ (১৯১৭)। কলকাতায় শুট হওয়া প্রথম সিনেমা ছিল এটাই।

শুধু কি এই-ই? উঁহু। তুমুল ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেই তাঁর নজরে পড়ল একটা বই, ১৯১৫ সালে, ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভাবের অভিব্যক্তি’। বইটির বিষয়: মেকআপের কলাকৌশল। রূপকলা সম্বন্ধে ধীরেন্দ্রনাথের জ্ঞান ও বোধ দেখে, মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ডেকে নিলেন জামশেদজি। কয়েক বছর পর, নিজের কোম্পানি খুলে ধীরেন্দ্রনাথ প্রযোজনা করলেন ‘বিলাত ফেরত’ (১৯২১); মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করলেন নিজেই; পরিচালনা করলেন নীতিশ লাহিড়ী; আর, ক্যামেরার পিছনে থাকলেন জ্যোতিষ সরকার। ‘বিলাত ফেরত’ ছিল সর্বার্থে প্রথম ‘বাঙালি’ ফিল্ম– কাস্ট, ক্রু, এমনকী সেকালের রীতি অনুসারে, লাইভ মিউজিক ব্যান্ডের সব্বাই ছিলেন বাঙালি। এই সিনেমাটি উল্লেখ্য আরেকটি কারণে: ভারতীয় পর্দায় প্রথম চুম্বন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল এখানেই!

ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানি হয়ে উঠল ‘ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেড’, ১৯১৯ সালে। টালিগঞ্জ অঞ্চলে প্রায় ১০ বিঘা জমি নিয়ে তৈরি হল ‘ম্যাডান স্টুডিও’; এখন যার নাম ‘ইন্দ্রপুরী স্টুডিও’। সেই স্টুডিওর প্রযোজনায়, বাংলার মাটিতে তৈরি হল প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিল্ম, ‘বিল্বমঙ্গল’ (১৯১৯); পরিচালনা করলেন রুস্তমজি ধোতিওয়ালা।

আফসোস, এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গিয়েছিল ম্যাডান স্টুডিওর প্রায় সব ফিল্ম। তবে, কয়েক বছর আগে প্যারিসের সিনেমাতেক ফ্রঁসেজ (Cinematheque Francaise) ‘বিল্বমঙ্গল’-এর মোটামুটি ২০ মিনিটের কিছু দৃশ্য পাঠিয়েছে ‘ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ ইন্ডিয়া’-র (এনএফএআই) কাছে। সেই ফুটেজে দেখা যায়, তখনকার তুলনায় সেই সিনেমার শিল্প নির্দেশনা কতটা উন্নত ছিল! আর, সেই বছরেই ম্যাডান থিয়েটার্স কিনে নিয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা বানানোর স্বত্ব, ৩০ হাজার টাকায়!

এখনকার ইন্দ্রপুরী স্টুডিও, যা একসময়ে ছিল ম্যাডান স্টুডিও

সে-যুগের চলতি ধারা মেনে, ম্যাডান স্টুডিওর প্রযোজনায় অধিকাংশ সিনেমার কাহিনি ছিল পৌরাণিক। যদিও, সামাজিক কাহিনি নিয়েও কয়েকটা সিনেমা তৈরি হয়েছিল বটে। প্রথমদিকে, সেখানকার বেশিরভাগ শিল্পী ছিলেন থিয়েটারের; আর মুখ্য চরিত্রের অভিনেত্রীরা সাধারণত ছিলেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, যাঁরা ভারতীয় ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। প্রচলিত সেই রীতির বিরুদ্ধে গিয়ে, নিজের আসল নাম বজায় রেখে প্রথম তারকা হয়েছিলেন পেশেন্স কুপার। ‘নল দময়ন্তী’ আর ‘ধ্রুব চরিত্র’-এ (দুটোই রিলিজ হয়েছিল ১৯২১ সালে) তাঁর কাজ দেখে ‘ধন্য-ধন্য’ করেছিলেন সমঝদাররা। ‘পত্নী প্রতাপ’-এ (১৯২৩) তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন ভারতীয় সিনেমায় অন্যতম প্রথম দ্বৈত চরিত্রে কাজ করার। বিখ্যাত হয়েছিল ‘নল দময়ন্তী’-র স্পেশাল এফেক্টস-ও। স্টুডিওতে কয়েকজন ভারতীয়ের পাশাপাশি পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন একগুচ্ছ নামকরা ইউরোপিয়ান– যেমন জর্জো মানিনি, ইউজেনিও ডি লিগুরো, কামি’ল গ্র্যান্।

পেশেন্স কুপার

৩.

মঞ্চের পর্দা টানার কাজ দিয়ে জীবন শুরু করা জামশেদজির চূড়ান্ত সফল জীবনের পর্দা পড়ল ১৯২৩ সালের ২৮ জুন। তবে, তাতে কোনও ভাঁটা পড়ল না ম্যাডান স্টুডিওর ব্যবসায়। গত শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষদিকে, ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেডের মালিকানায় ছিল এই উপমহাদেশের ১০০-টিরও বেশি সিনেমাহল; যার আওতায় পড়ত এই উপমহাদেশের বক্স অফিসের অর্ধেকের বেশি। বাংলা ভাষায় তৈরি হওয়া প্রথম সবাক সিনেমা ‘জামাইষষ্ঠী’ (১৯৩১) ছিল এই স্টুডিওর প্রযোজনা। যদি ভাবেন, সবথেকে বেশি গান আছে ‘হম আপকে হ্যাঁয় কউন…!’ (১৯৯৪), বা ‘রকস্টার’ (২০১১), বা ‘মেট্রো… ইন দিনোঁ’-তে (২০২৫)– তাহলে, বিনীত বলি, আপনার ওই ধারণা একেবারেই ভুল! ম্যাডান স্টুডিওর প্রযোজনায়, নাগরদাস নায়েকের সুরে ‘ইন্দ্রসভা’-য় (১৯৩২) ছিল প্রায় ৭০টা গান!

ভারতীয় বায়োস্কোপের রূপকার– জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডান

স্বাধীনতার আগের সময়ে– কলকাতা যখন প্রকৃত যুবতী– তখন তার হৃদকুঠুরিতে ম্যাডান স্টুডিওর জনপ্রিয়তার আরেকটা প্রমাণ রেখে গিয়েছেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর ‘ম্যাডান থিয়েটার বাই নাইট’ ছবিতে। ছবিটা এখন রাখা আছে, নিউ দিল্লির ‘ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্ট’-এ (এনজিএমএ)। আন্দাজ করা হয়, ছবিতে আঁকা বিল্ডিংটা ছিল ‘প্যালেস অফ ভ্যারাইটিজ’; যা পরে হয়েছিল ‘এলিট সিনেমা’। যদিও, কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেন যে, এলিট সিনেমাহল নয়; আঁকার সময়ে গগনেন্দ্রনাথের কল্পনায় হয়তো ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেডের অন্য কোনও বিল্ডিং ছিল।

‘ম্যাডান থিয়েটার বাই নাইট’, শিল্পী: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

গত শতকের তিনের দশক-জুড়ে হওয়া মহামন্দার তাণ্ডবে, সাংঘাতিক লোকসানের মুখে পড়ে ম্যাডানের ব্যবসা। শেষমেশ, ১৯৩৭ সালে বন্ধ হয়ে গেল ম্যাডান থিয়েটার্সের দরজা। মহাকালের অব্যর্থ নিয়মে মুছে গেল বা ভেঙে দেওয়া হল একসময়ে তাদের মালিকানায় থাকা অধিকাংশ সিনেমাহল। তবু, যদি কোনও বেভুল বিকেলে ধর্মতলা চত্বরে ম্যাডান স্ট্রিটের আশপাশে যান, তাহলে অন্তত একবার সেলাম করবেন ভারতের ‘প্রথম মুভি মোগল’-কে। অথবা, যদি এই উপমহাদেশের কোনও প্রান্তে, আজও কোথাও, একটু অবশিষ্ট সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমাহল দেখতে পান, তাহলে উঁকি দিয়ে দেখবেন, হয়তো তার ইটে লেখা আছে জামশেদজি ফ্রামজি ম্যাডানের নাম।

তথ্যসূত্র:
১. ‘দ্য ফেইলিওর অফ দ্য ব্যাঙ্ক অফ বম্বে, ১৮৪০-১৮৬৮’, ক্যারল গ্রেস লোভেল, ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, ১৯৭১
২. ‘কলকাতা সিটি গাইড’, সম্পাদনা: স্বাতী মিত্র, গুডআর্থ পাবলিকেশন, ২০১১
৩. ‘সিনেমা সেঞ্চুরি’, সংকলন: অর্পিতা বসু, আউটলুক, জুন ৪, ২০১২
৪. ‘উদোর পিণ্ডি’, উদয়ন ঘোষচৌধুরি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪
৫. ‘ম্যানেজিং থিয়েটার অ্যান্ড সিনেমা ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া: মরিস ই. ব্যান্ডম্যান, জে. এফ. ম্যাডান অ্যান্ড দ্য ওয়ার ফিল্মস’ কন্ট্রোভার্সি’, ক্রিস্টোফার বাল্মে, পপুলার এন্টারটেইনমেন্ট স্টাডিজ, ভলিউম ৬, ইস্যু ২, স্কুল অফ ক্রিয়েটিভ আর্টস, ইউনিভার্সিটি অফ নিউক্যাসেল, ২০১৫
৬. ‘দ্য রিক্ল্যামেশন অফ মুম্বই– ফ্রম দ্য সি, অ্যান্ড ইটস পিপল?’, শ্রীনাথ পেরুর, দ্য গার্জিয়ান, মার্চ ৩০, ২০১৬
৭. ‘জে. এফ. ম্যাডান’, করণ বালি, আপারস্টল, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৬
৮. “রিমেম্বারিং দ্য টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি থিয়েটার ইম্প্রেসারিও হু বিল্ট মুম্বাই’স আইকনিক অপেরা হাউজ”, আকাশ কারকারে, স্ক্রল, অক্টোবর ১৮, ২০১৬
৯. “ ‘মেকিং বম্বে আইল্যান্ড’: ল্যান্ড রিক্ল্যামেশন অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল কনসেপশনস অফ বম্বে, ১৬৬১-১৭২৮”, টিম রাইডিং, জার্নাল অফ হিস্টোরিক্যাল জিওগ্রাফি, ৫৯, এলজেভিয়ার, ২০১৮
১০. “ইন্ডিয়া’স হিস্টোরিক সিনেমা হলস ডিজার্ভ এ সেকেন্ড চান্স”, অ্যাসলি কোটেস, মিডিয়াম, অক্টোবর ১, ২০২১
১১. “ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেড: দ্য সাইলেন্ট ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি’স জায়ান্ট কর্পোরেশন”, আরজান, পার্সি খবর, নভেম্বর ১২, ২০২১
১২. ‘দ্য পার্সি পায়োনিয়ার অফ দ্য বেঙ্গলি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি’, দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়, পিপুল ট্রি, অক্টোবর ৬, ২০২২
১৩. “দ্য ফরগটেন হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’স ওল্ডেস্ট সিঙ্গল-স্ক্রিন মুভি থিয়েটার”, ভাস্বত সরকার, হোমগ্রোন, মার্চ ২৮, ২০২৩
১৪. ‘ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি: পায়োনিয়ারিং ফিগার ইন বেঙ্গলি সিনেমা হিস্ট্রি’, সানি শঙ্কর, এডিটোরিয়ালজে, নভেম্বর ১৮, ২০২৫

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ম্যাডান থিয়েটার্স রিসার্চ গ্রুপ